কারা যেন ফেলে রেখে গেছে লোকটাকে ডাক্তার হিরাম ম্যাক্সওয়েলের দরজায়। ভীষণ মার খেয়েছে লোকটা। বুজে গেছে একটা চোখ, ভেঙে গেছে নাকটা, থেঁতলে গেছে ঠোঁট দুটো। শুধু হাতের ঝালই ঝাড়া হয়নি ওর উপর, চাবকানোও হয়েছে— ছিঁড়ে ফালা ফালা হয়ে গেছে শার্ট, কাঁধ আর বুকে অসংখ্য ক্ষত, চওড়া পিঠের প্রায় পুরোটা জুড়ে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। জ্ঞান ফিরে পেলে ভালো চোখে তাকিয়ে থাকে সে, মাঝেমধ্যে প্রচণ্ড আক্রোশ দেখা যায় সে-চোখে। ভয়াবহ প্রতিশোধস্পৃহা আছে ওর মনে, এবং তা বাস্তবায়নের আগে মরবে না সম্ভবত। তাই, ঘটনাক্রমে ওর শুশ্রূষার দায়িত্ব পাওয়া জরজিনা ল্যাকারিকে প্রথম সুযোগেই বলল সে, ‘একটা পিস্তল যোগাড় করে দিতে পারবে, প্লিয? বিশ্বাস করো, একটা পিস্তলের খুব দরকার আমার।’
সায়েম সোলায়মানের জন্ম ২৩ জুলাই, ১৯৭৯, ঢাকায়। পেশাজীবনে তিনি একজন ব্যাংকার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যায় অনার্স এবং মৎস্যবিজ্ঞানে মাস্টার্স করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিজিডিআইটি সমাপ্ত করেন। এরপর একটি আইএসপি-তে কিছুদিন কাজ করার পর যোগদেন ব্যাংকে। বই কেনা ও পড়ার নেশাই তাকে উদ্বুদ্ধ করেছে লেখালেখির সঙ্গে জড়িত হতে। ছোট থেকেই নিয়মিত লিখতেন স্কুলের দেয়ালপত্রিকায় আর বার্ষিকীতে। তেবে আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ১৯৯২ সালে, কিশোর পত্রিকায় অনুবাদ গল্পের মাধ্যমে। ২০০৪ থেকে রহস্য পত্রিকায় নিয়মিত হওয়ার পাশাপাশি হাত দেন বড় কাজে।
নভেম্বর ২০০৪-এ সেব প্রকাশনীতে প্রকাশিত হয় তার প্রথম ওয়েস্টার্ন বই ‘সংকট’। ওয়েস্টার্ন বই তার কাছ থেকে আরো ৫টি পেয়েছি আমরা। একটি গল্প-সংকলন সহ অনুবাদ ও কিশোর ক্লাসিকের বই পেয়েছি ২১ এর বেশি। যার মাঝে রয়েছে আগাথা ক্রিস্টি, এইচ. জি. ওয়েলস, এরিক মারিয়া রেমার্ক, জুল ভার্ন, রাফায়েল সাবাতিনি, হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড এর মতো বিক্ষাত লেখকদের বই।
কাউবয় টালি গিবসকে (ক্রিকেটার হার্শেল গিবস না) পিটিয়ে আধমরা করে, মাতাল ডাক্তার হিরাম ম্যাক্সওয়েলের দরজায় ফেলে গেছে কয়েকজন লোক, জানিয়ে গেছে একটু সুস্থ হলেই আবার পেটাতে আসবে। ঘটনাক্রমে গিবসকে সেবাশ্রুশুষা করে সুস্থ করে তুলল জর্জিনা নামক এক রুপবতী তরুনী, যে কি না আবার গিবসের শত্রু 'বিশালদেহী কিন্তু মাথামোটা' বিগ জেমসের ছোটবোন :3 । ওদিকে এক প্রভাবশালী সিনেটর, যার র্যাঞ্চে কাজ করতো গিবস, তাঁর মেয়েও আবার গিবসের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে! কাজেই শুরু হলো... ইয়ে...মানে... বুঝতেই পারছেন... ত্রিভুজ প্রেমকাহিনি! লেখক সায়েম সোলায়মান সবসময়ই কাহিনিতে মুক্ত হস্তে রোমান্স দিয়ে থাকেন :D , ব্যতিক্রম হয়নি এখানেও। মাঝে মধ্যে মনে হয়েছে, বইয়ের নাম কার্তুজের বদলে 'প্রেমের কার্তুজ' হলেও মন্দ হতো না :D ! যাহোক, মূল কাহিনি হল, কেউ একজন রেঞ্জ ওয়র বাঁধিয়ে ফায়দা নিতে চাচ্ছে, গোপনে দখল করতে চাচ্ছে বিশেষ একটা উপত্যাকা। এর ভেতর নাক গলিয়ে দেয় এক নির্ভিক সাংবাদিক, কাকতালীয়ভাবে জড়িয়ে পড়ে বেপরোয়া কিন্তু ন্যায়পরায়ন কাউবয় টালি গিবস। ফলে কপালে (আসলে পিঠে) জুটল বেধরক পিটুনি। কাজেই প্রতিশোধ এবং সমস্যা সমাধানের শপথ নেয় সে। আর পশ্চিমে সমস্যা সমাধানের হাতিয়ার একটাই, কার্তুজ! সব মিলিয়ে ভাল লেগেছে, তবে প্রায় পাঁচশো পৃষ্ঠার এরকম ঢাউশ সাইজের ওয়েস্টার্নের কাছে প্রত্যাশাটাও আরও বেশি ঢাউশ ছিল।
