৪০০ বছরের কিছু আগের কথা। ঢাকা তখন বুড়িগঙ্গা পারের (অথবা অন্য কোনো নামের এক নদীপারের) বিচ্ছিন্ন কিছু গ্রামের একটি। ... মেঘনাদের এক অজানা চরে পর্তুগিজ জলদস্যুদের হাত থেকে পালিয়ে আসা আশুরার সাথে দেখা হয় সংসার-বিবাগী অরুর। ভাগ্যাহত দুই মানুষের পরিচয়ের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হতে শুরু করে প্রায় ১৫০ বছর ধরে বঙ্গোপসাগর ও তার চারপাশের নদ-নদী ঘিরে পর্তুগিজ জলদস্যুদের কায়েম করা ত্রাসের রাজত্ব, তার প্রভাব, এবং বিশেষত বাংলার বিখ্যাত বয়ন শিল্পীদের জীবনের সুখ-দুখ, আনন্দ-বেদনার কাহিনি। রাজা-বাদশাহর জীবন, ভোগ-বিলাস, রণ-কৌশল, রণসজ্জা ইত্যাদি রাজকীয় বিষয়াবলীর আড়ালে হারিয়ে যাওয়া অতি সাধারণ মানুষের জীবনের এক অনবদ্য দলিল এই উপন্যাস পুবের পূর্বপুরুষেরা।
মাসউদুল হকের জন্ম ১৯৭৪ সালে। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় পদচারণা করলেও তাঁর আগ্রহের জায়গা মুলত কথাসাহিত্য। তবে কথাসাহিত্যের নির্দিষ্ট কোন গণ্ডিতে নিজেকে আটকে রাখতে চান না। ফলে তাঁর প্রতিটি গল্প বা উপন্যাসের বিষয়বস্তু হয় ভিন্ন। কথাসাহিত্যের প্রতিটি শাখায় কাজ করার স্বপ্ন নিয়ে তিনি লেখালিখি করেন। প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন নতুন সাহিত্যিক চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করানাে এবং সেই চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণের চেষ্টাই মাসউদুল হকের সাহিত্য রচনার মূল প্রেরণা। পড়াশােনা করেছেন কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিভিল সার্ভিস কলেজে। একাডেমিক পড়াশােনার বিষয় সমাজকর্ম এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক। তবে আগ্রহের বিষয় দর্শন, ইতিহাস এবং রাজনীতি। প্রথম উপন্যাস ‘দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে’র জন্য ২০১২ সালে পেয়েছেন এইচএসবিসি-কালি ও কলম তরুণ কথাসাহিত্যিক পুরস্কার। তাঁর গল্প অবলম্বণে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি ‘ঘ্রাণ’ দেশের বাইরে একাধিক চলচ্চিত্র উৎসবের পাশাপাশি ২০১৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ স্বল্প দৈর্ঘ্য ছবির মর্যাদা পেয়েছে। মাসউদুল হক পেশায় সরকারি চাকুরে।
বইটার আকার অন্তত ৪০০ পাতা হওয়া উচিত ছিলো। শুরু করতে না করতেই শেষ হয়ে গেলো। লেখক যে ৪০০ বছর পূর্বের বাংলাকে নিয়ে লিখতে প্রচুর পরিশ্রম ও গবেষণা করেছেন তা স্পষ্ট বোঝা যায়।যতটুকু লিখেছেন তা অসাধারণ কিন্তু যে আয়োজন ছিলো তাতে দিব্যি মহাকাব্যিক বিস্তৃতিসম্পন্ন একটা উপন্যাস লিখে ফেলা যেতো।এই ধরনের পটভূমিতে ছোট উপন্যাস পড়ে পরিপূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায় না আসলে।
খুবই সুন্দর একটা বই। ঢাকা তখনও ঢাকা হয়ে উঠেনি। সুবেদার ইসলাম খাঁ এলো বলে... একটা যুদ্ধ লাগবে লাগবে সম্ভাবনা উঁকি ঝুঁকি মারছে.. ঠিক সেই সময়কার বাংলার চিত্র। বইয়ের নায়ক-নায়িকারা সবাই একদম মাটির মানুষ; মানে হচ্ছে একেবারে আম জনতা বলতে যা বুঝায় তা। ঢাকা একটা সময় বিখ্যাত ছিল মসলিন শিল্পকে কেন্দ্র করে। শুধু মসলিন না, সুতি কাপড়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল বিশাল একটা গোষ্ঠী। প্রথমে সবাই তাঁতি থাকলেও কেউ-বা ভালো সুতা কাটে, কেউ বা ভালো বুনতে পারে আবার কেউ ভালো চরকা বানাতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদির ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল অনেকগুলো পেশার সম্প্রদায়ও। এই বয়ন শিল্প,এই শিল্পের শিল্পীগণকে কেন্দ্র করে লেখক বুনেছেন তার উপন্যাসটি। কাপড় বুনবার সময় তাঁতিরা যেমন হরেক রঙের সুতা দিয়ে ডিজাইন করেন... তেমনিভাবে উপন্যাসটিকে পাঠকের আর মর্মমূলে গেঁথে দেবার জন্য তুলে ধরেছেন তখনকার বাংলার হালচাল। মসলিন শিল্পী অরু, সুতা কাটারি কাঞ্চনমালা, মগ দোষী হতভাগিনী আশুরা, মার্গারিতা, জলদস্যু সোসা বা ব্যবসায়ী মাখনলাল অথবা সদ্য মুসলিম হওয়া তাঁতী জালালুদ্দিন-এরা নিছক চরিত্র না, মধ্যযুগের বাংলার প্রতিনিধি বটে! মাসউদুল হকের 'পুবের পূর্বপুরুষেরা' খুব আয়েশি ভাবে শুরু হয়েছে.. শেষটাও মন্দ না কিন্তু তবুও একটা আফসোস.. একটা অতৃপ্তি। ভালো জিনিস বোধহয় এমনই হয় :3
'মগের মুল্লুক' বাগধারাটির সাথে আমরা সবাই পরিচিত। কেউ যখন জোর জবরদস্তি করে একতরফা কার্যক্রম পরিচালনা করে তখন তাদের আমরা মগদের সাথে তুলনা করি। মগরা ছিল আরাকান অঞ্চলের বাসিন্দা। মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় করার উদ্দেশ্যে পর্তুগিজ জলদস্যুদের আশ্রয় দিত আরাকান রাজারা।এইসব পর্তুগিজ জলদস্যুদের সাথে যোগ দিয়েছিল মগেরা। ষোড়শ শতক থেকে শুরু করে সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল পর্তুগিজ জলদস্যুদের। সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে শায়েস্তা খাঁ-র চট্টগ্রাম জয়ের মধ্য দিয়ে পর্তুগিজ শক্তিকে পুরোপুরি নির্মূলের পূর্ব পর্যন্ত হত্যা, লুটতরাজ এবং বন্দি করে বাংলার মানুষকে দাস হিসেবে বিক্রি করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল তারা। শুধু সমুদ্র এলাকায় নয়, উজানের ছোট বড় নদীতেও সমানভাবে দস্যুবৃত্তি চলতো তাদের।
