(বিশেষ দ্রস্টব্য: বহুপঠিত পৌরাণিক কাহিনীর অনুলিখন হওয়ায় আদতে "একলব্য"-এর ক্ষেত্রে স্পয়লারের কোনো জায়গা নেই। মহাভারতের কাহিনী সর্বজনব্যতীত। তারপরেও কেউ যদি মহাভারতের কাহিনী জেনে না থাকেন বা পড়ে জানার আগ্রহ রাখেন, অনুগ্রহ করে এই লেখাটি পড়বেন না।)
মহাভারতের "একলব্য"
---------------
(১)
অনেকগুলো ব্যাপারে আমি নিজেকে অতি সৌভাগ্যবান বলে মনে করি। তার একটা হচ্ছে ছোটবেলাতেই অনেক বিচিত্র বিষয়ের বই পড়তে পারার সুযোগ।
মহাভারত প্রথম যখন আমি পড়ি তখন আমি প্রাইমারি স্কুলে। বইটি ছিল উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর লেখা "ছেলেদের মহাভারত"। পড়তে গিয়ে বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছি। এর আগে পড়েছিলাম "ছেলেদের রামায়ন।" কিন্তু সেই তুলনায় মহাভারতের কাহিনীর ব্যপ্তি, এতগুলো চরিত্রের সমাহার, কুটিল রাজনীতি, রণকৌশল, আর নৈতিকতার ধূসরতা আমার মনে দাগ কেটে যায়। শেষ পয়েন্ট - ধূসর নৈতিকতা - মহাভারতে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ভাল মানুষ ও খারাপ মানুষের মাঝের ব্যবধান আসলে কম, সবারই ভাল ও খারাপ দিক থাকে। শুধু শৌর্য আর দক্ষতাই নয়, মহৎ উদ্দেশ্যে বা বড় কিছু পাওয়ার জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে ছলনার আশ্রয় নেয়া যুদ্ধনীতির অংশ, এটা জানতে পেরে আমি অভিভূত হয়েছিলাম। মহাভারতের অনেক চরিত্রই খুব জটিল, সোজাসাপ্টাভাবে নায়ক ও খলনায়কের বিভেদ করা খুব মুশকিল। রামায়নের ক্ষেত্রেও এটা বলা যায়, তবে আমার কাছে মনে হয়েছে এই দিকটাই মহাভারতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
ছোটবেলায় যেটা মিস করেছিলাম, বড় হয়ে যেটা বুঝে আরও মুগ্ধ হয়েছি, সেটা হচ্ছে মহাভারতের জাত-পাত ও শ্রেণিসংগ্রামের দিকগুলো। ছোট জাতের অছ্যূত যারা তাদেরকে রাজনীতির ইতিহাসে দাবা খেলার বোড়ে হিসেবে ব্যবহার করেছে শাসক ও শোষক শ্রেণি। হিন্দুপুরাণেও এর ব্যতিক্রম নেই।
----
(২)
পড়ে ফেললাম হরিশংকর জলদাসের লেখা উপন্যাস "একলব্য"। মহাভারতের গল্পটাই লেখা হয়েছে, তবে একলব্য চরিত্রের দৃষ্টিতে। এক কথায় অতুলনীয় একটা লেখা, মনে দাগ কাটার মত। হরিশংকর জলদাস চরিত্র বিন্যাস ও মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে বেশ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। লেখকের অন্যান্য বই পড়ার আগ্রহ পাচ্ছি।