ভালই। কলেবরের হিসেবে কাহিনি বেশ কয়েকবার পড়তে গিয়েও পড়েনি। ফ্ল্যাশব্যাকগুলোই ছিল সব থেকে বড় ড্রব্যাক। জেনুইন রেটিং হবে ৩.৫ আউট অফ ৫। কিন্তু ভগ্নাংশ দেয়ার উপায় নেই যেহেতু ৪-ই সই! ৩ পাওয়ার মত বই না কিনা!
সায়েমদার ডেথ ট্রেইল পড়লাম। বই তো না, বলা ভাল একটা রাজভোগ গিললাম। কাহিনি বা লেখনির দিক দিয়ে অসাধারন একটা বই। ওয়েস্টার্নে অ্যাকশন-থ্রিল-প্রেম-কন্সপিরেসি এত বেশি প্রত্যাশিত যে এগুলো ছাড়া ভাল কোন বই কল্পনাই করা যায় না। ওয়েস্টার্নে প্রত্যাশাও এত বেশি থাকে যে, এই সব গুনে গুনান্বিত একটা বইকেও সেরা ওয়েস্টার্ন এর মর্যাদা দেওয়া সম্ভবপর হয়ে উঠে না। কারন ওয়েস্টার্নে এরকম সেরা বইয়ের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। তবে ডেথ ট্রেইল নিঃসন্দেহে সায়েমদার সেরা ওয়েস্টার্ন- এটা স্বিকার করতেই হবে। ষড়যন্ত্রের জাল হয়ত কাহিনির দিক দিয়ে (অর্থাৎ মুল বইটা) ডেথ ট্রেইল থেকে আকর্ষনীয়, তবে ভাষা/অ্যাডাপ্টেশনের দিক দিয়ে ডেথ ট্রেইলই সেরা। বরাবরের মত বলতে বাধ্য হয়েছি, এটা সায়েমদার সেরা কাজ।
অ্যাডাপ্টেশনে অনুবাদকের স্বার্থকতা তার ভাষায়। ভালো কাহিনির জন্য কৃতিত্বটা সবসময় মুল লেখকই পায়, আর অনুবাদকের প্রশংসা জোটে তার লিখনি তথা ভাষার জন্য। এদিক দিয়ে সায়েমদা সবচেয়ে ভালটাই করেছেন।
সায়েমদার ভাষার আকর্ষনটা সম্ভবত এই, তিনি কাট ছাট ভাষা ব্যাবহার করেন না (সেবার ট্রেডমার্ক যেটা), আবার শুশীল সাহিত্যের মত একঘেয়ে বর্ননাও দিয়ে যান না। খুব বেশী সাবলীল তার ভাষা। খুব বেশি আকর্ষনীয়। রয়ে সয়ে পড়তেও বেগ পেতে হয় না।
★স্পয়লার★
লিয়নভাইর মতে সায়েমদা বস অফ রোমান্স। আমারও তাই বিশ্বাস। প্রেম-আত্বত্যাগ-রসায়ন-অসহায় পরিনিতি এসব ব্যাপার তার হাতে ভাল উঠে আসে। শুধুমাত্র রোমান্সের দিক দিয়েই বইটা অস্থির পর্যায়ে পড়ে।
সায়েমদার লিখনি সম্পর্কে আগেই বলেছি। পাঠকের সুবিধার কথা চিন্তা করে তিনি কতটা কাট ছাট করেন সেটা অভিজ্ঞ পাঠকমাত্রই ডেথ ট্রেইল পড়ার সময় বুঝে নিতে পারবেন। একেবারে শুরুতেই।
বইটাতে রোমান্সের পাশাপাশি আছে থ্রিল, অ্যাকশন আর রহস্য। তবে নির্দিষ্ট একটা সময় পর রহস্যটা অনেকটাই খোলামেলা হয়ে পরবে, তবে তাতে আকর্ষন বিন্দুমাত্র কমবে না। বরং জেব আর অলিভিয়ার রসায়নই বাধ্য করবে আপনাকে সামনে এগিয়ে যেতে।
থ্রিল/অ্যাকশন পুরোটা সময়েই টানটান থাকবে। মারামারির একঘেয়ে বর্ননা খুব কমই আছে। যতটুকু আছে, তা মোটেও একঘেয়ে নয়। আর ইন্ডিয়ানদের সাথে ওদের যুদ্ধটা রিতিমত উপভোগ্য মনে হবে আপনার কাছে।
মাসুদ রানায় যেরকম একমাত্র খুত: সুন্দরী মেয়ে মাত্রই রানার চেহারা দেখে প্রেমে পরে যাবে, তেমনি ওয়েস্টার্নের সবচেয়ে বড় খুত: এর নায়কদের অস্ত্রের হাত সবসময়ই সেরা। কখনো কখনো অবিশ্বাস্য মনে হয়, সেকেন্ডের মধ্যেই ড্র করে ফেলে নায়ক! এ কি করে সম্ভব!
