কিছু কিছু ভ্রমণ-কাহিনি হয় এমন, যেগুলো পড়লে বোঝা যায়না সেগুলো কোনও ব্যক্তি বিশেষের ভ্রমণের কথা নাকি সে স্থান সংক্রান্ত কোনও জ্ঞানকোষ থেকে তুলে দেয়া অংশ বিশেষ। কোনটিতে আবার লেখকের ভ্রমণ-কৃত স্থান, তার পরিবেশ, মানুষ, সেখানকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য- এসবের চাইতে বেশি প্রাধান্য পায় লেখকের নিজের কথা। আরেক শ্রেণির ভ্রমণকাহিনিতে ছবির আধিক্যে প্রাণ হারায় মূল লেখা। সঞ্জয় দের লেখা ভ্রমণকাহিনি এই তিনটি বিষয় থেকেই মুক্ত। লেখকের লেখাগুলো নিছক ভ্রমণকাহিনি নয়; তা ছুঁয়ে যায় সমসাময়িক ঘটনাবলী, ইতিহাস, ঐতিহ্য আর শিল্পকলা। আর এর সাথে পরিমিত পর্যায়ে সমন্বয় ঘটে লেখকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণলব্ধ অভিমতের। মার্কিন-প্রবাসী এই লেখক নিছক শখের বশে ঘুরে বেড়িয়েছেন পূর্ব ইউরোপের সাবেক সমাজতান্ত্রিক বেশ কয়েকটি দেশে। কৈশোর থেকে নিজের ভাবনার জগতে এই দেশগুলো সম্পর্কে লুকিয়ে থাকা কৌতূহলই লেখককে বাধ্য করেছে ইউরোপের এ অঞ্চল পরিভ্রমণে। বাল্টিক থেকে বলকান পর্যন্ত তার সেই ভ্রমণের ইতিবৃত্তে লেখক তুলে আনার চেষ্টা করেছেন সমাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের পর এই দেশগুলোর সমসাময়িক কিছু রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক দৃশ্যকল্প। এসবের সাথে সাথে এই দেশগুলোর পূর্বকালের প্রাসঙ্গিক ইতিহাস, নির্বাক স্থাপত্য আর সবাক জনগোষ্ঠীও সাথী হয়েছে লেখকের লেখনীর। এই বইয়ের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকা গল্পগুলোর কাব্যময়তা আর গতিশীলতা কখনও পাঠককে টেনে নিয়ে যাবে লাটভিয়ার রাজধানী রিগার লুথেরান গির্জার সম্মুখের টিউলিপের বাগানে আবার কখনও বসনিয়ার সারায়েভোতে বলকান যুদ্ধ শেষে নতুন করে জীবন সংগ্রামে উদ্দীপ্ত যুবক মুগদিবের কাছে।(http://boi-wala.com/riga-theke-saraje...)
ফ্ল্যাপে লেখা আছে, সঞ্জয় দে'র ভ্রমণগদ্যে "সমসাময়িক ঘটনাবলী, ইতিহাস, ঐতিহ্য আর শিল্পকলা " ঢুকে পড়ে। এ পর্যবেক্ষণ যথাযথ।তবে "রিগা থেকে সারায়েভো "তে ভ্রমণের চাইতে ইতিহাসের অংশ বেশি।পূর্ব ইউরোপের সাবেক সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে ভ্রমণ নিয়ে লিখতে যেয়ে লেখক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, হলোকাস্টসহ প্রাসঙ্গিক অনেক বিষয়ে তথ্য উপস্থাপন ও আলোচনা করেছেন। বইয়ের মূল কেন্দ্রবিন্দু যেহেতু ইতিহাস, লেখক পুরোপুরি সেদিকেই মনোনিবেশ করতে পারতেন। ছড়িয়ে ছিটিয়ে অল্প যেটুকু ভ্রমণের গল্প আছে তা গুরুগম্ভীর ও তিমিরাচ্ছন্ন অতীত ঘটনার পাশে বেমানান মনে হয়েছে ব্যক্তিগতভাবে। এমনিতে পুরো বইটা পড়তে ভালো লেগেছে।
ট্যাঁকে কড়ি আর ইচ্ছে থাকলে দু'চোখ ভরে দুনিয়া দেখা যায়। ঘুরে বেড়ানো যায় মনের মতো করে। সঞ্জয় দে যুক্তরাষ্ট্র থাকেন। বড়ো চাকরি করেন। অবসর পেলে বেরিয়ে পড়েন দেশ দেখতে। সেই যাত্রার বৃত্তান্ত লিখতে পছন্দ করেন। মোটকথা, নিজের বেড়াবার অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখালিখি করেন ভদ্রলোক। এবার বলকান রাষ্ট্রগুলো যথা- ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, বুলগেরিয়া,লিথুনিয়াসহ পূর্ব ইউরোপের একাধিক দেশে ঘুরেছেন তিনি। পথের দেবতার সান্নিধ্যের পাশাপাশি চাক্ষুষ করেছেন ইতিহাসের নানা ভাঙা-গড়ার সাক্ষী স্থাপনা ও স্থান।
প্রকৃতই পায়ের তলায় সর্ষে যাদের থাকে, তারা ঘুরে বেড়ান বটে। অতীত বর্ণনা করেন। কিন্তু তা অবশ্যই ন্যূনতম নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে। কেননা পক্ষপাতপুষ্ট হয়ে গেলে তা ভ্রমণকারীর চোখকে প্রভাবিত করে। এতে লেখার মান বিনষ্ট হয়। ঠিক এমনটাই ঘটেছে সঞ্জয় দে'র ক্ষেত্রে। বলকান রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘদিন সোভিয়েট বলয়ে ছিল। সমাজতন্ত্রের দোষ-ত্রুটি নিশ্চয়ই ছিল। নতুবা ত্যক্ত-বিরক্ত হয় মানুষ এই মতাদর্শ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতো না। কিন্তু সঞ্জয় দে'র বয়ান পড়লে মনে হবে, সমাজতন্ত্রের মতো জঘন্য মতবাদ আর নেই। সোভিয়েটের ন্যায় অত্যাচারী রাষ্ট্র আর একটিও ছিল না। সারকথা হলো সমাজতন্ত্র খারাপ। তাই এর পতন ঘটেছে। বিপরীতে আমেরিকাসহ ইউরোপের ধনতন্ত্র হলো উত্তম পন্থা।
