বইটির নাম, প্রচ্ছদ দেখে ভেবেছিলাম হয়তো বক্সিং মূলক কোনো স্পোর্টস ফিকশন উপন্যাস হবে। কিন্তু না, পটভূমি যদিও বক্সিং এর দুনিয়া, আদতে এটা একটা সরলরৈখিক অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী। শিমুল উঠতি বক্সার, কলকাতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে তার ছবি খবরের কাগজে ছাপা হয়েছিল। তার লক্ষ্য ছিল ন্যাশনালস্। কিন্তু আচমকা এক পারিবারিক দুর্ঘটনার জেরে, সেসব হঠাৎই ভেস্তে গেল। অকালেই বক্সিং গ্লাভস তুলে রেখে, সংসারের ভার কাধে তুলে নিলো তরুন শিমুল। চাকরি নিতে হল প্রখ্যাত রিটায়ার্ড বক্সার গণপতি হাজরার বাড়িতে। চাকরির ধরন যদিও ধোঁয়াশায় ঘেরা, এবং গণপতি বাবু মানুষ হিসেবে ভীষন দাম্ভিক, তবুও স্রেফ কটা পয়সার তাগিদে টিকে রইল শিমুল। এবং সেই সূত্রেই তারা পাড়ি জমালো সুদূর লক্ষ্ণৌ নগরীতে।
বইটি অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী হিসেবে পরিবেশনা করা হলেও, রহস্যের রসদ এটাতে খানিকটা কম। তবে যা আছে, সেটা হল লক্ষ্ণৌ ভ্রমন। ইতিহাস, অভিযান, স্পোর্টস, সব মিলিয়ে পড়তে ভালোই লাগে। অত্যাধিক জটিলতায় না ভর করে ভীষন সহজপাচ্য কিশোর সাহিত্য। অবশ্য, শিমুল চরিত্রটিকে আরেকটু অ্যাগ্রেসিভ ভাবে আঁকলে মন্দ হতো না। যতই তার পেটের দায়, দিনের শেষে, সে তার ভীষন সম্ভাবনাসূচক বক্সিং ভবিষ্যতটিকে ছেড়ে ফেলে এসেছে। তার রন্ধ্রে বইছে কম্পিটিটিভ স্পিরিট। হ্যাঁ, বিভিন্ন সময়ে সে রণে নামছে ঠিকই, কিন্তু অধিকাংশ মুহূর্তেই আমরা পাচ্ছি এক ভীত, সন্ত্রস্ত শিমুলকে।
মাইরি বলছি, গণপতি হাজরার মত এমন অভদ্র, কুচুটে, ক্লাসিস্ট মানুষকে হাতের কাছে পেলে বেধড়ক পিটিয়ে দিতাম খন। লেখক অবশ্য এখানে হাজরা চরিত্রকে লিখেওছেন খুব ক্যারিকেচারিশ ভাবে। হয়তো সেখানেই তার লেখনীর সার্থকতা।
খেলা নিয়ে উপন্যাস বাংলায় খুবই কম লেখা হয়েছে। যেটুকু হয়েছে, সেখানেও ক্রিকেট একটা বড়ো জায়গা জুড়ে আছে। বক্সিং নিয়ে লেখার কথা খুঁজতে গেলে মনে পড়ে শুধু মতি নন্দী-র “শিবা”, “শিবার ফিরে আসা”, এবং শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়-এর “বক্সার রতন”-এর কথা। আর তারপর আসে আলোচ্য উপন্যাসটির কথা।
