Harishankar is a promising Bangladeshi author. The most significant point to notice is that all the four novels produced from Harishankar's pen sketch the life of the downtrodden, some of whom are from among fisherfolks, some from among prostitutes and some others are the 'harijons' or 'methors'.
প্রতিটা চরিত্রের মনস্তত্ত্বকে যত ভাবে দেখানো সম্ভব লেখক তত ভাবেই দেখিয়েছেন। এত অসাধারণ উপস্থাপনা যে কাউকে মুগ্ধ করতে বাধ্য। লেখকের লেখনী মায়া আপনাকে এমন ভাবে ঘিরে ধরবে মনে হবে আপনি চরিত্রগুলোর সাথেই আছেন, সামনে থেকে দেখছেন। আর ক্লাইম্যাক্স এ যেন আপনি বার্ড ভিউ পেয়েছেন। আমার খুব বেশি প্রিয় লেখকদের মধ্যে যায়গা করে নিতে যাচ্ছেন হরিশংকর জলদাস।
এক বিখ্যাত লোক বলেছেন - পৃথিবীতে আছেই দুই ধরনের মানুষ এক খাঁটি আর দুই হলো জুয়াচোর। সেই হিসাবে গোটা মহাভারতে মাত্র দুটি খাঁটি লোকের দেখা পাবেন , দুর্যোধন আর ভীম । বাকি সব জুয়াচোর । কথা সত্য মহাভারতের চরিত্রগুলা এমন যে সবাই রে নিয়েই শ’খানেক পৃষ্ঠার কিছু একটা লেখা যায় । মানে প্রথমে মূল মহাভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে চরিত্রের বিস্তারিত বর্ণনা করে আপনার নিজের দৃষ্টিকোণ দিয়ে সেটাকে ভালো কিংবা মন্দ বিচার করে কিছু একটা লিখে ফেলা খুব কঠিন হওয়ার কথা নয় । হরিশংকর জলদাস গোটা মহাভারত ই বিস্তারিত আলোচনা না করে খুব সংক্ষেপে একলব্য উপন্যাসে লিখে দিয়েছেন । একলব্য তে শুধু একলব্য সম্পর্কেই নয় বরং কর্ণ , দ্রোণাচার্য , অর্জুন ইত্যাদি গুরত্বপূর্ণ ক্যারেক্টার গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে । একলব্য একজন নিষাদপুত্র। তখনকার সময়ে দ্রোণাচার্য ছিলেন সবচাইতে বড় ধনুর্ধর। তার কাছে অস্ত্রশিক্ষা নিতে আসতেন রাজপুত্ররা। তিনিও ঠিক করেছিলেন আর্য ছাড়া অন্যকাউকে অস্ত্র শিক্ষা দিবেন না তাই একলব্য দ্রোণের কাছে অস্ত্রচালনা শিখতে চাইলে দ্রোণ তাকে ফিরিয়ে দেন। এইটাই মূলত গল্পের প্রধান অংশ। তবে এই অংশেই গল্প থেমে থাকে নি গড়িয়েছে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ পর্যন্ত। সেসময় জাতপাতের ব্যাপার যে কত গুরুতর ছিলো তা জানতে পারা যায় শুধু মাত্র নিচু জাতের হওয়ার অপরাধে কর্ণ এবং একলব্যকে দ্রোণের অস্ত্রশিক্ষা দেওয়ার অস্বীকারের মাধ্যমে । এতেই শুরু হয় পারস্পরিক আক্রোশ , বিদ্বেষ। অবশ্য সবার ই নিজস্ব কারণ ছিলো । তবে ব্যক্তিগতভাবে অর্জুনের উপর আমি যথেষ্ট বিরক্ত এবং হতাশ । কিংবদন্তিদের মধ্যে এতো সংশয় থাকা উচিৎ নয় । যাই হোক বইটিতে আরেকটা তারা দিতাম কিন্তু মহাভারতের মহা ইন্টারেস্টিং চরিত্র গান্ধাররাজ সুবলের জ্যেষ্ঠ পুত্র রে নিয়ে তেমন কিছুই পাইলাম না দেখে দিলাম না । ভদ্রলোক আমার খুবই পছন্দের একজন। কিংবদন্তি যদি কিংবদন্তির মত আচরণ না করে তাইলে বিরক্তি লাগে আবার পছন্দের লোকজন বাদ পড়লেও বিরক্তি লাগে । এক তারা কমায়া ডবল বিরক্তি সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পাইতেছে না । বিরক্তি ঠিকমতো প্রকাশ করতে না পারলে, তার চাইতেও বেশি বিরক্তি লাগে। বিরক্তি প্রকাশ করতে না পারার জন্য যে তার চাইতেও বেশি বিরক্তির উদ্রেক হয়, সেই বিরক্তি চেপে রাখলে তারচাইতেও আরো আরোও বেশি বিরক্তি লাগে । আর তারচাইতেও আরো আরোও বেশি বিরক্তি নিয়ে উল্টাপাল্টা ‘’বিরক্তির’’ থিওরি দিলে, তারচাইতেও আরো আরোও ভয়ংকর বেশি বিরক্তি লাগে। এখন লাগলে কি করা যাবে !
শাস্ত্রীয় গাম্ভীর্য নেই, নেই দেব স্তুতি। আছে লৌকিক দৃষ্টিকোণ এবং মূল গ্রন্থ থেকে কিছু বিচ্যুতি।
তবুও একলব্য গ্রন্থটিকে আলাদা একটা তাৎপর্য দেয়া যেতে পারে। যদি আমরা মহাভারতের প্রতি ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দেখি তাহলে বেশ কিছু অনুসিদ্ধান্ত দেখতে পাই।
📌 মহাভারতের যুদ্ধ ছিল একটি রাজপরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক ক্ষমতার দ্বন্ধ থেকে সৃষ্ট উপমহাদেশীয় প্রচণ্ড এক যুদ্ধ। 📌 মহাভারতের যুদ্ধ ছিল কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসা কুরু এবং পাঞ্চাল দুই প্রতিবেশী রাজ্যের মাঝে কলহের চূড়ান্ত অধ্যায়। 📌 মহাভারত ছিল গান্ধার অধিপতি শুকুনি এবং দ্বারকাবতীর রাজন্যপুরুষ বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণের মনস্তাত্বিক লড়াই। যেখানে বীরত্ব এবং অস্ত্র থেকেও প্রাধান্য বিস্তর করে বুদ্ধি এবং কূটনীতি। 📌 মহাভারত ছিল ভারতবর্ষে আর্য এবং অনার্যদের ভাগ্য নির্ধারণী যুদ্ধ। আর্যদের সম্রাজ্যবাদ সুদৃঢ় করার মহাসমর ছিল এই যুদ্ধ।
উপরোক্ত সূত্রগুলির মাঝে শেষোক্তটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মহাভারতকে যদি ইতিহাসের আকরগ্রন্থ হিসাবে নাও ধরি তবুও মহাভারতের প্রাসাঙ্গিকতা বিন্দুমাত্র কমে না। কারণ এই গ্রন্থ নিছক কারও মস্তিষ্ক প্রসূত হলেও মহাভারত কয়েক হাজার বছর পূর্বে এই অঞ্চলের রাজনীতি, মানুষের জীবনযাত্রা ও বৈষম্যের দলিল।
মহাভারতে যেসব অনার্য চরিত্রকে আনা হয়েছে তাদের মাঝে জরাসন্ধের পরেই একলব্যকে স্থান দেয়া যেতে পারে। জরাসন্ধ ছিলেন অনার্য সংঘের সম্রাট। তিনি ছিলেন পুরো আর্যাবর্তের ত্রাসের কারণ। অন্যদিক একলব্য ছিল নিষাদ নামক উপজাতি থেকে আগত এক ছোট্ট রাজ্যের রাজপুত্র।
এই দুটি অনার্য চরিত্রের সাথে মহাভারতের আর্যগণ তীব্র বঞ্চনা ও ছলনা করেছেন। সেই ছলনার একটি ইতিহাস বিধৃত হয়েছে একলব্য গ্রন্থটির মাঝে। যদিও বইটিতে মূল মহাভারত থেকে প্রচুর বিচ্যুতি লক্ষ্য করলাম তবুও মহাভারতের যে অতি সামান্য নৃত্তাত্বিক উপাদান আছে সেটুকুর লৌকিক ব্যবহার এসেছে বইটিতে।
বিশাল মহাভারত গ্রন্থে মাত্র কয়েকটি পাতায় আবদ্ধ একলব্যকে লেখক হরিশংকর জলদাস পাঠকের পরিচিত জন করে দিয়েছেন বইটিতে। এক দুঃখী রাজকুমারকে আমাদের সামনে তুলে এনে লেখক দেখিয়েছেন হাজার হাজার বছর ধরে আদিবাসীদের প্রতি বর্ণের দোহাই দিয়ে আর্য শাসকযন্ত্রের বঞ্ছনা, অত্যাচার, মিথ্যাচার এবং নিষ্পেষণ।
তবে পরিশেষে আমি সতর্ক করবো। মহাভারত মূল কাহিনীকে এই বইটি দ্বারা বিচার করার একদমই সুযোগ নেই। কারণ বইটি অতি সরলীকরণ দোষে দুষ্ট। অনেক স্থানেই নায়ককে খল চরিত্ররূপে উপস্থাপন করতে গিয়ে পুরো কাঠামোটা নড়েচড়ে গেছে। তাই বইটি থেকে একলব্যের কাহিনীটি মোটামুটি জানা গেলেও মহাভারত সম্পর্কে সামগ্রিক সিদ্ধান্তে আসার একদমই সুযোগ নেই।
খুব সম্ভবত ক্লাস সেভেন কী এইটে থাকতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বদৌলতে “গ্রীস ও ট্রয়ের উপ্যাখ্যান” পড়েছিলাম। ইলিয়াডের সংক্ষেপিত ও সহজিয়া ভার্সন ছিল গ্রীস ও ট্রয়ের উপ্যাখ্যান। মনে আছে, বইটা পড়ে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। মহাকাব্যের দিকে আমার ঝোঁক তখন থেকেই। এপিক খুব বেশি পড়েছি, এরকম দাবি করবো না। তবে যাই পড়েছি খুব আগ্রহ নিয়ে পড়েছি। ইলিয়াড, ওডিসি, গিলগামেশ, মহাভারত, ঈনীড।
একলব্যের কাহিনী অল্প-বিস্তর আগে থেকেই জানতাম। ছোটবেলায় পড়েছিলাম, তাই কাহিনী অপরিচিত নয়। একলব্যের কিংবদন্তিসম গুরুভক্তি, তার অধ্যবসায়, তার দৃঢ় সংকল্প, দ্রোণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরও স্বীয় চেষ্টায় ঈর্ষাজাগানিয়া সমরাস্ত্র কৌশল রপ্ত করা, শেষমেষ গুরুর আদেশে নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি কর্তন-একজন ট্র্যাজিক হিরোর যে ধরণের গুণাবলী থাকা দরকার সবই একলব্যের মধ্যে আছে। বইটাতে মহাভারতের অন্যান্য চরিত্রদে���ও পাবেন। দ্রোণ তো আছেনই, আরো আছেন পরশুরাম, ভীষ্ম, পঞ্চপান্ডব, কর্ণ, দুর্যোধন। কিন্তু তারা এখানে মুখ্য না, একলব্যই মুখ্য। একলব্যের ট্র্যাজেডিই কাহিনীর ভিত্তি।
লেখা প্রসঙ্গে আসি। হরিশংকর জলদাসের লেখা আগে পড়িনি, এটাই প্রথম। প্রথম অভিজ্ঞতা বেশ সুখকর। তার লেখা যথেষ্ট গুরুগম্ভীর, কিন্তু যথেষ্ট সাবলীল। লেখা কোথাও আটকায় না, তরতর করে আগায়। তার চরিত্রচিত্রণ ভালো লেগেছে, সংলাপ ভালো লেগেছে, বইটা যেভাবে শেষ করা হয়েছে সেটাও ভালো লেগেছে। একটা জায়গায় একটু খচখচানি রয়ে গেছে অবশ্য। চাইলে বইটাকে আরো কিছুটা বড় করতে পারতেন হরিশংকর জলদাস, সে ধরণের ম্যাটেরিয়াল তার কাছে ছিল।
হিরণ্যধনু পুত্র একলব্য নাম ! দ্রোণের চরণে আসি করিল প্রণাম । যোড়হাতে করি বলে বিনয় বচন । শিক্ষাহেতু আইলাম তোমার সদন । দ্রোণ বলিলেন তুই হস নিচু জাতি তোরে শিক্ষা করাইলে হইবে অখ্যাতি ।।
-মহাভারত,আদি পর্ব ।
উপরের পংক্তি অনেক কিছুই বলে দেয়।
“মহাভারত” ! যার নাম শুনলে শুধু এই কথাগুলোই মনে - বিশ্বাসঘাতকতা,কূটচাল, চতুরতা, যৌনতা আর ডার্ক এলিমেন্টের সাথে এক এপিক গল্পের সংযোজন । যার কথা লিখতে গেলে আরেকটা মহাভারত লিখতে হবে । মহাভারতের এক একটি চরিত্র দিয়ে লেখা যাবে দিস্তার পর দিস্তা কাগজ। প্রতিটি চরিত্র যেখানে নিজ নিজ স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল । ন্যায় অন্যায়ের মিশেল যেখানে প্রতিটি চরিত্র যেখানে সমানভাবে পরিলক্ষিত । কোন চরিত্রই যেখানে দুধে ধোঁয়া তুলসি পাতা নয়। এক মহাভারত ,তার চরিত্র আর কেচ্চা কাহিনী নিয়ে কত শত বই লেখা হয়েছে তাও বোধহয় গুনে শেষ করে যাবে না ।
আমরা সাধারণত মহাভারতের কিছু কিছু চরিত্র সম্পর্কে জানি তারা ভালো , আর অমুক খারাপ । কিন্তু কেমন হয় যাদের আদর্শ ভেবে বইয়ের পাতার পর পাতা উল্টিয়েছেন তারা যদি আপনার বিশ্বাস কে ভঙ্গ করে ? আর যাদের কূটচালী , বদ ভেবে এসেছেন তারাই যদি আপনারে ভাবতে বাধ্য করে তারাই সঠিক তাহলে কেমন হয় ?