রাজপুত্র একলব্য মহাভারতের এক চরিত্র। সে ব্যাধ বা শিকারী গোত্রের নিষাদ জাতির রাজা হিরণ্যধণুর সন্তান। সে ভাল তীরন্দাজ। সে প্রার্থনা করে ধনুর্বিদ গুরু দ্রোনাচার্যের শিষ্যত্ব। কিন্তু দ্রোন তাকে প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ একলব্য শূদ্রজাত। দ্রোন শুধু রাজপুত্র আর উঁচুজাতের যোদ্ধাদেরকেই প্রশিক্ষণ দেন। এখানে উল্লেখ্য হচ্ছে রাজপুত্র হবার পরেও কৃষ্ণগাত্রবর্ণের একলব্যের স্থান হলো না দ্রোনাচার্যের চরণতলে। তাকে শিষ্যের জায়গা দিলে সুনাম ক্ষুণ্ণ হতে পারে, আর উচ্চবর্ণের রাজপুত্রেরা তার কাছে না-ও আসতে পারে এমনটাই আশংকা করলেন দ্রোন।
একলব্য প্রত্যাখ্যাত হয়েও দমে যায় না। সে গহ���ন জঙ্গলে দ্রোনের প্রতিকৃতি স্থাপন করে তাকে গুরু মেনে সাধনা শুরু করে। নিজে নিজে নীরবে অধ্যবসায় করে সে হয়ে ওঠে দ্রোনাচার্যের প্রিয় শিষ্য তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের সমকক্ষ তীরন্দাজ। এই খবর দ্রোন আর অর্জুনের কাছে গেলে তারা ভাবিত হন। তারা ভাবতে থাকেন কিভাবে একলব্যকে দৃশ্য থেকে সরিয়ে দেয়া যায়, কিভাবে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় আর্যগোষ্ঠীর সাজানো বৈদিক রীতিনীতির সমাজব্যবস্থার ঝাণ্ডা যথাস্থানে উড়িয়ে রাখা যায়।
দ্রোন ছলনার আশ্রয় নিলেন। একলব্যকে বললেন যে যদি একলব্য তাকে গুরু বলে মেনেই নিয়ে থাকে তবে তাকে গুরুদক্ষিণা হিসেবে তার ডান হাতের বুড়ো আঙুল যেন কেটে দেয়। একজন তীরন্দাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে তার প্রধাণ হাতের বুড়ো আঙুল। কিন্তু, গুরুভক্তির উদাহরণ স্থাপন করে একলব্য দ্বিতীয় কোনো চিন্তা না করেই তা দিয়ে দেয়।
হেরে গেল একলব্য। অর্জুন তুষ্ট। দ্রোন একলব্যকে পঙ্গু করে দিয়ে রাজপ্রাসাদে ফিরে গেলেন। কৌরবরাজ ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র দুর্যোধন, দুঃশাসন, বিকর্ণের একশ’ ভাই, তাদের খুড়তুতো পঞ্চপাণ্ডব - যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব, আর দুর্যোধনের বন্ধু দানবীর কর্ণের অনুশীলন আবার শুরু হলো।
একলব্যের বোধদয় যতক্ষণে হলো ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। সে শূদ্র, তার অবস্থানটা দ্রোনের চোখে কোথায় তা সে এখন পরিষ্কার দেখতে পেল।
গল্পটা এখানে শেষ হয়ে যেতে পারতো, কিন্তু হলো না। কারণ সে যে একলব্য! সে সাধনা আর অধ্যবসায়ের প্রতিমুর্তি। দ্রোনের প্রতি প্রচুর ঘৃণা নিয়ে সে এবার শুরু করলো চার আঙুলে তীর ছোঁড়ার অনুশীলন। শুণ্য থেকে শুরু করে আবার সে হয়ে উঠলো শ্রেষ্ঠ নিষাদ তীরন্দাজ।
