হরিহরণ দীর্ঘ সময় চুপ করে বসে রইল। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল, ও ছেলে তোর, তা বিষ্ণুপুরের কি কেউ জানে? হেমাঙ্গিনী দেবী সাথে সাথেই জবাব দিল না। চুপ করে রইল। তারপর বলল, জানে। হরিহরণ বলল, কে জানে? হেমাঙ্গিনী দেবী বলল, বড়বাবুর স্ত্রী। হরিহরণ এবার সত্যি সত্যি অবাক হল, বড় বাবুর স্ত্রী মানে? অবনীন্দ্রনারায়ণের স্ত্রী? বীণাবালা? হেমাঙ্গিনী অন্ধকারেই হ্যা সূচক মাথা নাড়াল। তারপর স্মিত কন্ঠে বলল, হ্যা। হরিহরণ বলল, তোর কি হয়েছে হেমাঙ্গিনী? আমায় খুলে বল। স্পষ্ট করে বল। হেমাঙ্গিনী আবারও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর সেও ঠান্ডা গলায় বলল, এই জমিদার বাড়ির সাথে আমার কিছু হিসেব আছে হরি কাকা। তোমারও ছিল। কিন্তু তুমি পালানো মানুষ। পালানো মানুষ হিসেব ভয় পায়। তারা হিসেব ছেড়ে পালায়। তুমিও পালাচ্ছ। হরিহরণ বলল, তত্ত্ব কথা ছাড় হেমাঙ্গিনী। এখন তত্ত্বকথার সময় নয়। আসল কথা বল। তুই কি খেলা শুরু করেছিস? আমায় বল। হেমাঙ্গিনী দেবী বলল, সব বলব হরি কাকা। সব বলব। তার আগে আমার ছেলেকে বাঁচাও হরি কাকা। আমায় জঙ্গলের ভেতর ওই বাড়িতে নিয়ে চল। হরিহরণের হঠাৎ মনে হল, আসলেইতো, আগে ছেলেটার কি হাল সেটি দেখা জরুরী। আর এখন এই শেষ রাতে ওখানে আর কারো থাকার কথাও না। হরিহরণ আর কথা বাড়াল না। সে হেমাঙ্গিনী দেবীর হাত ধরে টেনে নাও থেকে নামল। তারপর আবার ঢুকল বারোহাটির জঙ্গলে। হরিহরণ এবার আরো সংক্ষিপ্ত পথ ধরল। কিন্তু গভীর জঙ্গলে সেই ভাঙা বাড়ির সামনে এসে হেমাঙ্গিনী দেবী আর হরিহরণ থমকে গেল। বাড়ির সামনে দেবেন্দ্রনারায়ণ সম্পূর্ণ একা দাঁড়িয়ে আছেন। হরিহরণ আর হেমাঙ্গিনী দেবী নিশ্চুপ, নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল আড়ালে। দেবেন্দ্রনারায়ণ বাড়ির ভেতর ঢুকলেন। তারপর দীর্ঘসময় পর বাড়ির ভেতর থেকে বের হলেন। হরিহরণ আর হেমাঙ্গিনী দেবী দেখল দেবেন্দ্রনারায়ণের কাঁধে কাপড়ে মোড়ানো ছেলেটি। মশালের আলোয় তার পা দুখানা দুলছে। হরিহরণ আর হেমাঙ্গিনী দেবী বিষ্ফোরিত চোখে দেখল, দেবেন্দ্রনারায়ণ ছেলেটিকে একটি বৃক্ষের সাথে হেলান দিয়ে বসিয়ে রাখলেন। তারপর আবার ঢুকে গেলেন বাড়িটিতে। তার কিছুক্ষণ বাদে দেবেন্দ্রনারায়ণ আবার বাড়ি থেকে বের হয়ে এলেন। ততক্ষণে দাউদাউ আগুনে জ্বলতে শুরু করেছে বাড়িটি। দেবেন্দ্রনারায়ণ একবারের জন্যও পিছু ফিরে তাকালেন না। তিনি ছেলেটিকে ফের কাঁধে তুলে নিলেন। তারপর ঢুকে গেলেন জঙ্গলে। - অন্দরমহল
Sadat Hossain (born 29 June 1984) is a Bangladeshi author, screenwriter, film-maker, and novelist. Sadat Hossain was born In Madaripur, Dhaka, Bangladesh. He studied anthropology at Jahangirnagar University. He was a photojournalist in a newspaper. Then the editor told him that he should write the story of those photos. Eventually, with these, he published his first book in 2013 named Golpochobi. Then, he started to write short stories. In 2014 Janalar Opashe published. In 2015 Aarshinagor is the first book when people recognize him in 2015.[4] Besides writing he has interest in filmmaking as well. He has a production house named ‘ASH’ Production house, released a number of visual contents like short films, dramas, music videos, documentaries, etc.
'বইয়ের চেয়ে বড় বন্ধু আর নেই' - কথাটার তাৎপর্য হয়ত অনেকেই উপলব্ধি করেন। অনেকেই এক জীবনে একাধিক বই পড়েন। কিছু বইয়ের কথা চলে যায় বিস্মৃতির অতলে আর কিছু লেখার রেশ মন ধরে রাখে সারাজীবন জুড়ে। হয়ত সেসব লেখা তার মন এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়, হয়ত বা নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায় সে লেখায়, হয়ত বা অজানা কোনো রত্নের সন্ধান পায় সেই লেখা থেকে অথবা, অথবা সেই লেখা খোঁজ দিয়ে যায় মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক অন্দরমহলের। এই অন্দরমহলের খোঁজ কতজন রাখি? বেশিরভাগ মানবজনমই কেটে যায় মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা এই অন্দরমহলের খোঁজে।
"মানুষ তোর মানস ধন রইল পড়ে, তুই তবু কোন ধন খুঁজিস? সোনা-দানায় কি ধন থাকে, যদি বা তুই মন বুঝিস! যে সুখের খোঁজে তুই ধন কাড়িলি, সেই সুখখানি তোর কোথা রয়, মনের মাঝেই সুখের বসত, তবু সেই মনখানা তোর আড়াল রয়। জগত যে এক ভ্রমের নগর, সেই নগরে অন্ধ সকল, ইঁটের ভেতর মহল খোঁজে, আসল তো মন, অন্দরমহল।"