বইয়ের নাম দেখে এতক্ষণে বুঝে যাবার কথা বইটি কাকে নিয়ে লেখা হয়েছে ? জি হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন । বইটি মহাভারতের এক অগুরুত্বপূর্ণ চরিত্র (পান্ডব-কৌরব আর তাঁদের মিত্রদের কথা বিবেচনা করলে আরকি ) একলব্য কে নিয়ে লেখা । একলব্য এক নিষাদ রাজপুত্র । যাকে ঘিরেই আবর্তীন হয়েছে বইটি । সেইসাথে প্রয়োজনে সাথে সাথে ঘটনা এগিয়েছে তাঁকে ঘিরে মানুষদের সাথেও । আর সেইসাথে ঘটনার পরিসমাপ্তি দিকে । যা আমার চেয়ে আপনারই ভালো জানেন । একলব্য ছাড়াও বইয়ে উল্লেখিত চরিত্রের মধ্যে পুরোটা সময় যাকে কাহিনী এগিয়েছে সে হচ্ছে দ্রোণ । দ্রোণকে দেখানো হয়েছে একজন লোভী ,উচ্চাভিলাষী , দুর্দশাগ্রস্থ আর ভাগ্যবিড়ম্বিত ব্রাক্ষণ হিসেবে । সেইসাথে শুধু অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী একজন ব্রাক্ষন নয় একজন অসাধারণ শিক্ষক , আর হালের ফ্যাশনে আমরা যাকে বলি গুটিবাজ লোক । যিনি উপরে উঠার সিঁড়ি হিসেবে যাকে যখন প্রয়োজন সেই হিসেবে ব্যাবহার করেছেন। কিন্তু দিন শেষে একজন অসাধারণ যোদ্ধা ।
মহাভারত পড়ে হয়তো আমাদের মনে একলব্য বা কর্ণের প্রতি কোন অনুকম্পা জাগে না । কারণ তারা দুর্জন । কিন্তু তারাও মানুষ । দুর্জন হবার পিছনে তাঁদের একার কোন দোষ নেই । কেন তারা দুর্জন ? কে তাঁদের সেই পথে পরিচালিত করেছে ?
লেখক মহাভারতের কথা শুনাতে চাননি এখানে । ও সবার জানা । তাই তিনি সুকৌশলে পুরো কাহিনীই পাশ কেটে গিয়েছেন । বলা যায় কোন কিছুতেই স্পর্শ করেননি । শুধু একলব্য আর তার গল্পের প্রয়োজনে যাদের দরকার তাঁদের এনেছেন আর সেই সাথে কিন্তু পুরো মহাভারতের গল্পও একফাঁকে শুনিয়ে দিয়েছেন ।তবে শুধু একলব্যের কথা তিনি লিখতে চাননি লেখক যা বলতে চেয়ছেন তা হচ্ছে ভালো-মন্দ ,আর্্য –অনার্য ,ভেদ-বিভেদ , জাত-পাত, ন্যায়-অন্যায় , ব্রাহ্মণ-শূদ্রর কথা । যা আমরা ন্যায় বলে ভাবি তা আকি সত্যিই ন্যায় । নাকি ন্যায়ের আড়ালে এক ঘোর অন্যায় । জাত দিয়ে কি মানুষের মান বিচারক করা যায় ? নাকি ভেদ বিভেদ করা যায় ?
তাইতো তিনি বইয়ের শেষে বলেছেন “যে ভবিষ্যতে ব্রাক্ষণ এবং ক্ষত্রিয়ের দ্বারা ভারতবর্ষ শোষিত হবে না , শাসিত হবে জাতবর্ন নির্বিশেষে প্রাকৃত মানুষ দ্বারা ।”
বিশেষ কিছু আর বলার নাই । বইটি পড়ার সময় অনেক কিছু বলার ছিল । অনেক প্রশংস বানী অনেক জাত পাত নিয়ে লেখব ভেবেছিলাম কিন্তু লিখতে গিয়ে দেখি কিছুই আসছে না । তাই আমার মনে হয় বইটি পড়েই যাচাই করুন । হয়তো নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবেন আপনার চিনচেনা মহাভারত আর তার চরিত্রদের । কে জানে হয়তো জন্মাতে পারে এমন সব মানুষদের প্রতি ঘৃণা যাদের নায়ক ভেবে এসেছেন । হয়তো মন খারাপ হবে কিছু নেগেটিভ চরিত্রের মানুষদের ভাগ্যের জন্যও ।
জাতভেদ,বর্ণভেদ আবহমানকাল ধরেই মানুষের মাঝে বিদ্যমান। এই সভ্যতা,সংস্কৃতি,চিন্তার স্মরণকালের সর্বোচ্চ উন্মেষের সময়েও মানব এই দোষ থেকে মুক্ত হতে পারে নি। অনেক অনেক আগে এই অবস্থা ঠিক কেমন ছিলো তা সহজেই অনুমেয়। এই ভারতীয় ভূখন্ডে নীল চোখ, গৌরবর্ণের আর্যরা এসে উপস্থিত হবার আগ পর্যন্ত এখানটায় বাস করতো কৃষ্ণকায়, তুলনামূলক খর্বাকৃতির নিষাদরা। পৌরাণিক উপাখ্যান মহাভারতে অবহেলিত চরিত্র একলব্য এই নিষাদদের প্রতিনিধি। একলব্য যে কালে আর্যদের এক উৎকৃষ্ট নগরী হস্তিনাপুরের অস্ত্রগুরু দ্রোণের কাছে অস্ত্রশিক্ষা নেবার উদ্দেশ্যে বের হয়, এরও অনেক আগেই আর্যরা ভূখন্ড, সংস্কৃতি থেকে শুরু করে সবকিছু নিজেদের অনুকূলে সাজিয়ে নিয়েছে। ভূমিপুত্র নিষাদদের বানিয়েছে কুৎসিত,নীচু জাত। আর নিজেদের সবাই যেমন করে আসীন করে উৎকৃষ্টরূপে, তেমন করে সাজিয়েছে। আর্য অনার্যদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হওয়া তো এরপর অনিবার্য ছিলো। আবার আর্যদের নিজেদের মধ্যেও বর্ণভেদ ছিলো। কিন্তু অস্ত্রগুরু দ্রোণ মহৎ, দুনিয়াজোড়া তাঁর সুনাম। একলব্য অনার্য হলেও হয়তো তিনি তাকে ফেরাবেন না। নিষাদরাজ্যের রাজপুত্র একলব্য এই আশায় চললো হস্তিনাপুরে। ঋষি ভরদ্বাজের পুত্র দ্রোণ নানা প্রতিকূলতা,চড়াই-উৎরাই পার হয়ে দ্রোণাচার্য হয়েছেন। সমাজের তেরছা চোখ অগ্রাহ্য করে অনেক উপরে উঠেছিলেন তিনি। তেমন কেউ হতে চাওয়া নিষাদপুত্র একলব্য তাঁর শিষ্যত্ব লাভ করতে চাইলো। 'হিরণ্যধনুর পুত্র একলব্য নাম, দ্রোণের চরণে আসি করিলো প্রণাম।' কিন্তু হায়! দ্রোণাচার্যের ব্রাহ্মণ্যবাদ,অহংকার তাকে গ্রাস করলো। জাতভেদ, আর সব খোঁড়া অজুহাত দিয়ে বিমুখ করলেন নিষাদপুত্রকে। অনার্য এক ছেলেকে অস্ত্র শিক্ষা দিয়ে আর্যদের আধিপত্য হুমকির মুখে ফেলতে চান না তিনি। ক্ষণিকের জন্য একলব্যের অস্ত্রকৌশল দেখে বিমোহিত হলেও নিজেকে সামলে নেন। 'দ্রোণ কহিলেন তুই হোস নীচ জাতি তোরে শিক্ষা করাইলে হইবে অখ্যাতি।' মনে মনে ততদিনে গুরু হিসেবে সাজিয়ে ফেলা দ্রোণের এই রূপ দেখে প্রথমবারের মত থমকে গেলো একলব্য। এরপরের ঘটনা আমরা অনেকেই জানি। নিজ চেষ্টায় ধনুর্বিদ্যায় পারঙ্গম হয়ে মহাবীর অর্জুনের ঈর্ষার শিকার হয় একলব্য। প্রিয় শিষ্য অর্জুনের প্ররোচনায় গুরু না হয়েও ভক্তিতে নত একলব্যের কাছ থেকে গুরুদক্ষিণা হিসেবে তার বুড়ো আঙুলটি কেটে নেন দ্রোণ। যাতে করে আর ধনুক চালাতে না পারে সে। আবারো থমকে গেলো একলব্য। তারপর থেকে কেমন হয় একলব্যের জীবন? কেমন হয় বিশ্বাস? ঠিক কোথায় গিয়ে থামে সে? নিষাদপুত্র একলব্যকে নিয়ে হরিশংকর জলদাসের এই উপন্যাস। এখানে আছে আরেক নির্যাতিত মহাভারত চরিত্র সূতপুত্র কর্ণ, আছে অর্জুনসহ মহাভারতের অন্যান্য চরিত্র। মহাভারত ও রামায়ণের তিনটা করে সংস্করণ পড়া আছে আমার। সবকয়টাই কিশোর বা সংক্ষেপিত সংস্করণ। তাই আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় ঠিক কতটুকু মহাভারতে ছিলো আর কতটুকু কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন লেখক এই উপন্যাসে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকে একপাশে রাখলে এই উপন্যাসের ঘটনাবলি ঘুরপাক খেয়েছে মূলত একলব্য, দ্রোণ, কর্ণ এবং অর্জুনকে ঘিরে। এটাকে অনেকটা লেখকের স্বার্থকতাই বলবো একলব্যকে স্পটলাইটের সবটা না দিয়ে দেওয়া। তবে মহাভারতে বিভিন্ন চরিত্র যেখানে মানবিক ও সামাজিক দোষগুণের উর্ধ্বে না, এই উপন্যাসেও তাই প্রকাশ পেয়েছে। সেখানে একলব্য চরিত্রটাকে কতটুকু বাস্তবিক বলা যায়, প্রশ্নসাপেক্ষ ব্যাপার। তবে এমন একটা চরিত্রকে নিয়ে কাজ করায় লেখক প্রশংসার দাবী অবশ্যই রাখেন।
বইটা ২০০ পৃষ্ঠার না হয়ে আরো মোটা হলে পড়ে আরাম পাওয়া যেত। কিছু চরিত্র, কিছু কাহিনীর আরো বিস্তারিত বিবরণ, বা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কার কী ভুমিকা ছিল তা আরো স্পষ্ট হওয়া উচিৎ ছিল, যেমন শকুনি মামা, কৃষ্ণ। কারণ মহাভারত সম্পর্কে আমার মত ভাসাভাসা জ্ঞান থাকলে পড়তে বেশ বেগ পেতে হবে(কপাল ভাল আমার পাশে মহাভারত জানা এক বন্ধু ২৪ ঘন্টা ছিল :D) মোটের উপর খুবই ভাল লাগার মত বই, মজবুত লেখনী। লেখক মহাভারতে বর্ণিত আর্য- অনার্য, ব্রাহ্মণ-সুত ভেদাভেদের ছায়ায় আজকের সমাজের শাসক-শোষিতদের সম্পর্ক তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন বলে আমার ধারণা। গল্প শেষ করার ভঙ্গি দেখলে অন্তত তাই মনে হয়, '...ভবিষ্যতে ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয় দ্বারা ভারতবর্ষ শাসিত আর শোষিত হবেনা, শাসিত হবে জাতবর্ণ নির্বিশেষে প্রকৃত মানুষ দ্বারা'
❝তোমার ডান হাতের বুড়ো আঙুলটি আমায় দিতে হবে। সেটাই হবে তোমার গুরুদক্ষিণা।❞
একলব্য
দুই একলব্যের বর্ণবাদের শেকল ভেঙে ফেলে নিজেকে নিজে তৈরি করার উপাখ্যান। আত্মবিশ্বাস আর অণুপ্রেরণার আখ্যান। __________ আদিপর্ব
আয়তনে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মহাকাব্য মহাভারত অসংখ্য আখ্যান-উপাখ্যান, যুদ্ধ-হিংসা এবং অন্যায় দ্বারা ন্যায় প্রতিষ্ঠার গাঁথায় ভরপুর। এই মহাকাব্যের বিভিন্ন আখ্যানকে কেন্দ্র করে সাহিত্যে রচিত হয়েছে আরো শতাধিক বই। হরিশংকর জলদাসের একলব্যও সেরকম একটি বই। এই লেখাটি সম্পূর্ণ সেই বইয়ের পরিপ্রেক্ষিতে লেখা। চরিত্রগুলোও একলব্যের দৃষ্টিকোণ থেকেই বিশ্লেষণ করা।
মহাভারতের সিংহভাগ আখ্যান সেই সময় থেকেই আলোচিত-বিতর্কিত। আলোচনায় অনেক প্রধান ঘটনার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে অনেক তাৎপর্যবহ ঘটনা। তবে একলব্যের অংশটুকু সেই সারিতে পড়েনি। যুগ যুগ ধরে মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে এই ট্র্যাজেডি।
এই আখ্যানের প্রতিটি চরিত্রই এমন যে কাউকেই নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে নায়ক অথবা খলনায়ক বলার উপায় নেই। বাংলা সাহিত্যে পৌরাণিক ঘটনাগুলো নেতিবাচক চরিত্রদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা প্রথম শুরু করেছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত মেঘনাদবধ কাব্যের মধ্য দিয়ে। তারপর অনেক লেখক সেই ধারা অব্যাহত রেখেছেন। হরিশংকর জলদাস তন্মধ্যে একজন।
