জামশেদ, বিশিষ্ট শিল্পপতি আব্বাস খানের একমাত্র সন্তান। রগচটা, মাথা গরম, অ্যালকোহলিক, বড়লোকের বিগড়ে যাওয়া সন্তান জামশেদ হলো সাফ গেমসে স্বর্ণপদক পাওয়া শার্প শ্যুটার। পিতার মৃত্যুর পর থেকেই পীড়নে তার মানসিক দশা ভঙ্গুর হতে থাকে। দুঃস্বপ্ন হানা দেয় ঘুমের ভেতর আর জেগে থাকলে দেখতে থাকে হ্যালুসিনেশন। সাইকিয়াট্রিস্ট কিছুদিন ঢাকার বাইরে থাকার পরামর্শ দেয়, প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর বন্ধু শিপলুও দেয় উত্তরবঙ্গের এক অজপাড়াগাঁ এ নিয়মিত হানা দেওয়া কোনো অজানা জন্তুর শিকারে যাবার অফার। কিন্তু জামশেদ রাজি হয় না।
পরবর্তীতে প্রেমিকা আইরিনের টক্সিক এক্স রাশেদের সাথে ঝামেলা হলে জামশেদকে রাশেদের ভাড়া করা সন্ত্রাসী বোমা মজিদ আর তার দলের সাথে বন্দুক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয়। ঝামেলা থেকে বাঁচার জন্যে শিপলুর সাথে কাজিন সামাদকে নিয়ে উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত অঞ্চল জগনান্দপুরে হাজির হয় সে। নব্বই দশকেও আধুনিক যুগের ছোঁয়া সেখানে খুব একটা লাগে নি। বদ্ধভূমি আর ঘন জঙ্গল দিয়ে আবদ্ধ সে গ্রাম। আর জঙ্গল থেকে এক অজানা জন্তু নিয়মিত হানা দিয়ে গরু-ছাগলের পাশাপাশি একাধিক মানুষকেও মেরে ফেলেছে। যদিও গ্রামের মানুষদের মতে এগুলো কোনো ভয়ংকর পিশাচের কাজ।
দক্ষ বন্দুকবাজ হওয়ায় জন্তুটা শিকারের কাজে লেগে পড়ে জামশেদ। অন্যদিকে মাসিক হালচাল পত্রিকায় দেশের নানান প্রান্তে ঘটে যাওয়া অতিপ্রাকৃত ঘটনা দিয়ে ফিচার লেখা সাংবাদিক শিপলু, যার বিশ্বাস তার নিজেরও কিছুটা অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা রয়েছে, আভাস পাই ভয়ংকর কিছুর। মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যার সাক্ষী এই প্রত্যন্ত গ্রামে কোন শ্বাপদ তার বিষাক্ত শ্বাস ফেলছে? কেনই বা জামশেদকে তার বাবা স্বপ্নে বারবার সাবধান করে বলছে "আসল নকল বিচার করো"? কিভাবে একটা অপয়া ছায়া গ্রাস করে নিয়েছে জগনান্দপুর গ্রামকে, আর কিভাবেই বা ঘটবে এসবের সমাপ্তি? নাবিল মুহতাসিমের লেখা হরর থ্রিলার বই অবলম্বন এড্রিয়েন অনীকের আঁকা গ্রাফিক নভেলে পাওয়া যাবে সবকিছুর উত্তর।