আমার পড়াশোনা বা জানার জগতটা খুবই সীমিত। সেই সীমাবদ্ধতা ওপার বাংলার সাহিত্য ভান্ডারের খোঁজ তেমন রাখত না। সাদাত হোসাইনের নামও আগে শুনিনি। প্রথম শুনলাম এ বছর নন্দন চত্বরে বাংলাদেশ বইমেলা চলাকালীন অভিষেক আইচদার পোস্ট দেখে। সেই পোস্টেই আরো জানলাম ওনার বই নিলাম হয়েছে একলাখ টাকায়। কৌতুহল জন্মালো। বাংলাদেশের মূল্যস্তর সম্বন্ধে বিশেষ অবহিত নই। কিন্তু এপার বাংলার মূল্যস্তরে সদ্য প্রকাশিত কোনো বাংলা বই একলাখ টাকায় নিলাম হচ্ছে - ভাবনাটাই কিরম যেন কষ্টসাধ্য। ইতিমধ্যে 'অন্দরমহল' এবং 'আরশিনগর' এই দুটি বই নিয়ে অনেকের উচ্ছ্বাস চোখে পড়ল। প্রবল কৌতুহল হল বইদুটি সম্পর্কে জানার। অবশেষে বইমেলার শেষ দিনে বই দুটি সংগ্রহে এল। সাদাতের সাথে আলাপও হল এবং সদাহাস্যময় মানুষটি বার বার বললেন আগে 'আরশিনগর' পড়ে তারপর 'অন্দরমহল' পড়ার কথা। ওনার কথা শুনে কিছুদিন আগেই শেষ করেছিলাম 'আরশিনগর'। বেশ ভালো লেগেছিল। লেখক মনের সমস্ত মাধুরী মিশিয়ে তিলে তিলে তৈরি করেছিলেন আরশিকে। আরশি লেখকের মানসপ্রতিমা। অসাধারণ মায়াময়ী। পাঠক অন্য কোনো দিকে না তাকিয়ে আরশির কাজল চোখে 'বিবশ হয়ে চেয়ে' পড়ে ফেলতে পারে উপন্যাসটি। আরশিনগর আসলে এক ভাবালুতার জগৎ। এক অদৃশ্য জাদু বাস্তবতা ছুঁয়ে ছিল উপন্যাসটিকে। কিন্তু তারপরও সেই উপন্যাসের গতি কোথাও কোথাও শ্লথ লেগেছিল। মনে হয়েছিল লেখক - পাঠক দু তরফেই আবেগের ঘনঘটার কিঞ্চিৎ বাহুল্য প্রকাশ পেয়েছে।
এরপর শুরু করলাম 'অন্দরমহল'। অনেকদিন ধরে বেশ কিছু বই রিভিউ করার দৌলতে বুঝেছি স্বতঃস্ফূর্ত রিভিউ নির্ভর করে অবশ্যই লেখকের দক্ষতার উপর, তাঁর লেখনী কতটা এফোঁড় - ওফোঁড় করছে মানব মনকে - তার উপর, মানবমনের অন্দরমহলের কথা কতটা উন্মোচিত হচ্ছে তার লেখনীতে তার উপর। কিছু কিছু লেখার রিভিউ করার মত ভাষার জোর আমার মত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সমালোচককে ভগবান দেননি। সাদাতের 'অন্দরমহল' এই জাতের লেখা। অনবদ্য, অসাধারণ - আমার শব্দভান্ডার এ মহাকাব্যিক উপন্যাসের অসাধারণত্ব বর্ণনা করতে অক্ষম। একাধিক প্লট, সাবপ্লট, অনেক অনেক চরিত্রের ভিড়, কিন্তু কখনোই উপন্যাসের খেই হারিয়ে যায়নি। বরং প্রতি চরিত্র, তা ছোট - বড় যাই হোক, পেয়েছে পূর্ণ মর্যাদা ও পরিণতি। কয়েক পাতা জুড়ে এক-একটি অধ্যায়। অধ্যায়ের শেষ চরিত্রগুলির পরিণতি জানার অদম্য কৌতুহল বাড়িয়ে দেয়। এক একটি চরিত্রের সাথে জড়িয়ে থাকে এক একধরণের জীবনবোধ, তা যেমন কখনো হিংসার, দ্বেষের কখনো অজানার সন্ধানের, কখনো ভালোবাসার, কখনো অচেনা পথের পথিক সেই জীবনবোধ। কে জানে কখন যেন পাঠকও সন্ধান পেয়ে যান নিজেদের অন্দরমহলের। লেখকের সার্থকতা এটাই।
এ উপন্যাসের ঘটনাস্থল গঙ্গাবতী নদীর পাড়ে বিষ্ণুপুরে জমিদারবাড়ি গঙ্গামহলের ক্ষমতার অধিকার নিয়ে। বিশদে কিছু বললাম না। পাঠকরা নিজেরাই এই জমিদারীর অন্দরমহলে প্রবেশ করে খুঁজে নিন নিজেদের বুকের ভেতরে থাকা অন্দরমহলকে। এ উপন্যাস পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল ক্লাসিক যুগের কোনো লেখকের লেখা পড়ছি। বিশ্বাস করুন একদম বাড়িয়ে বলছি না। এত অল্প বয়সে এরম পরিণত লেখা লিখলেন কি করে সাদাত? আপনি সত্যিই বিস্ময়! গঙ্গামহলের অন্দরমহলে ঢুকতে ঢুকতে বার বার মনে হচ্ছিল একলাখ নয়, পার্থিব জগতের কোনো মূল্যই বোধহয় এ বইয়ের মূল্য নির্ধারণে অপারগ। আরো লিখুন সাদাত। আগামী দিনে আপনার থেকে মানবমনের অন্দরমহলের মণি মুক্তের সন্ধান আরো বেশি করে পাব সেই আশায় রইলাম।
ফেসবুকে তোলপাড় দেখে এইবারের বইমেলা থেকে বইটা সংগ্রহ করি এবং পড়ার আগ্রহ দেখাই। এই লেখকের আগের কয়েকটা বই এই বছরেই পড়েছি। বড় উপন্যাস এভারেজ লিখেন, তবে ছোটগল্প আমার কাছে ভালোই লেগেছে... এবার আসি এই বইয়ের কথাতে। প্রথম দিকে ভালোই লাগতেছিল। সাসপেন্স আছে। চরিত্রের গাঁথুনি ভালো। পাঠকের মনযোগ ধরে রাখতে পারতেছিলেন... কিন্তু! কিন্তু, যত বইটার ভিতরে ঢুকতেছিলাম, ততোই আমার কাছে গরুর রচনার 'খাঁচকাঁটা খাঁচকাঁটা খাঁচকাঁটা' এই শব্দটার কথা ইয়াদ আসতেছিল। মনে হচ্ছিলো, চুইংগামের মতোন বইটাকে টেনে বড় করা হয়েছে। আমি হাঁপিয়ে উঠতেছিলাম। হিন্দি সিরিয়ালের গল্পের মতোন লাগা শুরু করে দেয়। বিরক্তি ধরিয়ে দেয়। মনে হচ্ছিলো, শেষ হয় না কেন এই উপন্যাস!? ... কিছু কিছু লাইন ভাল লেগেছে। গভীর জীবনবোধ দেখানো হয়েছে। তবে সব মিলিয়ে আশানুরূপ না বইটা। যেভাবে হট কেকের মতোন ব্রিক্রি হয়েছে, অন্তত তেমনটা তো নয়ই! রেটিংঃ ১.৫/৫
''আমাদের কিছুই নেই ,অথচ সবটা সময় জুড়ে ভাবি, এই বুঝি নিঃস্ব হলাম!'' শাশ্বত অনির্বাণ এক সত্য। আর এই সত্যই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সাদাত হোসাইনের লেখা উপন্যাস 'অন্দরমহল' এর পাতায় পাতায়। পড়া শেষ করলাম 'অন্দরমহল'। যদি কেউ জিজ্ঞাসা করেন কেমন লাগল, আমি জানি না কি উত্তর দেব। ভালো, খুব ভালো ,ভয়ঙ্কর সুন্দর, আকর্ষণীয় ,উত্তম, দুর্ধর্ষ... যে কোন বিশেষণই ফিকে হয়ে যাবে।' অন্দরমহল' এই সব কিছুর অনেক উপরে অনিন্দ্য শাশ্বত সুন্দর। এই উপন্যাসের নায়ক বৈভবের আধার 'গঙ্গামহল'। কখনো গঙ্গামহলের অন্দরের পরিবেশ ,সেই মহলের মানুষ গুলির ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেছে ।কখনো বা সেই মানুষ গুলির মনের অন্দরে ঘটে চলা চিন্তাভাবনা কার্যকলাপ, গঙ্গামহলের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে।
''মানুষ তোর মানস ধন রইল পড়ে, তুই তবু কোন ধন খুঁজিস? সোনা-দানায় কি ধন থাকে, যদি বা তুই মন বুঝিস! যে সুখের খোঁজে তুই ধন কাড়িলি, সেই সুখ খানি তোর কোথা রয়, মনের মাঝেই সুখের বসত, তবু সেই মনখানা তোর আড়াল রয় । জগৎ যে এক ভ্রমের নগর ,সেই নগরে অন্ধ সকল, ইটের ভেতর মহল খোঁজে ,আসল তো মন, অন্দরমহল। '' চরম সত্য....'অন্দরমহল' এই নাম সার্থক ।