কালের ফেরে রাজনীতির প্যাঁচে ক্ষমতার লড়াই শুরু হলো। কুরুরাজপুত্র দুর্যোধন চাচাতো ভাইদের জানালেন “বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী” অর্থাৎ সুঁচের আগায় যতটুকু মাটি ধরে ততটুকুও দেব না যুদ্ধ ছাড়া। শুরু হলো আঠারো দিনের কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধ যাতে কৌরবপক্ষের নেতা দুর্যোধন আর অন্যদিকে পাণ্ডবপক্ষের নেতা অর্জুনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা যুধিষ্ঠির। দ্রোন নিলেন দুর্যোধনের পক্ষ, কারণ তিনি কুরুরাজের প্রতি অনুগত।
একলব্য ততদিনে রাজপুত্র থেকে রাজা হয়েছেন। তিনি পরলেন দ্বিধায়। একদিকে পাণ্ডবদলের অর্জুন যে তাকে হিংসে করে গুরু দ্রোনাচার্য-কে প্রভাবিত করেছে তার ক্ষতি করার জন্য। অন্যদিকে কৌরবদলের দ্রোনাচার্য, যে কিনা জাতপাতের দোহাই দিয়ে একলব্যকে বঞ্চিত করেছে।
রাজনীতি বড়ই বিচিত্র। কুরুরাজপুত্র দুর্যোধনের চরিত্রের অনেক খারাপ দিক থাকলেও রথচালকের পুত্র কর্ণ-কে তিনি বন্ধু হিসেবে নিয়েছেন। একলব্য নিচুজাতের হবার পরেও তার কাছে স্বীকৃতি পেয়েছেন। দুর্যোধন জাতপাত মানেন কম। অন্যদিকে যুধিষ্ঠির ন্যায়বান। অবশেষে দেখা গেলো শুদ্র গোত্রের রাজারাও দু’ভাগে ভাগ হয়ে কুরুক্ষেত্রে পক্ষ নিল। একলব্য নিলেন বন্ধু দুর্যোধনের পক্ষ, সেই হিসেবে দ্রোনের পক্ষ।
এই যুদ্ধে দ্রোন স্বাদ পেলেন তার নিজের ঔষধের। ছলনার।
কৌরবপক্ষের সর্বাধিনায়ক সেনাপতি দ্রোনের নয়নমণি তার পুত্র অশ্বত্থামা। ভীম যুদ্ধক্ষেত্রে মারলেন সেই একই নামে পরিচিত এক যুদ্ধ-হাতিকে। সত্যবাদী হিসেবে বিখ্যাত যুধিষ্ঠিরের কণ্ঠ থেকে বের হলো, “অশ্বত্থামা হত! ইতিঃ গজ।” অর্থাৎ, অশ্বত্থামা নামের হাতিটি মরেছে। কিন্তু হাতির অংশে যুধিষ্ঠির তার কণ্ঠ এত নিচু করে ফেললেন যে দ্রোন শুনতে পেলেন যে শুধু অশ্বত্থামা, তার আদরের পুত্র, আর নেই।
যুধিষ্ঠির ছলনা করতে পারেন তা দ্রোনের কল্পনাতেও নেই। অন্য কেউ বললে হয়তো বিশ্বাস করতেন না। একলব্য সতর্ক করলেন দ্রোন-কে, কিন্তু তবু তার বুক চিঁড়ে বের হল হাহাকার, “হা পুত্র! হা অশ্বত্থামা!!” দুঃখে তিনি অস্ত্র ত্যাগ করলেন। সেই সুযোগে অর্জুন শুরু করলেন তীরের ধূম্রজাল, যার আড়ালে তার শ্যালক ধৃষ্টদ্যুম্ন বধ করলেন দ্রোনকে।
সেনাপতি হারিয়ে কৌরবরা যুদ্ধ হেরে গেলেন, পাণ্ডবরা জয়ী হলেন। একলব্য ফিরে গেল ভগ্ন হৃদয়ে। ছলনায় যুদ্ধজেতা পাণ্ডবদের হাত দিয়ে শুরু হলো যুধিষ্ঠিরের ন্যায়ের সাম্রাজ্যের। কিন্তু বৈদিক রীতির সেই সাম্রাজ্য কি গোত্রপ্রথার উপরে উঠতে পারলো, পারলো কি জাতের হিসেবের বাইরে গিয়ে মেধার ও অনুশীলনের গুরুত্ব দিতে? এই নিয়ে ভাবতে লাগলেন একলব্য।