মহাভারতে যে চরিত্রটার পরিণতি প্রতিটি মানুষের অন্তরে আঘাত করেছে তার নাম একলব্য। অনার্য বনচারী রাজপুত্র একলব্য। নিজের জাতির সমরজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করার উদ্দেশ্যে আর্যাবর্তের শ্রেষ্ঠ গুরু দ্রোণাচার্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করার প্রয়াস নেয়। সেই উদ্দেশ্যে সামাজিক-পারিবারিক বাধা অতিক্রম করে অবশেষে উপস্থিত হয় দ্রোণাচার্যের আশ্রমে। তথাকথিত নিচু জাতের দোহাই দিয়ে দ্রোণাচার্য একলব্যের শিষ্যত্বকে অস্বীকৃতি জানায়। তারপরও হতাশাকে ঠাঁই না দিয়ে একলব্য নিজ প্রচেষ্টায় দ্রোণাচার্যের শিষ্যদের থেকেও বেশি অস্ত্রজ্ঞানী হয়ে উঠে স্রেফ একাগ্রতা আর ভক্তির জোরে। ঘটনাক্রমে তা অর্জুনের নজরে পড়ে গেলে গুরু দ্রোণকে প্ররোচিত করে। ফলতঃ দ্রোণাচার্য কৌশল-কপটতার আশ্রয় নিয়ে ধনুর্বিদ্যায় সবচেয়ে প্রয়োজনীয় একলব্যের ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল দক্ষিণা হিসেবে নিয়ে নেয়। তারপর একলব্যের কী হয়? বেশিরভাগ মানুষেরই ধারণা একলব্যের প্রতিভা আর ভবিষ্যৎ ওখানেই ধ্বংস হয়ে গেছিল। আদৌ কি তাই? একলব্যদের থামানো এত সহজ! এই বইটি সেই একলব্যের পরবর্তী জীবনেরই আখ্যান। যেখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী নিয়তি, অর্জুন এবং স্বয়ং কৃষ্ণ।
একলব্যকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বই লেখা বর্তমান সময়েও খুব প্রাসঙ্গিক এবং প্রয়োজনীয়। বিশেষ করে সামাজিক দিক দিয়ে। বলা হয়ে থাকে সেদিন যদি দ্রোণ একলব্যকে শিষ্যরূপে বরণ করতেন তাহলে সময় পেত অর্জুন আর কর্ণ থেকেও শ্রেষ্ঠ এক তীরন্দাজ যোদ্ধা। যে যুবক নিজে নিজে পিনাকপাণির বিদ্যা আবিষ্কার করে আত্মস্থ করতে পারে তার সম্পর্কে এমন ধারণা করা কখনো অত্যুক্তি নয়।
পুরাণে সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক চরিত্রগুলোর মধ্যে একলব্য অন্যতম। একলব্য জ্ঞানার্জনে বর্ণবাদ এবং জন্মগত ভাগ্যকে বুড়ো আঙুল দেখানোর গল্প; যার শুরুটাই হয় বুড়ো আঙুল হারিয়ে ফেলার মধ্য দিয়ে। প্রতিদ্বন্দ্বী বর্বর সমাজব্যবস্থা। স্বশিক্ষা, একাগ্রতা, অধ্যবসায় আর নিজের ভাগ্য নিজে তৈরি করে নেয়ার উপাখ্যান। __________ সমাজপর্ব
❝জাত পাত তো আপনাদেরই সৃষ্ট। শোষণ-শাসনের সুবিধার জন্য ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় মিলে বর্ণপ্রথার কঠিন নিগরটি তৈরি করেছেন। কঠোর শৃঙ্খলে বেঁধেছেন রাজ্যের অধিকাংশ খেটেখাওয়া মানুষকে।❞
একলব্য সমকালীন উপন্যাস। “সমকালীন সাহিত্য হলো বর্তমান সময়ের প্রতিনিধিত্বমূলক সাহিত্য, সময়ের ধ্বনি ও ভাষা, সময়ের ছবি, সময়ের সুর, সময়ের তাল ও লয়, সময়ের ছন্দ এবং সময়ের সাহিত্যবিভা।" অর্থাৎ বর্তমান সমাজেরই প্রতিচ্ছবি এই গল্পটি।
সমাজ মানেই একগাদা সামাজিক রীতি-নীতি। যেগুলো বলবৎ কেবল বর্ণবাদের তৈরি নিচু জাতের মানুষদের উপর। একলব্য, কর্ণদের স্রষ্টা এই সমাজই। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়েও একলব্যের সামাজিক গুরুত্বকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ___________ কর্ণপর্ব
❝ব্রাহ্মণদের হাজারো বিরোধিতার মধ্যেও তথাকথিত হীনজাতের মানুষরা মাথা তুলে দাঁড়াতে জানে। আমার দিকে তাকাও। আমি কর্ণও সেরকম একজন মানুষ।❞
মহাভারতের আরেক একলব্য কর্ণ। তবে তার গল্প ট্র্যাজেডির আকার নিতে পারেনি পুরোপুরি; কারণ “তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন ?"— নীতির ধার ধারেনি সে। একারণে তার আত্মার শক্তিকে নিয়তি হারালেও বর্বর সমাজব্যবস্থা হারাতে পারেনি কখনো। নিজের অধিকার ও মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠার জন্য যে আজীবন লড়াই করে গেছে পরিবেশ ও পরিস্থিতির বিরুদ্ধে। কর্ণের উপর লেখক ভালোই গুরুত্বারোপ করেছে। বোধ হয় একলব্যের মনের কথাগুলোই কর্ণকে দিয়ে বলিয়েছেন। একলব্যে কর্ণের উপস্থিতি উজ্জ্বল। কর্ণের পরিণতিতে একটা উপলব্ধি হল— যে সুযোগ মানুষ অবহেলা করে এড়িয়ে যায় সেই সুযোগই মানুষের ক্ষতি করে। __________ অর্জুনপর্ব
একলব্যের গল্পের মূল খলনায়ক অর্জুনকে বলা যায়। লেখকের একটা উপমা লক্ষণীয়— একলব্যের বুড়ো আঙুল কর্তনের ক্ষেত্রে কুড়াল দ্রোণাচার্য হলেও কাঠুরে অর্জুনই। অর্জুন তার ঈর্ষা আর কর্ণের প্ররোচনায় গুরু দ্রোণকে উস্কানি দিয়েছিল এই গর্হিত কাজটি করার। মহাকাব্যিক নায়ক বালক অর্জুনও দোষেগুণে পরিপূর্ণ। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিক্রিয়াশীল। __________ দ্রোণপর্ব
❝মানুষ অর্থের দাস, অর্থ কারও দাসত্ব করে না। কৌরবরা আমাকে ভরণপোষণ করে। তাদের কাছে আমি অর্থের দায়ে আবদ্ধ। ওই দায়ের কারণে যুদ্ধ আমাকে করতেই হবে।❞
এই বইয়েে একলব্য আর কর্ণকে ছাড়িয়ে যার গল্প মুখ্য হয়ে উঠেছে তিনি দ্রোণাচার্য। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে একলব্যের এই ট্র্যাজেডিতে দ্রোণাচার্যের অবস্থানটা দেখা যাক। তিনিও দারিদ্র্যপীড়িত হয়ে ব্রাহ্মণবৃত্তি ত্যাগ করে ক্ষত্রিয়বৃত্তি বেছে নিয়েছিলেন। এমতাবস্থায় শতাধিক আর্য রাজপুত্রদের সাথে অনার্য একজনকে শিষ্যরূপে গ্রহণ করলে তার চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ার একটা ভয় থাকেই। লেখকের গল্প বলার ধরনের সাথে যতটুকু পরিচিত তাতে ভেবেছিলাম গুরু দ্রোণকে তিনি নেতিবাচক হিসেবেই উপস্থাপন করবেন। তবে তা করেননি। গুরু দ্রোণের পরিস্থিতিও বর্ণনা করেছেন নিরপেক্ষ ভাষায়। তারপরও গুরু দ্রোণের ব্যাপারে আরো প্রচলিত কিছু যুক্তি উল্লেখ করা যায়।
মহাভারতে একলব্য এবং কর্ণ এই দুই ট্র্যাজেডির জন্মদাতা হিসেবে দ্রোণাচার্যকে দায়ী করা হয়। তার দিক থেকে দেখলে দেখা যায় এসব ক্ষেত্রে তিনি কেবল সমাজের গুটি ছিলেন। পরম্পরাকে আশ্রয় করেছেন। তাঁর গুরু পরশুরামের শিক্ষাও কিন্তু তাকে এসব করতে সমর্থন করেছিল। কর্ণও দ্রোণের শিষ্য ছিল। ঈর্ষাপরায়ণ হওয়ায় কর্ণ ব্রহ্মাস্ত্রের জ্ঞান লাভের যোগ্যতা হারিয়েছিল। মূলত এজন্যই কর্ণ দ্রোণাশ্রম ত্যাগ করে পরশুরামের কাছে যায়।
অনেকক্ষেত্রে বলা হয় একলব্য যেহেতু দ্রোণকে গুরুরূপে স্বীকার করেছে তাই দ্রোণের পূর্ণ অধিকার আছে যা ইচ্ছা দক্ষিণা চাওয়ার। একটু সাধারণ জ্ঞান দিয়ে ভাবলে বোঝা যায় একলব্যের অর্জনে গুরু দ্রোণের কোনো অবদান নেই। এমনকি আশীর্বাদও করেননি কখনো। অতএব দক্ষিণা হিসেবে একলব্যের আঙুল চাওয়া মহাভারতের সবচেয়ে বড় অন্যায়গুলোর একটি। অনার্য-আর্য সংঘাতটা তখন প্রবল। তাই আর্য হিসেবে একলব্যের মত সম্ভাবনাময় যোদ্ধাকে এভাবে থামিয়ে দেয়া দ্রোণাচার্যের কূটবুদ্ধি আর দূরদৃষ্টির পরিচয়ই বহন করে।
পরশুরামের দিক থেকে দেখলে বোঝা যায় একলব্য আর কর্ণকে ক্ষত্রিয়বিদ্যা প্রদান করলে তিনিও রুষ্ট হতেন হয়ত। এমনটা ভাবার কারণ হিসেবে কর্ণের মত যোগ্য ছাত্রের সত্যি জেনে ফেলার পর তাকে অভিশপ্ত করার ঘটনাটায় দৃষ্টিপাত করা যায়। পরম্পরাকে বহন না করে ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য এবং কর্ণ যদি দুর্যোধনের পক্ষ না নিতেন তাহলে হয়ত ঐ যুদ্ধে অংশ নেয়ার সাহসই পেত না দুর্যোধন। মহাভারতের সবচেয়ে বড় খলনায়ক এই পরম্পরা। দ্রোণও এই পরম্পরার শিকার। একলব্যে আসলে কেউই খারাপ নয়; দোষ সব বহুযুগ ধরে সমাজে জমতে থাকা জাত্যাভিমানের আবর্জনার। ঐশ্বরিক জ্ঞানী ব্যক্তিরাও বিভিন্ন প্রয়োজনে যা এড়িয়ে যেতে পারেননি।
তারপরও দ্রোণাচার্যকে সেরকম অর্থে মহৎ গুরু বলা যায় না। তিনি তাঁর অমূল্য জ্ঞানের মূল্য নির্ধারণ করেছিলেন। তাঁর শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য ছিল হিংসা। প্রতিশোধ। দক্ষিণা হিসেবে যুদ্ধ চেয়ে তিনি তাঁর শিষ্যদের কাছে বিষাক্ত এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। দক্ষিণা হিসেবে হিংসা, রক্তপাত চাওয়া দ্রোণের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। সেটা দ্রুপদের পরাজয় হোক বা একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুলি। একজন শিক্ষকের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রের প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা থাকতেই পারে। এদিক দিয়ে তাকে দোষী করা যায় না। __________ অপূর্ণ-পর্ব:
বইয়ের উদ্দেশ্য রক্ষার স্বার্থে একলব্যের আসল জন্মরহস্য ফাঁস না করায় লেখককে বেশ কৌশলী এবং দক্ষই বলা যায়। নামচরিত্র হিসেবে একলব্যের উপস্থিতি কম। দ্রোণাচার্যের উপর বেশি মনোযোগ দেয়া হয়েছে। আর কর্ণ। ফলতঃ পূর্ণাঙ্গ একলব্যের গল্প হয়ে উঠতে পারেনি একলব্য। একলব্যের জন্মবৃত্তান্ত থেকে কর্মকাণ্ড নিয়ে যেসব গল্পগাঁথা প্রচলিত আছে চাইলে তার সুন্দর একটা সুন্দর সংমিশ্রণ ঘটানো যেত। একলব্যের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে আরো গুরুত্ব দিলে ভালো লাগত। একলব্য সবসময় একটা কুয়াশায় ছিল। তার পারিবারিক কাজ, বিভিন্ন যুদ্ধ এসব বর্ণিত হয়নি। অর্থাৎ সার্থকভাবে একলব্যকে ফুটিয়ে তুলতে পারেনি গল্পটি।
মহাকাব্যের গল্প হিসেবে সংলাপে দুর্বলতা ছিল। যেহেতু অনেককিছু পরিবর্তন করে নিজের মত সাজিয়েছেন সেহেতু রোমাঞ্চকর কিছু সংলাপ যোগ করা যেত। একলব্যের একটা সংলাপ বেমানান লেগেছে— “আমার পৃথিবীর সকল অণু-পরমাণুতে আপনি ছড়িয়ে আছেন।" উপমা হলেও একলব্য যে সময়কালের গল্প তখন অণু-পরমাণু আবিষ্কৃতই হয়নি।
সার্থক উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য হল সব চরিত্রকেই ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে হয়। তাই আশেপাশের সব চরিত্রের উৎসের প্রয়োজনীয় অংশটুকু লেখক ভালোভাবেই বলেছেন। সংক্ষিপ্ত ভাষায় কাহিনী বিস্তৃত হয়েছে কর্ণের জন্ম থেকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষপর্ব পর্যন্ত। জানা থাকাই এসবে কিছুটা একঘেয়েমি আসলেও গদ্যশৈলী আর লেখনশৈলীর গুণে তা কেটে গিয়েছে। __________ রং-তুলি-পর্ব