আমি এই উপন্যাস সম্পর্কে খুব সবিস্তারে কিছু বলব না। কারণ আমি চাই ,আমার পাঠক বন্ধুরাও শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এই উপন্যাস উপভোগ করুন। আমি চাই তারা বিভুঁইয়ের সাথে কান পেতে শব্দ শুনুক ,হরিহরণের সাথে বারোহাটির গভীর জঙ্গলে অজানা ভয় নিয়ে ঘুরে বেড়াক ,বীণাবালার নৃশংসতায় স্তব্ধ হয়ে যাক ,আড়ালে দাঁড়ি���়ে দ্বিজেন্দ্র ও মধুর কথপোকথনে শিউরে উঠুক। আমি চাই গঙ্গাবতীর জলোচ্ছ্বাসে শুধু গঙ্গামহল নয়, পাঠকের অন্দরমহলও ভেঙে তোলপাড় হোক। তবু কিছু কথা না বললেই নয়।উপন্যাসের কিছু জায়গা আমায় খুর নাড়িয়ে দিয়েছে। দীপেন্দ্র আত্মবিশ্লেষণে বলেছেন, তার মধ্যম বা মাঝারি হওয়ার যন্ত্রণার কথা। এই মাঝারি মানুষ গুলোর নিজস্ব কোন অস্তিত্ব সমাজে থাকে না। তারা থাকে উপেক্ষার খাতায়। তারা তখন নিজের একার হয়ে পড়ে। তারা নিজেকে ছাপিয়ে গিয়ে কিছু একটা হতে চায়। আর এই হতে চাওয়া, উপরে উঠতে চাইতে গিয়ে, দীপেন্দ্রকে নামতে হয় অনেকটা নীচে। উপন্যাসের কোথাও অতিরিক্ত কিছুই নাই। যেখানে ঠিক যতটা দরকার, ততটাই উপাদান রয়েছে। হরিহরণ ,রতনকান্তি চরিত্র দুটি অনবদ্য। তাদের ভূমিকা নাটকের মঞ্চের পিছনের কলাকুশলীর মতো। তারা অনেক কিছু জানেন ,অনেক ঘটনার নীরব সাক্ষী। নাটকে যেমন মঞ্চের পিছনে চলে এক বড় প্রস্তুতি পর্ব । মঞ্চে যা ঘটতে চলেছে তা যেমন তাদের জ্ঞাত থাকে , তেমন হরিহরণ রতনকান্তিরও সবই জ্ঞাত ছিল। তারা উপন্যাসের চলনশক্তি। ঠিক যেখানে যতটা আলো ,যতটা শব্দ দানের প্রয়োজন ছিল ঠিক ততটাই করেছে তারা। এটা আমার খুব ভালো লেগেছে।
অন্দরমহল নিয়ে কথা বলব ,আর দেবেন্দ্রনারায়ণ, সর্বজয়া, হেমাঙ্গিনী দেবী, বিভুঁইকে নিয়ে কিছু বলব না তা কি হয়! এ সমাজে কিছু মানুষ সত্যিই বুকে নোনা জলের সমুদ্র নিয়ে ঘুরে বেরায়, কিন্তু বাইরে সে বজ্রকঠিন। দেবেন্দ্রনারায়ণও তেমন। সর্বজয়া সত্যই সর্বজয়া। কঠিন পরিস্থিতিকে জয় করে সে এগিয়ে গেছে জীবনে। তবে বাবা মেয়ে দুজনেই এই জয়ের নেশায় খামখেয়ালিপনা, হঠকারিতাও করেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে এই হঠকারিতার প্রয়োজন ছিলও। আবার পৃথিবীতে এমন মানুষও থাকে যার জন্ম হয় দুঃখের হাত ধরে আর মৃত্যু হয় সেই দুঃখের কোলে মাথা রেখেই। হেমাঙ্গিনী দেবীও এমনই এক মানুষ। যে কেবল দুঃখ পেতে পেতেই মারা গেছে। মৃত্যুর কথা বলতে মনে পড়ে গেল ,লেখক সর্বজয়ার মুখে পৃথিবীর সবচেয়ে গরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন রেখেছেন ,''কে বেশি বড় মায়া, না মৃত্যু ?''এই অংশটি পড়তে গিয়ে আমার বঙ্কিমচন্দ্রের 'আনন্দ মঠ' উপন্যাসের একটি লাইন মনে পড়ে গেল....''মায়া কাটাইতে পারে কে ?যে বলে আমি মায়া কাটাইয়াছি ,হয় তার মায়া কখনো ছিল না ,বা সে মিছা বড়াই করে।'' এই সত্যপোলব্ধি আরো একবার এই উপন্যাসে পেলাম। যে সকল মানুষদের জাগতিক চোখ দুটি থাকে না ,তারা মনের চোখে কিছু বেশিই দেখে। ছোট্ট বিভুঁই এর ব্যাতিক্রম নয়। তার সামনে দাঁড়ালে ,যেকোন মানুষের মনের দুর্ভেদ্যতা রিক্ত হয়ে যায়। সারল্যের জোড় বুঝি এতখানিই হয়। অর্থ বৈভরের প্রতি লোভের শিকার হয় ভুজঙ্গ ,মধু, সনাতন, দ্বিজেন্দ্র ,বীণাবালা, কমলামাসি। প্রকৃতি তার বিচার জানায় সত্যের দিকে, লোভহীনতার দিকে । আর সেই বিচারে ঘটনার আবর্তে টিকে থাকার লড়াইয়ে শেষ অব্দি সত্য সরল বিভুঁই এগিয়ে থাকে। বাংলা সাহিত্যে বর্তমানে ভালো লেখার অভাব নেই। কিন্তু পাঠক মন কালজয়ী লেখা পড়তে চায়। আমার মতে বর্তমানে কলোত্তীর্ণ লেখার বড় অভাব। রবীন্দ্রনাথ ,বঙ্কিম চন্দ্র, শরৎ চন্দ্র, মহাশ্বেতা দেবী ,প্রফুল্ল রায়ের মতো কিছু নাম ছাড়া ,আর বেশি কিছু মনে পড়ে না। আমার মাঝে মাঝে মনে হতো, আর কি কখনও কলোত্তীর্ণ লেখা তৈরী হবে না!! হবে। এই উপন্যাস তার প্রমাণ । আজ থেকে বহু বছর বাদেও এই উপন্যাস পাঠককে সমান রোমাঞ্চিত করবে। হ্যাঁ, আমি একে কালজয়ী উপন্যাস বলছি। অনেকের একথা অত্যুক্তি মনে হতেই পারে। তাদেরকে লেখাটি পড়ে দেখার অনুরোধ জানালাম। মানুষ বিশেষে অনুভূতির পার্থক্য থাকবে হয়তো। কিন্তু একথা অস্বীকার করার অবকাশ দেয়নি এই ধারালো লেখনী। এই যে এত্ত কিছু বললাম ,এ শুধু কণিকা মাত্র। উপন্যাসের ব্যাপ্তি আরো অনেক গভীর । সাদাত হোসাইনের হাত ধরে বাংলা সাহিত্য এক সমৃদ্ধ লেখনী পেল।তাকে ধন্যবাদ । এমন আরো অনেক লেখা পড়ার অপেক্ষায় রইলাম। আমি চাই না কাঁটাতার কোন ভাবে অন্তরায় হোক। নিরবিচ্ছিন্ন থাকুক সাহিত্য পাঠের এই আনন্দটুকু।
বইটা আগেও অনেকবার শুরু করেও কন্টিনিউ করতে পারি নাই। অবশেষে শেষ করলাম। বছরের শুরুটা ভালো কিছু দিয়ে শুরু করতে পেরে শান্তি লাগছে।
মানুষের দুই অন্দরমহলের একটা সত্য, আরেকটা মেকি।সবাই কী তার মেকি অন্দরমহল নিয়ে বাঁচতে পারে? কেউ কেউ এই ভানের পরিবেশ থেকে নিজেকে মুক্ত করে নেয় পুনর্জন্ম। ভানের মধ্যে থেকে থেকেই আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাই অন্যকে চিনতে চিনতে। যেখানে নিজেরাই নিজেদের কাছে থাকি অচেনা। আমাদের নিজস্ব কিছুই নেই, তবুও মনের ভেতর একটা হাহাকার এই বুঝি সব হারিয়ে ফেললাম। নিজের বলতে যা দেখি এতকাল তা নিজের দাবি করে নিজেকে সান্ত্বনা দেই যা হয়তো আজীবনই অন্যের আয়ত্তে থাকা বস্তু।
মানবজীবনের একটা বড় সময় কেটে যায় ছলনার পেছনে নিজের আবেগ খরচ করে। ফলাফল ভয়ংকর ক্রোধ যা সময়ের সাথে রূপ নেয় বড় কোনো ভুলে। কয়জন পারে নিজেকে সামলে নিতে?