সপ্তদশ শতকের বাংলা। মোগল সুবেদার ইসলাম খাঁ তখনও বারো ভূইয়াদের পুরোপুরি পরাজিত করে ঢাকায় রাজধানী স্থাপন করেন নি। এমনই এক সময়ে মেঘনাদের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝ দিয়ে হুগলীর ব্যবসায়ী মাখনলালের নৌকা যাচ্ছিল। নৌকায় মাঝি-মাল্লা ছাড়াও পথের মাঝে আরো কিছু যাত্রী তুলে নিয়েছিল নিরাপত্তার খাতিরে।কারণ নৌকা আক্রান্ত হলে একা থাকার চাইতে একাধিক যাত্রী ভরসা দেয়। মাখনলালের সেই নৌকায় ঠাই নিয়েছিল এক ভবঘুরে যাত্রী অরু। সংসার বিবাগী অরু গত ছয়টি বছর ধরেই এই জলপথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাখনলালের নৌকা যাত্রাপথে এক চরে একটি মহিলাকে অজ্ঞান অবস্থায় পায় কিন্তু মগদোষী হওয়াতে নৌকায় নিতে চায় না আশুরাকে। অগত্যা মায়ার কারণে হোক কিংবা যে কারণেই হোক অরু আশুরাকে সাহায্যের জন্য মাখনলালের নৌকা থেকে নেমে যায়।নির্জন চরে তখন অরু আর আশুরা ব্যতীত তৃতীয় কোনো মানুষ নেই। দুইজনই ভাগ্যের চাকায় ঘুরতে ঘুরতে এখানে এসে মিলিত হয়েছে। তাদের অতীত এবং বর্তমানকে ঘিরেই 'পুবের পূর্বপুরুষেরা' বইটির গল্প সাজিয়েছেন লেখক।
ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস আমার সবসময়ই ভালো লাগে। বিশেষ করে এই বইটি সেই ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীর হওয়াতে বেশ আগ্রহ নিয়ে পড়েছি। চরিত্রগুলো ৩-৪ শ বছর আগের হওয়ায় তাদের মনোভাবকেও সমান্তরাল রাখার চেষ্টা করেছেন লেখক। উপন্যাসটিতে ঐতিহাসিক চরিত্রের পাশাপাশি ঢাকাই মসলিনের কথা উঠে এসেছে। ঢাকাই মসলিনের কদর একসময় দেশ ছাড়িয়ে আরবদেশ এমনকি ইউরোপের অন্দরমহল পর্যন্ত চলে গিয়েছিল যা বাংলার গৌরবকে মনে করিয়ে দেয়।
বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সংযোজন বইটি।দারুণ এই বইটি পড়ার সময় পাঠক নিজেকে আবিষ্কার করবেন ডোমারগাঁও নামক কোনো তাঁত পল্লিতে কিংবা শীতলক্ষ্যার পানিতে ভেসে চলা কোনো পটলা নৌকার পাটাতনে। হ্যাপি রিডিং।
ঢাকার ইতিহাস নিয়ে নতুন নতুন পড়াশোনার আগ্রহ হয়েছে। এই বইটা সেকারণেই কেনা। ৪০০ বছরেরও কিছু আগের কথা এই বইতে। ঢাকা বাংলার রাজধানী হওয়ার অনেক আগে। ইসলাম খাঁ এর বিরুদ্ধে মুসা খাঁ এর নেতৃত্বে বারো ভুঁইয়ারা একজোট হয়েছেন। রাজনৈতিক উত্থান পতন প্রতিনিয়ত চলছে। আরেকদিকে পর্তুগীজ আর মগ জলদস্যুদের কারণে বাংলার ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ মানুষ সবাই আতঙ্কে থাকে। ওই সময়ের মূল রাজনীতি নিয়ে বা জলদস্যু নিয়ে না গল্পটা। বরং ওই পরিস্থিতিতে সাধারণ দুইজন মানু্ষের কথা, পরিবার, দুর্দশা নিয়ে গল্প। একদম সারমর্ম বলতে গেলে যথারীতি মগদস্যু আর পর্তুগীজ দস্যুদের শিকার হয় আশুরা নামের এক নারী। একের পর এক হাত ঘুরতে ঘুরতে যুদ্ধ করতে থাকে। নিজের কোন দোষ না থেকেও মগদোষী হয়। আরেক প্রধান চরিত্র অরু। নিজের স্ত্রী, সন্তান, পরিবার রেখে গৃহহীন। প্রথমে ভেবেছিলাম সন্ন্যাস জীবন বেছে নিয়েছে বা সর্বহারা হয়ে গিয়েছে। তাই একজন বিখ্যাত মসলিন তাঁতী হয়েও ঘর ছেড়ে নাবিক হয়েছে। পরে দেখলাম আসলে এখানে পরকীয়া জনিত কারণ আছে। নিজে পাপ করে সেটার শাস্তিও পেয়েছে। বিভিন্ন প্রেম ভালবাসার গভীর উপন্যাস আমার কখনোই ভালো লাগে না সেটার অনেকগুলা কারণের মধ্যে অন্যতম কারণ হল, প্রেমের কারণে সমস্ত অন্যায় আর দায়িত্বজ্ঞানহীনতা কে অনেক বেশি মাত্রায় আইডিওলাইজ করা হয়। এই বইতে ভেবেছিলাম সেরকমই কিছু হতে যাচ্ছে। কিন্তু পরে অরুর নিজের অন্যায় এর উপলব্ধি এর কারণে সেটা কিছুটা কম মনে হয়। একেবারে সরাসরি ইতিহাস ও না, একেবারে সাধারণ মানুষের দুঃখ, কষ্ট ও না। তবে প্রধান চরিত্র মসলিন তাঁতী হওয়াতে তাঁতী পরিবারের জীবন, তাদের ব্যবসা, তুলা থেকে শুরু করে নিজেদের উদ্ভাবিত বিভিন্ন মসলিন বিক্রি পর্যন্ত অনেক নতুন কিছুই আছে। সব মিলিয়ে ভালো লেগেছে।
প্রাক-মোগল আমলের ঢাকার ইতিহাস কে মনে করা হয় অন্ধকারাচ্ছন্ন। আজকের ঢাকা তখন ছিলো নিতান্তই একটা নিভৃত পল্লী। সপ্তম শতাব্দীতে গুপ্ত যুগের স্বর্ণমুদ্রা এবং একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর হরিশংকরের মূর্তি আবিষ্কার এ অঞ্চলের প্রাচীন সভ্যতা সম্পর্কে কিছু ধারণা দেয়। এছাড়া শিলালিপিতে ম��জিদ নির্মাণের কথা উৎকীর্ণ থাকায় মুসলিম-সভ্যতার উপস্থিতি প্রমান করে।
এই উপন্যাসের সময়টা সপ্তদশ শতকের প্রথম দশক। ঢাকার আশপাশের নদী তীরবর্তী মানুষের জীবন জীবিকা এর বিষয়বস্তু। প্রাচীন ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত এটা স্থির করে বলা মুশকিল। তখন নদীগুলোর গতিপথ নিয়ত পরিবর্তনশীল।
বাংলায় হাজার হাজার নদীর থাকলেও জন্মসূত্রে অরুর নদী ছিলো পাঁচ টি। দোলাই, বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, মেঘনাদ আর লক্ষ্যা। নদীর তীরে তাঁত পল্লীতে বেড়ে ওঠা এবং পারিবারিক কাজ হিসেবে তাঁত বুনাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া। অরুর পূর্বপুরুষরা ছিলো হিন্দু। তারাও তাঁতের কাজ করতেন। বাবা জালালউদ্দিনের বয়েস হওয়ার কারনে আর নিখুদ শাড়ী তৈরি করতে না পারলেও, অরু এবং তার বোন অসাধারণ সব মসলিন তৈরি করে থাকেন যা সেই সময়ের সুলতান ও সুবেদার রা কিনে নিয়ে যেতেন। তাছাড়া অরু এতো সুন্দর সব মসলিন তৈরি করে যা অন্য কারো সাথে মেলে না তাই গোপনীয় ভাবে নদীতে নৌকায় ছৈয়ের মধ্যে বসে মসলিন তৈরি করে। সেই বিখ্যাত মসলিন তৈরি বাদ দিয়ে অরু একদিন জাহাজের খালাসি হিসেবে পাড়ি দেয় সমুদ্রে।
