Nabaneeta Dev Sen is an award-winning Indian poet, novelist and academic. Sen has published more than 80 books in Bengali: poetry, novels, short stories, plays, literary criticism, personal essays, travelogues, humour writing, translations and children’s literature. Her short stories and travelogues are a rare combination of fine humour, deep human concern, and high intellect, which has made her a unique figure in the Bangla literary scene.
She is a well-known children's author in Bengali for her fairy tales and adventure stories, with girls as protagonist. She has also written prize-winning one-act plays.
সে কি ভালো আছে? যতটা থাকলে ভালো অন্ধকারে একা একা থাকা যায় ততটা ভালো কি?
মনের এককোণে এ প্রশ্ন ঘুরপাক খেলেও উত্তর আমি জানি, নিয়তি নির্মমভাবে দেরিতে হলেও অনেক কিছুর অনুধাবনের রাস্তায় ঠেলে জোর করে নামিয়ে দিয়েছেন স্বপ্ন থেকে এমন বাস্তবে যা আমি শত্রুর জন্য ও কামনা করিনা কখনোই।কি আর করা,মেনে নেওয়াটাই ভবিতব্য। তবুও মানা না মানার দোলাচলে আছি,থাকবো কতদিন জানি না।
এ গল্প বরং থাক।চলে যাই নবনীতার কাছে,তার স্বজনদের মাঝে। নরেন্দ্র দেব-রাধারানীর ঔরসজাত তনয়া ,স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যার নাম রেখেছেন (রাধারানীর পুনর্বিবাহের প্রাক্কালে কবিগুরু এই নামখানি তাকে দিয়েছিলেন, রানীদেবী পিতৃপ্রদত্ত নামের প্রতি অকুণ্ঠ টান আর ভালোবাসার জন্য বিনয়ের সাথে রাজি হবার অপারগতা জানালেও পরবর্তীতে নিজের একমাত্র কন্যার মাধ্যমে সন্মান জানিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের নামকরণের)।নবনীতার দাবি বিস্মৃতির বিচারে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হবেন সহজেই কারন তার স্মৃতি বড্ড দুর্বল,দেখতে তিনি ছোটখাটো বেঁটে বদখত ভেতো বাঙালী (নির্জলা মিথ্যাচার ছাড়া আর কিচ্ছু না, আদতে অসম্ভব রূপবতী পূর্ন চন্দ্রের মতো ভরাট মুখ, উজ্জ্বল হাসি ,প্রানশক্তিতে ভরপুর সরস রসিকতার এক পুর্ন আকরখনি নবনীতা)পাতায় পাতায় স্বজন বন্ধুদের নিয়ে এমন প্রাঞ্জল মোহন ভাষায় লিখেছেন ,গহনের গহীনে গেঁথে যায় স্মৃতি কথাগুলো।
স্মৃতির মেদুর রোদে সিক্ত হয়েছি প্রতি পাতা পড়ে।সুধর্মা -তপোধাম-ইলাবাস-ভালোবাসা সাহিত্য কিংবা ইতিহাসের উজ্জ্বল সাক্ষী বাড়িগুলোর গল্প সমৃদ্ধ করেছে পাঠকের অজানাকে।কবিতাভবনের গল্প,প্রতিভা বসুর দশভূজা রুপে দেখার সৌভাগ্য, বুদ্ধদেবের বুদ্ধি চিন্তা গবেষনার সাথে ওতপ্রোতভাবে ভাবে চাক্ষুষ করার কথা কজনে জানতুম আমরা?অশোক মিত্র বা নরেশ গুহর মধ্যে যেকোনো একজনকে জামাতা রূপে গ্রহণ করার গোপন মনবাসনার জোর গুঞ্জন কলকাতার আকাশে বাতাসে যখন ভেসে বেড়াত,নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে মীনাক্ষী -জ্যোতির্ময়ের জোড় বাধা ,অলকনন্দা প্যাটেলের বিয়ের পিঁড়ি আঁকা,সেই পিঁড়ি বেনারসে বয়ে নিয়ে যাওয়া আশোক-গৌরির ঘরের খবর কজন জানাতো আমাদের?
সুনীতি-সুকুমারী-সত্যজিৎ-সুনীল-শক্তি-শ্যামল-শঙ্খ- তপন-মল্লিকা প্রত্যেকের সাথে এত অন্তরঙ্গ আড্ডা গান কবিতার স্মৃতি, ভালোবাসা বাড়ির ভালো-বাসার বারান্দা হয়ে উঠার নেপথ্য কারিগর সৌরনীল থেকে ঋতুপর্ণ ঘোষের রূপান্তরের চিত্র হয়তো আমি জানতুম ই না এমন করে কক্ষনো.