বর্তমান সময়ে বাংলা কমিক জগতে আমার মতে সবচেয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে এড্রিয়েন অনীকের গ্রাফিক নভেলগুলো। বাংলা সাহিত্যের বেশ কিছু ভালো আর ম্যাচিউরড গল্প যখন যথাযথ পরিসরে দক্ষ আর্টওয়ার্কের মাধ্যমে ফুটে উঠে, একজন কমিক-বুক ফ্যান হিসেবে গ্রাফিক বাংলা পাবলিকেশনের উন্নত মানের প্রোডাকশনে সেই কাজের স্বাদ নেওয়ার চেয়ে উপাদেয় আর কিছু নেই। এর আগে নাবিল মুহতাসিমের স্পাই-অ্যাকশন থ্রিলার জনরার বাজিকর বইয়ের গ্রাফিক নভেল অ্যাডাপ্টেশনটা আমার অসাধারণ লেগেছিল। তাই গ্রাফিক বাংলা পাবলিকেশনের বাকী গ্রাফিক নভেলগুলো সংগ্রহে নিতে একটুও দ্বিধা বোধ করি নি।
'শ্বাপদ সনে' গ্রাফিক নভেলটা নাবিল মুহতাসিমের প্রথম উপন্যাস অবলম্বনে বানানো। সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার আর সুপারন্যাচারাল হরর জনরার মিশ্রণে এর গল্পটা লেখা। গল্প আবর্তিত হয় এর মূল চরিত্র জামশেদ আর তার আশেপাশের কিছু চরিত্রকে ঘিরে। জামশেদের জবানীতে তার জীবনে ঘটতে থাকা ভয়ংকর সব ঘটনা, সেইসাথে তার বন্ধু শিপলুর কিছু কেস স্টাডি (মাসিক হালচাল পত্রিকায় অতিপ্রাকৃত ঘটনা নিয়ে লেখা ফিচার) নিয়ে গল্প এগিয়েছে।
একটা সাইকোলজিক্যাল হরর কমিক হিসেবে 'শ্বাপদ সনে' এর গল্পটা খারাপ না। এরকম প্যারাসাইকোলজির সত্য-মিথ্যা দ্বিধার সাথে বাস্তব জগতে ঘটে যাওয়া ব্যাখ্যার অতীত ভয়ংকর গল্প নিয়ে বাংলায় কমিকস আগেও হয়েছে, তবে এতো ডিটেইলড আর বড় পরিসরের কাহিনী এবং জামশেদের মতো এতটা ধূসর আর সাইকোলজিক্যালি আনরিলায়েবল প্রোটাগনিস্ট নিয়ে গল্প তাতে পাওয়া যাবে না। গল্প একেবারে শুরু থেকে আগ্রহোদ্দীপক আর গতিশীল ছিল।
গল্প মূলত শুরু থেকে কিছুটা খন্ডাকারে এগিয়েছে। জামশেদের জবানবন্দি আর শিপলুর কেসস্টাডি দিয়ে সাজানো গল্পের খন্ডগুলোকে একটু ধীরে ধীরে বিল্ডআপ করে ডার্ক আর ইনটেন্স বানানো হয়েছে। বিল্ডআপ দিয়ে গল্পের হরর ওয়ার্ল্ড কিংবা অ্যাকশন দৃশ্যের সেটআপ সবই গড়ে তোলা হয়েছে ভালোভাবে। দুই-তিনটে অ্যাকশন দৃশ্য ছিল যেগুলো উপভোগ্য। রহস্যভেদ আর টুইস্টগুলো একটু গতানুগতিক হলেও ভালো ছিল। যদিও লেখকের অন্যান্য বই পড়া থাকলে আর গল্পের ধরণ বিবেচনা করলে টুইস্টগুলো কি তা আন্দাজ করা বেশী কঠিন হবে না, তবে বাংলা কমিকস হিসেবে দেখলে বেশ ভালো। 'শ্বাপদ সনে' বইয়ের যে সংলাপ কিংবা বর্ণনাগুলো এই গ্রাফিক নভেলে ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো বেশ লেগেছে। বিশেষ করে রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার সংলাপগুলো আর লেখকের নিজেরই লেখা বাউল সঙ্গীতখানা এক কথায় দারুণ।