লেখক মাসউদুল হক এর " পুবের পূর্বপুরুষেরা" উপন্যাস হারিয়ে যাওয়া কিছু মানুষের জীবন ও জীবিকা নিয়েই। একই সাথে মোঘল শাসন ব্যবস্থা, জলদস্যু দ্বারা সাধারণ নারী-পুরুষ দাস হিসেবে বিক্রি হওয়া। নারীরা দাসী ও একই সাথে রক্ষিতা হয়ে নিজের সমাজ সংসার থেকে হারিয়ে যাওয়া। বাংলার তাঁত ও মসলিনের ইতিহাস, নদীর গতিপথ ও বর্ণনা, জলদস্যুদের উৎপাত, মোঘলদের রাজ্য বিস্তার, সামজিক আচার বিধি সব কিছু মিলিয়ে বইটা উপন্যাস হলেও নন-ফিকশন এর কাছাকাছি। তথ্য সমৃদ্ধ আমাদেরই পুবের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস এই চমৎকার বইটা।
মোটামোটি লেগেছে। এক্সপেকটেশন অনেক হাই ছিল ।তাই কিঞ্চিত হতাশ হয়েছি।তবে ওভারওল,ভালোই। বাংলার মসলিন আর সেই সময়ের মগ আর ফিরঙ্গি দস্যু এবং তাঁদের অত্যাচার এই বিষয়গুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আর সেই স্ময়ের বাংলার অস্থির রাজনীতির ও বর্নণা দেওয়া আছে। হাতে অনেক মশলা ছিল কিন্তু লেখক কাহিনী আর তাঁদের চরিত্রকে আর ব্যাপ্তি দেয় নি। ভালো, তবে আরো ভালো হতে পারতো।
৪০০ বছরের কিছু আগের কথা। তখনো ঢাকা গড়ে উঠেনি। আমি সেই সময়ের কাহিনি বলছি যখন ইসলাম খাঁ বাংলা আক্রমণ করতে আসছেন। এই উপন্যাসের সময়কাল আনুমানিক ১৬০৫ সাল থেকে ১৬১১ সালে ইসলাম খাঁর বাংলা বিজয় পর্যন্ত। সেই অস্থির সময়ের কথা বলবো যখন জলদস্যুদের অত্যাচারে বাংলা পরিণত হয় মগের মুল্লুকে। ভারতীয় উপমহাদেশে পর্তুগীজদের আগমনের আসল কারণ কি জানেন? অনেকগুলা কারনের একটা হলো সুলতান মুহম্মদ আল ফাতিহের কন্সট্যান্টিনোপোল বিজয়ের পর মসলার যুদ্ধের সময় বিকল্প নৌরুট আবিস্কার খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। অটোমানদের কারনে ভিন্ন পথে ভারতবর্ষে আসা শুরু করে বিদেশি নাবিকরা এবং এখানে ইউরোপের রেনেসাঁর প্রভাবও ছিল। তখন নৌবিদ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকা পর্তুগিজরা সবার আগে ভারতবর্ষে আসতে সক্ষম হয়। তৎকালীন আরাকানরাজের পক্ষে পর্তুগিজদের ছাড়া মোগল শক্তির সাথে পেরে উঠা সম্ভব ছিল না। দক্ষ নাবিক পর্তুগিজরা এই সুযোগে বাংলার ভিতর লুটপাটের ফ্রি পাস পেয়ে যায়। অন্যদিকে বারোভুঁইয়ারাও মোগলদের রুখে দিতে সেই পর্তুগিজদের নৌ সাহায্য নেয়া শুরু করে।
পুরো উপন্যাসটা মাত্র ১১০ পেজ হলেও এর ব্যাপ্তি বিশাল কলেবরের। প্রথম অংশে, নদীমাতৃক বাংলার বানিজ্য ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের কাহিনি এসেছে। কাহিনির স্রোতের সাথে এখানে এসেছে হুগলির ব্যবসায়ী মাখনলাল, মসলিন কারিগর অরু, হতভাগা বধু আশুরা ও পর্তুগিজ জলদস্যু সোসার কাহিনি। আতংকিত হবার মতো ঘটনা যেভাবে শুরু হয়েছিল মাঝপথেই পর্তুগিজদের সেই কাহিনি শেষ। উপন্যাসের এই অংশে নদীমাতৃক বাংলা, ভূরাজনীতি, পর্তুগিজ জলদস্যুদের জলেস্থলে সর্বত্র যৌনতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বইয়ের সামান্য কয়টা পাতা শেষ হয়েছে। নারীদের উপর অত্যাচার, লুটপাটের বর্ণনার সাথে এসব অযাচিত ঘটনা বার বার পড়তে বিরক্ত লেগেছে। সংলাপ বিবর্জিত এই অংশে চরিত্রায়নের আগামাথা আমার চোখে পড়েনি। মন্দের ভাল বলতে পোপের ইনকুইজিশনের অনুমতি নিয়ে স্থানীয় সব ধর্মের অধিবাসীদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টাটা এখানে ভাল মত দেখাতে পেরেছেন লেখক।
দ্বিতীয় অংশে, অরুর মাধ্যমে ৬ বছর আগে পরে ফ্ল্যাশব্যাকে অরুসহ আরো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র দেখানো হয়েছে। মসলিনের স্বর্নযুগে সুবর্ণগ্রামকে(বিক্রমপুর) পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে এক নামে চিনতো। সুবর্ণগ্রাম ও তৎসঙ্গলগ্ন এলাকা তুলা চাষের জন্য ছিল সবচেয়ে উৎকৃষ্ট। সেই তুলা কাটার জন্য খুব দক্ষ মানুষের প্রয়োজন হতো। ঘটনাক্রমে অরুর দেখা হয় কাঞ্চনমালা নামে একজন সুতাকাটুরের। সুতাকাটুরে কাঞ্চনমালার সাথে দেখা হবার পর অরুর সর্বনাশের শুরু। বিবাহিত অরুর পরনারীর প্রতি মোহকে এভাবে বলা যায়_ মানুষটার মন রেখে গেছে এক ঘাটে, আর দেহ আরেক ঘাটে , অসহ্য দোটনায় পড়ে জীবনটা ঠেলে দিচ্ছিল মেঘনাদের বুকে।
এই উপন্যাসে চরিত্রায়নের প্রাপ্তি বলতে গেলে অরু আর কাঞ্চমালার অংশটুকুই। এই অংশে কিছু সংলাপের দেখা মিলবে তবে সেগুলা পড়ে আপনার মনে হতে পারে গলার টুটি চেপে বার করা হয়েছে। মসলিন নিয়ে অনেক লেখা পাবেন, যদি কারো এই বিষয়ে অনেক আগ্রহ থাকে পড়তে পারেন। পুরো উপন্যাসটা থার্ড পারসন ন্যারেটিভে লিখেছেন লেখক। বিস্তৃত কাহিনি ও চরিত্র তৈরীতে যথেষ্ট সুযোগ থাকলেও এখানে ঐতিহাসিক তথ্য ঠেসেঠুসে ডাম্পিং করা হয়েছে। সংলাপহীন উপন্যাসে আমার প্রবল আপত্তি নাই কিন্তু এই ধরনের লেখায় ঘটনার সুনির্দিষ্ট গতিধারা থাকা উচিত যেটা এখানে একেবারেই অনুপস্থিত। উপন্যাসের নামকরণে বলা ‘পুবের পূর্বপুরুষেরা’ শুধুই কি বস্ত্রশিল্পের সাথে জড়িত ছিলেন? উপন্যাসের কাহিনি যেমন পূর্ণতা পায়নি তেমনি নামকরণের সাথে এর মিল নেই। ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে কল্পনার মিশেল ছিল সামান্যই। ইতিহাসের বিশাল নদী থেকে বিভিন্ন কাহিনির শাখা প্রশাখা গতি পেলেও তা শেষমেষ সমুদ্রে মিলতে পারেনি।
This entire review has been hidden because of spoilers.