বলকান রাষ্ট্রগুলো নিয়ে আমার জানাশোনা নেই। তবু আমার মতো অর্বাচীন আবিষ্কার করলো, ভুলভাল ইতিহাস শেখাচ্ছেন সঞ্জয় দে। একটা উদাহরণ দিই- লেখক লিখেছেন, ষাটের দশকের শেষের দিকে লিথুনিয়ায় সোভিয়েটের জুলুমের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলো ব্যবস্থা নিতে পারেনি স্রেফ স্ট্যালিনের ভয়ে! অথচ স্ট্যালিন মারা গেছেন ১৯৫৩ সালে। বুঝুন অবস্থা।
দেখবার ক্ষমতা থাকলেই হয় না। তা লিখে প্রকাশ করার মতো কলমের জোর থাকা চাই। এখানেও মার খেয়ে গেছেন সঞ্জয় দে। একদম একঘেয়ে বর্ণনা। পড়ে আরাম নেই। তবে হ্যাঁ, বুলগেরিয়া ভ্রমণের পর্বটি বেশ আয়েশ করে উপভোগ করা গেছে।
একান্তই হাতে বই না থাকলে পড়তে পারেন। নতুবা ভ্রমণকাহিনি পড়ার মর্জি থাকলে সঞ্জয় দে মুখো না হওয়াই উত্তম।
আমি খুব অলস মানুষ।তবে সঞ্জয় দাদার ভ্রমণ কাহিনিগুলো পড়লে মনে হয় ব্যাগপেগ নিয়ে বেরিয়ে যাই।এই বইটা পড়ার ইচ্ছে অনেক দিন ধরেই ছিলো,অবশেষে পড়া হলো।দারুন লাগছে।
"এখানে আনন্দ নেই, তবে আছে বিগত কালো ইতিহাসকে জানবার উপাদান।" অ্যামস্টারডাম থেকে ভিলনুসের কেজিবি জাদুঘর দেখতে আসা সেই দর্শণার্থীর লিখে রেখে যাওয়া লাইনটা এই বইয়ের বিষয়বস্তু অনেকাংশেই তুলে এনেছে। কারণ লেখক এই বইতে তার পূর্ব ইউরোপের বেশকিছু দেশ ঘুরে দেশগুলোর উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া যুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি আর ফেলে যাওয়া চিহ্নগুলো তুলে এনেছেন।
লেখক ঘুরেছেন পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়াসহ বেশ কিছু দেশ। সাবেক সমাজতন্ত্রের দিনগুলো থেকে আজকের গনতন্ত্রের যুগে দেশগুলো, মানুষগুলো কেমন আছে তা প্রত্যক্ষ করেছেন খুব কাছ থেকে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে ঘুরতে ঘুরতে পুরনো ইতিহাসের বুলি আওড়াতে গিয়ে উপরি পাওনা হিসাবে পাঠকদের ইতিহাসের পাঠও দিয়ে গেছেন। ইতিহাসের কালো কিছু অধ্যায়ের সাথে পরিচয় করিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যুগোস্লাভিয়ায় নব্বইয়ের দশকের যুদ্ধ, বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় চলমান সার্ব ক্রোয়াট ও মুসলিমদের কোন্দলের ইতিহাস উঠে এসেছে ক্ষণে ক্ষণে। পোল্যান্ডে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রেখে যাওয়া চিহ্ন আউসভিতজ বিরকানাও কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, মায়দানেক ক্যাম্প, ভিলনুসের কেজিবি জাদুঘর বা গনহত্যা জাদুঘর, প্রিনসিপের হাতে ফারদিনান্দের পতনের স্থান সেই প্রিনসিপ সেতু (যা থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত) সব খুব কাছ থেকে দেখেছেন লেখক। মানুষের সাথে মিশে লক্ষ্য করেছেন হাঙ্গেরিসহ ইউরোপের অনেক দেশে কর্মক্ষেত্রের প্রতি পদে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ। দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের কাছে শুনেছেন আজো মার্শাল টিটোর প্রতি সম্মান, তাঁর সময়ের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য স্মৃতি রোমন্থন।
কিন্তু তাই বলে পুরো বইটাকে বিষাদগ্রস্ত ভাববেন না।জার্মান বাহিনীকে ধোঁকা দিয়ে এক ফার্মেসীর আড়ালে বহু ইহুদিকে বাঁচিয়ে দেওয়া পানকিভিজ সাহেবের সাহসিকতার গল্প, হাঙ্গেরির পাতালে অবস্থিত লবনখনির আধিভৌতিক সৌন্দর্য, ভিলনুসের স্থাপত্যশিল্পের চমৎকার সব নিদর্শন, সারায়েভোর হোটেল মালিকের আতিথেয়তাসব চমৎকার সব সুখকর স্মৃতিও ছড়িয়ে আছে পুরো বই জুড়ে।
সব মিলিয়ে রিগা থেকে সারায়েভো একটা ফুল প্যাকেজ। ইতিহাস, শিল্প, সমাজ, রাজনীতি, প্রকৃতি সব মিলে এক হয় সঞ্জয় দে'র লেখায়।