এই হলো একলব্যের উপাখ্যান।
---
(৩)
মহাভারত চমৎকার সব চরিত্রের সমাহার। অর্জুনপুত্র অভিমন্যু, যে কিনা দ্রোনাচার্যের রণকৌশল চক্রবূহ্য ভেদ করে ঢুকতে জানতো কিন্তু বের হতে জানতো না, পিছপা হয়নি। শিখণ্ডি জন্ম নিয়েছিলেন মেয়ে হিসেবে, পরে পুরুষ হয়েছেন, বধ করেছেন প্রথম কৌরব সেনাপতি পিতামহ ভীষ্মকে। অশ্বত্থামা, যার মিছে মৃত্যুসংবাদ বদলে দিয়ে যুদ্ধের মোড়। শকুনি, যে কিনা দুর্যোধনের উপদেষ্টা হিসেবে কূটচাল চালতো। বিদুর শূদ্র দাসীর গর্ভে জন্ম নিয়েও কুরুরাজ্যের সন্মানিত মন্ত্রী ও উপদেষ্টা হয়েছিলেন। দ্রোন জাতিতে ব্রাহ্মণ হয়েও পুজাপাঠ ছেড়ে দারিদ্র্য ঘোঁচাতে আর সুনাম করতে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে ক্ষত্রিয়ধর্ম পালন করেছেন, আচার্য হিসেবে সন্মানিত হয়েছেন। তার চিন্তাভাবনার একটা বড় অংশ ছিল অর্থনৈতিক। শিশুপুত্র অশ্বত্থামা দুধ খেতে না পেরে কেঁদেছে, আর দ্রোন শপথ নিয়েছেন ধনী হবার।
যত পড়ি তত মুগ্ধ হই। কোথায় গেইম অব থ্রোনস, আর কোথায় গ্রেকো-রোমান মীথোলজি! আমাদের নিজেদের অঞ্চলের সাহিত্যের যে রত্নসম্ভার, যে অভূতপূর্ব কাহিনীর শাখাপ্রশাখা আর বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সমাহার তার কোনো তুলনাই হয়না। রামায়ন আর মহাভারতের মূল কাহিনীকে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা যায়। পান্ডবদের দৃষ্টিতে দেখলে এক, আবার অনার্য জাতিগুলোর দৃষ্টিতে দেখলে আরেকরকম। একলব্যের পিতা রাজা হিরণ্যধনু আর পিতামহ অবসরপ্রাপ্ত রাজা অনমোদর্শী তাকে কৈশরে শোনায় রামায়নের কাহিনী। তাদের দিক থেকে দেখলে আর্যরা মূলত বহিরাগত, আর অনার্য যারা, বিশেষ করে জঙ্গলবাসী ব্যাধরা, তারাই ভারতবর্ষের নিজস্ব সন্তান। একই গল্প আলাদা দু’দিক থেকে বললে কতই না বিচিত্র রঙের মেলা বসে!
আমরা কি আমাদের পরের প্রজন্মের হাতে এই রত্নসম্ভার তুলে দিচ্ছি? থর, ওডিন বা জিউসের গল্প শুনে বড় হওয়া প্রজন্ম কি আমাদের অঞ্চলের পৌরাণিক কাহিনীর স্বাদটা পাচ্ছে?
(পাদটীকা)
পৌরাণিক কাহিনী হলেও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। ইতিহাসের পণ্ডিতদের মতে ক্রিস্টপূর্ব ১০০০ সনের দিকের কোন এক মহাযুদ্ধকে ভিত্তি করে হয়তো এটা লেখা। আর অন্য একটি জনপ্রিয় মত হচ্ছে যে এটা খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ সনেরও আগের ঘটনা।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে বঙ্গ পক্ষ নিয়েছিল কৌরবদের। সে হিসেবে আমরা বিজিত পক্ষ।