গঙ্গামহলের জমিদার বাড়ির প্রতিটি দেয়ালই উপন্যাসের প্রতিটি মানুষের কাজের সাক্ষী। হারিয়ে যাওয়া চরিত্রের কিছু বিশেষ গুরুত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সাথে লেখক তুলে ধরেছেন। মা-ছেলের নিঃস্বার্থ সম্পর্ক, যৌন নির্যাতনের স্বীকার কিশোরীর জীবনে ঘুরে দাঁড়ানো, একজন আদর্শ জমিদারের বৈশিষ্ট্য, প্রতিশোধ-পরায়ন মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপ লেখক মনোমুগ্ধকরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন
লেখকের প্রতিটি বাক্যেই ছিলো গভীর কিছু মনোভাব। রহস্যগুলোর এক একটিতে ছিলো মানুষের জীবনের গল্প, দীর্ঘশ্বাস, তৃষ্ণা, আত্মতৃপ্তির মতো সহজাত প্রবৃত্তি।
একইসাথে আমি অবাক মানুষের অতীত দেখে আবার খুশিও কারণ নিজেকে বুঝতে পারার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছি আবার হতাশও মানুষের মেকি অন্দরমহলের ভয়াবহতা দেখে। সবমিলিয়ে পাঠকালীন সময়টা উপভোগ্য।
কাহিনী সংক্ষেপ: উপন্যাসটির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে উনিশ শতকের আবহে বিষ্ণুপুর অঞ্চলের এক হিন্দু জমিদার পরিবারের গল্প নিয়ে। বিষ্ণুপুরের জমিদারবাড়ি গঙ্গামহলের চার দেয়ালের মাঝে বাস করা মানুষগুলোর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অর্থ ও প্রতিপত্তির লোভ আর জীবনের নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়েই এগিয়ে গেছে অন্দরমহলের কাহিনী।
জমিদার বিষ্ণুনারায়ণ বিষ্ণুপুর অঞ্চলের জমিদার। তিন ছেলে ও তাদের সন্তান-সন্ততি নিয়ে তিনি বাস করেন গঙ্গামহলে।
বড় ছেলের নাম অবনীন্দ্রনারায়ণ। জগত সংসারের প্রতি তার বরাবরই অনাগ্রহ। সে সঙ্গীতসাধক। রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে সঙ্গীতসাধনা করেন। জমিদারি, অর্থ-প্রতিপত্তি, ক্ষমতার লোভ এসবের কোনোকিছুই তাকে কখনো টানে না।
কনিষ্ঠপুত্র দীপেন্দ্রনারায়ণ কারো সাতে-পাঁচে নেই। জমিদারির প্রতিও আপাতদৃষ্টিতে তার কোনো লোভ নেই। তাকে সবাই সহজ-সরল মানুষ বলেই জানে। এ জন্য তার কোনো শত্রুও নেই।
বিষ্ণুনারায়ণের মেজো ছেলের নাম দেবেন্দ্রনা���ায়ণ। প্রবল পরাক্রমশালী, বেপরোয়া ও বেহিসেবী লোক। জগৎ সংসারের সকল আনন্দই তিনি উপভোগ করেছেন। বারোহাটির জঙ্গলে গড়ে তুলেছেন নিজের আলিশান বাগানবাড়ি। পরিবারের মেজো ছেলে হওয়া সত্বেও তাকে গঙ্গামহলের সকলেই ভবিষ্যৎ জমিদার হিসেবে মেনে নিয়েছেন। এমনকি খোদ বিষ্ণুনারায়ণও তার সিদ্ধান্তের উপরে কথা বলতে ভয় পান। তবে সবাই তাকে ভবিষ্যৎ বিষ্ণুপুরের জমিদার হিসেবে মেনে নিলেও একজন তাকে কখনোই মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। তিনি হচ্ছেন অবনীন্দ্রনারায়ণের স্ত্রী বীণাবালা।
এক রাতে দেবেন্দ্রনারায়ণ তার বারোহাটির আলিশান বাগানবাড়িতে রক্ষিতা হেমাঙ্গিনী দেবীর সাথে রাত্রিযাপন করছিলেন। হঠাৎ করেই তিনি জরুরী সংবাদ পেয়ে ছুটে যান গঙ্গাবতী নদীর তীরে। নদীর ঘাটে এক নৌকার মধ্যে দেখতে পান সারা শরীর বসন্তে ছেয়ে যাওয়া মৃতপ্রায় একটি ছেলেকে। ছেলেটির পাশে থাকা একটি জলের ঘটিতে বাঁধা একটি কাগজ দেখেই হঠাৎ চমকে ওঠেন দেবেন্দ্রনারায়ণ। এক মুহূর্তেই ওলট-পালট হয়ে যায় তার পৃথিবী। যদি ছেলেটির পরিচয় ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে গঙ্গামহলের চার দেয়ালের মাঝে বয়ে যাবে এক প্রলয়ঙ্করী ঝড়। তাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়বে সবকিছু।
গ্রামবাসীর মধ্যে বসন্তের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সিদ্ধান্ত নেয়া হল ছেলেটিকে বারোহাটির জঙ্গলে জীবন্ত অবস্থায় আগুনে পোড়ানো হবে। কিন্তু এরই মধ্যে সারা গাঁয়ে মহামারীর মত বসন্ত ছড়িয়ে পড়ল। শত শত মানুষ মারা যেতে লাগলো। আক্রান্ত হলেন খোদ দেবেন্দ্রনারায়ণও। অসুস্থ হয়ে পড়ে রইলেন বারোহাটির বাগানবাড়িতে। এরই মধ্যে মারা গেলেন বিষ্ণুনারায়ণ। মহামারী থেকে রক্ষা পেতে বন্ধ করে দেয়া হল গঙ্গামহলের সিংহদরোজা। তারপরই ক্ষমতা দখলের নোংরা কূটকৌশল আর ষড়যন্ত্রের খেলা শুরু হল গঙ্গামহলের চার দেয়ালের অভ্যন্তরে। একের পর এক ষড়যন্ত্র আর অত্যাচারে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে দেবেন্দ্রনারায়ণ আর তার পরিবারের জীবন। তবে যে ষড়যন্ত্রের বিষবৃক্ষ গঙ্গামহলে রোপণ করা হয়েছিল তার ফল শুধু দেবেন্দ্রনারায়ণ আর তার পরিবারকেই ভোগ করতে হয়নি, ভোগ করতে হয়েছিল গঙ্গামহলের ভিতরের আর বাইরের মানুষগুলোরও।
কে রয়েছে গঙ্গামহলের এসব ষড়যন্ত্রের মূলে? তার সহযোগীই বা কারা? ক্ষণস্থায়ী এ জগতের সাময়িক সুখের জন্য যে অপকর্মে তারা ডুবে রয়েছে, তা কি আদৌ কোনো ভালো ফল বয়ে আনবে? নাকি নিয়ে আসবে ভয়াবহ কোনো পরিণাম? জানতে হলে আপনাদেরও উপন্যাসটি পড়তে হবে আর প্রবেশ করতে হবে বিষ্ণুপুর জমিদারির অন্দরমহলে।
বইটি পড়ার প্রেক্ষাপট: সাদাত হোসাইনের লেখার সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল “মানবজনম” পড়ে। তখনই আমি তার লেখার ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। পুরো বইটা পড়ার সময়ই জীবন নিয়ে এক গভীর ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম। বাকী বইগুলোও তখন থেকেই পড়ার ইচ্ছা ছিল। তবে বিভিন্ন কারণে সংগ্রহ করা হয়ে ওঠেনি। কাকতালীয়ভাবে কিছুদিন আগে খুব কাছের একজন মানুষের কাছ থেকে “অন্দরমহল” বইটি উপহার পেয়ে গেলাম। এরপরই পড়া শুরু।