হরিশংকর জলদাসের লেখনশৈলীতে একটা অদ্ভুত মুগ্ধতা আছে। এজন্যই গল্পের জানা অংশটুকু পড়তে পড়তে একঘেয়েমি চলে আসলেও কোনো সমস্যা হয় না। চিরায়ত উপন্যাসের লেখনীর অনুভূতি দেয়। নৃশংসতা আছে, কিন্তু নৃশংসতার বিশেষণ নেই। তারপরও এত স্বাভাবিক বর্ণনায় হ*ত্যাগুলো লেখা খুব কষ্ট হচ্ছিল হৃৎপিণ্ডে।
এত সুন্দর করে রাস্তাঘাট-জঙ্গল আর প্রকৃতির বর্ণনা দেয়া যে, কেমন একটা বিভূতিভূষণ বিভূতিভূষণ অনুভব হচ্ছিল। দ্রোণাচার্য যখন একলব্যকে ছোটজাত বলে অপমান করছিলেন সেই সময়টা পড়ে কল্পনা করতে গিয়ে একলব্যের মানসিক অবস্থা চিন্তা করে বেশ বিষণ্ন হয়ে পড়েছিলাম। লক্ষ্মণের বুকে শক্তিশেলও বোধ হয় এভাবেই আঘাত করেছিল।
প্রতিটি পরিচ্ছেদের শুরুতে একটা মহাকাব্যিক কথা তুলে দিয়ে একটা আকর্ষণ তৈরি করে দেয়া হয়েছে । শব্দচয়ন আর উপমা মিলিয়ে এতসুন্দর করে গল্পটা বলা হল যে হারিয়ে গেছিলাম সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগের ভারতবর্ষে। মনে হচ্ছে চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি একলব্য জঙ্গলে হাঁটছে, ঐ তো মুনির আশ্রম, ঐ তো অর্জুন দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে ধনুকে তীর যোজনা করছে।
উন্নতমানের বাঁধাই এবং পৃষ্ঠার কারণে বইটির দাম একটু বেশি। তবে বইটি পড়ার পর এই নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই। রাজকীয় ভাষা, রাজকীয় গল্প, রাজকীয় বই। ___________ সমাপ্তি-পর্ব
একলব্য অর্থ যে দেখে ধনুক শিখেছে। তবে আমার কাছে এই শব্দটির অর্থ এক-লক্ষ্য। যারা মানবতার গল্প পড়তে, শেকল ভেঙে সববিষয়ে জ্ঞানচর্চা করতে, প্রচলিত কুৎসিত প্রথাবিরোধী হতে এবং একটা ঘটনাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে ভালোবাসেন তারা বইটি উপভোগ করবেন ভীষণ। তবে যেহেতু পূর্ণাঙ্গ মহাভারত নয়— বরং বিচ্যুতি ঘটেছে; তাই একলব্যের আলোকে চরিত্রগুলো নিয়ে নির্দিষ্ট একটা সিদ্ধান্তে যাওয়া চরম ভুল হবে।
কর্ণ আর একলব্য দুজনই কিন্তু একই পরিস্থিতির শিকার। তারপরও একলব্য হারিয়ে গেছে আর কর্ণ মহিমাময় প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। আসলে পৃথিবী একটা যুদ্ধক্ষেত্র। প্রতি��াবান কিন্তু দুর্বলদের সময় গ্রাস করে ফেলে। কর্ণের মত প্রতিযোগী হয়ে কামড়ে পড়ে থাকলেই প্রতিষ্ঠা লাভ করা যায়। অনোমদর্শী চরিত্রটি বিশেষ ভালো লেগেছে। একলব্যদের এমন সমর্থক খুব প্রয়োজন। প্রসঙ্গক্রমে ক্ষণিকের জন্য রামায়ণের কথাও এসেছে।
পরিস্থিতি আর সময় খুব ভালোদেরও ভালো থাকতে দেয় না। কারো না কারো গল্পে তারা হয়ে যায় খলনায়ক। পরিশ্রমী, ধোয়া তুলসীপাতারা এখানে ট্র্যাজেডি; প্রতিযোগী, কপট কর্ণ-অর্জুনরাই এখানে প্রতিষ্ঠিত।
❝অপেক্ষা সেই ভবিষ্যতের জন্য, যে ভবিষ্যতে ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়ের দ্বারা ভারতবর্ষ শাসিত আর শোষিত হবে না, শাসিত হবে জাতবর্ণ নির্বিশেষে প্রাকৃত মানুষ দ্বারা।❞
সমাপ্তিতে সমাপ্ত হল না। চাইলে এরপরের কাহিনী লেখা যায়। না লিখলেও গল্পের কোনো ক্ষতি নেই; সমাজের ক্ষতি। __________ একনজরে: লেখক: হরিশংকর জলদাস ধরন: সমকালীন উপন্যাস, পৌরাণিক উপন্যাস, মহাকাব্যিক উপন্যাস পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৯৬ প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ প্রকাশনী: অন্যপ্রকাশ __________
মহাভারতের দুই অবহেলিত(পরাজিত বলে!) বীর চরিত্র একলব্য আর কর্ণকে বিশেষায়িত করে, ধর্ম ও অধর্মের লড়াই অর্থাৎ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ নিয়ে সংক্ষেপিত লেখা।
অনার্য এবং নিষাদ গোত্রের রাজপুত্র একলব্য অস্ত্রশিক্ষার জন্য, সময়ের শ্রেষ্ট ধনুর্ধর দ্রোণাচার্যের কাছে যান। কিন্তু অনার্য হওয়ায় একলব্যকে ফিরিয়ে দিলে, গুরুভক্তিকে হৃদয়ে ধারণ করে নিজে নিজে অস্ত্র চালনায় শ্রেষ্টত্ব লাভ করেন।
ঘটনাক্রমে, প্রত্যক্ষ গুরু না হয়েও, দ্রোণাচার্য একলব্যের নিকট গুরুদক্ষিণা হিসেবে, একলব্যের অভাবনীয় এক ক্ষতি করে বসেন!
একইভাবে কর্ণও নিচু জাতের হওয়ায় দ্রোণাচার্য অস্ত্রচালনা শিক্ষা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে, উভয়ের মধ্যে যে ক্রোধ, আক্রোশ, বিদ্বেষ বা ঘৃণার উদ্ভব হয়, তাই একলব্য উপন্যাসের প্রধান বিষয়।
মহাভারতের অন্যান্য প্রধান চরিত্র গুলোরও সমন্বয়ে পারিবারিক 'পাণ্ডব ও কৌরবদের' কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ নিয়ে সমাপ্তি ঘটান।
উপন্যাসের প্রতিটা চরিত্রের চারিত্রিক ব্যাখ্যাটা অনবদ্য ছিল।
শেষে এসে বড্ড তাড়াহুড়ো হয়ে গেলো। যেন এসাইনমেন্টের ওয়ার্ড লিমিট পার হয়ে যাচ্ছে! গল্পের নাম একলব্য হলেও মূল কাহিনী আবর্তিত হয়েছে দ্রোণাচার্যকে ঘিরেই। হরিশংকর জলদাসের আগের লেখা পড়া থাকায় জাত প্রথার কারণে তাঁর ব্যক্তিগত বেশ কিছু অভিজ্ঞতার ব্যাপারে জ্ঞাত। দ্রোণাচার্য নিজের জাত ছাড়লেও লোভ ও অহংবোধ ছাড়তে পারেননি। যেটা একলব্যের মধ্যে আসেনি। কেনো যেন মনে হয়েছে, একারণেই বইয়ের নাম দ্রোণাচার্যের নামে না হয়ে একলব্যের নামে দেয়া হয়েছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পরিসর অতি বিশাল। সবচেয়ে এই উপন্যাসের সেই যুদ্ধের বৃহৎ কলোবর আসে নি। কিছু চরিত্রকে কাছ থেকে দেখানো আর সাবলীল গল্প বলার ধরণা ভালোই লেগেছে। নামকরণ নিয়েই যা আপত্তি!
This entire review has been hidden because of spoilers.
কেমন যেন বিরক্তি চলে এলো! ভাবছিলাম একলব্য সম্পর্কে হয়তো আরো কিছু আসবে আসবে!! মাঝখানে মনে হচ্ছিলো বইয়ের নাম দ্রোণাচার্য!! ১৯৬ পৃষ্ঠা না লিখে ৯৬ পৃষ্ঠায় শেষ করা যেতো।
একটা সময় ছিলো যখন ভারতবর্ষ শাসন করতেন আর্য রা। এরা এদেশের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন না, দূর দেশ থেকে এসে প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তার করে রাজ্য শাসন করতে থাকে। আর এদেশের অনার্যদের আবার ছিল নানা জাতিভেদ। অনার্য রাজারা বারবারই আর্য দের সাথে যুদ্ধে রাজ্য হারিয়ে অঙ্গ রাজ্যের রাজা হয়ে থেকেছেন।
এমনই এক অনার্য অযোনিজ, ব্রাহ্মণ ভরদ্বাজতনয় দ্রোণ। গুরু পরশুরামের কাছে শিক্ষা নিয়ে বন্ধুর দ্বারা অপমানিত হয়ে আসেন হস্তিনাপুরে। সেখানে তিনি গুরু দ্রোণাচার্য হয়ে রাজ পরিবারের সন্তানের শিক্ষা দিয়ে থাকেন।
একলব্য, অনার্য, প্রন্তজন। ব্যাধসমাজের অনোমদর্শী র ছেলে মহারাজ হিরণ্যধনুর একমাত্র পুত্র একলব্য। বাল্য কাল থেকে শিক্ষা গুরুর কাছে দ্রোণের নাম শুনে সে মনে মনে তাকে গুরু বলে মেনে নেয়। যুবক বয়সে সে পিতা মাতা ও পিতামহের অনুমতি নিয়ে দ্রোণাচার্য এর আশ্রমে আসেন শিক্ষা লাভের জন্য। ততোদিনে গুরু দ্রোণাচার্যের একমাত্র প্রিয় শিষ্য হয়ে উঠেছেন অর্জুন। কর্ণকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেননি শুধু নিচু বংশে জন্ম বলে, এর পরই আসলেন আশ্রমে একলব্য। সে দ্রোণাচার্য কে গুরু হিসেবে বহু পূর্বে মনে ঠাই দিয়েছেন এখন শুধু সামনে থেকে গুরুর অনুমতি প্রার্থনা।
মহাভারত এর আদি পর্ব্ব তে এক ক্ষুদ্র অবহেলিত কিন্তু প্রতিভাবান চরিত্র একলব্য। নিচু বংশে জন্ম এবং বংশ পরম্পরায় নিজের শারীরিক গঠন ও গায়ের রং যা উচু বংশের সাথে যায় না। তবে বংশের এই বাধার পরও প্রতিভাবান, সৎ চরিত্র একজন মানুষ তিনি সমসজের বিরোধিতাকে অতিক্রম করে চলতে চেয়েছেন একা একাই।
আচার্য দ্রোণাচার্য ও প্রিয় শিষ্য অর্জুনের ঘৃণা- চাতুরতা, হিংস্রতারয় একলব্য শেষ হতে হতেও ঘুরে দাঁড়ায়, সে অবহেলিত ক্ষুদ্র চরিত্র নিয়েই লেখক হরিশংকর জলদাস এর " একলব্য" উপন্যাস। ধর্নুবিদ্যায় পারদর্শী এক প্রতিভাবান যুবক, যার কোথাও কোন স্বীকৃতি নাই। প্রবঞ্চনা গঞ্জনার ও প্রতারিত হতে হতে এক সময় নিজের জীবন বিসর্জনের মুখে এসে প্রতিবাদী হয়ে হঠে, সে চরিত্র নিয়ে লেখকের বিশাল কাহিনি থেকে তুলে আনা অংশবিশেষ উপন্যাসের কাহিনি তবে কিছুটা বিচ্যুতি আছে মূল কাহিনি থেকে।
মহাভারতের অসংখ্য চরিত্রের মাঝ থেকে লেখক এই ছোট চরিত্রকে বেছে নিয়েছেন মূল চরিত্র হিসেবে। কাহিনি অসাধারণ তবে সংলাপের ব্যবহার বেশী যা উপন্যাসের ক্ষেত্রে যায় না , আমার মনে হয়েছে। এছাড়া লেখকের লেখার মানটা আরও উন্নত হতে পারতো বলে মনে হয়, আমি মোটামুটি আশাহত লেখার মান নিয়ে।
নিজে হিন্দু সমাজের জাত প্রথার সর্বশেষ জাতে জন্ম বলেই হয়তো বেশির ভাগ সময়ে হরিশংকর জলদাস ব্রাত্যজনদের নিয়ে লিখতে বেশি পছন্দ করেন। তেমনি এক ব্রাত্যজন হলেন নিষ���দপুত্��� একলব্য। মহাভারতের রথী মহারথীদের ভীড়ে উপেক্ষিত এক বীর তিনি। যাঁর সকল গুণ থাকার পরেও, গুরু দ্রোণাচার্য অর্জুনের প্রতি পক্ষপাতিত্ব এবং জাত্যাভিমানের কারণে তাঁর বিদ্যা এবং অস্ত্র শিক্ষায় বাঁধা হয়ে দাঁড়ান।
আমরা সচরাচর যে দিক থেকে ইতিহাসকে দেখি, তারচেয়ে ভিন্ন পারস্পেক্টিভে দেখতে বেশ ইন্টারেস্টিং লাগে আমার। সেই হিসেবে একলব্য বইটি একটা ভিন্ন পারস্পেক্টিভের বই। তবে বইটির কলেবর আরেকটু বড় হলে হয়তো আরেকটু বেশি সুখপাঠ্য হতো।
Harishankar Jaldas is one of my favorite writer. This one is very good, in the light of Kourava clan's fight with Pandava's. A new angel to look on Karna and the titled hero "Ekalavya". Got to know some new things as well.