অনুপ রায়ের গতিময় প্রচ্ছদ ও অলংকরণে সমৃদ্ধ এই শক্ত মলাটের নাতিস্থূল উপন্যাসটি একেবারে প্রথম থেকেই পাঠককে টেনে নেয় গল্পের রিং-এ, যেখানে তার চোখের সামনে হেঁটে বেড়ান ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন, ধনী, এবং প্রবল প্রতাপান্বিত গণপতি হাজরা। এই দাম্ভিক, উদ্ধত, এবং আদ্যন্ত অভদ্র মানুষটির ফাইফরমাশ খাটার কাজ পেয়েছে প্রতিশ্রুতিমান, কিন্তু দারিদ্র্যের থাবায় দুমড়ে যাওয়া বক্সার শিমুল, যে গণপতির সঙ্গে তাঁর শ্রেষ্ঠ সম্পদ সোনার মেডেলটি নিয়ে চলেছে লখনউ। লখনউ-এ পৌঁছবার পর থেকেই কয়েকটা জিনিসে খটকা লাগে শিমুলের, যা থেকে তার মনে হয় যে নিছক একটা বিজ্ঞাপনের শ্যুটিং-এ নয়, গণপতি হাজরাকে ডেকে আনা হয়েছে অন্য কোনো কারণে। কী সেই উদ্দেশ্য? কী সম্পর্ক আছে তার সঙ্গে গণপতির সোনার মেডেলের? শিমুল কি পারবে তার সততা আর আদর্শ অটুট রেখে নিজেকে এই ভয়ংকর দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে?
খেলা ভালোবাসেন এমন যেকোনো মানুষের পছন্দ হওয়ার মতো এই চমৎকার লেখাটি পাঠকের নজরের আড়ালে থেকে গেলে সেটা বড়োই দুঃখের হবে। তাই, হাতে পেলেই পড়ে ফেলুন!
উঠতি বক্সার শিমুল আর্থিক অবস্থার জন্য প্রাক্তন বক্সিং চ্যাম্পিয়ন গণপতি হাজরার বাড়িতে কাজ নেয়। গণপতি হাজরা অত্যন্ত উদ্ধত এবং অহংকারী প্রকৃতির মানুষ। এরপর হাজরাবাবুর জিতে পাওয়া সোনার মেডেল নিয়ে কী কাজ কারবার শুরু হল সেটা জানতে হলে বইটা পড়তে হবে।
একদা উদয়ারুণ থেকে প্রকাশিত বইটি আর পাওয়া যায় না। এখন পত্র ভারতীর অ্যাডভেন৪ বইতে এই উপন্যাস সংকলিত হয়েছে। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল আজকাল খেলা পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে।
এটা লেখকের প্রথম দিকের লেখা। সেটা পড়লেই বোঝা যায়। কাহিনীতে তেমন বিশাল কোনো মোড় নেই। সোজা সাপ্টা লেখা হলেও লেখার গতি এমনই শুরু করলে শেষ না করে ছাড়তে পারবেন না। একটা ছোট ভুল চোখে পড়েছিল, লখনৌ থেকে উন্নাও এর দূরত্ব কিন্তু লখনৌ থেকে অযোধ্যার দুরত্বর থেকে কম।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখা "বক্সার রতন" এর পর অনেক বছর বাদে বইমেলায় (২০১৬) আবার কোনো কিশোর উপন্যাসের প্রচ্ছদে বক্সিং এর দৃশ্য দেখলাম। স্বাভাবিক ভাবেই বইটার প্রতি বাড়তি আকর্ষণ অনুভব করলাম এবং তারপর যখন দেখলাম লেখক যখন হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত বাবু তখন বইটা ব্যাগ বন্দী করতে দুবার ভাবলাম না।
বইটার নাম এবং প্রচ্ছদ দেখে দুটি ব্যাপার পরিষ্কার ১) বইটির কাহিনী গণপতি হাজরা নামক কোনো ব্যক্তির সোনার মেডেল নিয়ে ২) বইটির কাহিনীতে কোনো না কোনো ভাবে বক্সিং জড়িত আছে