নব্বই দশকের প্রথমার্ধে যখন প্রাইমারি ইশকুলে পড়তাম, রোজ সকালে ঘুম ভাংত রেডিওতে বিবিসির খবর শুনে। অফিসের জন্য প্রস্তত হতে হতে বাবা শুনতেন। উপসাগরীয় যুদ্ধের ডামাডোলের পরে একসময়ে খবর জুড়ে থাকত বলকানের নানান সংঘাতের সংবাদ। জানা যেত জাতিসংঘের মহাসচিব বুট্রোস ঘালি কিংবা মার্কিন রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিন্টন যুদ্ধ পরিস্থিতি সম্পর্কে কী বলেছেন। এভাবে একসময়ে হলিউডি সিনেমায় দেখানো পূর্ব ইউরোপের মলিন চেহারা আর দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের যুদ্ধবিধ্বস্ত মুখ ধারনায় স্থায়ী আসন করে নিয়েছিল। মাসুদ রানা কিছু কিছু মিশনে ওদিকে ঘোরাঘুরি করলেও গড়পরতা বাঙালি শখ করে পূর্ব ইউরোপ কিংবা বলকানের দেশগুলোতে এভাবে ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ জায়গাগুলোতে ঘুরছে আর ভ্রমণকাহিনী লিখছে এমনটা খুব একটা দেখা যায়নি। আর যাও বা দুয়েকজন পর্যটকের দ���খা পাই তাদের লেখা খুব একটা আকর্ষণ করে না।
'রিগা থেকে সারায়েভো' ভালো লাগার কারণ হলো যেসব জায়গায় লেখক গিয়েছেন সেখানকার প্রকৃতি, ইতিহাস, স্থাপত্য, সংস্কৃতি আর মানুষের বর্ননা দিয়েছেন অত্যন্ত প্রাণবন্তভাবে। বলেছেন নিজের ভাবনা আর অনুভূতির কথা। আমার মত ভ্রমণবিমুখ ছাপোষা কেরানীকেও এই বই ভ্রমণে উদ্বুদ্ধ করে তুলতে চায়। আমি ইতিউতি গুগল সার্চ মেরে চেষ্টা করি একটা ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরি করতে। আর বইটি শেষ করা মাত্র হাতে তুলে নিই লেখকের পরবর্তী বই 'বলকানের বারুদ'।
লেখক সঞ্জয় দে এঁর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো, বলকান, বাল্টিক অঞ্চলের ভ্রমণ কাহিনি নিয়ে বই রিগা থেকে সারায়েভো। আশির দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। এই টালমাটাল সময়ে লেখক ব্যক্তিগত জীবনে যে কৌতূহলে আবৃত ছিলেন, সেই সূত্র ধরে লেখক চষে বেড়িয়েছেন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়া দেশগুলোতে। ইতিহাসের পথে ধরে তিনি হেঁটেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ঘটে যাওয়া নৃশংসতার অলিগলিতে। পোল্যান্ডের আউসভিতজ, বিরকানাও ক্যাম্প, মায়দানেক ক্যাম্প।
পোল্যান্ডের ক্রাকভ শহরের অদূরে আউসভিতজ গ্রামে নাৎসিরা গড়েছিল গত শতাব্দীর অন্যতম বৃহৎ শব তৈরির কারখানা। পোলিশ, রাশান যুদ্ধবন্দী আর ইহুদি নিধনের জন্য কুখ্যাত এই ক্যাম্পে প্রায় এগারো লাখ মানুষের প্রাণ হরণ করে। জার্মান কেমিক্যাল কোম্পানি জাইক্লন বি গ্যাস ( সায়ানাইড কীটনাশক) তৈরি করত ইঁদুর মারার কাজে। স্ফটিকদানার মতো কীটনাশক বাতাসের সংস্পর্শে এলেই গ্যাসে পরিণত হয়। আর এক কৌটা জাইক্লন বি গ্যাস দিয়ে খুন করা সম্ভব কয়েকশো মানুষ। আর এই গ্যাস চেম্বারে নিধনের পরে মৃতদের নিয়ে যাওয়া হতো দহন ভবনে। আর দাহ করার আগে প্রতিটি মৃতদেহে সোনায় বাঁধানো দাঁত আছে কিনা, আর তা থাকলে উপড়ে ফেলা হতো। এমনকি মৃতদের অঙ্গহানি করেও খোঁজা হতো লুক্কায়িত সম্পদ। এরপরে সেখানে পুড়িয়ে ভস্ম করা হতো তাদের। নৃশংসতা শুধু এখানেই থেমে ছিল না, ক্যাম্পের হাসপাতালে বন্দীদের ওপরে করা হতো কুখ্যাত পরীক্ষামূলক প্রকল্প। জোসেফ মেঙ্গেলে/ ওঙ্কেল মেঙ্গেলে নামে পরিচিত এই দানব শিশুদের ওপর চালাত গবেষণার নামে বিকৃত মস্তিষ্ক প্রসূত অত্যাচার। খুঁজে খুঁজে জমজ শিশুদের ওপর প্রয়োগ করত তার প্রকল্প। কালো চোখের মণিতে তরল প্রবেশ করিয়ে দেখত চোখের মণিতে গাঢ় নীল বর্ণ ধারণ করে কিনা। লেখক আউসভিতজ ভ্রমণের সময় দেখতে পান ক্যাম্পের সামনে ঝুলানো আছে ‘আরবাইটজ মাক্ট ফ্রাই’ অর্থাৎ কর্মেই মুক্তি। এ যেন বন্দীদের সাথে করা নাৎসিদের এক পরিহাস। আউসভিতজের ক্যাম্পে সারি সারি লালচে ইটের ব্যারাক। এই ক্যাম্পে এখনও আছে গ্যাস চেম্বারের নমুনা। করিডরে লাগানো আছে শত শত মানুষের ছবি যারা এখানে যুদ্ধবন্দী ছিল৷ ফ্রেমবন্দী সারি সারি ছবির মাঝে শিশুদের হাসিমাখা মুখের ছবি