হিমু। মানুষকে বিস্মিত করতে যার ভালো লাগে। তার উপখ্যানে, আলাপচারিতায়, নিতান্ত তুচ্ছ বা 'perfunctory' ব্যাপারগুলোকেও যে সে গভীরতায় এক মন্ত্রমুগ্ধকর আবহের সৃষ্টি করে, সেই মায়াজালে যে আমিও জড়িয়ে পড়ছি, আমি নিজেই এটি নিয়ে বিস্মিত ও আনন্দিত। আমার হিমুভক্ত স্টুডেন্ট এর সাথে এটি নিয়েই কথা হচ্ছিল। ভালোলাগার বিষয়গুলো রিলেট করার মতো কাওকে পেলে সময়টা মন্দ যায় না।
এই বইয়ের নামটাই আকর্ষণ করার মতো। এই নগরী নিয়ে যত অভিযোগই থাক, জীবনের কৈশোর, যৌবনের গাথা যে এখানের আকাশে-বাতাসে-সংকীর্ণ রাজপথ-গলিতে প্রোথিত। গল্পের শুরুটা হয় হিমুর আশার সাথে পরিচয়ের মাধ্যমে। আশা আমেরিকা প্রবাশী এক কিশোরী। হিমুর দায়িত্ব পরে তাকে বাংলাদেশ ঘোরানোর। হিমু শুরুতেই তাকে ঢাকা শহর দেখাতে নিয়ে যায়। নগরের অবিরাম ছুটে চলার মাঝেও যে কিছু মানুষ সব দায়িত্ব রেখে নিতান্তই কোনো কারণ ছাড়া গর্ত খোঁড়া, কিংবা অন্যদের শষা খাওয়ার দৃশ্য দূর হতে দাঁড়িয়ে দেখে, ব্যাপারটি আশার কাছে যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক ছিল। গল্পের মাঝে কিছু ব্যাপার অর্থহীন ছিল বটে, যেমন ভিখারীর সাথে সাক্ষাতকার। বৃষ্টি বিলাসী লেখক বৃষ্টির যে বদনা, আকাশের বারিধারার যে চমৎকার দৃশ্য এনেছেন, সেটি অনুরাগী পাঠককে pluviophile বানাতে যথেষ্ট। যান্ত্রিক এ জীবনে বিশাল কনক্রিটের পাইপের মাঝে বসে বৃষ্টি দেখাও যে আয়োজনের কিছু হতে পারে, তা মাথাতেই না আসাটা স্বাভাবিক।
আশার এক মানসিক ব্যাধি থাকে। তার মাথায় কোনো কথা একবার ঢুকে গেলে তা বাজতেই থাকে। মনে হয় যেন কোন পোকা মাথার ভেতর কুটকুট করছে। তখন ঘুমের অষুধ খেয়ে ঘুমাতে হয় তাকে। একবার হিমু আর আশা গেল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, বৃষ্টি বিলাসে। হিমুর কথা অনুযায়ী কদম ফুল ছাড়া নাকি বৃষ্টি দেখা পূর্ণতা পায় না। " বর্ষা দেখতে হলে কদম ফুল লাগে। একেকটা দেখার একেক রকম নিয়ম। জোছনা দেখতে হয় সাদা রঙের কাপড় পরে।" কদম ফুল সংগ্রহের সময় আশার সেই তীব্র মাথা ব্যাথা শুরু হয়। "মেয়েটা কাঁদতে শুরু করেছেঃ চোখের পানির রহস্যময় ব্যাপার হচ্ছে- ঝমঝম বৃষ্টির পানির মধেও চোখের পানি আলাদা করা যায়।"
এই কদম ফুল!!!
গল্পের আরেক অংশে থাকে হিমুর মেসের জয়নাল ভাই। যার রাতে ঘুম আসে না, নিশাচর তিনি। রাতজাগার ক্ষুধা নিবারণে তিনি দরজা খোলা হিমুর রুমে ঢুকে বিস্কিট খান। পরে হিমুর ঘুম ভাঙ্গানোর প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ তিনি হিমুর মাথা মালিশ করে ঘুম পাড়িয়ে দেন। এই মালিশ এক নাপিতের কাছ থেকে শেখা তার। আরেকজন থাকে মেসের ম্যানেজার। টাকা চুরির অপরাধে হাজতে যায় সে। হিমুর চেষ্টা থাকে তাকে মুক্ত করার। সে থেকে ওসির সাথে সখ্যতা হয় হিমুর।
জয়নাল সাহেব তার স্ত্রী কর্তৃক ধোঁকার শিকার। পরকিয়ায় জড়িত স্ত্রী তাকে এসিড ছোঁড়ার পরিকল্পনায় ফাঁসিয়ে জেল খাটায়। তার ছিল এক ছোট কন্যা শিশু। পরে আর মেয়ের সাথে দেখা হয় না তার কখনো। এই দুঃখের কথা তিনি হিমুকে জানান। এক সময় হার্ট এটাক হয় তার। হিমু তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তিনি আবদার করেন তার মেয়েকে নিয়ে আসার জন্য। হিমু যতই বলে তার দ্বারা সম্ভব না, কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা। হিমুর আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় তার মেয়ে উপস্থিত হবে, এ তার দৃঢ় বিশ্বাস। পরে হিমু মিথ্যা এক নাটক সাজায়। আশাকে নিয়ে আসে সে জয়নাল সাহেবের মেয়ে হিসেবে। হাসপাতালে অবতারণা হয় এক মর্মস্পর্শী এক দৃশ্যের।
হাসপাতাল থেকে হিমু ও ওসি সাহেব বের হয়ে আসে। বাইরে বৃষ্টি নেমেছে। ওসি সাহেব গান ধরেনঃ
এসো নীপবনে ছায়াবীথি তলে,
এসো করো স্নান নবধারা জলে।
জীবনের অনেক আক্ষেপের মধ্যে একটা , হিমু আরোও আগে শুরু না করা। ভার্সিটি জীবনের প্রথমে শুরু করলে ভাল হত মনে হয়।হিমুর বাবা যেমন বলেছেনঃ নিজের প্রদীপ নিজেকেই জ্বালাতে হবে। প্রদীপে তেল থাকতে হয়।প্রদীপ জ্বালানোর জন্যে ম্যাচের কাঠি থাকতে হয়। এগুলো জোগাড় করতে দেরি হয়ে গেসে। আমার টাইমিং টা কেন জানি ঠিক হয় না । ঠিক হলে হয়তো কদম ফুলের আক্ষেপটাও থাকতো না!