পাঠ প্রতিক্রিয়া: বইটা পড়ার পর বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম। গভীর ভাবনায় ডুবে গিয়েছিলাম। ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রতি মানুষের দুর্নিবার মোহ আর তার পরিণতি নিয়ে চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম।
অন্দরমহল আমার পড়া সাদাত হোসাইনের দ্বিতীয় উপন্যাস। বইটা পড়া শুরু করার পর চোখের পলকেই পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা শেষ হয়ে গিয়েছে। যতক্ষণ পড়ছিলাম মনে হচ্ছিল যেন আমি একজন দর্শক হয়ে হারিয়ে গিয়েছি বিষ্ণুপুর গ্রামে, মিশে গেছি অন্দরমহলের চরিত্রগুলোর মাঝে।
ক্লাসিক উপন্যাস পড়ার সময় মূলত দু'টি বিষয়ে আমি বেশি গুরুত্ব দেই। এক. বর্ণনা আর দুই. উপন্যাসে চিন্তার গভীরতা। দু’টি উপাদানই উপন্যাসটিতে সঠিকভাবে থাকায় পড়ার সময় কোনো বিরক্তি আসেনি। লেখকের বর্ণনা করার ক্ষমতা সত্যিই অসাধারণ। মনে হচ্ছিল যেন দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আর উপন্যাসটিতে অন্তর্নিহিত জীবনবোধ নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। সাধারণত আমি থ্রিলার বেশি পড়ি। কিন্তু বইটা পড়ার সময় এত গভীরভাবে চিন্তায় ডুবেছিলাম যে অনেক থ্রিলার পড়ার সময়ও এত ভাবতে হয়নি। মাঝখানে কিছু রহস্য অমীমাংসিত থাকায় ভেবেছিলাম সেগুলো হয়ত অমীমাংসিতই থেকে যাবে। তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়গুলো পরিষ্কার করায় লেখককে বিশেষভাবে ধন্যবাদ।
এবার বইয়ের বাঁধাই ও মুদ্রণের প্রসঙ্গে আসি। ভাষাচিত্রের বাঁধাই ও পেজের মান দু'টোই উন্নতমানের। এজন্য পড়তে কোনো সমস্যা হয়নি। তবে তাদের সবচেয়ে বেশি প্রশংসা প্রাপ্য নির্ভুল বানানের জন্য। বর্তমানকালের বিভিন্ন প্রকাশনীর ভালো ভালো বইতেও মাত্রাতিরিক্ত বানান ভুলের কারণে পড়ার আনন্দ বাধাগ্রস্ত হয়। এজন্য স্বাভাবিকভাবেই বই পড়ার সময় চোখে বানান ভুল বেশি ধরা পড়ে। মানবজনম পড়ার সময় যখন কয়েকটা তুচ্ছ প্রিন্টিং মিস্টেক ছাড়া বড় কোনো বানান ভুল পেলাম না, তখন থেকেই হয়ত ভাষাচিত্রের প্রতি প্রত্যাশাটা একটু বেশিই ছিল। মজার ব্যাপার হলো, অন্দরমহল পড়ার পরও সেই প্রত্যাশা অটুটই রয়ে গেছে। এটিতেও খুব তুচ্ছ কয়েকটা প্রিন্টিং মিস্টেক ছাড়া গুরুতর কোনো বানান ভুল চোখে পড়েনি। এজন্য ভাষাচিত্রকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ। তবে হ্যাঁ, শুধু ধন্যবাদ পেয়েই খুশি হলে কিন্তু চলবে না। এ ধারা অবশ্যই অব্যাহত রাখতে হবে।
সাধারণত সমালোচনা ছাড়া আমি রিভিউ লিখতে পারি না। তবে এটাও সত্যি যে আমি কখনোই সমালোচনা করার উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো বই পড়ি না। বইটা পড়ার সময় আমি কাহিনীর মধ্যে এমনভাবে ডুবে ছিলাম যে সমালোচনা নিয়ে আর ভাবার সময় পাইনি। কিছু সমালোচনা নাহয় ভালোলাগা দিয়েই পূরণ হয়ে যাক।
অন্দর মহল-বুক মিভিউ। অন্দরমহল, নাম শুনলেই কেমন জানি গম্ভীর গম্ভীর ভাব আসে, তাই না? অন্দর মহল তো সেই আলো বাতি মহল, আর আরেক মহল তো বিবেক। অনেকে বলবেন হৃদয়, সমস্যা হল-হৃদয় বলিতে আবার হৃদপিন্ড চোখে ভাসে। তাই তা বাদ। সবসময় তা কাপিতেছে। লেখকের আরশিনগর ছিল গ্রাম্য উপজীব্য, বৃষ্টি, ঘাস, ঘাসের গন্ধ। আমি খালি মনে মনে দয়া করছিলাম-অন্তত যাতে অন্দরমহল সেরকম না হয়। প্রথম ভাবালুতা বই হিসেবে আরশিনগর ঠিক আছে। কিন্তু সব বই যদি আবার পান্তা হাসে একগাদা ভাবালু হয় তবে খবর আছে। সেক্ষেত্রে লেখক সফল। লেখক আমার মনের কথা বুঝেছেন। অন্দরমহল জুড়ে তাই ষড়যন্ত্রের ফিসফিসানি, দুর্যোগের ঘনঘটা, গঙ্গাবতীর উন্মত্ত স্রোত। সবসময় যেন গেম অফ থ্রোনসের সিজন ৬ ফিনালের থিম সং মাথায় বাজে-এই কিছু হল, এই যেন কে মরলো। উপন্যাসের শুরুতেই লেখক বলে নিয়েছেন-লেখকের মৃত্যু পাঠকের কাছে এসে। লেখক হয়তো রাজমহল, আকবর দ্যা গ্রেট ভঙ্গিতে চিন্তা করেছেন-আর আমার চোখে ভেসে উঠেছে আরেক ভংগীতে। কারো চোখে সুলতান সোলেমান সিরিয়ালের স্টাইলে, আর আমার চোখে গেফ অফ থ্রোনসের মত করে। তবে হ্যা-গঙ্গাবতী ভাবতে গিয়ে বুড়িগঙ্গার কালো পানি অন্তত মনে আসেনি। নির্দ্বিধায় আমি বানীবালাকে সার্সেই ল্যানিস্টার এর সাথে মিলাতে পারি, তার পুত্র দ্বিজেন্দ্র মিলে যায় জফ্রে ব্যারাথিওন এর সাথে। থাক সে কথা বলবো না, অনেকেই বুঝবেনা। লেখক সময়কাল না রেখে ভালো করেছেন। সময় বলে দিলেই তা প্রথম আলোর ত্রিপুরা রাজ হোক, আর তা প্রতাপের ইলিশ মাছ কেনা হোক রাজনীতি, অর্থনীতির ছোয়া থাকতোই। সময় উল্লেখ না করাতে আমি কল্পনার রাজ্যে স্বাধীন ছিলাম। সত্য কথা বলতে এত বড় পর���সরে, এত কূটকৌশল ভেবে, এত বড় বই(আকার ও দাম) লিখতেও কিছু সাহস লাগে। এই অন্দর মহল বাংলাদেশে যেমন জনপ্রিয় হবে-কলকাতাতে তার চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছে সম্ভবত। অন্দরমহল ফেরত দিচ্ছি আজ-বইদাত্রী মানবজনম হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ওহ-হো এই মানবজনম সেই মানবজনম নয়! লেখকের সর্বশেষ বই।
" কী আশ্চর্য এই মানবজনম। যার পুরোটাজুড়ে এমন করেই কেবল লেখা থাকে আক্ষেপের গল্প। মানুষ আসলে রোজ রোজ জীবনের নামে যা যাপন কর তার নাম আক্ষেপ জনম। শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্য তাই জীবনের অন্য নাম হয়ে থাকে কেবলই আক্ষেপ। পাতার পর পাতা জটিল সব হিসেব কষে সে জীবনের ফলাফল পায় শেষ অবধি শূন্য।" -দেবেন্দ্রনারায়ণ (অন্দরমহল)
The author does complete justice to the name. There were times when I literally had to read some lines, close the book and reflect. The plot and the mystery that comes along is breathtaking.