ভালো, বেশ ভালো। কোন কোন জায়গায় পাঠকের মনে হতে পারে লেখক অনেক বেশি তথ্য উপস্থাপন করছেন যেটা উপন্যাসে প্রয়োজন নেই। এই বিষয়টা মনে হতো না যদি লেখক আখ্যানভাগকে আরেকটু বিস্তৃত করতেন। তবে যেটুকু যা লিখেছেন তা ভালো। কিন্তু 'পুবের পূর্বপুরুষেরা' নামের মধ্যে যে বিস্তৃতি আছে তা এই উপন্যাসে আসলে ফুটে ওঠেনি। একটি নির্দিষ্ট গণ্ডি, স্পষ্ট ভাবে বললে বস্ত্র বয়ন বা মসলিন শিল্পের সাথে জড়িত কিছু মানুষ এবং সেই সময়ের একটা চিত্র পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের কেবল তারাই তো পুবের 'পূর্বপুরুষ' ছিলেন না।
সমালোচনা যদি বেশি হয়ে যায় তো প্রসংশা হিসেবে বলতে হবে উপন্যাসের গঠন, উপস্থাপনা ও ভাষার ব্যবহার ভালো। একটা ঠিক যে আরও কিছু লেখা যেতো কিন্তু এটাও ঠিক লেখক অপ্রয়োজনীয় কিছু লেখেননি। অপ্রয়োজনীয় কিছু লেখার চেয়ে কম লেখা ভালো
“পুবের পূর্বপুরুষেরা” বইটি রচনার জন্য লেখক যে প্লট বেছে নিয়েছেন, তা দিয়ে অনেক কিছু করে ফেলা সম্ভবত হতো। কিন্তু বইটি শেষ করার পর মনে হয়েছে লেখকের প্লট নির্বাচন দারুন হলেও, গল্পের ধারাবাহিকতা বেশ হতাশাজনক। একটি সম্ভাবনাময় প্লটের অপমৃত্যু হয়েছে এখানে।
“পুবের পূর্বপুরুষেরা” বইটিতে লেখকের গল্প বলার ধরন এক কথায় ভালো লাগেনি। তিনি কেন এভাবে বইটি রচনা করেছেন আমি জানি না। হয়তো লেখক এভাবেই লেখেন। কিন্তু এমন লেখা সংযোগ স্থাপন করতে ব্যর্থ। আমার মনে হয়েছে, লেখকের প্রবণতা ছিল তিনি যে ইতিহাস সম্পর্কে জানেন সে তথ্য অতিমাত্রায় পাঠককে জানানো। ফলে মূল কাহিনি কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে। ঐতিহাসিক উপন্যাসে ঐতিহাসিক সম্বলিত তথ্যের সমাহার থাকে ঠিক, কিন্তু তা থাকে গল্পের ফাঁকে ফাঁকে। ঐতিহাসিক উপন্যাসে ঐতিহাসিক কাহিনির মাঝে কিছু কাল্পনিক চরিত্রের আনাগোনা থাকে। এই দু’য়ের সম্মিলিত গল্পের ফাঁকে লেখক তথ্য জানাতে উদগ্রীব হয়। অথচ “পূর্বের পূর্বপুরুষেরা” যেন এখানে উলটো। লেখকের তথ্য ডাম্পিংয়ের মাঝে মাঝে গল্প বলেছেন। ফলে আমার বিরক্তির কারণ ছিল বেশ।
আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ যে সমস্যা আমাকে বেশ বিরক্তি দিয়েছে, তা হলো সংলাপের অভাব। লেখক গল্প বলার দিকেই সব মনোযোগ দিয়েছেন। ফলে সংলাপের ধার ধারেননি। কিন্তু ঐতিহাসিক উপন্যাসে চরিত্রদের কথোপকথন, বাকবিতণ্ডা, তর্ক, অনুভূতি, মতামত— সবকিছু এক ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে আমার মনে হয়। সেক্ষেত্রে বেশ হতাশার এক অনুভূতি হয়েছে ঠিকমতো উপভোগ করতে পারিনি।
কাহিনি নিয়ে বলতে গেলে লেখক যে সময়ের কথা বলেছে তখন মুঘল শাসন চলমান। বাংলার বুকে বা এর আশেপাশে বারো ভূঁইয়াদের রাজত্ব। মুঘল সাম্রাজ্য ভারতবর্ষকে কব্জা করলেও, বাংলাকে হাতের নাগালে পাচ্ছে না। তাই ইসলাম খাঁ বাংলার অভিমুখে যাত্রা করে। যু দ্ধের দামামা বেজে ওঠে। ঠিক ওই সময় বাংলার জলপথে মগদের ভয়াবহতা। পাশাপাশি চলছে পর্তুগিজ জলদস্যু। তারাও যেন বাংলার মানুষদের জীবনটাকে দুর্বিষহ করে তুলছে। লুটপাট, নারীর সম্ভ্রমহানি, দাস বাজারে বন্দীদের বিক্রি করে দেওয়া নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। যেন এক অন্ধকার সময়ের গল্প বলা হয়। যার মূলে বাংলা থাকলেও অতি প্রাচীন নগরী বুড়িগঙ্গার তীরে বেড়ে ওঠা ঢাকাকে যেন আলো দেওয়া হয়।
এছাড়াও এই গল্পের মাঝে আছে বাংলার ঐতিহ্য। তাঁত, মসলিন, জামদানি শাড়ির যে প্রসার ছিল— তা এখানে দৃশ্যমান। অরু ও তার পরিবার শাড়ির এ ব্যবসা করে জীবন ধারণ করে। অরুর হাতের জাদুতে যেন প্রাণ ফিরে পায় শাড়িগুলো। কিন্তু একসময় অরুর মতিভ্রম হয়। কাঞ্চনমালার প্রেমে মত্ত হয়ে দেশান্তরী হয়। না পায় কাঞ্চনমালাকে, না সংসার করে স্ত্রীর রুকমনির সাথে। এখানে লেখকের এই ব্যাখ্যা আমি বুঝতে পারিনি। একজনের প্রেমে পাগল হলে হয়ে এভাবে স্ত্রী, সন্তানকে ছেড়ে দেশান্তরী হওয়া সম্ভব?