মহাভারত-এই মহাকাব্য সম্পর্কে একটু হলেও যাদের আইডিয়া আছে তারা জানেন, বইটার প্রেক্ষাপট মূলত চন্দ্রবংশের দুই পরিবার পাণ্ডব এবং কৌরবদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ, তৎকালীন রাজনীতি, কূটনীতি, যুদ্ধ ইত্যাদি ইত্যাদি। আরও সহজ বাংলায়-ধর্ম ও অধর্মের লড়াই। আর আরেকটু ডিটেইলস যারা জানি তারা হয়তো বলবে, ধর্ম-অধর্মের লড়াই এইটা না হয় ঠিক আছে.. কিন্তু সবচেয়ে বড় যে সংঘর্ষ, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, সেটার পিছনে আরেকটা বড় কারণ লুকিয়ে আছে, একজন নারী ও একখন্ড ভূমি।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে এক পক্ষে পান্ডবগণ অপরপক্ষে কৌরবরা শত ভাই। রাজনৈতিক কারণে এদের সাথে যুক্ত হয়েছিল আরও অনেক চরিত্র। বিপুল বিক্রমে আঠারো দিন ব্যাপী যুদ্ধ চলে। অবশেষে জয় হয় ধর্মের তথা পান্ডবদের। দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় সুশাসন ও ন্যায়ের। মোটামুটি এই হলো কাহিনি। এইটুকু পর্যন্ত আমরা সবাই জানি।
মজার ব্যাপার হলো, যে কোন বইয়ে, স্পেশালি যদি হয় হিস্টোরিক্যাল ফিকশন, সে ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাপারটা কাজ করে সেটা খুব সম্ভবত পার্স্পেক্টিভ। মানে লেখক ঠিক কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন, কিভাবে চরিত্রগুলো বিশ্লেষণ করেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। আর পাঠকমাত্রই লেখকের লেখনী দ্বারা চালিত আর তাই খুব স্বাভাবিকভাবে পাঠকও ঠিক সেভাবেই প্রভাবিত হয় ঠিক যেভাবে লেখক উপস্থাপন করেন। ব্যাসদেবের মহাভারতে যেভাবে পান্ডবভাইদের সফলতাকে, তাদের ন্যায়-নিষ্ঠাকে হাইলাইট করে দেখানো হয়েছে ঠিক তার বিপরীতভাবে দেখানো হয়েছে কৌরবভাইদের অন্যায়, দুষ্টবুদ্ধি ও কূটচালগুলোকে। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমরা ধরেই নিয়েছি, অমুকরা ভালো আর অন্যরা মন্দ৷
অর্জুন, ভীমদের বীরত্বগাঁথা লেখা হয়েছে কারণ তারা যুদ্ধে জয়ী হয়েছে, পরাজিতদের কোন ইতিহাস থাকে না। অর্জুন,ভীমদের পাশাপাশি সমান বীর ছিলেন কর্ণ, একলব্যও। কিন্তু ইতিহাস তাদের সেভাবে মনে রাখেনি। আর মহাভারতে সম্ভবত সবচেয়ে আন্ডাররেটেড (অন্যদের তুলনায় কম আলোচনায় এসেছেন সেটা বুঝাতে চাইছি) বীর একলব্য৷ একলব্যের কথা মনে হলেই তার বীরত্ব ছাপিয়ে যায় যে ব্যাপারটি সেটা হলো তার গুরুভক্তি৷ হালের হরিশংকর জলদাস তার 'একলব্য' বইটায় তুলে ধরেছেন একলব্যের ইতিহাস আর তার গুরু দ্রোণাচার্যের গল্প, সঙ্গে অল্প কিছুটা মহাভারত। সব মিলিয়ে অনবদ্য এক উপন্যাস।
হিস্টোরিক্যাল ফিকশনগুলোর এই এক মজা, কাহিনি জানা থাকে আগে থেকেই কিন্তু লেখক ঠিক কিভাবে উপস্থাপন করেন সেটাই হচ্ছে দেখার বিষয়। একলব্যের নিষ্ঠা, একাগ্রতা, গুরুভক্তি অবশ্যই প্রশংসনীয়। এরকম গুণাবলীসম্পন্ন একজন শিষ্য পেলে অবশ্যই যে কোন গুরুই বর্তে যাবে। কিন্তু সবধরণের গুণ থাকা সত্ত্বেও গুরু দ্রোণাচার্যের শিষ্যত্ব মেলে না কেবলমাত্র একটা কারণে৷ একলব্য অনার্য, নিষাদ গোত্রের। হোক না সে রাজপুত্র। শুধু তাই নয়, শুধু মাত্র নীচু জাতের বলেই বাকিটা জীবন বিভিন্নভাবে মূল্য দিতে হয়েছে তাকে। 'একলব্য' বইটা শুধু একলব্যের কাহিনিই না, এখানে উঠে এসেছে নীচু জাতদের প্রতি উঁচু জাতের নিপীড়ন, নিষ্পেষণ আর তুচ্ছতাচ্ছিল্যতার কথা। শিষ্য একলব্যের কাহিনির পাশাপাশি উঠে এসেছে বইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ন চরিত্র গুরু দ্রোনাচার্যের জীবন কাহিনিও। বইয়ে একলব্যের অন্যতম মিত্র কর্ণ। দানবীর কর্ণ নামে পরিচিত এই রাজা ইতিহাসে নেগেটিভ চরিত্র হিসেবেই পরিচিত। অর্জুনের অন্যতম দুশমন (কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে নিহত হন অর্জুনের হাতেই)। কিন্তু এই যে অর্জুনবিরোধীতা কিংবা গুরু দ্রোণাচার্যের প্রতি বিদ্বেষ-সেটারই বা উৎপত্তি কোথা থেকে খুব সুন্দর করে ফুটে উঠেছে বইটিতে৷ সত্যি কথা বলতে কি, মানুষের জন্ম কিভাবে (বৈধ নাকি অবৈধ সেই অর্থে) বা কি বংশ পরিচয় সেটা কখনোই কারও বড় পরিচয় হতে পারে না কিংবা একজন মানুষ যে কখনোই জন্ম থেকে খারাপ হয় না পরিবেশ-পরিস্থিতি তাকে সেদিকে ঠেলে দেয় এই বইটা পড়লে টের পাওয়া যায় হাড়ে হাড়েই।
এইজন্যেই বলছিলাম৷ যে কোন হিস্টোরিক্যাল ফিকশন বইয়ের সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে পার্সপেক্টিভ। যে কারণে সারাজীবন নেগেটিভ চরিত্র হিসেবে জানা চরিত্রগুলোকেও পজেটিভ ভাবতে ইচ্ছা হয়। তাদের জন্য বুকের খুব গভীর থেকে উঠে আসে একটা দীর্ঘশ্বাস! আহারে একলব্য! আহারে কর্ণ!
(বিশেষ দ্রস্টব্য: বহুপঠিত পৌরাণিক কাহিনীর অনুলিখন হওয়ায় আদতে "একলব্য"-এর ক্ষেত্রে স্পয়লারের কোনো জায়গা নেই। মহাভারতের কাহিনী সর্বজনব্যতীত। তারপরেও কেউ যদি মহাভারতের কাহিনী জেনে না থাকেন বা পড়ে জানার আগ্রহ রাখেন, অনুগ্রহ করে এই লেখাটি পড়বেন না।)
মহাভারতের "একলব্য" --------------- (১) অনেকগুলো ব্যাপারে আমি নিজেকে অতি সৌভাগ্যবান বলে মনে করি। তার একটা হচ্ছে ছোটবেলাতেই অনেক বিচিত্র বিষয়ের বই পড়তে পারার সুযোগ।
মহাভারত প্রথম যখন আমি পড়ি তখন আমি প্রাইমারি স্কুলে। বইটি ছিল উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর লেখা "ছেলেদের মহাভারত"। পড়তে গিয়ে বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছি। এর আগে পড়েছিলাম "ছেলেদের রামায়ন।" কিন্তু সেই তুলনায় মহাভারতের কাহিনীর ব্যপ্তি, এতগুলো চরিত্রের সমাহার, কুটিল রাজনীতি, রণকৌশল, আর নৈতিকতার ধূসরতা আমার মনে দাগ কেটে যায়। শেষ পয়েন্ট - ধূসর নৈতিকতা - মহাভারতে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ভাল মানুষ ও খারাপ মানুষের মাঝের ব্যবধান আসলে কম, সবারই ভাল ও খারাপ দিক থাকে। শুধু শৌর্য আর দক্ষতাই নয়, মহৎ উদ্দেশ্যে বা বড় কিছু পাওয়ার জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে ছলনার আশ্রয় নেয়া যুদ্ধনীতির অংশ, এটা জানতে পেরে আমি অভিভূত হয়েছিলাম। মহাভারতের অনেক চরিত্রই খুব জটিল, সোজাসাপ্টাভাবে নায়ক ও খলনায়কের বিভেদ করা খুব মুশকিল। রামায়নের ক্ষেত্রেও এটা বলা যায়, তবে আমার কাছে মনে হয়েছে এই দিকটাই মহাভারতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
ছোটবেলায় যেটা মিস করেছিলাম, বড় হয়ে যেটা বুঝে আরও মুগ্ধ হয়েছি, সেটা হচ্ছে মহাভারতের জাত-পাত ও শ্রেণিসংগ্রামের দিকগুলো। ছোট জাতের অছ্যূত যারা তাদেরকে রাজনীতির ইতিহাসে দাবা খেলার বোড়ে হিসেবে ব্যবহার করেছে শাসক ও শোষক শ্রেণি। হিন্দুপুরাণেও এর ব্যতিক্রম নেই।
---- (২) পড়ে ফেললাম হরিশংকর জলদাসের লেখা উপন্যাস "একলব্য"। মহাভারতের গল্পটাই লেখা হয়েছে, তবে একলব্য চরিত্রের দৃষ্টিতে। এক কথায় অতুলনীয় একটা লেখা, মনে দাগ কাটার মত। হরিশংকর জলদাস চরিত্র বিন্যাস ও মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে বেশ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। লেখকের অন্যান্য বই পড়ার আগ্রহ পাচ্ছি।
রাজপুত্র একলব্য মহাভারতের এক চরিত্র। সে ব্যাধ বা শিকারী গোত্রের নিষাদ জাতির রাজা হিরণ্যধণুর সন্তান। সে ভাল তীরন্দাজ। সে প্রার্থনা করে ধনুর্বিদ গুরু দ্রোনাচার্যের শিষ্যত্ব। কিন্তু দ্রোন তাকে প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ একলব্য শূদ্রজাত। দ্রোন শুধু রাজপুত্র আর উঁচুজাতের যোদ্ধাদেরকেই প্রশিক্ষণ দেন। এখানে উল্লেখ্য হচ্ছে রাজপুত্র হবার পরেও কৃষ্ণগাত্রবর্ণের একলব্যের স্থান হলো না দ্রোনাচার্যের চরণতলে। তাকে শিষ্যের জায়গা দিলে সুনাম ক্ষুণ্ণ হতে পারে, আর উচ্চবর্ণের রাজপুত্রেরা তার কাছে না-ও আসতে পারে এমনটাই আশংকা করলেন দ্রোন।
একলব্য প্রত্যাখ্যাত হয়েও দমে যায় না। সে গহীন জঙ্গলে দ্রোনের প্রতিকৃতি স্থাপন করে তাকে গুরু মেনে সাধনা শুরু করে। নিজে নিজে নীরবে অধ্যবসায় করে সে হয়ে ওঠে দ্রোনাচার্যের প্রিয় শিষ্য তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের সমকক্ষ তীরন্দাজ। এই খবর দ্রোন আর অর্জুনের কাছে গেলে তারা ভাবিত হন। তারা ভাবতে থাকেন কিভাবে একলব্যকে দৃশ্য থেকে সরিয়ে দেয়া যায়, কিভাবে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় আর্যগোষ্ঠীর সাজানো বৈদিক রীতিনীতির সমাজব্যবস্থার ঝাণ্ডা যথাস্থানে উড়িয়ে রাখা যায়।
দ্রোন ছলনার আশ্রয় নিলেন। একলব্যকে বললেন যে যদি একলব্য তাকে গুরু বলে মেনেই নিয়ে থাকে তবে তাকে গুরুদক্ষিণা হিসেবে তার ডান হাতের বুড়ো আঙুল যেন কেটে দেয়। একজন তীরন্দাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে তার প্রধাণ হাতের বুড়ো আঙুল। কিন্তু, গুরুভক্তির উদাহরণ স্থাপন করে একলব্য দ্বিতীয় কোনো চিন্তা না করেই তা দিয়ে দেয়।
হেরে গেল একলব্য। অর্জুন তুষ্ট। দ্রোন একলব্যকে পঙ্গু করে দিয়ে রাজপ্রাসাদে ফিরে গেলেন। কৌরবরাজ ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র দুর্যোধন, দুঃশাসন, বিকর্ণের একশ’ ভাই, তাদের খুড়তুতো পঞ্চপাণ্ডব - যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব, আর দুর্যোধনের বন্ধু দানবীর কর্ণের অনুশীলন আবার শুরু হলো।
একলব্যের বোধদয় যতক্ষণে হলো ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। সে শূদ্র, তার অবস্থানটা দ্রোনের চোখে কোথায় তা সে এখন পরিষ্কার দেখতে পেল।
গল্পটা এখানে শেষ হয়ে যেতে পারতো, কিন্তু হলো না। কারণ সে যে একলব্য! সে সাধনা আর অধ্যবসায়ের প্রতিমুর্তি। দ্রোনের প্রতি প্রচুর ঘৃণা নিয়ে সে এবার শুরু করলো চার আঙুলে তীর ছোঁড়ার অনুশীলন। শুণ্য থেকে শুরু করে আবার সে হয়ে উঠলো শ্রেষ্ঠ নিষাদ তীরন্দাজ।