বইয়ের কাহিনীটা অল্প কথায় একটু বলি - গল্পের নায়ক শিমুল একজন সম্ভবনাময় বক্সার যে স্বপ্ন দেখে বক্সিং এ সে একদিন ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হবে। কিন্তু বাবার আকস্মিক মৃত্যুতে তার সে স্বপ্ন ধাক্কা খায় এবং সংসারে হাল ধরতে তাকে কাজের সন্ধানে নামতে হয়। বক্সিং প্রশিক্ষক বিশুদার কল্যানে সে একটা কাজ পেয়ে যায় এক্স ন্যাশনাল বক্সিং চ্যাম্পিয়ন গণপতি হাজরার বাড়িতে। সেখানে কাজ করতে গিয়ে সে বুঝতে পারে গণপতি হাজরা একজন অহংকারী, উদ্ধত, স্বার্থপর "আমি" সর্বস্ব মানুষ। শিমুলকে সে মানুষ হিসাবেই মনে করে না এবং পদে পদে তাকে নানা ভাবে অপদস্থ করে এক অদ্ভূত আনন্দ পান। পরিস্থিতির চাপে শিমুলকে সব কিছু সহ্য করতে হয়।
একদিন "সিংভি ফুড প্রোডাক্টস " নামক এক কোম্পানি থেকে এক বিজ্ঞাপন ছবিতে কাজ করার আমন্ত্রণ পান গণপতি হাজরা, তাকে সেই কোম্পানির মুখ করে বাজার দখল করতে চায় সংস্থাটি। এই বিজ্ঞাপনের শুটিং এর জন্য তাকে লখনৌ যেতে হবে এবং সাথে করে আনতে হবে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে জেতা সোনার মেডেলটা। মেডেলটা নেবার ইচ্ছে না থাকলেও বিজ্ঞাপন চুক্তির আর্থিক পরিমানের কথা ভেবে তিনি সেটা তিনি সঙ্গে নিয়ে পাড়ি দেন সূদুর লখনৌ এবং শিমুল তার সফর সঙ্গী হয়।
লখনৌ পৌঁছে তাদের আলাপ হয় সিংভি ফুড প্রোডাক্টস সংস্থার কর্ণধার অর্জুন সিংভির সাথে, মানুষটিকে শিমুলের খুব ভালো লেগে যায়। আস্তে আস্তে অর্জুন সিংভির সাথে শিমুলের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে কিন্তু ব্যাপারটা গণপতি হাজরা মোটেই ভালোভাবে নেয় না। এখানে আসার পর থেকেই শিমুল ল���্ষ্য করে গণপতি বাবু কেমন যেন ভয়ে ভয়ে থাকেন , সকলকে খুব সন্দেহর চোখে দেখেন , শোবার সময় সবসময় রিভলভার নিয়ে শুতে যান , মেডেলটা কখনো চোখের আড়াল করতে চান না , সর্বপরি শিমুলকে বলেন কোনো কান কাটা লোক দেখলেই যেন তাকে খবর দেওয়া হয়।
এরপর আর কিছু লেখা ঠিক হবে না বরং বাকিটা জানতে চোখ রাখুন হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত বাবুর লেখা নতুন কিশোর উপন্যাস "গণপতি হাজরার সোনার মেডেল" বইটিতে। হিমাদ্রিবাবুর লেখা উপন্যাসের আর একটি বিশিষ্ট দিক হলো কাহিনীর পটভূমির ইতিহাস ; যা তিনি খুব সুন্দর গল্পের আকারে চরিত্রদের মুখ দিয়ে শুনিয়ে দেন। এতে যেমন কাহিনীর কোনো ব্যাঘাত ঘটে না, তেমনি পাঠকদের অনেক অজানা জিনিস জানা হয়ে যায়। এখানেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। লখনৌ শহর এবং সেখানকার দ্রষ্টব্য স্থানগুলির বর্ণনা ও সেই স্থানের ইতিহাস ও তথ্য খুব সুন্দর করে বলেছেন লেখক।