১২৬ পৃষ্ঠার ছোটো এই বইটিতে লেখক যতটা না কাহিনি বলেছেন, তার চেয়ে অপ্রাসঙ্গিক অনেক কথা টেনে এনেছেন। ঠিক অপ্রাসঙ্গিক নয়, কাহিনির চেয়ে তথ্য জানানোতে লেখক আগ্রহী বেশি ছিলেন। ফলে কাহিনি ঠিকঠাক ফুটে ওঠেনি। ফুটে ওঠেনি চরিত্রও। সবগুলো চরিত্রের মধ্যে কেবল অরুকে লেখক সময় দিয়েছেন। অন্য চরিত্র আড়ালে থেকে গিয়েছে। তাছাড়া আরও বেশি হতাশাজনক বিষয় হচ্ছে, ফ্ল্যাপের সাথে কাহিনির মিল তেমন নেই। ফ্ল্যাপ পড়লে মনে হয়, হয়তো এখানে যুদ্ধের কথা থাকবে। কিংবা জলদস্যুদের ভয়াবহতা দেখানো হবে। লেখক যুদ্ধের কথা বললেও, এর ব্যাখ্যা সচেতনভাবে এড়িয়ে গিয়েছেন। জলদস্যুদের ব্যাপারে লিখলেও এর বীভৎসতা তুলে ধরতে পারেননি। বা যাও দেখিয়েছেন, তা পর্যাপ্ত ছিল না।
মোটকথা, লেখক সবকিছুই ভাসাভাসা দেখিয়েছেন। কিছুই আলো ছড়াতে পারেনি। কখনও মনে হয়েছে ননফিকশন পড়ছি, কখনো মনে হয়েছে কারো জীবনের ডায়েরি পড়ছি। যেমন গল্পের মাঝে মাঝে অরুর অতীত কাহিনি এমন অনুভূতি দিয়ে গিয়েছিল। আবার কোথায় কাহিনি বর্ণনা করতে গিয়ে অন্য কারও কথা লেখক টেনে এনেছেন, ইতিহাসের গল্প তুলে ধরেছেন। ফলে কখন কী হচ্ছিল বা কোন ঘটনা কেন আসছে, সেটাও বুঝতে বেগ পেতে হয়েছে। লেখকের লেখনশৈলী আর শব্দচয়ন ভালো থাকলেও, কিছু শব্দচয়ন আরও ভালো হতে পারত। বিশেষ করে, ‘সঙ্গম’ শব্দটি শুরুর দিকে লেখক যতবার উল্লেখ করেছেন আমারই অস্বস্তি হচ্ছিল। অন্যভাবে উপস্থাপন করা যেত।
পরিশেষে, “পুবের পূর্বপুরুষেরা” বইতে লেখক যে সময়ের গল্প লিখেছেন, সেটা আরো বেশি সমৃদ্ধ করা যেত। এ জাতীয় গল্প বিশাল কলেবরে হওয়ার দাবি রাখে। নাহলে ঠিকঠাক অনুভব করা যায় না। এই বাংলার ইতিহাস অনেক প্রাচীন। জাদুর শহর এই ঢাকা অনেক প্রবীণ শহর। এমন শহরের ইতিহাস যখন লিপিবদ্ধ করতে হলে যদি দক্ষতার সাথে না করা হয়, তখন কোথাও যেন ছন্দ কেটে যায়।
‘পুবের পূর্বপুরুষেরা’, মাসউদুল হকের এক অনবদ্য সৃষ্টি। বইমেলায় চৈতন্য থেকে দুজনেরই বই প্রকাশ হওয়াতে পরিচয় এবং আড্ডার সুযোগ হয়। তার নাম শুনছি বেশ কিছুদিন ধরে। লেখালেখিও টুকটাক পড়ছি। এই বইটি পড়বার আগে যে ক’জন লেখককে শাহাদুজ্জামান কিংবা শহীদুল জহিরের যোগ্য অনুসারী ভাবা হচ্ছে মাসউদুল হক সেই অল্প ক’জনের মধ্যে অন্যতম।
বইটি নিয়ে কথা বলবার আগে লেখককে নিয়ে একটু বলি। লেখন একজন উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা। পড়ালেখা করেছেন ক্যাডেট কলেজ এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। লেখক বিশেষত যারা একটু নামকরা, তাদের পাঠকপ্রিয়তা থাকুক কিংবা না থাকুক বেশ একটু হামবড়া ভাব থাকে। আর যদি সেই লেখক মাসউদুল হকের মানের হন তবে তাদের কথা না বলাই ভালো, তাদের সাথে কথা বলা যায় না, দেখা করা যায় না, অনেকটা রবীন্দ্রনাথের জমিদারিত্বের কথা মনে করিয়ে দেন তারা ভাব-চালে।
মাসউদুল হক অবাক করার মতো বিনয়ী এবং বন্ধুভাবাপন্ন। ধরে নিতে পারতাম আমি নিজেও লিখি বলে হয়ত আমার সাথে তিনি ভালো ব্যবহার করেছেন, আলাপচারিতা চালিয়েছেন কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়, পুরো মেলাজুড়ে খেয়াল করেছি তিনি সমকালীন প্রায় সকল লেখক এবং পাঠকদের সাথে খুব বিনয়ের সাথে ভাব-বিনিময় করেছেন। আমি তার এই বইটি পড়বার পূর্বে তার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়েছি। সমাজে আমরা এমন লেখক-সাহিত্যিক চাই যারা মানুষ হিসেবেও উঁচু মানের, যাদের সমাজ আইকন হিসেবে মেনে নিতে পারে। মাসউদুল হক এমন একজন লেখক, সাহিত্যিক।
পুবের পূর্বপুরুষেরা পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। ওই যে বললাম যেহেতু তাকে ইতিমধ্যে তুলনা করা হচ্ছে শাহাদুজ্জামান কিংবা শহীদুল জহিরের সমমনা সাহিত্যিক তাই ভাবছিলাম তার বইয়ে নতুনত্ব কিছু পাওয়া যাবে কিনা! আরেকটা ভয় ছিল ৪০০ বছরের পুরনো ইতিহাস নিয়ে উপন্যাস কতটাই না তথ্যভারে ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। ইতিহাসের বইগুলোতে দেখেছি এতো চরিত্র এবং সময়ের সন্নিবেশ ঘটে যে লেখক একসময় খেই হারিয়ে ফেলেন এবং তার যৌক্তিক সমাপ্তি টানতে পারেন না। আরেকটি ব্যাপার ঘটে লেখক ঘটনা বর্ণনা করেন অনেক পূর্বের সময়ের কিন্তু তার লেখনীতে ফুটে ওঠে সমকালীন চিত্রধারা।