হৃদয়কে টুকরো টুকরো করে দেয়৷ হয়তো এই শিশুরা জীবনে প্রথম বারের মতো ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, আর তারা বুঝতেও পারেনি কি অপেক্ষা করে আছে তাদের সামনে। আউসভিতজের মুল ক্যাম্পের দূরে দ্বিতীয় ক্যাম্প ‘বিরকানাও’। এই ক্যাম্পটি বানানো হয়েছিল হিট * লার ঘোষিত ইহুদিদের সমূলে উৎপাটনের লক্ষ্যে। ‘Schindler's List’ মুভিতে বিরকানাও ক্যাম্প দৃশ্যায়িত হয়েছিল। আরেকটা ব্যাপার লেখক উল্লেখ করেছেন এই শিন্ডলারস লিস্ট সিনেমা নিয়ে। শিন্ডলার নামের এক সাহেব কারখানা তৈরি করে ইহুদিদের নিয়ে আসতেন তার কারখানায় কাজ করানোর জন্য, তাঁর আসল উদ্দেশ্য ছিল আউসভিতজ ক্যাম্প থেকে তাদের বাঁচানোর উদ্দেশ্য। এভাবে তিনি বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন বহু ইহুদির প্রাণ। লোকচক্ষুর আড়ালে আরেকজন যিনি ইহুদিদের জন্য কাজ করেছেন, তিনি হলেন পানকিভিজ৷ ক্রাকভ শহরে এক ফার্মেসি'র মালিক। ফার্মেসির নাম হলো আপটেকা পড অরলেম, যার বাংলা অর্থ হলো ইগল ফার্মেসি। পানকিভিজ মশাই নাৎসিদের বলে কয়ে এই শহরে দোকান চালানোর পাস জোগাড় করে ফেলেছিলেন। তো, এই ঘোর অমানিশায় তিনি যেন ছিলেন এক আলোকবর্তিকা। বিনা মূল্যে ঔষধ সরবরাহ, খাবার, শত্রুদের খবরাখবর পৌঁছে দিতেন ইহুদিদের নিবাস ঘেটটোতে। লেখক খোঁজ পেয়েছেন পোল্যান্ডের এক লবণখনির। সেই লবণখনির যাওয়ার পথে বাসে চড়বার অভিজ্ঞতাটা বেশ দারুণ। বাসে উপচে পড়া ভীড়, আর এক বুড়ো সিট না পেয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে দাঁড়িয়ে রইলে। কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, হয়তো ওদেশে এসব আদবকেতার বালাই নেই। কিন্তু লেখক তো চর্চা লব্ধ সংস্কৃতি ভুলে যেতে পারেন না। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে তাকে বসার জায়গা ছেড়ে দিতেই সেই বৃদ্ধ মাথা নাড়িয়ে মৃদু স্বরে বললেন, জিঙ্কুয়ে, জিঙ্কুয়ে। লেখক ক্রাকভ শহরে তার হোস্টেলের কাছে পেয়ে যান এক বাংলাদেশির বিরিয়ানির রেস্তোরাঁ। পোল্যান্ডের ক্রাকভ শহরে বাঙালি বিরিয়ানি! আহা!!
আউসভিতজ ক্যাম্পে নির্যাতনের অনেক চিহ্ন লোপাট হয়ে গেলেও পোল্যান্ডের আরেক শহর লুবলিন এ আরেকটা ক্যাম্প আছে। মায়দানেক ক্যাম্প। এ ক্যাম্প ধ্বংস করার সময় পায়নি পলায়নপর জার্মান বাহিনী। মায়দানেক ক্যাম্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল রাশান যুদ্ধবন্দী রাখার জন্য। পরে রাশান, ইহুদিদের ঢল নামে এই যুদ্ধবন্দীদের তালিকায়। ১৯৪৩ সালের ৩রা নভেম্বর নাৎসিরা ১৮ হাজার ৪০০ জন বন্দীকে গুলি করে খুন করা হয়। কী ভয়াবহ নৃশংসতা! এই ক্যাম্পেই এক লাখ ইহুদি আর প্রায় দুই লাখ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীভুক্ত মানুষকে খুন করা হয়। লেখক ভ্রমণ করেছেন বাল্টিক রাষ্ট্র লিথুয়ানিয়ার শহর ভিলনুসে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পরে স্বাধীন হয় লিথুয়ানিয়া। তবে এই স্বাধীনতা বিনা রক্তে আসেনি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগ পর্যন্ত পঞ্চাশটি বছর ধরে লিথুয়ানিয়ার ভিলনুস শহরে দুই নম্বর, অকু গাতভ সড়ক পরিচিত ছিল যমালয় হিসেবে। এখানেই কেজিবি'র কার্যক্রম পরিচালিত হতো। এই পঞ্চাশ বছরে অসংখ্য লিথুয়ানিয়ানদের যাদের মনে করা হতো সোভিয়েত আগ্রাসনের পথের বাঁধা, তাদের পাঠানো হতো সাইবেরিয়ার তুন্দ্রা অঞ্চলে, কিংবা কিরগিজস্তানের বিরান স্তেপে৷ হতভাগা মানুষেরা এটাও জানতো না কি তাদের অপরাধ! এই জাদুঘরে পরিদর্শনের সময়ে লেখক পরিদর্শন খাতায় লিখে এসেছেন, ‘মনুষ্যত্বের জয় হে’।
লেখক ভ্রমণ করেছেন হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট শহরে। দানিয়ুব নদীর এপার ওপার দুই ভাগে বিভক্ত এই শহর- বুদা এবং পেস্ট। এই শহরেই এসেছিলেন রবিঠাকুর। বুদাপেস্ট শহরের সাথে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস। রোমান, রেঁনেসা, বাইজেন্টাইন, ক্ল্যাসিজম, গথিক, রোমান্টিক, আর্ট নুভহ- এই স্থাপত্যরীতির বিবর্তন যেন মেলে ধরেছে শহরের ভবনের স্থাপত্য নকশা। তাই তো এই শহরে মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন কবিগুরু, ❝আমার লিখন ফুটে পথধারে ক্ষণিক কালের ফুলে চলিতে চলিতে দেখে যারা তারে চলিতে চলিতে ভুলে।❞