কালের ফেরে রাজনীতির প্যাঁচে ক্ষমতার লড়াই শুরু হলো। কুরুরাজপুত্র দুর্যোধন চাচাতো ভাইদের জানালেন “বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী” অর্থাৎ সুঁচের আগায় যতটুকু মাটি ধরে ততটুকুও দেব না যুদ্ধ ছাড়া। শুরু হলো আঠারো দিনের কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধ যাতে কৌরবপক্ষের নেতা দুর্যোধন আর অন্যদিকে পাণ্ডবপক্ষের নেতা অর্জুনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা যুধিষ্ঠির। দ্রোন নিলেন দুর্যোধনের পক্ষ, কারণ তিনি কুরুরাজের প্রতি অনুগত।
একলব্য ততদিনে রাজপুত্র থেকে রাজা হয়েছেন। তিনি পরলেন দ্বিধায়। একদিকে পাণ্ডবদলের অর্জুন যে তাকে হিংসে করে গুরু দ্রোনাচার্য-কে প্রভাবিত করেছে তার ক্ষতি করার জন্য। অন্যদিকে কৌরবদলের দ্রোনাচার্য, যে কিনা জাতপাতের দোহাই দিয়ে একলব্যকে বঞ্চিত করেছে।
রাজনীতি বড়ই বিচিত্র। কুরুরাজপুত্র দুর্যোধনের চরিত্রের অনেক খারাপ দিক থাকলেও রথচালকের পুত্র কর্ণ-কে তিনি বন্ধু হিসেবে নিয়েছেন। একলব্য নিচুজাতের হবার পরেও তার কাছে স্বীকৃতি পেয়েছেন। দুর্যোধন জাতপাত মানেন কম। অন্যদিকে যুধিষ্ঠির ন্যায়বান। অবশেষে দেখা গেলো শুদ্র গোত্রের রাজারাও দু’ভাগে ভাগ হয়ে কুরুক্ষেত্রে পক্ষ নিল। একলব্য নিলেন বন্ধু দুর্যোধনের পক্ষ, সেই হিসেবে দ্রোনের পক্ষ।
এই যুদ্ধে দ্রোন স্বাদ পেলেন তার নিজের ঔষধের। ছলনার।
কৌরবপক্ষের সর্বাধিনায়ক সেনাপতি দ্রোনের নয়নমণি তার পুত্র অশ্বত্থামা। ভীম যুদ্ধক্ষেত্রে মারলেন সেই একই নামে পরিচিত এক যুদ্ধ-হাতিকে। সত্যবাদী হিসেবে বিখ্যাত যুধিষ্ঠিরের কণ্ঠ থেকে বের হলো, “অশ্বত্থামা হত! ইতিঃ গজ।” অর্থাৎ, অশ্বত্থামা নামের হাতিটি মরেছে। কিন্তু হাতির অংশে যুধিষ্ঠির তার কণ্ঠ এত নিচু করে ফেললেন যে দ্রোন শুনতে পেলেন যে শুধু অশ্বত্থামা, তার আদরের পুত্র, আর নেই।
যুধিষ্ঠির ছলনা করতে পারেন তা দ্রোনের কল্পনাতেও নেই। অন্য কেউ বললে হয়তো বিশ্বাস করতেন না। একলব্য সতর্ক করলেন দ্রোন-কে, কিন্তু তবু তার বুক চিঁড়ে বের হল হাহাকার, “হা পুত্র! হা অশ্বত্থামা!!” দুঃখে তিনি অস্ত্র ত্যাগ করলেন। সেই সুযোগে অর্জুন শুরু করলেন তীরের ধূম্রজাল, যার আড়ালে তার শ্যালক ধৃষ্টদ্যুম্ন বধ করলেন দ্রোনকে।
সেনাপতি হারিয়ে কৌরবরা যুদ্ধ হেরে গেলেন, পাণ্ডবরা জয়ী হলেন। একলব্য ফিরে গেল ভগ্ন হৃদয়ে। ছলনায় যুদ্ধজেতা পাণ্ডবদের হাত দিয়ে শুরু হলো যুধিষ্ঠিরের ন্যায়ের সাম্রাজ্যের। কিন্তু বৈদিক রীতির সেই সাম্রাজ্য কি গোত্রপ্রথার উপরে উঠতে পারলো, পারলো কি জাতের হিসেবের বাইরে গিয়ে মেধার ও অনুশীলনের গুরুত্ব দিতে? এই নিয়ে ভাবতে লাগলেন একলব্য।
এই হলো একলব্যের উপাখ্যান।
--- (৩) মহাভারত চমৎকার সব চরিত্রের সমাহার। অর্জুনপুত্র অভিমন্যু, যে কিনা দ্রোনাচার্যের রণকৌশল চক্রবূহ্য ভেদ করে ঢুকতে জানতো কিন্তু বের হতে জানতো না, পিছপা হয়নি। শিখণ্ডি জন্ম নিয়েছিলেন মেয়ে হিসেবে, পরে পুরুষ হয়েছেন, বধ করেছেন প্রথম কৌরব সেনাপতি পিতামহ ভীষ্মকে। অশ্বত্থামা, যার মিছে মৃত্যুসংবাদ বদলে দিয়ে যুদ্ধের মোড়। শকুনি, যে কিনা দুর্যোধনের উপদেষ্টা হিসেবে কূটচাল চালতো। বিদুর শূদ্র দাসীর গর্ভে জন্ম নিয়েও কুরুরাজ্যের সন্মানিত মন্ত্রী ও উপদেষ্টা হয়েছিলেন। দ্রোন জাতিতে ব্রাহ্মণ হয়েও পুজাপাঠ ছেড়ে দারিদ্র্য ঘোঁচাতে আর সুনাম করতে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে ক্ষত্রিয়ধর্ম পালন করেছেন, আচার্য হিসেবে সন্মানিত হয়েছেন। তার চিন্তাভাবনার একটা বড় অংশ ছিল অর্থনৈতিক। শিশুপুত্র অশ্বত্থামা দুধ খেতে না পেরে কেঁদেছে, আর দ্রোন শপথ নিয়েছেন ধনী হবার।
যত পড়ি তত মুগ্ধ হই। কোথায় গেইম অব থ্রোনস, আর কোথায় গ্রেকো-রোমান মীথোলজি! আমাদের নিজেদের অঞ্চলের সাহিত্যের যে রত্নসম্ভার, যে অভূতপূর্ব কাহিনীর শাখাপ্রশাখা আর বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সমাহার তার কোনো তুলনাই হয়না। রামায়ন আর মহাভারতের মূল কাহিনীকে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা যায়। পান্ডবদের দৃষ্টিতে দেখলে এক, আবার অনার্য জাতিগুলোর দৃষ্টিতে দেখলে আরেকরকম। একলব্যের পিতা রাজা হিরণ্যধনু আর পিতামহ অবসরপ্রাপ্ত রাজা অনমোদর্শী তাকে কৈশরে শোনায় রামায়নের কাহিনী। তাদের দিক থেকে দেখলে আর্যরা মূলত বহিরাগত, আর অনার্য যারা, বিশেষ করে জঙ্গলবাসী ব্যাধরা, তারাই ভারতবর্ষের নিজস্ব সন্তান। একই গল্প আলাদা দু’দিক থেকে বললে কতই না বিচিত্র রঙের মেলা বসে!
আমরা কি আমাদের পরের প্রজন্মের হাতে এই রত্নসম্ভার তুলে দিচ্ছি? থর, ওডিন বা জিউসের গল্প শুনে বড় হওয়া প্রজন্ম কি আমাদের অঞ্চলের পৌরাণিক কাহিনীর স্বাদটা পাচ্ছে?
(পাদটীকা) পৌরাণিক কাহিনী হলেও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। ইতিহাসের পণ্ডিতদের মতে ক্রিস্টপূর্ব ১০০০ সনের দিকের কোন এক মহাযুদ্ধকে ভিত্তি করে হয়তো এটা লেখা। আর অন্য একটি জনপ্রিয় মত হচ্ছে যে এটা খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ সনেরও আগে��� ঘটনা।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে বঙ্গ পক্ষ নিয়েছিল কৌরবদের। সে হিসেবে আমরা বিজিত পক্ষ।
"হিরণ্যধনুর পুত্র একলব্য নাম। দ্রোণের চরণে আসি করিল প্রণাম।। যোড়হাত করি বলে বিনয় বচন। শিক্ষাহেতু আইলাম তোমার সদন।। দ্রোণ বলিলেন তুই হোস্ নীচ জাতি। তোরে শিক্ষা করাইলে হইবে অখ্যাতি।।
:আদি পর্ব্ব, মহাভারত। কাশীরাম দাস . . "এই জগৎ-সংসারকে আমি দেখিয়ে দিতে চাই-- একলব্য নামে একদা এক নিষাদপুত্র ছিল। যে হেলায় জাতপাতের দুর্লঙ্ঘ্য দেয়াল ডিঙিয়ে, উচ্চবর্ণের অবহেলা-অপমানকে পাত্তা না দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছিল।" . . হরিশংকর জলদাসের প্রথম বই পড়লাম "একলব্য"। সুখপাঠ্য একটা উপন্যাস। মহাভারতের একটি অবহেলিত চরিত্র 'একলব্য'কে নিয়ে লেখা। চরিত্রটিকে তিনি সমস্ত আবেগ ঢেলে দারুণভাবে তুলে ধরেছেন। মনে হয়েছে লেখক নিজে এ চরিত্রে ঢুকে গেছেন। . অনার্য হিরণ্যধনুর পুত্র একলব্য। নিজ রাজ্যে অস্ত্রশিক্ষা সমাপ্ত করে ধর্নুবিদ্যা লাভের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান জগদ্বিখ্যাত অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্যের আশ্রমে। ব্রাহ্মণ না হয়ে অনার্য হওয়ায় গুরু দ্রোণ তাকে শিক্ষা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। কিন্তু একলব্য নাছোড়বান্দা। দ্রোণকে মানসপটে গুরু মেনে তার মূর্তি তৈরি করে নির্জনে ধর্নুবিদ্যা শিখতে থাকে একবল্য, হয়ে উঠতে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। এমন সব কিছু আয়ত্ত করে ফেলে দ্রোণের প্রিয় শিষ্য অর্জুনেরও ছিল অজানা। একলব্যকে শিষ্য না মেনেও তার কাছে গুরুদক্ষিণা হিশেবে ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি চেয়ে বসেন গুরু দ্রোণাচার্য। একলব্যও তার বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে ফেলে। কৌশলে গুরু দ্রোণ একলব্যকে সরিয়ে অর্জুনকে করতে চেয়েছিলেন জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্নুবিদ।যাতে তিনি সফল হন। . বইটা জুড়ে ছিল প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্যের বর্ণনা। সাথে কুরুযুদ্ধের সময়ের আখ্যান,একলব্যের পরিনতি। দ্রোণাচার্যের জীবনের নানা ঘটনা। . জাত-পাতের ব্যাপারে একটা উক্তি বেশ ভালো লেগেছে। বইটাও শেষও হয়েছে এই বাক্যের দ্বারা। . "যে ভবিষ্যতে ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয় দ্বারা ভারতবর্ষ শাসিত আর শোষিত হবে না, শাসিত হবে জাতবরণ নির্বিশেষে প্রাকৃত মানুষ দ্বারা।"
বই ~ একলব্য লেখক ~ হরিশংকর জলদাস প্রকাশনী ~ অন্যপ্রকাশ মূল্য ~ ৪৫০/- পৃষ্ঠা ~ ১৯৬
অসাধারণ একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস। একলব্য নামের এক অসীম সাহসী, পরিশ্রমী এক যোদ্ধার গল্প বলা হয়েছে এই উপন্যাসে। হিন্দুধর্মের বর্ণ প্রথা-কে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে পরতে পরতে। যোগ্যতা থাকার পরেও আর্য অর্থাৎ ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়রা কিভাবে বঞ্চিত করেছে শূদ্র ও বৈশ্য বর্ণের অর্থাৎ নিম্নবর্ণের হিন্দুদের, একলব্য এবং মহাবীর কর্ণের মুখে উচ্চারিত বাক্যগুলোর মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক তা তুলে ধরেছেন সুনিপুণ দক্ষতায়।
এপিকধর্মী উপন্যাস একলব্য। মহাভারতের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ বর্ণিত হয়েছে হরিশংকর জলদাসের স্বতন্ত্র আঙ্গিকে। আর হ্যাঁ, নাম 'একলব্য' হলেও অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্যই এই উপন্যাসের মূল চরিত্র।
একলব্য, মহাভারতের এক অবহেলিত চরিত্র। পাণ্ডব পুত্র অর্জুনের ঈর্ষা আর পান্ডব ও কৌরবদের অস্ত্র শিক্ষা গুরু দ্রোণাচার্য এর অধিক অর্জুন প্রীতি একলব্য কে বেধে রেখেছিল অবহেলার কারাগারে। সেই একলব্য কে তুলে এনেছেন সুলেখক হরিশঙ্কর জলদাস তার এপিকধর্মী উপন্যাস “একলব্য” তে।
নিষাদরাজা হিরন্যধনু ও রানি বিশাখার একমাত্র পুত্র একলব্য। শৈশব থেকেই একলব্য এর ইচ্ছে সে ভারতের সেরা অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য এর কাছ থেকে অস্ত্র শিক্ষা নেবে। উপন্যাসের শুরু হয় যখন একলব্য তার পিতা হিরন্যধনুকে তার অভিপ্রায় ব্যাক্ত করে। কিন্তু বিচক্ষণ হিরন্যধনু চায় না তার পুত্র হস্তিনাপুরে যাক ব্রাম্মন দ্রোণাচার্য এর কাছ থেকে অস্ত্র শিক্ষার জন্য। কেননা তিনি জানতেন ব্রাম্মন দ্রোণাচার্য কখনই একজন ব্যাধ পুত্রকে অস্ত্র শিক্ষা দিবেন না। কিন্তু একলব্য নাছোড়, সে যাবেই। একপর্যায়ে হিরন্যধনু তার পিতা অনোমদর্শী কে অবহিত করলে, অনোমদর্শী পরামর্শ দেয় একলব্য কে যাওয়ার অনুমুতি দিতে।