পুবের পূর্বপুরুষেরা পড়ে এই কারণে প্রীত হয়েছি যে মাসউদুল হকের উপন্যাস এর কোন দোষেই দুষ্ট নয়। বইটিতে লেখক তার স্বাতন্ত্র্য লেখনী ধরে রাখতে পেরেছেন যার সাথে অন্য কোন লেখকের তুলনা করা যাবে না! বইটি ৪০০ বছরের পুরনো প্রেক্ষাপটে লেখা এবং লেখক নিজেকে সেই সময়ে নিয়ে গিয়ে তখনকার আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিয়ে উপন্যাসটি লিখেছে ফলশ্রুতিতে পাঠক যখন বইটি পড়বে তারাও নিজেদেরকে তখনকার ঢাকা কিংবা সুবর্নগ্রামে হারিয়ে ফেলবে, হঠাৎ করে ফিরে আসবে না বর্তমান বাংলাদেশ। লেখকটি মূল চরিত্র অরু উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজের গুরুত্ব বজায় রেখেছে। উপন্যাসের কোন অংশকে ‘লাউড’ মনে হয়নি বরঞ্চ একটি নিমগ্ন ধারাবাহিকতা ফুটে উঠেছে বইটির পাতায় পাতায়। যদিও বইটি আলোচনায় বিভিন্ন জায়গায় নারী চরিত্রের মধ্যে আশুরার গুরুত্বের কথা বলা হয়েছে আমার কাছে মনে হয়েছে বইটির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কাঞ্চনমালা। কাঞ্চনমালাকে ঘিরেই যেন ঘটনার আবহ তৈরি যা ফুটিয়ে তুলতে প্রয়োজন হয়েছে আর সব সব চরিত্রের। অত্যন্ত নীরব চরিত্র হলেও রকুমনির গুরুত্ব কম নয়। অল্প উপস্থিতি তখনকার নারীদের এক পরিষ্কার অবয়ব লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন তার মাধ্যমে। অরুর বাবা জালালউদ্দি বুঝিয়েছেন পিতার উপস্থিতি সন্তানের জীবনে সময়কাল মানে না। আয়াসের চরিত্রের নানা দিক, বণিক মাখনলাল ও তার দাসীদের উপস্থিতি সমাজের নানা সুক্ষ্ম অসঙ্গতি ফুটিয়ে তুলেছে সুনিপুনভাবে।
লেখক বলেছেন তিনি যেখানে মনে করেছেন তার বক্তব্য শেষ হয়েছে সেখানেই উপন্যাসের পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন, ইতিহাসের উপন্যাস হিসেবে দীর্ঘায়িত করেননি। তার এই যুক্তি মেনে নিয়েই বলছি উপন্যাসের শেষাংশ পড়ে মনে হয়েছে লেখকের একটা তাড়া ছিল উপন্যাসটির সমাপ্তি ঘটানোর। আশুরা চরিত্রের যদিও অনেক সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু মনে হয়েছে চরিত্রটি পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি সময় কিংবা ব্যপ্তির অভাবে। অরু এবং আশুরা চরিত্রের আরও সম্ভাবনা হয়ত চাপা পড়ে গেছে সময়ের দ্রুত পরিভ্রমণে। উপন্যাসটিতে বড় কোন চমক নেই। চমক থাকতেই হবে এমন নয়, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে মনে হয়েছে কিছুটা নাটকীয়তার অবতারণা করলে উপন্যাসটি হয়ত আরও জমজমাট হতো।
সার্বিকভাবে বললে বলা যায়, পুবের পূর্বপুরুষেরা মাসউদুল হকের আরেকটি অনবদ্য সৃষ্টি। বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাস নির্ভর উপন্যাসগুলোর মধ্যে এটি যে জায়গা করে নেবে সে বিষয়ে আমার অন্তত কোন সন্দেহ নেই। চারশ বছর পুরনো ইতিহাস ঘেটে এমন প্রায় নিখুঁত একটি উপন্যাসের অবতারণা যে কতটা দুরূহ ব্যাপার তা লেখক মাত্রই জানবেন। লেখককে অভিনন্দন বাঙলা সাহিত্যে এই অনন্য সংযুক্তির জন্য। তার কাছ থেকে আরও বড় কলেরবে ইতিহাসনির্ভর উপন্যাস এখন পাঠক আশা করতেই পারেন।
মনে হলো শেষে গিয়ে কাহিনী একটু তাড়াতাড়ি পরিণতি পেলো। বইটাকে আরও লম্বা করা যেতো। যে সময়টাকে এখানে তুলে ধরা হয়েছে, সে সময়ের খুব বেশি তথ্য আসলে লিখিতভাবে পাওয়া যায়না। অনেকটা ঘসা কাঁচ দিয়ে দূরের জিনিস দেখার চেষ্টার মতো, কিছুটা চোখের, আর অনেকটা কল্পনাশক্তির মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা।
আমার নানীজান ছোটবেলায় দুই জোলার গল্প বলতেন। লাল সুতা, নীল সুতার গল্প। তখন থেকে জোলা মানে জানলাম বোকা। আমরা দুই ভাইবোন গল্প শুনে হেসে কুটিকুটি হতাম। মানুষ এতো বোকা হয়?
তো এই জোলা শব্দের ইতিহাস অনেক পুরনো। এর উৎপত্তি বাংলার মধ্যযুগে। সেসময় জোলা ডাকা হতো মুসলমান নিরীহ তাঁতিদের। বাংলায় তখন হাওয়াবদল চলছে ক্ষনে ক্ষনে। বাংলায় শাসন চলছে মুসলিম শাসকদের। বৌদ্ধ, হিন্দু ব্যবসায়ীর অনেকেই সুবিধা পাবার আশায় মুসলমান হচ্ছেন।
সপ্তদশ শতকের প্রথম দশক। তখন বাঙলার তাঁতের খুব সুনাম দেশে দেশে। দেশ বিদেশের বণিকরা এদেশ থেকে তাঁতের কাপড় কিনে নিয়ে যেতেন। মলমল খাস, সরকার আলা, ঝুনা, মসলিনের মতো নামিদামী সব নাম। এসব নরম কাপড় ছাড়া অন্য কাপড় গায়ে তুলতে পারতেন না রাজপত্নীরা। সেই তাঁতের কাপড় বানাতে তুলা আবার আসতো কাপাসিয়া, বাজিতপুর, জঙ্গলবাড়ি, সুবর্ণগ্রাম, ধর্মরাজিয়া থেকে। যত ভালো তুলা তত ভালো কাপড়। তাঁতকে ঘিরে সমৃদ্ধ এক জনপদ তখন বাঙলা।
কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবস্থা ভালো নয়। একদিকে বাঙলার বারোভুঁইয়া-রা মোঘলদের বাঁধন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন শাসন চাইছে। অন্যদিকে সুবাদার ইসলাম খাঁ ধেয়ে আসছে তাঁদের দমন করতে। মানসিংহ দৌর্দন্ড প্রতাপে নদীপথে অবস্থান নিয়ে বসে আছে। যুগে যুগে এই নদীই ছিল বাঙলার ভয়ঙ্কর অস্ত্র। অথচ এখানে নদীর নাম ছিল মেঘনাদ, পদ্মাবতী, ইছামতি, লাক্ষ্যার মতো কাব্যিক। সে নদীতে বাণিজ্যপণ্য নিয়ে বজরা ভাসাতো ধনপতি মাখনলালেরা। সেই ধনপতিদের কাওকে ভাগ্যের নদীপথে আর পরিণামের মঞ্চে এনাম চুকাতে হতো যাত্রাপালার ভাঁড় হয়ে।
সেসময় কেউ কেউ দোলাই আর বুড়িগঙ্গা নামে আলাদা দুটো প্রধান নদীর কথা বলেন। আবার কেউ বলেন বুড়িগঙ্গাই দোলাই। আমরা আর দোলাই খুঁজে পাইনা। ইতিহাস আমাদের একটা নদী নিয়ে গেছে। আমার একটা নদী যে ছিল, জানলোনা তো কেউ।