এদিক দিয়ে সায়েমদা নায়ককে অতিমানব হিসেবে উপস্থাপন না করে বরং অনেকটা সাধারনভাবেই তুলে ধরেছেন।
নায়ক জেব স্টুয়ার্ট; কোন গানম্যান নয়, তবে অস্ত্রে ইর্ষনীয় হাত। সেকেন্ডের ভগ্নাংশে বা বিদ্যুৎের মত আগুন ছলকায় না তার পিস্তল!
লেখকের আরেকটা স্বার্থকতা; চরিত্র সৃস্টায়নে। কার চরিত্র কিরকম, সেটা আগেভাগেই বলে মজা নস্ট করে দিতে চাই না আপনার। তবে এতটুকু নিশ্চিত থাকুন, এ বইয়ের চরিত্রগুলো মানুষ চিনতে সাহায্য করবে আপনাকে। অন্তত আমাকে চিনতে শিখিয়েছে।
★ব্যাককাভারে লেখা কাহিনিসংক্ষেপ★
"আড়াই লক্ষ ডলারের বুলিয়নের একটা চালান যাছছিল রেটন পাস থেকে স্যান মার্কোস সিটিতে। দৃস্টি আকর্ষিত হলো শকুনদের, অ্যাম্বুশ করল তারা। কপালগুণে বেঁচে গেল বুলিয়নবাহী ওয়্যাগনের মাস্টার জেব স্টুয়ার্ট। মারা পড়ল ওর তিন বন্ধু। শহরে ফিরে বুঝতে পারল, ফেঁসে গেছে সে- লুন্ঠিত চালান উদ্ধার করতে না পারলে জেল হয়ে যাবে। এদিকে ওর কম্পানির একাংশ কিনে নিয়েছে অলিভিয়া কারসন, যে মনে করে তার বাবার মৃত্যুর জন্য জেবই দায়ী। শরীরে বুলেটের ক্ষত, নতুন পার্টনারের মনে সন্দেহ। শকুনেরা ব্যাস্ত আরেকটা নীলনকশার বাস্তবায়নে। দুমাসের মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে কম্পানি দেউলিয়া। এ অবস্থায় ডেথ ট্রেইলে রওয়কনা হতে হল জেবকে, যে ট্রেইল দিতে পারে হারানো বুলিয়নগুলোর সন্ধান। কিন্তু ঘাতকরা আছে সঙ্গে, হামলা করতে পারে ইন্ডিয়ানরা। সুতরাং ডেথ ট্রেইলে কারো না কারও মৃত্যু সুনিশ্চিত।"
সায়েমদার থেকে ভাল কাহিনিসংক্ষেপ লেখার যোগ্যতা আমার নেই। তাই দাদার লেখা প্রিভিউটাই তুলে দিলাম।
কার্তুজ শেষ করলাম। প্রকৃতি পরিবেশের বিবরণ যথেষ্ট ভাল লেগেছে বইতে। আছে বেশ কিছু গ্রাফিক একশন। আছে ত্রিকোণ প্রেম। তবে রোমান্টিক ফ্ল্যাশব্যাক কিছুটা কম হলে আরও ভাল লাগত। গল্প এক চতুর্থাংশ কমে গেলে আরও টানটান হতে পারত কাহিনী। সর্বোপরি মোটামুটি লেগেছে বইটি। লেখকের ডেথ ট্রেইল বইটি অপেক্ষাকৃত বেশি ভাল লেগেছিল।