তবে শুধু সৌন্দর্য নয়, অসৌন্দর্যের তিলকও আছে এ শহরে। কেজিবি'র বিভীষিকার জাল এখানেও ছড়িয়ে রেখেছিল। আন্দ্রেসি স্ট্রিটে রয়েছে হাউজ অব টেরর। নামেই যার পরিচয়। শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্ন দেখিয়ে অন্যায়ের জগদ্দল পাথর চেপে বসেছিল এই ছোট্ট দেশটির ওপরে।
লেখক বাল্টিক দেশ লাটভিয়াতে দুভাগা নদীর তীরের শহর রিগাতে ভ্রমণ করেছেন। এই দেশেই ত্রিশ বছর আগে সোভিয়েত সরকারের আমন্ত্রণে রিগা শহরে এসেছিলেন সুনীল গ���্গোপাধ্যায়। তাঁকে সহ অন্যান্য সাহিত্যিকদের দেখানোর চেষ্টা করেছেন সোভিয়েত সরকারের দয়ায়, সোভিয়েত ইউনিয়নের ছায়াতলে তারা কতটা ভালোভাবে বেঁচেবর্তে আছে। আরেকটা ব্যাপার হলো, হলোকাস্ট নিয়ে আমরা জানি, পোল্যান্ড, জার্মানি, অস্ট্রিয়া - এই তিন দেশের নামই সামনে আসে। কিন্তু লাটভিয়ায় যে কতবড় হলোকাস্ট হয়েছিল, এটা অনেকেই অজানা। ১৯৪১ সালে জার্মান বাহিনী লাটভিয়ার ৯০ ভাগ জনসংখ্যা ইহুদি, সংখ্যায় ৮০ হাজার ইহুদিদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়!
লেখক ঘুরে দেখেছেন যুগোস্লাভিয়ার দেশগুলো। দেখেছেন তুঁতরঙা সাগর অ্যাড্রিয়াটিকের কোল��েঁষে বসনিয়ার শহর মোস্তার। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে চষে দেখেছেন ১৯৯২ এর উত্তাল সময়ের যুগোস্লাভিয়া ভাঙনের দেশগুলো। বসনিয়া গণহত্যার ইতিহাস, সেই সারায়েভো শহর, এখনো ক্ষতের ওপরে প্রলেপ পড়েনি সেই শহরে। সেই শহরের মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। জেনেছেন সেই বিভীষিকার কথা।
বই পড়তে পড়তে মাঝেমধ্যেই আমি দুম করে বই বন্ধ করে দেই, চিন্তা করি, আনমনা হই। কিন্তু এই বইটা পড়তে যেয়ে বারবার বই বন্ধ করতে হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় শূন্যতা নিয়ে, বিষণ্নতা নিয়ে পড়ে যেতে হয়েছে। রেমার্কের গল্পের মতো শূন্যতা নামে পাঠজুড়ে। লেখক শুধুমাত্র ইতিহাস আর স্থানিক বর্ণনা দেননি, জেনেছেন ঐ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কথা৷ তাদের গল্পে এই বই হয়ে উঠেছে ডকুমেন্টারি হিসাবে। লেখার অন্যতম গুণ হলো পরিমিতিবোধ। এজন্য গল্পগুলো তড়তড় করে পড়ে গেছি এক রাশ বিষণ্ণতা নিয়েও। প্রায় প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে লেখক জয়গান গেছেন মানুষের। বিগত শতাব্দীতে ঘটে যাওয়া দুটো বিশ্বযুদ্ধ, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ- আর এতো এতো মানুষের প্রাণনাশ। আসলে এত যে ইজম, তা আসলে কার জন্য? মানুষের জন্য? না কি মানুষ ইজমের জন্য?? এই পৃথিবীতে মানুষের চেয়ে বড় কোনো 'বাদ' নেই। মানুষই সবচেয়ে বড় ইজম। না হলে এত ইজমের কোন্দলে পড়ে মানবতাবাদের গলা কাটা যাবে।
আমি স্বেচ্ছায় বইয়ের প্রথম কয়েকটি লেখার রিভিউ স্কিপ করে যাচ্ছি। কেনো যাচ্ছি সেটা রিভিউর শেষে বলেছি। ছয় নং লেখাটা দিয়েই শুরু করি বরং।
ভালো লাগার ভিলনুস - ভিলনুস লিথুয়ানিয়ার রাজধানী। নেরিস নদীর তীরে আধুনিক এক শহর। এ শহরে সঞ্জয় দে বিদ্যুৎচালিত ট্রাম বাস দেখে অবাক হন। অবাক হন ১৯৯১ এর ১৩ জানুয়ারি রুশ সেনা আর স্বাধীনতাকামী লিথুনিয়ানদের সংঘর্ষের স্মৃতিচিহ্ন টিভি ভবন দেখে, যে সংঘর্ষে ঝড়ে গিয়েছিলো ১৩ টি প্রাণ। উজুপিস এক অদ্ভুত মহল্লা। যে মহল্লার নিজস্ব সংবিধান আছে। আছে প্রেসিডেন্টও। যদিও এই অদ্ভুত পাড়ায় যাওয়ার সৌভাগ্য সঞ্জয় দের হয়নি৷ এছাড়াও লেখক ঘুরে দেখেছেন প্রেসিডেন্ট ভবন (যেখানে ঢোকায় কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই!), লিথুনিয়ার প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট জেদিমিনাসের নামাঙ্কিত জেদিমিনাস স্ট্রিট, শ্বেতশুভ্র ক্যাথেড্রাল ব্যাসিলিকা, কমিউনিস্টদের রোষানলে পড়া সেন্ট অ্যানি চার্চ, পথের মাঝখানে থাকা মিসেরিকরদিয়া চার্চ ইত্যাদি। লিথুয়ানিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিরও একটা ধারণা দিয়েছেন তিনি।