Since, I ain't used to read such big books, it took me a long time to finish or should I say tooooo long 🙈. Just when I was in the middle part, I could wait to finish and yes I did.
রাত দ্বিপ্রহর পেরিয়েছে অনেক আগে। সারাদিন মাছ ধরে ক্লান্ত নিতাই তার নৌকা খানা গঙ্গাবতী নদীর তীরে ভিড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎই দেখে তার নৌকার পাশে আরেকটি নাও। ছইয়ের ভিতরে মুখ অবধি ঢেকে শুইয়ে রাখা আছে একটি বালককে। মাথার কাছে জলের ঘটির গলায় বাঁধা চিরকুট। কিন্তু এ কী! ছেলেটার শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে, সারা গায়ে যে মহামারী গুটিবসন্ত! তীব্র আতংকে জমে গেলো নিতাই!
খবর গেলো দেবেন্দ্রনারায়ণ এর কাছে। গঙ্গাবতীর পাশ ঘেঁষে বিশাল জমিদার বাড়ি, তারই মেজোকর্তা তিনি। জমিদার বিষ্ণুনারায়ণের তিন সন্তানের মধ্যে মধ্যম হলেও, বড় পুত্র অবনীন্দ্রনারায়ণের বদলে বৃদ্ধ পিতার জমিদারি দেবেন্দ্রনারায়ণই দেখেন। প্রবল ব্যক্তিত্বের অধিকারি দেবুর মধ্যে জমিদারি রক্তের খামখেয়াল, বহুগামিতা, চন্ডাল-রাগ সবই বিদ্যমান।
এতো পরাক্রম সত্বেও সেই রাতে নদীর তীরে পাওয়া রহস্যময় ছেলেটির জন্যই বদলে গেলো দেবেন্দ্রনারায়ণের জীবনছক। দীর্ঘকাল ধরে জমিদার বাড়ির অন্দরমহলে পাতা হয়েছে ষড়যন্ত্রের শতরঞ্জ খেলা! বীণাবালা জাল গুটিয়ে এনেছেন। তার সাথে খেলায় যোগ দিল আরো অনেকেই, কেউ লোভের ফাঁদে, কেউ প্রতিশোধের অনলে জ্বলন্ত।
দেবেন্দ্রনারায়ণকে চুকাতে হবে অনেক পাপের হিসেব। শুধু কি তিনি? প্রকৃতি ছেড়ে কথা বলে না কাউকেই, সকলের প্রাপ্য বুঝিয়ে দেয়।
গঙ্গামহলের প্রতিটি ইঁট যে চিৎকার করে বলছে লোভ, বঞ্চনা, আর প্রতিহিংসার গল্প!
পাঠপ্রতিক্রিয়া:
যেকোনো গল্প পড়ার সময় পাঠক মাত্রই কল্পনা করে নেয় একটা দৃশ্যপট। তা না হলে নিজেকে সম্পৃক্ত করে ডুব দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। 'অন্দরমহল' উপন্যাসের সময়কালটা পুরনো পটভূমিতে লেখা হলেও, সেটা ঠিক কবে সে বিষয়টি লেখক এড়িয়ে গিয়েছেন। ভূমিকাতে দায়মুক্তির জন্য উল্লেখ করেছেন বাস্তবের সঙ্গে সংস্পর্শ এড়াতে তিনি কোনো নির্দিষ্ট সময়কাল বেছে নিচ্ছেন না। উপন্যাস শুরু করার আগেই এমন শুভংকরের ফাঁকির মত ঘোষণা পুরো সময় মাথায় চাপ ফেলেছিল।
গল্পের কিছু কিছু জায়গাতেই গল্পপ্রবাহকে 'অনেকদিন' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গল্পে যেখানে জীবন-মরণের টানটান উত্তেজনা, সেখানে 'অনেকদিন কেটে যাওয়া' সময় খুব বিভ্রান্তিকর। কখনো আবার লেখক এই অনির্দিষ্ট সময়ে এগিয়ে গিয়ে, ফ্ল্যাশব্যাকে কি কি ঘটে গেছে বর্ণনা করেছেন। এর চাইতে ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে গল্প এগিয়ে গেলে পড়তে বেশি ভালো লাগতো৷ পুরো উপন্যাস পড়ার পরও ঠিক ঠাহর করতে পারিনি 'অন্দরমহল' এর পুরো ঘটনাটা কতোটা সময় যাবত ঘটেছে।
পরিচয়ের পুনরুক্তি ঘটেছে গল্পে বারবার। গঙ্গাবতীর তীর ঘেঁষে গঙ্গামহল, পরপর কয়েক পাতায় এই বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। রতনকান্তিকেও প্রতিবার গানের শিক্ষক হিসেবে পরিচয় করিয়ে না দিলেও চলে।
গল্পে রহস্য জমিয়ে তুলে আবার সব উত্তর দিয়ে দেওয়া হয়েছে দ্রুত। সাসপেন্স তাই থমকে যাচ্ছিলো। কি ঘটবে পাঠক সহজেই ধরে নিতে পারবেন, এবং বুঝে নেওয়ার জন্য আগে থেকে প্রচুর সূত্র রাখা হয়েছে। অবশ্য লেখক কোনো রহস্য উপন্যাস লিখতেও চাননি, তিনি চেয়েছেন লোভ- লালসা আর পরিণতির গল্প বলতে।
'অন্দরমহল' উপন্যাস ভালো লাগার প্রধান কারণ এর পটভূমি। জমিদার বাড়ি, ক্ষমতার লড়াই, আর প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের গল্প পড়তে এমনিতেও ভালো লাগে, অন্যরকম একটা জগতে বাস করা যায় পড়ার সময়টা। গঙ্গামহল, উচ্ছল গঙ্গাবতী নদী, বজরাডুবির চর, বারোহাটির ভূতূড়ে জঙ্গল আর বাগানবাড়ি - সবকিছুই ছিল উত্তেজনাময়।
বড় কলেবরে লেখা উপন্যাসের অনেক চরিত্র, তাদের ব্যপ্তি শক্তিশালী এবং গভীর। দেবেন্দ্রনারায়ণ উগ্র মেজাজের বুনোঘোড়া, যিনি স্ত্রী রেণুকাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য তাকে দিয়েই কিশোরী দাসীর সাথে মিলিত হওয়ার শয্যা প্রস্তুত করে পাশে বসিয়ে রাখেন, অথবা নির্মাণকাজ মনমতো না হওয়ার রামচরণ কারিগরের দু'হাত কেটে নেওয়ার নির্দেশ দেন। তার চরিত্রেই আবার সংমিশ্রণ ছিল অপরাধবোধে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া স্নেহশীল জন্মদাতার। বাইজি হেমাঙ্গিনী দেবী, বিভুঁই, হরিহরণ বণিক, রতনকান্তি, সর্বজয়া, দ্বিজেন্দ্র - সব চরিত্রের আলাদা আলাদা গল্প লেখক সুন্দরভাবে বলে গিয়েছেন।
লেখকের 'নির্বাসন' পড়েছিলাম এর আগে। সেই তুলনায় এই উপন্যাসের গল্পের গাঁথুনি আর চরিত্রায়ন অনেক বেশি ভালো লেগেছে। লেখক যা কিছু দর্শন এবং স্বরচিত গান ব্যবহার করেছেন তাতে বিরক্তি লাগেনি, বরং গল্পের প্রয়োজনে এসেছে।
প্রকৃতি মানুষের হিসাব তার জীবদ্দশাতেই অনেকটা বুঝিয়ে দেয়, হোক তা পাপের প্রায়শ্চিত্ত বা পূণ্যের প্রতিদান। যে এক জীবনে মানুষ লোভের পিছনে ছুটে বেড়ায়, তাতে শান্তি কি পায়? 'আমাদের কিছুই নেই, অথচ সবটা সময়জুড়ে ভাবি, এই বুঝি নিঃস্ব হলাম!' - এই জীবনবোধ নিয়েই পাঠককে ভাবাবে অন্দরমহল উপন্যাসটি।