মহাআনন্দে একলব্য রওনা দেয় দূরবর্তী হস্তিনাপুরের উদ্দেশ্যে। বহু পথ পাড়ি দিয়ে একলব্য হাজির হয় দ্রোণাচার্য এর সামনে। কিন্তু দ্রোণাচার্য যে ব্রাহ্মণ, নিম্ন বর্ণের কাউকে অস্ত্র শিক্ষা দেবে না।ব্যাধ রাজার (ব্যাধ বলতে বুঝায় যারা শিকারি বা মৃগয়াজীবী জাতি তাদের কে) ছেলে হওয়ায় একলব্য কে তিনি অপমান করে তাড়িয়ে দেন।
মনের দুঃখে একলব্য আর বাড়ি ফিরে না গিয়ে বনের মধ্যে একটা ছোট্ট কুটির বানিয়ে থাকতে শুরু করে। দ্রোণাচার্য যতই অপমান করুক তাকে যে সমস্ত মন দিয়ে একলব্য তার শিক্ষাগুরু হিসেবে ভেবে এসেছে। তখন একলব্য তার কুটির এর সামনে গুরু দ্রোণাচার্য এর একটি মৃন্ময় (মাটি নির্মিত) মূর্তি তৈরি করে সেই মূর্তি কে নিজের গুরু হিসেবে মান্য করে নিজে নিজেই অস্ত্র সাধনা করা শুরু করে। এভাবে কেটে যায় অনেকগুলো বছর। এরমধ্যে হস্তিনাপুরে দ্রোণাচার্য এর কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে মহাবীর হয়ে ওঠে অর্জুন। কৌরবদের একশ ভাই, পাণ্ডবদের অর্জুন বাদে বাকি চার ভাই, কর্ণ, এমনকি দ্রোণাচার্য এর নিজের ছেলে অশ্বত্থামার থেকেও প্রিয় হয়ে ওঠে অর্জুন দ্রোণাচার্য এর কাছে। দ্রোণাচার্য তার সেরা অস্ত্র “ব্রমাস্ত্র” তুলে দেন অর্জুনের হাতে।
এদিকে অরন্য মাঝে একলব্য তার একাগ্র সাধনার মাধ্যমে নিজে নিজেই শিখেছে অস্ত্র চালনা। এমন কিছু ট্রিক সে আবিস্কার করে ফেলেছে যা দুনিয়ার আর কেউ জানে না। একবার মৃগয়ায় (পশু শিকার) গিয়ে অর্জুন দ্যাখে ব্যাধ পুত্র একলব্য এমন কিছু পারে যা সে পারেনা। অর্জুন একলব্য এর কাছে জানতে চায় কে তাকে এসব শিখিয়েছে? একলব্য বলে সে এসব দ্রোণাচার্য এর কাছে শিখেছে। কারণ একলব্য তো দ্রোণাচার্য এর মৃন্ময় মূর্তিকে তার গুরু ধরে নিয়ে এতকাল সাধনা করে আসছে। একথা শুনে ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে অর্জুন। সে ছুটে যায় দ্রোণাচার্য এর কাছে। দ্রোণাচার্য তো শুনে অবাক। সে তো নিষাদ রাজার ছেলেকে কোন শিক্ষা দেয়নি, দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল। এদিকে অর্জুন ও নাছোড়, ব্যাবস্থা একটা নিতেই হবে। দ্রোণাচার্য যে কথা দিয়েছিল অর্জুন কে যে তার থেকে বড় ধনুর্ধর আর কেউ হতে পারবে না।
অর্জুন কে নিয়ে দ্রোণাচার্য ছুটলেন একলব্য এর কুটিরে। সেখানে গিয়ে তো দ্রোণাচার্যর চক্ষু চড়কগাছ। তার মৃন্ময় মূর্তিকে গুরু মেনে এক ব্যাধ পুত্র যে সেরা হয়ে উঠেছে। খুশিতে কোথায় একলব্য কে বুকে জরিয়ে ধরবে তা না করে উলটো অর্জুনের কূট বুদ্ধিতে দ্রোণাচার্য একলব্য এর কাছে গুরুদক্ষিনা চেয়ে বসলো। কি সেই গুরু দক্ষিনা? একলব্য কে তার দক্ষিন হ��্তের বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে দিতে হবে। একজন তীরন্দাজের জন্য সবথেকে জরুরী যেই অঙ্গ সেটাই দাবী করে বসলেন দ্রোণ। কিন্তু একলব্য একবার ও নিজের কথা না ভেবে নিজের ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে রেখে দিলেন গুরু দ্রোণাচার্য এর পায়ের কাছে। তৎক্ষণাৎ ঘুরে চলে গেলেন দ্রোণ আর অর্জুন। একবার ফিরেও তাকালেন না একলব্য এর দিকে।
এরপর কি হল? কিভাবে আবার একলব্য নিজেকে গড়ে তুললেন একটু একটু করে? কুরুক্ষেত্রের সেই বিশাল যুদ্ধে কি সে পেরেছিল অর্জুন বধ করতে? কেন একলব্য আক্রমন করে বসলেন কৃষ্ণের রাজধানীতে জানতে হলে বইটি পড়তে হবে।
লেখক দারুন সাবলীল ভাবে লিখে গেছেন। তবে মাঝে মাঝে মনে হয়েছে বইটা কি একলব্য কে নিয়ে লেখা হচ্ছে নাকি দ্রোণাচার্য কে নিয়ে। কারন একটা দীর্ঘ সময় জুরে লেখক দ্রোণাচার্য কে নিয়েই লিখেছেন। পৃষ্ঠার হিসেব করতে বসলে তো আমার মনে হয় দ্রোণাচার্য কে নিয়েই বেশি লিখেছেন লেখক। তবে মহাভারত এর কাহিনী নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে তাদের অবশ্যই এই বইটা পড়ে দেখা উচিৎ। তবে এই বই পড়ার জন্য অবশ্যই মহাভারত পড়া থাকা জরুরী। যদিও লেখক অনেক দারুন ভাবে ডিটেইল এ বর্ণনা করেছেন, তারপরও মহাভরত পড়া না থাকলে আসল রস আস্বাদন করা যাবে না।
হিরণ্যধনু পুত্র একলব্য নাম। দ্রোণের চরণে আসি করিল প্রণাম।। যোড়হাত করি বলে বিনয় বচন। শিক্ষাহেতু আইলাম তোমার সদন।। দ্রোণ বলিলেন তুই হোস্ নীচ জাতি। তোরে শিক্ষা করাইলে হইবে অখ্যাতি।। - আদি পর্ব্ব, মহাভারত। কাশীরাম দাস
এভাবেই শুরু হয়েছে বইটি... হরিশংকর জলদাসের কিছুলেখা আগেও পড়েছি। চমৎকার সাবলীল লেখা। তবে এই লেখার বিষয় বা কাহিনী মৌলিক নয়। মহাভারতের কিছু কাহিনীর অংশবিশেষ যেখানে একলব্য কে প্রধান করে গল্প এগিয়ে গেছে লেখকের নিজস্ব ভঙ্গিতে।
মৌলিক লেখা না হবার পরেও কাহিনীর বিস্তার এবং বর্ণনা পড়তে বেশ “সুখপাঠ্য”, কিন্তু যেহেতু কাহিনীর অনেকাংশই জানা তাই খুব বেশি রোমাঞ্চিত হবার সুযোগ নেই। তবে জানা কাহিনীকেই লেখক এত সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন যে পুরাণপ্রেমী সব পাঠক আনন্দ নিয়ে পড়েছেন নিশ্চিত, এখানেই লেখক হিসেবে তিনি সার্থক।
একলব্য চরিত্রকে তিনি দারুণভাবে চিত্রণ করেছেন। আনার্য হিরণ্যধনুপুত্র একলব্য, একনিষ্ঠ সাধনা, গুরুভক্তি এবং নীতিতে আবিচল। নিষাদ ও ব্রাক্ষণদের যে জাত অভিমান-অহমিকা তা দূর করে, আনার্যদের আলাদা মর্যাদার জায়গা দিতেই একলব্য চায় যুদ্ধবিদ্যায় অদ্বিতীয় হতে। কিন্তু অনেক আশা নিয়ে, অনেক পথ পাড়ি দিয়ে গেলেও ব্রাক্ষণ নয় বলে দ্রোণাচার্য তাকে বিদ্যাশিক্ষা দেননি, অথচ তিনি নিজে ব্রাক্ষণ হয়েও যাজনযোজন এর পথ বেছে নেনিনি। পৃথিবীশ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদ দ্রোণ যখন ফিরিয়ে দিলেন একলব্যকে তখন যে নিজেই মানসপটে দ্রোণাচার্যকে গুরুর আসনে বসিয়ে, গুরুর ভাস্বর্য বানিয়ে একান্তে বছরের পর বছর সাধণা করে এবং একক ও অদ্বিতীয় হয়ে উঠছিল। সে নিজেই এমন সব শর নিক্ষেপ বিদ্যা আয়ত্ব করছিল যা দ্রোণাচার্যের প্রিয়তম পাত্র অর্জুনেরও ছিল আজানা। কিন্তু নিজের শিষ্য হিসেবে দ্রোণ একলব্যকে স্বীকার না করেও গুরুদক্ষিণা হিসেবে ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল কেটে নিতে দুবার ভাবেন নি। ঠান্ডা মাথায়, কৌশলে একলব্যকে হীনবল করার চেষ্টা করেছেন তিনি। যেন এই ধরাতে শুধু অর্জুনই শ্রেষ্ট ধনুর্বিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সরস্বতীর তীরে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে এই অর্জুনেরই কৌশলের কাছে যুধিষ্টিরের হাতে মারা যান দ্রোণ, যেখানে প্রিয় অর্জুন যুদ্ধ করে দ্রোণের বিরুদ্ধে।
কিন্তু গল্পের কোন কোন জায়গায় চরিত্রগুলো বেশ অবস্থান বদলেছে, একবার এদিকে তো আরেকবার ওদিকে। যেহেতু পুরো মহাকাব্যের অংশ তাই ছোট চরিত্রগুলোও এখানে প্রাধান্য পেয়েছে তাই তাদের প্রকৃতি অনেকটাই ধরা যায়না। প্রথমে দ্রোণের প্রতি ভালোবাসা পরে আবার ঘৃণার উদ্রেক হয়, একই ব্যাপার ঘটে কর্ণের ক্ষেত্রে। প্রথমে তাকে দুর্বিনীত ও অহংকারী হিসেবে দেখা গেলেও পরে তাকে “ঠিকঠাক” মনে হয়।
গল্পের কোন কোন জায়গায় আলাদা আলাদা কথা এসেছে, দ্রোণ এবং ধ্রুপদের গল্পটি গল্পের বিশাল অংশ দখল করেছে।
গল্প প্রথমে যেভাবে এগিয়েছে পরের দিকে বেশ তাড়াহুড়ো করেই শেষ হয়েছে এবং সমাপ্তি বলাই বাহুল্য "অসমাপ্ত"।
মহাভারতের মতো এক সুবিশাল, বহুস্তরবিশিষ্ট কাহিনিতে কিছু চরিত্র শুধুই “ঘটনা” হিসেবে হাজির হয়ে চলে যায়। তাদের কেউ মনে রাখে না, কেউ বুঝতেও চায় না। এমনই এক চরিত্র একলব্য—নিষাদপুত্র, যে এক সময়ে হয়ে উঠেছিল ধ্বংসাত্মক প্রতিভার প্রতীক, অথচ শোষিত, বঞ্চিত, ন্যায়ের বাণীহীন। সেই অবহেলিত একলব্যকে তুলে এনেছেন কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস, তার এপিকধর্মী উপন্যাস “একলব্য”-তে।
উপন্যাসের সূচনা একলব্যের শৈশবে। নিষাদরাজা হিরণ্যধনু ও রানি বিশাখার ঘরে জন্ম নেওয়া এই বালকটির সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল—ভারতের শ্রেষ্ঠ অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য এর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করা। কিন্তু পিতা হিরণ্যধনু জানতেন, দ্রোণ কেবল ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় বংশীয়দেরই শিক্ষা দেন। ব্যাধ (শিকারি) জাতের সন্তানকে কখনোই মেনে নেবেন না।
তবু একলব্যের দৃঢ় সংকল্পের কাছে সমস্ত বাধা তুচ্ছ হয়ে যায়। পিতামহ অনোমদর্শীর পরামর্শে অবশেষে সে পায় যাত্রার অনুমতি। তার যাত্রা শুরু হয়—উত্তেজনায়, অজ্ঞতায়, আর ভরসায়।
দূর হস্তিনাপুরে গিয়ে একলব্য মুখোমুখি হয় নির্মম বাস্তবতার। দ্রোণাচার্য তাকে সরাসরি তিরস্কার করে বিদায় দেন, কারণ সে “নিচুজাত”। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদ দ্রোণ যখন জাত পরিচয়ের ছুতোয় একলব্যকে ফিরিয়ে দিলেন, তখন একলব্য কারো প্রতি বিষোদ্গার না করে নিজেই নিজের মনে দ্রোণকে গুরুর আসনে বসালেন, জঙ্গলের গভীরে গিয়ে মধ্যে মাটি দিয়ে তৈরী তাঁর মূর্তিকে বানালেন সাধনার কেন্দ্র। বছরের পর বছর একান্তে, নিঃসঙ্গভাবে, নিঃশব্দে চালিয়ে গেলেন কঠিন অস্ত্রচর্চা।
সেই নিঃশব্দ সাধনাই এক সময় তাকে গড়ে তুলল একক ও অতুলনীয় এক ধনুর্বিদ হিসেবে। সে আয়ত্ত করেছিল এমনসব নিপুণ শরনিক্ষেপ কৌশল, যা দ্রোণাচার্যের প্রিয়তম শিষ্য অর্জুনেরও অজানা ছিল। একদিন শিকারে গিয়ে অর্জুন তার কীর্তি দেখে অভিভূত এবং ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে। জানতে চায়, এত কিছু কে তাকে শিখিয়েছে?