ওদিকে তখন আবার বাঙালার নদীপথে ত্রাস সৃষ্টি করে ওৎ পেতে আছে নৌবিদ্যায় পারদর্শী পর্তুগিজ, হার্মাদ জলদস্যুরা। স্বন্দীপ দখল করে বসে আছে স্বার্থপর এই জলদস্যুরা। আরাকান বা রোসাঙ্গের দিয়াং বন্দরে বসে বাঙলা থেকে ধরে আনা দাস-দাসীদের সমাহার। সেই বন্দরে দেদারসে এখানকার মানুষ বিক্রি করতো তারা।
এই যখন সময়কাল, তখন আশুরা, কাঞ্চনমালা, মোনাই, পুনু্দের মতো সাধারণ মানুষদের গীতিকা আর কেইই বা জানতো? যাত্রাপুর, সুবর্ণগ্রাম, ভাওয়াল, শ্রীনগর, বিক্রমপুর, হিজলী, শত জনপদের মানুষদের ইতিহাসের কথা কেইই বা খবর রাখতো? লেখক মাসউদুল হক তাই মধ্যযুগের সেইসব সাধারণ মানুষদের নিয়ে একটা ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস উপহার দিলেন। যেহেতু সেসময়কার ইতিহাস অনেকটাই অন্ধকারে রয়ে গেছে, সেকারণে এই উপন্যাসটির টাইমলাইনগুলো হয়তো মিশে গেছে। এতো ছোট কলেবরের এই চমৎকার উপন্যাসটিই আসলে উৎসাহ জাগাতে পারে বাঙলার মধ্যযুগ নিয়ে জানতে। একই সাথে ভাবাবে এই অঞ্চলের মানুষদের যুগে যুগে কিভাবে জোলা বানিয়ে ক্ষমতাবানেরাই হাতের পুতুল করে রেখেছেন আর লুটেপুটে নিয়েছে। সাথে ধর্ম, গোত্র, জাত, পাতের বোঝা সাধারণ মানুষের সাধারণ জীবনের সাধটাও অপূর্ণ করে দিয়েছে। সেজন্য মাঝেমধ্যেই হয়তো মনে পড়বে কাঞ্চনমালাকে উদ্দেশ্য করে অরুর বলে ওঠা ওই কথাটা,
ঢাকার ইতিহাস নিয়ে নতুন নতুন পড়াশোনার আগ্রহ হয়েছে। এই বইটা সেকারণেই কেনা। ৪০০ বছরেরও কিছু আগের কথা এই বইতে। ঢাকা বাংলার রাজধানী হওয়ার অনেক আগে। ইসলাম খাঁ এর বিরুদ্ধে মুসা খাঁ এর নেতৃত্বে বারো ভুঁইয়ারা একজোট হয়েছেন। রাজনৈতিক উত্থান পতন প্রতিনিয়ত চলছে। আরেকদিকে পর্তুগীজ আর মগ জলদস্যুদের কারণে বাংলার ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ মানুষ সবাই আতঙ্কে থাকে। ওই সময়ের মূল রাজনীতি নিয়ে বা জলদস্যু নিয়ে না গল্পটা। বরং ওই পরিস্থিতিতে সাধারণ দুইজন মানু্ষের কথা, পরিবার, দুর্দশা নিয়ে গল্প। একদম সারমর্ম বলতে গেলে যথারীতি মগদস্যু আর পর্তুগীজ দস্যুদের শিকার হয় আশুরা নামের এক নারী। একের পর এক হাত ঘুরতে ঘুরতে যুদ্ধ করতে থাকে। নিজের কোন দোষ না থেকেও মগদোষী হয়। আরেক প্রধান চরিত্র অরু। নিজের স্ত্রী, সন্তান, পরিবার রেখে গৃহহীন। প্রথমে ভেবেছিলাম সন্ন্যাস জীবন বেছে নিয়েছে বা সর্বহারা হয়ে গিয়েছে। তাই একজন বিখ্যাত মসলিন তাঁতী হয়েও ঘর ছেড়ে নাবিক হয়েছে। পরে দেখলাম আসলে এখানে পরকীয়া জনিত কারণ আছে। নিজে পাপ করে সেটার শাস্তিও পেয়েছে। বিভিন্ন প্রেম ভালবাসার গভীর উপন্যাস আমার কখনোই ভালো লাগে না সেটার অনেকগুলা কারণের মধ্যে অন্যতম কারণ হল, প্রেমের কারণে সমস্ত অন্যায় আর দায়িত্বজ্ঞানহীনতা কে অনেক বেশি মাত্রায় আইডিওলাইজ করা হয়। এই বইতে ভেবেছিলাম সেরকমই কিছু হতে যাচ্ছে। কিন্তু পরে অরুর নিজের অন্যায় এর উপলব্ধি এর কারণে সেটা কিছুটা কম মনে হয়। একেবারে সরাসরি ইতিহাস ও না, একেবারে সাধারণ মানুষের দুঃখ, কষ্ট ও না। তবে প্রধান চরিত্র মসলিন তাঁতী হওয়াতে তাঁতী পরিবারের জীবন, তাদের ব্যবসা, তুলা থেকে শুরু করে নিজেদের উদ্ভাবিত বিভিন্ন মসলিন বিক্রি পর্যন্ত অনেক নতুন কিছুই আছে। সব মিলিয়ে ভালো লেগেছে।
সেই সময় যখন বুড়িগঙ্গার তীরে এক গণ্ডগ্রামে ঢাকার পত্তন হচ্ছে দেখে সমৃদ্ধ মুন্সীগঞ্জ আর সোনারগাঁয়ে অপার বিস্ময়! সেই সময় যখন ঢাকাই মসলিন দিল্লীর দরবার ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে পারস্য, অটোম্যান আর রোমান রাজকন্যাদের কাছে! সেই সময় যখন সামাজিকভাবে বিভাজন হচ্ছে হিন্দু আর নব্য মুসলমানদের, কিন্তু কোনো কোনো নারী- পুরুষের হৃদয় থেকে যাচ্ছে নিয়ম-নিষেধ আর বিভাজনের ঊর্ধে, সেই সময় যখন ঢাকার আশেপাশের লক্ষ্যা, বালু, কাওরান, দোলাই,কালীগঙ্গা, মেঘনাদ কিংবা ধলেশ্বরীতে ঘুরে বেড়াত দুর্ধর্ষ মগ-পর্তুগীজ- হার্মাদ দস্যুর দল, সেই সময় যখন পাপীদের পিছন পিছন এ দেশে চলে এসেছিলেন পাদ্রীদের দল, সেই সময় যখন জলদস্যুদের হাতে কামিনী কাঞ্চন হারিয়ে উদভ্রান্ত সন্ত্রস্ত ছিল এই জনপদ, সেই সময় যখন 'মগদোষী' আশুরা আর কাঞ্চনমালাদের রূপকথাকেও হার মানানো কাহিনি্র সুতো ছড়িয়েছিল কিংবা প্রেমের আলেয়ার পিছনে এক গৃহস্থ তাঁতশিল্পী বিপন্ন বিস্ময়ে জীবন- ভূগোল পর্যটন করেছিল- সেইসব সময়ের পরিধি, আজ ৪০০ বছর পর - একদিকে লেখকের দরদভরা চরিত্রচিত্রন, অন্যদিকে সামাজিক গবেষকের তীক্ষ্ণ চোখ -- দুই মিলে আখ্যানটিকে করেছে জীবনঘেঁষা, নিখুঁত। ঐতিহাসিক এই পটভূমিতে রাজা বাদশাহ নেপথ্যে থাকলেও , গল্পটা আম জনসাধারণেরই, পাঠও করবেন রোমাঞ্চে উদ্বেল সাধারণ মানুষেরাই।
লেখকের কাছে আমার আর কোনো দাবি নাই যে – যে সময়ের গল্প হচ্ছিল সে সময়ের ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর কাছে নিয়ে গেলেন না কেন পাঠককে? তবে সেটা ভিন্ন আরেকটি উপাখ্যান হতে পারে ।
পুবের পূর্বপুরুষেরা পড়ে মনে হয়েছে একটা উপন্যাস লিখতে গিয়ে বেচারা লেখক আর কত পরিশ্রম করতে পারতেন!