অন্দরমহল বইটি পড়া শুরু করেছিলাম বছরখানেক আগে, কিন্তু তখন কেন যেন ঠিক মন বসাতে পারিনি। তবে হাল ছেড়ে দেইনি বইটির উপর। তাই এই বছর শেষ করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়েই আবার খুলে বসলাম অন্দরমহল।
বিষ্ণুপুরের রাজকীয় জমিদার বাড়ি গঙ্গামহলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এই গল্পের কাঠামো। এই বাড়ির বিভিন্ন চরিত্র ও তাদের মধ্যেকার সম্পর্ক ও ষড়যন্ত্রের সুতো দিয়ে গল্পটি বুনেছেন লেখক। এই বুনন সবক্ষেত্রে নিখুঁত না হলেও সবমিলিয়ে যেই ছবিটি ফুটে ওঠে সেটি বেশ চমৎকার! কাহিনীর শুরু হয় অন্দরমহলের অন্যতম প্রধান চরিত্র জমিদার বিষ্ণুনারায়ণের মেজপুত্র ও বিষ্ণুপুরের হবু জমিদার দেবেন্দ্রনারায়ণকে দিয়ে। এক গভীর রাতে দুঃসংবাদ পেয়ে বারোহাটির প্রমোদমহল হতে হন্তদন্ত হয়ে গঙ্গাবতীর নদীর উদ্দেশ্যে রওনা দেন দেবেন্দ্রনারায়ণ। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন রাতের আঁধারে নদীর তীরে এসে ভিরেছে একটি নৌকা। নৌকার যাত্রী গুটিবসন্তে আক্রান্ত একটি অচেতন ছোট্ট বালক, তার সাথে পাঠানো একটি চিরকুট। সেই চিরকুটে লেখা এমন এক কথা যা জানাজানি হলে মুহূর্তের মধ্যে বদলে দিতে পারে বিষ্ণুপুর জমিদারির ভবিষ্যৎ।
এই বইয়ের মূল আকর্ষণ আমার মতে এর চরিত্রসম্ভার। এত এত চরিত্র থাকা সত্ত্বেও লেখক প্রতিটি চরিত্রে ফুটিয়ে তুলেছেন আলাদা ব্যক্তিত্য। কেউ কারো গল্পের ভীড়ে হারিয়ে যায়নি। দেবেন্দ্রনারায়ণ, হেমাঙ্গিনী দেবী, বীণাবালা, অবনীন্দ্রনারায়ণ, সর্বজয়া, হরিহরণ...প্রতিটি চরিত্রই স্বকীয়তায় পরিপূর্ণ। লেখকের শব্দচয়নে আছে মাধুর্য ও নৈপুণ্য।
বইয়ের মূল ভাবাবর্তন হয়েছে লালসাকে ঘিরে। হোক তা অর্থ, দেহ কিংবা ক্ষমতার লালসা। মানবজাতির এই লালসার প্রতিদান প্রকৃতি কিভাবে দেয় তাও কুশিলতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। আরো ভালো লেগেছে স্থান ও সময়কাল উহ্য রাখার সিদ্ধান্ত লেখকের। এই অজানা সময়, অচেনা দেশের গঙ্গামহল ও বিষ্ণুপুর যেন রয়েছে নিরবধি।
অন্দরমহলের অনেক অংশ জুড়ে আছে ভাবালুতা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই অনেক বিষয়ের পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে যা খানিকটা এক��েয়ে লেগেছে ব্যাক্তিগতভাবে। এছাড়া বিভিন্ন পরিচয় প্রদানেও সেই পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে, যা ছিল অপ্রয়োজনীয়। অতিরিক্ত পূর্বাশঙ্কা ও পূর্বাভাসে কাহিনীর ছন্দ কেটেছে মাঝে মধ্যে। এই পর্যায়ে কারো কারো মনে হতে পারে শুধু ৫ তারা না দেয়ার জন্যই বুঝি ছুতো ধরছি বসে বসে। কিন্ত বড্ড খুঁতখুতে পাঠক যে আমি। সবদিক থেকে পরিপূর্ণতা না পেলে এই হাত থেকে ৫ তারা খসে না।
তবে মন্দের চেয়ে ভালোটাই অনেক বেশী সাদাত হোসাইনের লেখনীতে। অন্দরমহল আমাকে যতখানি মুগ্ধ করেছে, এতখানি প্রত্যাশা ছিল না। তার বাকি বইগুলো পড়ার জন্য বেশ আগ্রহ জেগেছে এখন। আশা করি একই রকম মুগ্ধতায় বিমোহিত হব।
কোন এক অনির্দিষ্ট সময়ের বাংলার এক জমিদার পরিবারের 'অন্দরমহল' এর নানা ঘটনা, জমিদারি হস্তান্তর নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র নিয়ে লেখা এই উপন্যাস। প্রথমদিকে খুবই বিরক্ত লাগছিলো পড়তে কোন এক অজানা কারনে। ৪০% পড়ার পর টানা পড়ে ফেলেছি। সকল খলনায়কের নির্মম পরিনতিগুলো খুবই স্যাটিস্ফায়িং লেগেছে।
'অন্দরমহল' --- এক অত্যাচারী হিন্দু জমিদার বংশের গল্প। জমিদারবাড়ির বেশিরভাগ চরিত্রই স্বার্থান্বেষী, অর্থ-প্রতিপত্তির পেছনে ছুটে বেড়ানো মানুষ। আবার কেউ কেউ ভাবালুতায় মগ্ন, অল্পতেই হৃষ্ট, বা জীবনের খোঁজে এত প্রতিপত্তির প্রতি উদাসীন।
সিংহাসনের লোভে জমিদারপত্নীর এক ঘড়া পাপের কাহিনী এই অন্দরমহল, সাথে রয়েছে অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে প্রজাদের প্রতিশোধ নেয়ার ক্রোধন্মত্ততা। সব মিলিয়ে পুরো গল্পজুড়ে জমিদারদের বিরুদ্ধে শুধু মিথ্যে আর ষড়যন্ত্র। শেষে এক ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয় ঐ মহল। লোভ-লালসার পিছে ছোটা মানুষগুলোর প্রাপ্তি হয় 'শূন্য'।
রূপকথার মত একটা গল্প। ঘুরেফিরে একই কথা বারবার। সবদিকে শুধু মত্ততা। বাড়াবাড়ি রকমের টানা-হেঁচড়া করে বইয়ের পাতা বাড়ানো, যেখানে কয়েক লাইন পড়েই পরের কাহিনী কি হবে আঁচ করতে পারা যায়।
এক জমিদারবাড়ির ক্ষমতা বদলের গল্প। এক হামখেয়ালি জমিদারের গল্প, এক স্বামীর গল্প, একজন প্রমিকের গল্প, একজন পিতার গল্প। আরো রয়েছে প্রতিশোধগ্রহণের গল্প। মা ছেলের গল্প, এক অগ্নিময় নারীর গল্প। অধিকার আদায়ের গল্প।
ভালবাসা, ঘৃণা, প্রতিশোধ, স্নেহ, মমতা সব কিছু নিয়ে লেখক যে আবেগের সমাহার ঘটিয়েছেন তা আসলের প্রশংসাযোগ্য।
ফিলসফির যে অসাধারণ ব্যবহার সত্যিই মুগ্ধকর।
মাঝে মাঝে মনে হয়েছে লেখক টেনে টেনে লম্বা করছেন গল্পটা। কিন্তু পরে গিয়ে বুঝা গেল, বর্ণনা গল্পের প্রয়োজনেই এসছে।