একলব্য জানায়—সে মৃন্ময় মূর্তির রূপে দ্রোণকেই গুরু হিসেবে মানে।
অর্জুন দ্রোণাচার্যের কাছে ছুটে যায়, প্রশ্ন তোলে “অঙ্গীকার”-এর। দ্রোণ একদিন তাকে কথা দিয়েছিলেন—অর্জুনই হবেন শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর।
অতএব, একলব্য নামক এই প্রতিভাকে দমন করতেই হবে। তাই দ্রোণ গুরুদক্ষিনার নামে কোনো দ্বিধা ছাড়াই, ঠাণ্ডা মাথায়, কৌশলে সেই প্রতিভাকে হীনবল করে দিতে চাইলেন, যেন একমাত্র অর্জুনই ধরণীতে শ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদ হিসেবে ইতিহাসে লেখা থাকে।” কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সরস্বতীর তীরে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে এই অর্জুন-যুধিষ্টিদের কৌশলের কাছেই পরাজিত হয় দ্রোণ। যেখানে প্রিয় অর্জুন যুদ্ধ করে গুরু দ্রোণের বিরুদ্ধে। যে নিচুজাতের জন্য একলব্যকে দ্রোণ উপেক্ষা করেছে সেই একলব্যই তাকে যতটা সম্ভব ছিল তাক��� শেষ পর্যন্ত সুরক্ষা দেবার চেষ্টা করে গেছে।
বলা হয়ে থাকে মাতৃদুগ্ধে একজন শিশুর যেরকম অধিকার, গুরুর স্নেহের ওপর একজন শিষ্যরও তেমন অধিকার। কিন্তু সবসময় কি তা হয়ে ওঠে? একজন গুরু কি তার সব শিষ্যকে সমান চোখে দেখতে পারে? নাকি কখনো শিষ্যর মাহাত্ম্য গুরুকে ছাড়িয়ে যায়? অনার্য একলব্য, নিষাদরাজা হিরণ্যধনুর পুত্র। পিতামহ অনোমদর্শী। ছোটবেলা থেকেই বেড়ে ওঠে পিতা,মাতা,পিতামহের স্নেহে। সমসাময়িক সময়ে ভারত তখন শাসন করছে আর্যগোষ্ঠী। জাতপাতে ভেদাভেদ তুলে ক্ষমতা করাগত করে রেখেছে। ছোটবেলা থেকে বালক একলব্য যুদ্ধবিদ্যা শিখতে আরম্ভ করে।ছোটবেলা থেকেই তার অভীষ্ট ছিলো তখনকার সময় সেরা ধনুর্বেদ দ্রোণাচার্যের শিষ্য হওয়ার। দ্রোণাচার্য তখন অর্থলিস্পায় ব্রাহ্মণ্যবৃত্তি ত্যাগ করে ক্ষত্রিয়বৃত্তি গ্রহণ করেছে। হস্তিনাপুর এর কৌরব-পান্ডব রাজপুত্রদের শিক্ষাভার গ্রহণ করেছে। সর্বাপেক্ষা তার প্রিয় শিষ্য ছিলো অর্জুন। অর্জুনকে সবচেয়ে বিধ্বংসী ব্রহ্মাস্ত্র দিলেও সমগুনসম্পর্ণ হওয়া সত্ত্বেও জাত্যভিমানের বশে শিষ্য কর্ণকে ব্রহ্মাস্ত্র দিতে অস্বীকার করে বসে। এদিকে একলব্য দ্রোণাচার্য থেকে শিক্ষা গ্রহণের জন্য হস্তিনাপুর চলে আসে। কিন্তু নিচু জাতের বলে তাকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। ভগ্নহৃদয় নিয়ে বনে চলে যায় একলব্য। নিজের হাতে গুরুর প্রতিকৃতি তৈরী করে, তার পদচারণে কঠোর অধ্যবসায় নিয়ে ধনুর্বিদ্যা অর্জন করতে থাকে। এদিকে একদিন ঘটনাক্রমে সেই অরণ্যে শিকারে আসে অর্জুনরা। তাদের কুকুর ঘটনাক্রমে একলব্যর সামনে গিয়ে পড়ে। বিদ্যাচর্চায় ব্যাঘাত ঘটায় তার মুখে তীর ছুড়ে মারে।কিন্তু তার নৈপুণ্যতায় কুকুরে মুখ বন্ধ হয়ে গেলেও সেখান থেকে কোন রক্ত পড়ছিলো নাহ। তা দেখে অর্জুন বুঝতে পারে সে পৃথিবীতে তার থেকে শ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদ আছে। তখন সে দ্রোণাচার্যের কাছে গিয়ে একলব্যর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকে। দ্রোণাচার্য যে একলব্যর গুরু হতে অস্বীকার করেছিল সেই একলব্যর কাছ থেকে গুরুদক্ষিণা চেয়ে বসে। কিছু মাত্র চিন্তা না করেই একলব্য প্রতিজ্ঞা করে গুরু যা চাইবে তাই দিবে একলব্য। ঈর্ষান্বিত দ্রোণ অর্জুনের ছলনা একলব্যর কাছে চেয়ে বসে একজন ধনুর্ধর এর সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অঙ্গ বৃদ্ধা আঙুল। গুরুর জন্য একলব্য তার বৃদ্ধাআঙুল বিসর্জন দেয়। এ ঘটনাই দূর থেকে অবলোকন করে কান্নায় ভেঙে পড়ে কর্ণ। কিন্তু কঠোর অধ্যবসায় একলব্য আঙুল ছাড়াও পূর্বের দক্ষতা ফিরে পায়। আর অর্জুনকে ধ্বংসের জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। লেখক শুধু এ গল্পে একলব্যকে আঁকেননি। লেখক বলতে চেয়েছেন চিরায়ত কাল ধরে চলে আসে জাত-পাত, নিচুজাত -উঁচুজাত,শূদ্র-ক্ষত্রিয়, বর্ণভেদাভেদের কথা। ভেদাভেদের যাঁতাকলে স্বপ্নভঙ্গের করুনকাহিনী। তাই বইয়ের সমাপ্তিতে তিনি বুনেছেন সেই সমাজের কথা যেখানে ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় দ্বারা ভারতবর্ষ শাসিত হবে নাহ, হবে জাতিবর্ণ নির্বিশেষে প্রাকৃত মানুষ দ্বারা।
This entire review has been hidden because of spoilers.
একলব্য। মহাভারতের বিশাল পৌরাণিক চরিত্রগুলার মধ্য হয়ত খুব নগণ্য, ছোট্ট একটা চরিত্র সে। কিন্তু কি বিশাল তার ব্যাপ্তি! নিষাদপুত্র (অর্থাৎ অনার্য বংশের) হয়েও শ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদ দ্রোণের থেকে ধনুর্বিদ্যা শেখা ছিল একলব্যের একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু আর্য রাজবংশের সন্তানদের শাস্ত্রগুরু - দ্রোণাচার্য যখন শুধু নিচ বংশে জন্ম বলে একলব্যকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করলেন না, তখন সে নিজ থেকেই কঠোর শাস্ত্রাভ্যাস শুরু করল। কিন্তু মনে মনে গুরু হিসেবে পূজা করতে লাগল সেই দ্রোণকেই। কিন্তু বিধির কি নির্মম পরিহাস! সেই দ্রোণ এবং তার প্রিয় শিষ্য অর্জুনের জন্য বিশাল ত্যাগ শিকার করতে তাকে। তার এতদিনের কষ্টার্জিত শিক্ষা একমুহূর্তে হয়ে গেল অকার্যকর। প্রথমবার শিষ্য হতে ব্যর্থ হয়ে একলব্য বাঁধা মানেনি। দ্বিতীয়বার দ্রোণের কূটকৌশলেও হার মানল না। চালিয়ে গেল তার শাস্ত্রাভ্যাস। তারপর কুরুক্ষেত্র যুদ্ধেও বীরদর্পে লড়াই করল।
এ সবকিছু যেন শুধু একলব্য করে গেল উঁচুজাতের দ্বারা নিচুজাতের লাঞ্ছনা আর প্রবঞ্চনার প্রতি প্রতিশোধ নিতে এবং বর্ণ ও জাতপ্রথার ঊর্ধ্বে গিয়ে এক মহান ভারতবর্ষ দেখার জন্য। ... একলব্যের গল্প ছোটবেলা থেকেই জানতাম আমি। কিন্তু লেখকের এত সুন্দর বর্ণনায় এ গল্প পড়ে মনে হচ্ছিল নতুন করে পড়ছি সবকিছু। প্রত্যেকটা অধ্যায় শেষ করে তারপর কি হল জানার জন্যে অদম্য কৌতুহল হচ্ছিল। তাই এক বসায় বইটি শেষ না করে উঠতে পারলাম না।
[পুনশ্চ : মহাভারতের কাহিনী কারো আগে জানা না থাকলে মনে হবে দ্রোণাচার্যকে নিয়ে লেখক বর্ণনাটা একটু বেশিই করেছেন। কিন্তু কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ময়দান পর্যন্ত আসতে গেলে এ বর্ণনাটুকুর দরকার ছিল। কারণ বিশাল এ যুদ্ধ লাগার পিছনে পরোক্ষভাবে দ্রোণও দায়ী ছিলেন।]
একলব্য অনেক আগে থেকে আমার কাছে মহাভারতের অন্যতম রহস্যময় চরিত্র। হঠাৎ করে এসে আবার হারিয়ে যাওয়া এক চরিত্র। হিরণ্যধনু এবং বিশাখার একমাত্র ছেলে একলব্য নিষাদ-যুবরাজ। ধনুর্ধর একলব্যের নিজের ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল কেটে গুরুদক্ষিণা দেওয়ার গল্পের বেশ জনপ্রিয়তা থাকলেও, কেন ধমনীতে রাজরক্ত থাকা স্বত্তেও দ্রোণাচার্য ধনুর্বিদ্যা শেখার অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে চিরদিনের মতো ধনুর্ধর একলব্যকে পঙ্গু করে দেয় এই প্রশ্নের উত্তর অজানা। এমনকি ইতিহাসও তারপ্রতি ন্যায় দেখাতে আগ্রহ প্রকাশ করেনি। তাকে যে শুধুমাত্র অনার্য হবার অপরাধে নয়, সঙ্গে ভবিষ্যতে অর্জুনের প্রতিদ্বন্দ্বি না হলেও সমকক্ষ হবার আশঙ্কায় দ্রোণ কৌশলে পঙ্গু করেছিলেন এটা স্পষ্ট অনুমান করা যায়। আর উপন্যাস দাড়িয়েছে এই অনুমানের ওপরের।
পুরো উপন্যাসকে তিনভাগে দেখলে প্রথম ভাগে নিষাদরাজ্য আর একলব্যের সঙ্গে আর্য - অনার্য জাতি নিয়ে বেশ বিস্তর আলাপ লেখা থেকে মনোযোগ সরতে দেয় না। কিন্তু দ্বিতীয় ভাগে এসে কখন যেন বিষয়বস্তুু একলব্যের ঘাড় থেকে সরে এসে দ্রোণের ঘাড়ে চেপে বসে। ঋষি ভরদ্বাজ, দ্রোণ এবং কৃপাচার্যের জন্মের কদর্য বিবরণ আর দ্রোণের প্রতি যুক্তিবর্জিত নিন্দা থেকে শুরু হয় উপন্যাসের প্রতি বিরক্তি। আর তৃতীয়ভাগে পুরোটাই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের বর্ণনা আর উৎকট কল্পনায় ভর করে একলব্যকে রথে চড়িয়ে এনে কুরুক্ষেত্রে দাঁড় করানো থেকে শুরু হয় চরম বিরক্তি। মূল গ্রন্থ থেকে এতো অসংখ্য বিচ্যুতি আর সংলাপের আনাড়ি ধরন প্রচন্ড হতাশাজনক।
This entire review has been hidden because of spoilers.
কর্ণ আর একলব্য তারা হলো এই সমাজের সেই বিদ্রোহী মানুষ। যারা জাতপাতের ধার ধারে না,ধনী গরীবের ব্যবধান করে না।অধিকার সবার জন্য সমান।সেখা��ে রাজার ছেলে রাজা হবে, তা হবে না।যোগ্যতা যার সেই হবে। পুরাণ এই কাহিনি আজো আমাদের সমাজে,রাষ্ট্রে ছড়িয়ে আছে।সেই দিন থেকে আজ অবধি সেইকৃষ্ণ, সেই বিশ্বাস ঘাতক, সেই ধর্ম ব্যবসায়ী ব্রাহ্মণ,পার্দী,মৌলবীর কাছে বার বার পরাজিত হচ্ছে।এই কর্ণ আর একলব্য নামের মানুষ জন।এই ভাবেই দিন দিন সমাজে বৈষম্য বেড়ে চলেছে।
মহাভারতের অন্যতম রথী বীর একলব্য কে নিয়ে রচিত এই বই। সমাজে অনার্যদের উপর আর্যদের অন্যায় অত্যাচার, ধর্মের নামে ধর্মাবতারের অধর্ম কাজ, ছল চাতুরির মাধ্যমে পিতামহ ভীষ্ম,কর্ণ,গুরু দ্রোণাচার্যের মৃত্যুর ঘটনা বর্ণনা করার মাধ্যমে মনুষ্যতে নাড়া দিয়েছেন লেখক। বইটি পড়তে পারেন। ভালো লাগবে। চেনা ঘটনাকে অন্যভাবে ভাবতে বাধ্য করবে এই বই😊
This entire review has been hidden because of spoilers.