শেষদিকে গল্পকে একটু ওপেন এন্ডেড সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের মতো বানিয়েছেন লেখক। যদিও সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হিসেবে 'শ্বাপদ সনে' এর গল্পটা কিছু ক্ষেত্রে দূর্বল হয়ে পড়ে। মূলত জামশেদ বাদে অন্যান্য চরিত্রগুলোকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে সেভাবে ডেভেলপ করতে না পারার কারণে এটা হয়েছে (বিশেষ করে একটা চরিত্রের ভালো মনস্তাত্ত্বিক চরিত্রায়ন প্রয়োজন ছিল, তবে লেখক মূলত টুইস্টের জন্যে সেটা করেন নি)। আর থ্রিলার হিসেবে গল্পের গঠন আরও ভালো হওয়া দরকার ছিল। এটার অভাবে বারবার গল্পের প্রতি খন্ডের মোড় পরিবর্তন বিরক্তিকর ঠেকবে, কিংবা টুইস্টগুলোকে মনে হবে আরোপিত।
তাছাড়া একটা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার বইয়ে লেখক চরিত্রের মনের অবস্থাকে গদ্যের দ্বারা যেভাবে দেখাতে পারেন, ভিজ্যুয়ালি সবসময় সেটা করা যায় না। তাই বোধহয় চরিত্রদের মনস্তাত্ত্বিক গঠনের ক্ষেত্রে গ্রাফিক নভেলটা মূল বইয়ের চেয়ে দূর্বল। একারণে গ্রাফিক নভেলের পাশাপাশি পিডিএফে মূল বই-টাও পড়ছিলাম। আর গল্প হিসেবে শিপলুর কেস স্টাডিগুলা আহামরি কিছুই হয় নি, শুধু 'রিগর মর্টিস' গল্পের আইডিয়াটা মোটামুটি ভালো ছিল। এবার আসি আর্টওয়ার্কের ব্যাপারে। এক কথায় যদি বলি, এটা পড়ে আমি একইসাথে মুগ্ধ আবার হতাশও। কারণটা ব্যাখ্যা করছি।
এড্রিয়েন অনীকের একেবারে লেটেস্ট কাজটা বেশী দিন হয় নি আমি পড়েছি। নাবিল মুহতাসিমের 'বাজিকর' অবলম্বনে সেই গ্রাফিক নভেলে তিনি এককথায় দূর্দান্ত কাজ দেখিয়েছেন। তাই 'বাজিকর' এর বহু আগে প্রকাশিত আর্টিস্টের প্রথম গ্রাফিক নভেল 'শ্বাপদ সনে' পড়ার সময় বারবার বাজিকরের অসাধারণ আর্টওয়ার্কগুলো মাথায় ভেসে আসছিল। এমনকি পাশাপাশি বই দুটি রেখে তুলনাও করেছি।
জানি তুলনাটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। কারণ একে তো বই দুটির জনরা এক নয়, তার উপরে একজন শিল্পী ক্রমাগত প্র্যাক্টিস করেই আগের কাজ বেটার কাজ উপহার দেয়, এটা জানা কথা। কিন্তু সেই বেটার কাজ অলরেডি পড়ে ফেলার কারণেই এই গ্রাফিক নভেলের কিছুটা দূর্বল আর্টওয়ার্ক, কনসিস্টেন্সির অভাব, কম্পোজিশনে ক্রপিংয়ের জন্য ঝাপসা করে ফেলা, লং শটে অতিরিক্ত সরলীকরণ আর ডিটেইলিংয়ের অভাব অনেক চোখে লেগেছে। সেইসাথে ছবির সাথে ডায়লগ বক্সের অসামঞ্জস্যতা আর তাতে বেশী লেখা আটাতে গিয়ে লেখা অতিরিক্ত ছোট করে ফেলা, প্যানেলগুলোর দূর্বল ফ্রেমিং দেখে হতাশ হতে হয়।