ভিলনুসের যমালয় : ভিলনুস ভ্রমণে যে জিনিসটি বাদ পড়ে গিয়েছিলো সেটি হলো কুখ্যাত কেজিবি জাদুঘর, সোভিয়েত আমলে কেজিবি ও এনকেভিডির লিথুয়ানিয়ান সদর দপ্তর। ১৯৪০ এর বসন্তে কিভাবে লাল বাহিনী হামলে পড়লো লিথুয়ানিয়ায়, কিভাবে হাজার হাজার স্থানীয়কে জোরপূর্বক পাঠানো হলো ইউনিয়নের দূর দূরান্তে, গুপ্ত গণহত্যা, বিরুদ্ধমতের দমন, বন্দীদের ভয়াবহ জীবনসহ সোভিয়েত শাসনের এক কালো ইতিহাসের সাক্ষী এই কেজিবও জাদুঘর।
বুদাপেস্টে বিমোহিত : হাঙ্গেরীর রাজধানী বুদাপেস্টকে বলা হয় পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের সংযোগস্থল। গ্রামীণ পটভূমিতে দানিয়ুবকে দেখতে দেখতে সঞ্জয় দে পা রাখেন এই শহরের সুপ্রাচীন কেলেতি রেলস্টেশনে। হাজার বছরের পুরনো শহর বুদাপেস্ট। কত ধরণের স্থাপত্যরীতি, কত চমৎকার সব আর্ট! কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেই সঞ্জয় দে যতটা সম্ভব ঘুরে নেন হাঙ্গেরীর গথিক স্টাইলে নির্মিত সুবিশাল সংসদ ভবন, যেখানে দেখা পান দ্বাদশ শতাব্দী থেকে চলে আসা বিখ্যাত রাজ মুকুটের। হাঙ্গেরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির খুব কাছের মিত্র ছিলো। ফলে ইহুদি গণহত্যা হয়েছে আকছার। অ্যায়রো ক্রস বাহিনীর তেমনি এক গণহত্যার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দানিয়ুব পাড়ে কিছু জুতোর অবয়ব। দানিয়ুবের পূর্ব পাড়ের পেস্ট আর পশ্চিম পাড়ের বুদায় ঘটা ভয়াবহ রুশ-জার্মান যুদ্ধের কথাও আছে এই লেখায়। সঞ্জয় দে শেষদিকে পেস্ট ছেড়ে নদীর ওপাড়ে বুদায় রওনা দেন। পেস্ট সমতল হলেও বুদা পাহাড়ি। সিটেডাল পাহাড়, প্রেসিডেন্ট প্যালেস (এখানেও নিরাপত্তা নেই তেমন!), ক্যাথলিজমের সূচনাঘর ম্যাথিয়াস চার্চ এবং কেজিবির কুখ্যাত কসাইখানা বা হাউস অব টেরর জাদুঘর ইত্যাদি ঘুরে নেন তিনি। লেখার শেষ অংশে আছে হাঙ্গেরির এন্টি সেমিটিজমের কথা। পোল্যান্ডের আউসভিতজে মাত্র দশ সপ্তাহে দুই লক্ষ হাঙ্গেরিয়ান ইহুদিকে হত্যা করা হয়। দাহানি স্ট্রিটে বুদাপেস্টে প্রাচীন এক সিনাগগ দেখতে দেখতে সেই ইতিহাসই তুলে ধরেন লেখক।
দুগাভা নদীর তীরে : সঞ্জয় দে এবার আরেক বাল্টিক দেশ লাটভিয়ার রাজধানী রিগায়। লাটভিয়ার ফুলের প্রতি ভালোবাসা, কাবাবের প্রতি ভালোবাসা, আর্ট নুভহর প্রতি ভালোবাসা (হাজার মুখের শহর রিগা) এবং ধর্মকর্মের প্রতি কম ভালোবাসা (লুথেরিয়ান চার্চের অবস্থা বেহাল) দিয়ে লেখা শুরু হয়। এখানেও প্রেসিডেন্ট ভবনের নিরাপত্তা নেই বললেই চলে। তবে লেখাটিতে ভ্রমণের চাইতেও বেশি এসেছে লাটভিয়ার প্রাচীন ইতিহাস। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লাটভিয়া রাশিয়ানদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ে, দেশকে জার্মান মুক্ত করে। লেনিনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী লাটভিয়া স্বাধীনতা পেলেও সেই ১৯৪০ এ সোভিয়েতরা আবার দখল করে নেয় দেশটি। ডিপোর্ট করা হয় হাজার হাজার মানুষকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি ত্রাতা হয়ে লাটভিয়াকে উদ্ধার করে, সেই সাথে দেশজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক ইহুদি নিধন। কয়েক মাসের মাথায় দেশটির মোট ইহুদি জনসংখ্যার নব্বই ভাগ মানে আশি হাজার মানুষ নাই হয়ে গেলো। এর নেতৃত্বে ছিলো দালাল বাহিনী ‘আজারস কমান্ডো’ আর তাদের নেতা হার্বার্টস সুকুরস। সিনাগগে প্রার্থনা চলাকালীন ইহুদি হত্যা, ধর্ষণ, রিগা ঘেটোয় পাচার - এমন কুকর্ম নেই যা সুকুরস করেনি। যুদ্ধের পর আর্জেন্টিনা পালালেও নাৎসী হান্টাররা ঠিকই তাকে খুঁজে বের করে হত্যা করেছিলো। যুদ্ধশেষে আবার লাল বাহিনীর কবলে পড়ে লাটভিয়া। যাদের স্বাধীনতার মুখ দেখতে অপেক্ষা করতে হয়েছিলো সেই ১৯৯১ পর্যন্ত। দেশটি এখন রুশ শাসনমুক্ত হলেও রয়ে যাওয়া রাশিয়ান দের সাথে লাটভিয়ানদের এখনো ঠান্ডাযুদ্ধ চলছে।