অমর্ত্য কে নিয়ে তো চিরকালের মতো মিষ্টি পরিমিত বোধের পরিচয় দিয়েছেন লেখার খাতায়।প্রাক্তন মানেই বিষাক্ত গরল ঢেলে বিষবাস্পে বাঁচতে হবে এমন রীতির বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেছেন বেশ কয়েকটি জায়গায়। ভেঙ্গে যাওয়া সংসারের কাটাকুটির খেলায় ক্ষতখানির ভাগীদার নিজেকে যতটা মেনেছেন, অমর্ত্যর জন্য ততটাই মৌন থেকেছেন।সংসারসুধার অমৃত রসের কতটা বশে আর কতটা বিবশে ছিলেন আমৃত্যু থেকেছেন নিরপেক্ষ নীরব। অমর্ত্য বরং প্রশংসিত হয়েছেন বেশি নবনীতার কলমে, জনসম্মুখে।অথচ যার ঘর পুড়েছে,মন ভেঙেছে,সন্তানেরা স্বাভাবিক সম্পর্কের সংসার থেকে বঞ্চিত হয়েছে ,সেই নবনীতা'রই ছিল অনুযোগের সবচেয়ে বড় অধিকার।
নবনীতার শক্তি শব্দ শিক্ষা সহবত মানুষকে সমৃদ্ধ করার দুর্লভ স্বভাব ,এত আশ্চর্য সব সদগুন একসাথে থাকা সত্ত্বেও চিরকাল নিজেকে অহংকারের আশনাইতে বাঁধেননি ব্যক্তিজীবনে বা পোশাকি পরিবেশে।
নরেন্দ্র দেব হয়তো জন্মলগ্ন থেকে নিজের "সবাইরে বাসো ভালো ,ভুলে থাকো ভুলগুলো, বেঁচে থাকো নিজের আলোয়"মন্ত্রে দীক্ষিত করে দিয়ে গেছেন কন্যাকে।
এ জীবনে হয়তো এত ভালো আমি কখনোই হতে পারবো না, ক্ষুদ্র জীবনে স্বল্প সময়ে ভালোবেসে বাঁধার বদলে বন্ধনের গ্ৰন্থিগুলো ক্ষয়াটে চাঁদের মতো ম্রিয়মাণ হয়ে হারিয়ে দিয়ে যায় বারবার মনের জোর, বিশ্বাসের ধার,আশা রাখার স্বপ্ন দেখার সাধ।আছে রাগ ক্ষোভ জেদ হিংসের মতো সর্বনাশা কতগুলো নিজস্ব সীমাবদ্ধতা।জোন বায়াজ তো আর নই যে;we shall overcome গানের মতো সত্যি সত্যিই ওভারকাম করে ফেলবো ইন্দ্রিয়ের ইতরবিশেষ বদগুন গুলো।
তাই পরম করুণাময়ের কাছে একান্ত প্রার্থনা লীলা মজুমদারের মতো এক্কেবারে সবকিছু সব্বাই কে ভুলিয়ে দিয়ে অ্যালজাইমারে যেন আমি হারিয়ে যাই।নয়তো প্রণবেন্দুর মতো ভালোবাসাহীন অবিশ্বাসের আতংকে বেঁচে থাকার ভয় ক্রমশ গিলে খাবে আমায়।
তার পরে শুধু যখন ,পুরোটা দেহ আগুনের আঙুলে গলে যাবে, তখন সবাই বলবে: আহা পুড়েছিল। সারাজীবন পুড়েছিল।
জীবনী কিংবা স্মৃতি কথা পড়ার অদ্ভুত এক ঘোর আছে বোধকরি। যে-জীবন একজন মানুষ কাটিয়ে এসেছেন সেই জীবনটাকে পুনর্বার যাপনের আনন্দ-বিষাদ ঘিরে ধরে। যিনি লিখছেন তার চারপাশের মানুষগুলো আপনার হয়ে ওঠে। লেখকও আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। তার পাশে বসে গল্প শুনবার সাধ হয়। এতটা পর্যন্ত হতে পারাটা অবশ্যই বয়ানক্ষমতা, বয়ানভঙ্গির ওপর নির্ভর করে। আরেকজন মানুষের যাপনের ভেতর ঢুকে পড়ে আনন্দ যেমন হয় তেমনি প্রতিটি বিচ্ছেদ, প্রতিটি ভাঙন, প্রতিটি মৃত্যুর তাজা ব্যথা এসে প্রাণে লাগে। এই সবগুলো অনুভূতির ভেতর দিয়েই যেতে হয় 'স্বজনসকাশে'পাঠ করতে গিয়ে। একদিকে অজস্র গুণী মানুষকে কাছে থেকে দেখার পুলক, অন্যদিকে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নতুন করে তাদেরকে হারিয়ে ফেলা। নবনীতা দেবসেনের গদ্যে যেমন আছে বাহুল্যহীনতা, অনাড়ম্বরতা তেমনি আছে প্রাণের স্পন্দন, মমতা, সতেজতা। লেখকের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষদেরকে নিয়ে লিখেছেন এ বইতে। আর অপর মানষকে আঁকতে আঁকতে আপনা থেকেই লেখকের প্রতিমূর্তিটিও আঁকা হয়ে যায়। এই বইটির এমন পাঠক মেলা ভার যিনি বিস্মিত হয়ে না ভাববেন যে, কতটা বিরল হলে একজন মানুষ তাঁর জীবনের প্রাক্তন সঙ্গীর কথা এতটা অভিযোগহীনতায়, এতটা শ্রদ্ধায় বর্ণনা করতে পারেন!
হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো তো বটেই যিনি তাঁদেরকে নতুন একটা জীবন দিয়ে পাঠকের কাছাকাছি নিয়ে এলেন তিনিও যে অস্পৃশ্যলোকে হারিয়ে গেছেন এই বিচ্ছেদ ব্যক্তি আমাকে ব্যথাতুর করে। যাঁর জীবনের অলিতে গলিতে আলো ফেলে ফেলে এতটা পথ হাঁটা হলো অজ্ঞাতেই তিনিও 'স্বজন' হয়ে ওঠেন যে!
অমর্ত্যকে নিয়ে কী লিখলেন, সেই 'নাক গলানো'র বাতিকগ্রস্ত হয়ে বইটি ধরা,প্রায় বছর আগে। তারপর গতিপথ বদল করে বয়ে গিয়েছে সময়,সবসময়ের মতো। মাঝে মাঝে এমন মনোমতো গল্প শোনার বই হয়।সবকিছু নিয়ে বলা হয়ে ওঠেনা,এবই নিয়ে কথাগুলো তোলা থাক।
স্মৃতিমেদুরতা। ভালো-বাসার বারান্দর ভালোলাগার রোদ্দুর। নিরহঙ্কারী শব্দের আঁচে সাহিত্যের প্রবাদপুরুষগণের স্মৃতিচারণ। তাদের অনেক জানা-অজানা কথা, স্মৃতি, ভালো-বাসার বারান্দাটুকু গড়ে ওঠার গল্প, কবিতাভবন এর অন্দরমহলের চিত্র - "স্বজনসকাশের" মলাটবদ্ধ শব্দরা ধারন করে এসবই এবং তারও থেকে আরও বেশি কিছু।
নবনীতা দেবসেনের পিতা নরেন্দ্র দেব, মাতা রাধারানী, বুদ্ধদেব বসু, প্রতিভা বসু, সত্যজিৎ রায়, আশাপূর্ণা দেবী, অজিত দত্ত, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণ ঘোষ, যামিনী রায়, অশোক মিত্র, তপন রায়চৌধুরী আরও বহু গুনীজনের মেলায় সমৃদ্ধ এই বই।
চলে যাওয়া মানুষগুলোর প্রতি শব্দের এই শ্রদ্ধার্ঘ্য মনে করিয়ে দেয় নবনীতা দেবসেনে কবিতটার অমোঘ সত্যটুকু -
"তুমি যতো বলো চিরদিন, চিরদিন আমি শুনি শুধু আজকেই, আজকেই।"
আর একটুকরো দীর্ঘশ্বাস!