উপন্যাসের পথপরিক্রমায় উঠে এসেছে সপ্তদশ শতাদ্বীর বাংলা অঞ্চলের শাসন ব্যবস্থার এক অনন্য চিত্র। একদিকে পর্তুগীজ এবং মারাঠাদের মধ্য দ্বৈত বন্ধন এবং গ্রামের পর গ্রাম জুড়ে লুটতরাজ ( যেখানে ফুটে উঠে পর্তুগীজদের শাসন প্রক্রিয়া - যে তারা বাংলা শাসন করতে নয় বরঞ্চ এখানের সম্পদ লুন্ঠন, স্থানীয় লুটতরাজ গোষ্ঠীকে তুষ্ট করণ এবং দাস ব্যবসা চালনাতেই বেশি আগ্রহী), অন্যদিকে বারো ভূইয়াদের স্বাধীন শাসন ব্যবস্থা ও মুঘলদের সাথে স্থানীয় যুদ্ধে কিভাবে পরাস্ত করছিল এবং ক্ষেত্রবিশেষে পরাস্ত হচ্ছিল, আর আছে অরু নামের এক মসলিন তাতীর জীবনগাথা- যা বাকে বাকে তার রূপ বদলিয়েছে, কত নারী তার জীবনে স্থান করে নিয়েছিল; কিন্তু বাউন্ডূলে এই জীবনে তাকে আকড়ে ধরে রাখতে পারেনি কেউই। সবশেষে যেন শূন্যতাই চিরন্তন।
পজিটিভ দিক ১. ভাষাশৈলীর অনন্য ব্যবহার। প্রায়শই ইতিহাস নির্ভর উপন্যাস পড়তে গিয়ে দেখা যায় কাঠখোট্টা ভাষার ব্যবহারে জর্জরিত করে আসল কাহিনীই অনুপস্থিত হয়ে যায়। সেই হিসেবে লেখকের প্রাঞ্জলতা এবং সেই সময়কার আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারে স্বতঃস্ফুর্ততা প্রশংসনীয়।
নেগেটিভ দিক ১. মসলিন কিভাবে হারিয়ে গেল, পর্তুগীজ শাসনই বা কিভাবে স্থমিত হয়ে গেল, সেসব উঠে আসেনি। অনেক চরিত্রের আগমন এবং ইতি খুব দ্রুততায় বিলীন হয়ে গেছে। হয়ত লেখক শুধু একটা নির্দিষ্ট সময়কেই উপস্থাপন করতে চাচ্ছিলেন। তবে পাঠক হিসেবে চাচ্ছিলাম, গল্পটা আরো গড়ালে ভালো হত।
গবেষক, শিক্ষক,বা তাত্ত্বিকদের যাত্রা যেখানে শেষ হয় , সেখান থেকেই গল্পকার বা উপন্যাসিকের যাত্রা শুরু, যেখানে থাকে নতুন উদ্যম ও মুক্ত চিন্তা বহিঃপ্রকাশ । মূলত মধ্যযুগের শেষ ভাগের বাংলার সরূপ ফুটিয়ে তুলার চেষ্টা করা হয়েছে এই উপন্যাসে । যেখানে মগ বা পর্তুগীজদের ভূমিকা বা বাংলার নদীতে তাদের বিস্তর তান্ডব লীলা থেকে শুরু করে বাংলার মসলিন বা তাঁতিদের তাঁত বস্ত্র তৈরি হয়ে ইসলাম খাঁয়ের প্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে মুসা খা কে পরাজয় ও উৎখাত সবটুকুই সংক্ষিপ্ত ও প্রাসঙ্গিক ভাবে ফুটে উঠেছে । উপন্যাসের ভিতর দিয়ে কীভাবে নিরেট ইতিহাস বা জীবনযাত্রাকে সহজবোধ্য ও সুখপাঠ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় , এই বইটা হয়তো এর জাজ্বল্যমান উদাহরণ ।
লেখক ৪০০-৫০০ বছর পূর্বের বাংলার সাধারন মানুষের গল্প বলতে চেয়েছেন, অবারিত ভাবেই মুঘল, বার ভুঁইয়া, জলদুস্যদের কাহিনী এসেছে। কারন ইতিহাস এদের নিয়েই রচিত, সাধারন মানুষ না। বিস্তৃত একটা প্লট খুব দ্রুত শেষ হয়ে গেছে, কারন লেখক সাধারন মানুষের গল্প বলতে চেয়েছেন, তাদের যখন প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে উপন্যাস শেষ হয়ে গেছে।
সতেরশ শতাব্দীতে আমাদের পূর্ব পুরুষেরা কেমন ছিলেন তা যদি কেউ গল্পের ছলে জানতে চায় তাহলে এই বইটি অবশ্যই পাঠ্য। লেখক এখনই সাথে ইতিহাস তুলে ধরেছেন এবং সাধারণ মানুষের গল্প বলে গেছেন। জোলা শব্দটি অনেকবার শুনলেও এর পেছনের ইতিহাস এই প্রথম জানলাম।
এমন ইতিহাসের নির্দিষ্ট সময়ের পটভূমিতে লেখা উপন্যাস পড়ার সময় সারাক্ষণ একটা চিন্তা মাথার ভিতরে কাজ করে। কোন কোন ব্যাপারগুলো লেখকের বিশুদ্ধ কল্পনা আর কোন কোন উপাদানগুলো লেখক ইতিহাস ঘেঁটে সংগ্রহ করেছেন সেটা বোঝার একটা চেষ্টা যেন। উপন্যাসের একটা পর্যায়ে যখন অরুর অতীত তুলে ধরা হচ্ছিল কয়েক অধ্যায়ের জন্যে ভুলেই গিয়েছিলাম এটা ৪০০ বছর আগের গল্প। হঠাত কাঞ্চনের সহমরণের প্রসঙ্গ আসায় খেয়াল হলো সেটা। পড়তে পড়তে কিছুক্ষণ ইতিহাস পড়লাম কিছুক্ষণ পড়লাম উপন্যাস। সাধারণ মানুষের মুখের জন্যে ভাষা তৈরির ব্যাপারটা ভালো লাগলো। একটা খুঁতখুঁতানি শুধু রয়ে গেলো শেষে। পরিকথনে লেখক যে বললেনঃ "তাই নিজে ইতিহাসনির্ভর উপন্যাস লিখতে গিয়ে চারশ বছর আগের মানুষ কীভাবে ভাবতে পারে তা কল্পনা করার চেষ্টা করেছি এবং ভাবনার সীমানা নির্ধারণ করেছি।" পড়তে গিয়ে সেটা ঠিক কিভাবে তিনি করেছেন বুঝতে পারি নাই। এই ব্যাপারটাকে পাঠক হিসাবে নিজের সীমাবদ্ধতা ধরে নিয়ে তিন আর চারের মাঝে দুলতে দুলতে চার তারা দিয়ে দিলাম।