মোস্তারের প্রস্তর সেতু এবং সারায়েভোর স্নাইপার : এ দুটি কাহিনীতে দেখা যায় সঞ্জয় দে ঘুরছেন যুদ্ধবিধ্বস্ত বসনিয়া-হার্জেগোভিনার দুটি আলোচিত শহর মোস্তার ও সারায়েভোতে। বসনিয়া মানেই সেই ১৯৯২ সালের ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধ। লেখকের কলমেও তাই বারবার এসেছে যুগোস্লাভিয়া ভাঙনের সেই ভয়াবহ দিনগুলি৷ হার্জেগোভিনায় পুঁতে রাখা অজস্র মাইন, বসনিয়াক মুসলিমদের সাথে ক্রোয়েটদের বিশ্বাসঘাতকতা, নেরেৎভা নদীর পূর্বে ক্রোয়েটদের কামানের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত মোস্তার শহরের বাড়ি আর ক্রোয়াট স্নাইপারদের লক্ষ্যবস্তু মোস্তারের প্রস্তর সেতুর বর্ননা দিয়ে শুরু হয় সঞ্জয় দের বসনিয়া ভ্রমণ। সেখান থেকে অনেক ঝক্কি-ঝামেলার মধ্য দিয়ে সারায়েভোয় পা রাখেন তিনি। শুরুতেই লাতিন সেতু ওরফে প্রিন্সিপ সেতু - যার গোড়ায় অস্ট্রিয়ান যুবরাজ ফারদিনান্দকে হত্যা করা হয়, আর বেজে উঠে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা। এরপর একে একে আসে সার্বদের ঘাঁটি হলুদ দুর্গ, শ্বেতপাথরের অজস্র কবর, ফায়ারপ্লেসে পুড়ে চলা হাজার হাজার বই, পানীয় জলের একমাত্র সম্বল প্রস্রবণের জল, শান্তিরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিমানবন্দরের নীচে বসনিয়াকদের খোঁড়া টানেল, জাতিসংঘের মর্মান্তিক উপহার বহুবছরের বাসি বিস্কুট আর মাংসের টিন, যুদ্ধ ঘিরে গজিয়ে ওঠা অস্ত্রের কালোবাজার, সার্ব স্নাইপারদের মজায় মজায় মানুষ মারার খেলা এবং মাইনফিল্ডে রূপ নেয়া অলিম্পিকের ভেন্যু। এত এত ভয়াবহতার মাঝে একটু রিলিফ নিতে সঞ্জয় দে ছুটে যান মার্শাল টিটো সড়কের শেষপ্রান্তে চাষিদের আনা ফল ও জ্যাম জেলির বাজারে৷ কিন্তু এই বাজারের সৌন্দর্যের পেছনেও আছে ট্রাজেডি, আছে সেই গৃহযুদ্ধের দামামা। ১৯৯৫ সালের আগস্টে এই বাজারেই (মার্কেট স্কয়ার) মর্টার শেলের আঘাতে প্রাণ হারান ৪৩ জন মানুষ। ঠিক মাসখানেক আগেই ঘটে আরেক ট্রাজেডি। সেব্রেনিৎস্কা গ্রামে রাতকো ম্লাদিচের নেতৃত্বে গণহত্যার শিকার হয় প্রায় পাঁচ হাজার বসনিয়াক পুরুষ। এই দুই ঘটনা সার্বদের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। মাত্র ১৫ দিনেই ন্যাটোর বিমানহামলায় গুঁড়িয়ে যায় সার্বদের গুরুত্বপূর্ণ সব ঘাঁটি। স্বাক্ষরিত হয় ডেটন চুক্তি। বসনিয়াতে লেখক আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় খেয়াল করেছেন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা পেট্রোডলার কি উসকে দিচ্ছে বসনিয়াক মুসলিমদের? তৈরী করছে উগ্রপন্থার ওপেন ফিল্ড? এর উত্তর সময়ই দিবে। সঞ্জয় দে সারায়েভোয় আরো দেখেছেন রাদমান কারদাভিচের স্মৃতিবিজড়িত হলিডে ইন হোটেল, অটোমান ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা অর্থোডক্স চার্চ, চা তৈজসপত্র চাদর আর গুসলে নামক বাদ্যযন্ত্রের নিবাস বাস্কারসিয়া বাজার, সারায়েভো বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন এবং নতুন রঙ খেলানো বসনিয়ার জাতীয় গ্রন্থাগার। লেখাটি শেষ হয় সঞ্জয় দের হোটেল মালিক মুগদিবের মায়ের স্বজন হারানোর হাহাকার দিয়ে - যা এক অর্থে সমগ্র বসনিয়ারই হাহাকার।