যদি এই গ্রাফিক নভেলটা আমি সবার আগে পড়তাম, তাহলে হয়তো আর্টিস্ট আস্ত বই অবলম্বনে প্রায় চারশো পৃষ্ঠার কমিকস এঁকেছেন দেখে সব ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতাম। কিন্তু যেহেতু আমি আর্টিস্টের বেটার কাজ পড়েই ফেলেছি, তাই হতাশও হয়েছি বেশি। তবে এটা কি প্রশংসার ব্যাপার নয়? আর্টিস্ট তার প্রথম কাজের (গ্রাফিক নভেল হিসেবে) দূর্বলতার বেশীরভাগই ক��টিয়ে উঠেছেন তার ৪র্থ কাজে। তার আর্টওয়ার্ক এর উন্নতি চোখে পড়ার মতো। এতে তো বোঝাই যায়, ভবিষ্যতে এড্রিয়েন অনীক আমাদের আরও অনেক ভালো মানের কাজ উপহার দেওয়ার পোটেনশিয়াল রাখেন।
আর একেবারে সবই যে খারাপ লেগেছে তা নয়। অনীক গল্পের প্রায় সব দৃশ্যগুলোকেই মোটামুটি ভালোভাবে চিত্রিত করেছেন। উত্তরবঙ্গের দৃশ্যায়নও বেশ ভালো হয়েছে। অ্যাকশন দৃশ্যগুলোর গঠনও যথাযথ হয়েছে, যাতে মূল গল্পের ইন্টেন্সিটিটা ফুটে উঠেছে। তবে আর্টিস্ট আসল দক্ষতা দেখিয়েছেন হরর পোর্শনগুলো দৃশ্যায়নে। এর আগেও ঢাকা কমিকসের 'পিশাচ কাহিনি' সিরিজের মাধ্যমে তিনি হরর কমিকস এঁকেছেন দক্ষভাবে, যার প্রভাব এই গ্রাফিক নভেলেও দেখতে পাওয়া যায়।
গল্পে আসা নানা মন্সটার, সুপার ন্যাচারাল এন্টিটিদের বেশ গোর, ভায়োলেন্ট আর ডিস্টার্বিংভাবেই এঁকেছেন তিনি, যা হরর দৃশ্যগুলোকে শক্তিশালী করে। একারণে শিপলুর কেস স্টাডির টিপিক্যাল ভূত এফএম মার্কা গল্পগুলোও গ্রাফিক নভেলে বিশেষ হয়ে ওঠে। সেইসাথে রাতের অন্ধকারের দৃশ্যগুলোর কালার গ্রেডিংটা বেশ ভালো হয়েছে। আর যেহেতু গল্পটা সাইকোলজিক্যাল, সেই হিসেবে আর্টিস্টকে চরিত্রদের অভিব্যক্তি নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। আমার মতে সেটা তিনি মোটামুটি ভালোভাবেই সম্পন্ন করতে পেরেছেন। সবমিলিয়ে বলবো 'শ্বাপদ সনে' গ্রাফিক নভেল আমার মোটামুটি ভালোই লেগেছে। বেশ কিছু নেতিবাচক দিক যে ছিল না তা নয়, সেইসাথে আমার পড়া লেখক-আঁকিয়ে জুটির অন্য গ্রাফিক নভেলটা থেকেও অনেক দূর্বল। তবে সত্যি বলতে, বাংলা ভাষায় এমন মানের গ্রাফিক নভেলও খুব বেশি নেই। একারণে মোটামুটি ভালো মানের কমিকসও বাংলায় পড়লে অনেক বেশী ভালো লাগে।
📚 বইয়ের নাম : শ্বাপদ সনে (গ্রাফিক নভেল)
📚 লেখক : নাবিল মুহতাসিম
📚 অঙ্কন : এড্রিয়েন অনীক
📚 বইয়ের ধরণ : গ্রাফিক নভেল, প্যারাসাইকোলজিক্যাল হরর থ্রিলার, সাসপেন্স থ্রিলার
📚 ব্যক্তিগত রেটিং : ৪/৫