নবনীতা দেবসেনের কলমের বড় শক্তি তার শব্দের আন্তরিকতা। ঋতূপর্ণ ঘোষের শব্দে এমন আশ্চর্য আন্তরিকতা দেখেছি। পড়েছি। এবার পড়লাম নবনীতা দেবসেনের "স্বজনসকাশে"। পরিমিতি বোধের আর আশ্চর্য এবং ম্যাগনেটিক ব্যক্তিত্ববোধের অধিকারী নবনীতা দেবসেন। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কথায়, "নবনীতার কলম দু দিকেই সমান ভাবে চলে। যেমন কবিতায়, তেমনি গদ্যে।" আসলেই তাই, বা নিজস্ব ভাবে একটু বলতে গেলে কবিতা আর গদ্যের মিশেল। ভালোলাগার সাথে যোগ হয় সমৃদ্ধ হওয়ার অনুভূতি।
অমর্ত্য সেনের কথা অনকবারই এসেছে। শেষে আলাদা দুটো অধ্যায়ই তাঁকে নিয়ে। অথচ প্রাক্তনের দিকে আঙ্গুল তোলার মতো একটা শব্দও ছিলনা, বরং ভালো-বাসার বারান্দা আর রোয়াকে বসে শব্দগুলো যেন অমর্ত্য সেনকে আলাদা করেই চিনিয়ে দিয়ে গেল। এখানেই নবনীতা দেবসেনের পরিমিতি বোধের স্বাক্ষর, পাঠকের কোন প্রকার অস্বস্তি ব্যতিরেক ভালোবাসার এবং ভালোলাড়ার একক হয়ে থাকার জায়গা "স্বজনসকাশে"।
২৮শে জুন ১৯৭০। নবনীতা দেবসেন এবং অমর্ত্য সেনের বিয়ের তারিখ। জেনিভা থেকে অমর্ত্য টেলিগ্রাম পাঠিয়েছেন নবনীতাকে, "Treat this telegram as flowers."
নবনীতা দেবসেনের "স্বজনসকাশে" নিয়ে নিশ্চিন্তে বলা যায়, "Treat this book as flowers."
সুঘ্রাণটুকু লেগে আছে শব্দে। স্বজনসকাশের প্রতিটা পাঁপড়িতে। গুরুত্বপূর্ন এবং দরকারী বই।
নবনীতা দেবসেনের 'স্বজন সকাশে' পড়লাম। ভ্রমণ সমগ্ৰ দুই খণ্ড ও নোটবুক বই পড়েই তার গদ্য আমার ভাল লেগেছিল।ঝরঝরে, সাবলীল,আন্তরিক শব্দে ভরপুর বাক্য। সারা পৃথিবী জুড়েই আপনজন খুঁজে নেওয়ার মতো মানসিকতার প্রতিফলন তার স্বজন সকাশে'র কাহিনীতে। নামিদামি সব বাঙালি ব্যক্তিত্বদের সাথে উঠাবসা। শুধু বাঙালি বলি কেন-- অন্যান্যদের সাথেও। পরিচিত সবাই তার স্বজন। নিজের দুর্বলতা প্রকাশে কুন্ঠিত নন,সবল দিক প্রকাশেও অহংকারী নন। বিভিন্ন চরিত্রের সমাবেশে, বিভিন্ন সময়ের উপস্থিতিতে, বিভিন্ন দেশের পরিবেশ বর্ণনায় ভরপুর "স্বজন সকাশে" বইটি। এতে নীরদ সি চৌধুরী,ঐতিহাসিক তপন রায়চৌধুরী, বুদ্ধদেব বসুর পরিবার, অধুনা বিখ্যাত সিদ্ধার্থ মুখার্জিসহ আরো কতজনের চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্যের যে পরিচয় পেয়েছি। অমর্ত্য সেনের সাথে প্রেম ও বিয়ের ঘটনা---ছাড়াছাড়ির কথাও আছে,তবে তিক্ত কোন শব্দবিহীন। এখনো অমর্ত্য সেন ও তার পরিবারের রয়েছে চমৎকার সুসম্পর্ক। পড়ার সময় এতো ভালো লাগতেছিল যে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ২৩৩ পৃষ্ঠার পুরো বই প্রথমবারের মতো মোবাইলে পড়ে শেষ করে ফেলেছি।
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, সত্যজিৎ রায়, লীলা মজুমদার, আশাপূর্ণা দেবী, প্রতিভা বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণ ঘোষ, তপন রায়চৌধুরী, অমর্ত্য সেন সহ নবনীতা দেব সেনের জীবন অনেক মনীষীর সহচর্যে, বন্ধুত্বে সিক্ত হয়েছে। এই বইটি তাদের কথা স্মৃতিচারণ করেই লেখা। বিভিন্ন সময়ে অনেক কিছুই বারবার পুনঃবিবৃত হয়েছে হয়তো বইটির লেখাগুলো ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল বলেই। এছাড়া নবনীতা দেব সেনের লেখনী একদমই মেদহীন, প্রাণবন্ত, পড়ে আরাম আছে।