গঙ্গাবতী নামের নদীর তীরঘেষে গড়ে ওঠা এক প্রাচীন জমিদারবাড়ি গঙ্গামহল যার নাম। চারখানা দ্বিতল অট্টালিকা নিয়ে গড়ে ওঠা এই মহলে থাকেন জমিদার বিষ্ণুনারায়ণ ও তার তিন পুত্র। প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী জেষ্ঠপুত্র অবনীন্দ্রনারায়ণ পরবর্তী জমিদার হওয়ার কথা থাকলেও সকলের ধারণা জমিদার হিসেবে তিনি উপযুক্ত নয়। কেননা তিনি অত্যন্ত ভাবপ্রবণ এবং খেয়ায়ী একজন মানুষ বরং দ্বিতীয় পুত্র দেবেন্দ্রনারায়ণের মধ্যে রয়েছে জমিদার হওয়ার মত সকল গুণাবলী। দেবেন্দ্রনারায়ণ গঙ্গামহল থেকে কয়েক ক্রোশ দূরে বারোহাটির জঙ্গলের কোল ঘেষে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব এক মহল, বারোহাটি বাগানবাড়ি যার নাম। সকল প্রকার ভোগ-বিলাসের আয়োজন রয়েছে এই মহলে। কাহিনীর সূত্রপাত হয় এই মহল থেকেই। প্রচন্ড রকমের এক উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে সূচনা হওয়া এই উপন্যাসকে প্রথম দিকে আমার কাছে একটা থ্রিলার বলেই মনে হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই যেকোন জমিদার বাড়িকে ঘীরে থাকে রহস্যময় ইতিহাস। গঙ্গামহলকে ঘীরেও রয়েছে অজস্র রহস্য। শুরুতে সেইসব রহস্যের কিছু কিছু ইঙ্গিত দিয়ে লেখক খুব চমৎকারভাবে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। গভীর রাতে বারো-তেরো বছরের গুটিবসন্তে আক্রান্ত একাকী অচেনা এক বালকে আবিষ্কার করা হয় নদীতে ভাসমান নৌকায়। এদিকে বারোহাটির বাগানবাড়ির দরজা-জানালা বন্ধ এক কক্ষ থেকে সম্পূর্ণ হাওয়া হয়ে যায় দেবেন্দ্রনারায়ণের পছন্দের এক নর্তকী হেমাঙ্গিনী দেবী। সবকিছু মিলিয়ে শুরুতেই পাঠকের হৃদয়ে যে অপূর্ব কৌতুহল সৃষ্টি হয় তা শুধু লিখে প্রকাশ অসম্ভব। লেখকের কাহিনী বর্ণনার দক্ষতার এক্ষেত্রে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। তবে গল্পের আরেকটু গভীরে প্রবেশ করতেই লেখক সচেতনভাবেই প্রায় সকল রহস্যের জট ছাড়িয়ে দিয়েছেন এবং এই পর্যায়ে এসে আমার মনে হয়েছে এটা শুধুমাত্র একটা থ্রিলার উপন্যাস নয় বরং লেখকের আধ্যাত্মিক চিন্তার চমৎকার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এখানে। লোভ-লালসার বশবর্তী হয়ে মানুষ তার জীবনের উদ্দেশ্য ভুলে প্রতিনিয়ত যে স্বার্থ চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে উঠছে তার পরিনাম কতটা ভয়ঙ্কর সেদিকেই উপন্যাসের ফোকাস চলে গেছে। পার্থিব সম্পদের প্রতি অবনীন্দ্রনারায়ণের কখনই আগ্রহ ছিলো না। তার স্ত্রী বীণাবালার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তাই তিনি প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। কিন্তু বীণাবালার কূট কৌশলের কাছে হার মেনে অবশেষে অন্য এক সম্পদের সন্ধানে গৃহ ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়েন অবনীন্দ্রনারায়ণ। চলে যাওয়ার পূর্বে জমিদারবাড়ির দেওয়ালে লিখে রেখে যান জীবনের এক শাশ্বত সত্য, “আমাদের কিছুই নেই, অথচ সবটা সময় জুড়ে ভাবি, এই বুঝি নিঃস্ব হলাম!”। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে লেখক যে গানগুলো লিখেছেন সেগুলো তার আধ্যাত্মিক চিন্তার গভীরতার প্রকাশ। রতনকান্তি, হরিহরণ প্রভৃতি সাধারণ চরিত্র হয়েও লেখকের সুনিপুণ দক্ষতায় হয়ে উঠেছেন অতি অসাধারণ। দেবেন্দ্রনারায়ণের জেষ্ঠ্য কন্যা সর্বজয়ার প্রতি এক কর্তব্যবোধ থেকে শেষ পর্যন্ত মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ হয় রতনকান্তি। গভীর রাতে সুগভীর জঙ্গলে অভিযান চালানো হরিহরণ সহজেই পাঠকের হৃদয় জয় করে নেয়। উপন্যাস শেষ করার পর পাঠকের হৃদয়ে সত্যিই এক দার্শনিক সত্যের উপলব্দি হয়- যে অর্থ সম্পদের মোহে আমরা ন্যায়-অন্যায় ভুলে যাই সেই সম্পদ আসলে ক্ষণস্থায়ী এবং এই ধন-সম্পদ কখনও প্রকৃত সুখ এনে দিতে পারে না। সংসারের মায়ায় আবদ্ধ হয়ে সেই সুখের সন্ধান পাওয়া কখনই সম্ভব নয়। সেই প্রকৃত সুখের সন্ধান পেতে হলে পার্থিব সম্পদের প্রতি মায়া ত্যাগ করতে হবে। সব মিলিয়ে বইটি আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে।
আগে পড়ে অনেক জায়গায় দেখেছি,পড়েছি সাদাত হোসাইনের লেখনীতে নাকি হুমায়ূন আহমেদের লেখার অনেক ছাপ রয়েছে। ওনার বেশ কিছু বই ই আমার পড়া হয়েছে তবে আমার কাছে কখনোই এমন কিছু লাগেনি কিন্তু অন্দরমহল পড়ে মনে হলো একদমই হুমায়ূন আহমেদের মাতাল হাওয়া বা মধ্যাহ্ন পড়ছি। একদমই ওই রকমের প্লট এ লেখা, একদম হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের মতো টুইস্ট। "অন্দরমহল" বইটার কাহিনী মূলত হচ্ছে বিষ্ণুপুর নামক এক জায়গার জমিদারি ক্ষমতা নিয়ে। এই জমিদারি নিয়েই বাড়ির অন্দরমহলে কতো কল্পনা জল্পনা। তবে বইটার শেষটা আমার খুব ভালো লেগেছে। পুরো বইয়ে লেখক হুমায়ূন আহমেদকে অনুসরণ করলেও শেষটা সুন্দর মতোই ফুটিয়ে তুলেছে।
আজ থেকে পণ করলাম, রিভিউ লিখলে সাথে সাথে লিখবো নতুবা না। এই যে পরের জন্য রেখে দেই পরে আর অনেক কিছু মনেও থাকে না প্লাস লেখার আলসেমিও কাজ করে।
এনিওয়ে, সাদাত হোসাইনের এই বইটা দারুণ। প্লট, চরিত্রায়ন, বর্ণনা সব কিছুই ভালো। চমৎকার কিছু ডায়ালগ তো আছেই, সেই সাথে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গল্পের ফ্লো একইরকম ছিলো। তবে সবচেয়ে সুন্দর হচ্ছে বইটার এক্সিকিউশন। এত চমৎকার ভাবে করেছেন যেটা অনেক লেখকই করতে পারেন না। এতো গুলো চরিত্র কিন্তু কোনোটাই ঘেঁটে যায়নি। এই বইটা রেকমেন্ডেড। পড়ে দেখতে পারেন।
দুনিয়ার সবথেকে ফালতু বই যদি পড়তে চান, তবে এইটা পড়তে পারেন।
ক্ষণে ক্ষণে লেখকের বিরক্তি উদ্রেককারক লেখনির সাথে লেখক সংস্কৃত সম্পর্কে কিছু না জেনে ও কেন যে বইতে এই লেখার শ্লোক উদ্ধৃত করতে গেলেন, আমার তা কিছুতেই বোধগম্য হয়নি। বিস্তারিত ভবিষ্যতে লিখে এই আলোচনা আরও বড় করার ইচ্ছে রইলো।