ভিতুশা পাহাড়ের নিমন্ত্রণে এবং সোভিয়া থেকে দূরে কোথাও : লেখকের এবারের গন্তব্য বুলগেরিয়া। যারা আমাদের পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করে পাশে থেকেছে। ঝিভকভের বুলগেরিয়ায় লেখকের ভ্রমণ লিস্টে আছে ভিতুশা বুলভার্ড ও সন্ত সোফিয়ার মূর্তি, বানিয়াবাসি মসজিদ, সোফিয়া সিনাগগ, মুছে যাওয়া নাইনথ সেপ্টেম্বর স্ট্রিট, অ্যালেক্সান্ডার নভস্কি ক্যাথেড্রাল, সোভিয়েত আর্মি মেমোরিয়াল পার্কের ভাস্কর্য এবং কমিউনিস্ট জাদুঘর। এসবই ছিল রাজধানী সোফিয়াতে। সেখান থেকে পরবর্তীতে ট্যুর গাইড গিওর্গির সাথে সঞ্জয় দে পাড়ি জমান দূরবর্তী বয়ানা গ্রামে। বয়ানা চার্চের আর্ট দেখতে দেখতে আর রিলা মনাস্টেরিতে অটোমান হানাদারদের আক্রমণের ইতিহাস শুনতে শুনতে আমরা লিন্ডেনপাতার চা (লিপা চাই) ও বুলগারিকাস ব্যাকটেরিয়ার বিষয়েও জেনে যাই। পরদিন লেখক ছুটেন প্লভদিভে। এ শহরের আকর্ষণ প্রাচীন রোমান নাট্যমঞ্চ। কিন্তু তার চেয়েও হয়তো গুরুত্বপূর্ণ অজস্র তুর্কি আক্রমণ ও তার বিরুদ্ধে বুলগেরিয়ানদের গর্জে ওঠার ইতিহাস। আজও তুর্কিদের অত্যাচারের স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাছে গাছে ঝোলানো নোটিশ বাক্স।
মার্শাল টিটোর সমাধিতে : গিওর্গির উপহার লিপা চাই সঙ্গে নিয়ে সঞ্জয় দে এবার পাড়ি দেন মার্শাল টিটোর স্মৃতিবিজড়িত বেলগ্রেডে, তাঁর সমাধিভবনে। এই লেখাটি ইতিহাস প্রধান। ব্যক্তি টিটোর বর্ণনা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন উস্তাশা, চেটনিক ও পার্টিজান পার্টির উত্থানের কথা এবং টিটো কিভাবে যুগোস্লাভিয়াকে একত্রে বেঁধে রেখেছিলেন তার বর্ণনা পাওয়া যায়।
দুব্রভনিকে মুগ্ধতায় দ্রবীভূত : বইয়ের শেষ লেখা। স্থান ক্রোয়েশিয়ার সমু্দ্র তীরবর্তী শহর দুব্রভনিক। শহরটি খুবই অদ্ভুত। পাহাড় এবং দুর্গে দুর্গে ভরা। প্রাচীর, সিঁড়ি আর যুদ্ধের গোলায় ক্ষতবিক্ষত বাড়ির দেখা পাবেন পুরো শহর জুড়েই। এই লেখাটি ব্যতিক্রম, কারণ সারা বই জুড়ে সমালোচিত ২য় বিশ্বযুদ্ধকালীন ফ্যাসিস্টদের এক নবরূপের দেখা পাই আমরা বইয়ের শেষে এসে। সঞ্জয় দে যার বাসায় উঠেছেন - সেসিপ - তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন তিনি একজন উস্তাশা সদস্য। বেশ গর্বের সাথেই। এই উস্তাশা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ক্রোয়েশিয়ায় নয় লক্ষেরও বেশি গণহত্যায় জড়িত। যদিও আজকের ক্রোয়েশিয়ায় জাতীয়তাবাদী হিসেবে এরা এখনো সমান জনপ্রিয়। ক্রোয়েটদের সার্ববিদ্বেষও নাকি এখনো এতো বেশি যে এরা কথায় কথায় একে অপরকে সার্ব বলে গালি দেয়।
আমি বইয়ের প্রথম ৫ টি লেখা নিয়ে সেভাবে কোনো রিভিউ দিইনি কারণ সেই পাঁচ ভ্রমণকাহিনীর প্রায় পুরোটা জুড়েই হলোকাস্ট। আর এক লেখায় হলোকাস্টের নির্মমতা বর্ণনা করা সম্ভব না আমার পক্ষে। অনুরোধ করবো নিজ উদ্যোগে বইটা পড়ে জেনে নেয়ার৷ বীভৎস আউসভিৎজ ও বিরকানাও কিংবা মায়দানেক কনসেনট্রেশান ক্যাম্প, শিন্ডলারের কারখানা কিংবা পানকিভিজের ঈগল ফার্মেসি - সবকটাই সাক্ষী নৃশংস ইহুদি গণহত্যার। আমাদের দেশে অনেকেই নাৎসীদের প্রতি বেশ সহমর্মী। যার মনেই নাৎসীদের প্রতি এরকম ন্যূনতম সমবেদনা আছে তাকেই বলবো স্ব উদ্যোগে একটিবার জায়গাগুলো ঘুরে আসতে।
‘রিগা থেকে সারায়েভো’ সঞ্জয় দের প্রথম বই, আমার পড়া সম্ভবত চার কি পাঁচ নং। প্রথম বই পড়ে বুঝলাম কেনো এটি প্রকাশের পরপরই ট্রাভেলগ জগতে তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। ইতিহাস ও ভ্রমণের এমন চমৎকার মিশেল পাওয়া মুশকিল। রেটিং ৫/৫।
সুলিখিত এবং সে কারনেই সুপাঠ্য লেখক সঞ্জয় দে'র ভ্রমন কাহিনী 'রিগা থেকে সারায়েভো' বইটি। পূর্ব ইউরোপের নানান দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপন, যুদ্ধদিন বা রাজনীতিক পালাবদলের নানা ঘটনা অপুর্বভাবে লেখক তুলে এনেছেন। যাদের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর 'ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ' পড়া আছে তারা জানবেন লেখকের মনস্তত্বে ছাপ আছে 'ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ' এর। এক একটা ভালো লেখা এইভাবে নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করে। 'রিগা থেকে সারায়েভো' বইটি'র লেখনী আমাদের জানিয়ে দেয় যে, এই বইটিও ঠিক এইভাবেই কয়েক যুগ পরে নতুন কোন লেখক বা পাঠককে অনুপ্রানিত করবে। নতুন লেখকেরা আজকের লেখকের দেখানো পথেই ঘুরে আসবেন পূর্ব ইউরোপ, আমাদের জানিয়ে যাবেন দূর মহাদেশের মানুষের ইতিহাস ও জীবনের গল্পগুচ্ছ।