'ঝিলাম নদীর দেশ' লেখা হয়েছিল ১৯৮৭তে। বই হিসেবে প্রকাশ করেছিল 'সৃজন', ১৯৯০এ। এরপর সে মুদ্রিত হয়েছে একান্ন বার। সেই নাজনীনকে খুঁজতে আবার কাশ্মীর ভ্রমণ! আঠাশ বছর যথেষ্ট সময়। নদীর স্রোতকে বাঁধা গেলে দেখা যেত সে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে এসেছে অসংখ্য বার। যদিও কাশ্মীরের ভাগ্য বদলায়নি। বরং বেড়েছে বঞ্চনা। বেড়েছে আর্তনাদ ও ক্রন্দন। হয়ত এই-ই তার নিয়তি। নিজের শিকলে নিজেই বন্দী!
লেখক ও কবি বুলবুল সরওয়ার পেশাগত জীবনে একজন চিকিৎসক ও শিক্ষক। অসাধারণ কিছু ভ্রমণকাহিনী রচনার জন্য অধিক খ্যাত হলেও গল্প, কবিতা, উপন্যাসেও তাঁর অবাধ বিচরণ। এছাড়া অনুবাদ সাহিত্যে তাঁর শক্তিশালী অবদান রয়েছে।
ইদানিং ভ্রমন সাহিত্য ভালো লাগছে বলেই এই বইটা সংগ্রহ করেছিলাম। লেখকের দ্বিতীয় কাশ্মীর ভ্রমনের গল্প। বেশ কিছু জায়গায়ই বর্ননাভঙ্গি বিরক্তির উদ্রেগ করেছে। দুই তারা দিলেও লেখকের প্রথম ঝিলাম ভ্রমনের কাহিনীটা পড়ার আগ্রহটা বজায় রইলো।
এই বইটি লেখার আগে লেখক ১৯৮৭ সালে লেখেন "ঝিলাম নদীর দেশে", যা প্রকাশ পায় ১৯৯০। বইটিতে তিনি নাজনীন নামের একটি মেয়েকে নিয়ে কাশ্মীরে ঘোরার কাহিনী লেখেন, যার মূল চরিত্রে ছিলল নাজনীন। সেই বইয়ের ধারাবাহিকতায় লেখেন "ঝিলামে ছিলাম যখন"। সেই নাজনীনকে খুজতেই আবার কাশ্মীর ভ্রমন। নাজনীনের টানেই হয়তো পূর্নতা পেয়েছে "ঝিলামে যখন ছিলাম"।
আঠাস বছর যথেষ্ঠ সময়। নদীর স্রোতকে বাধা গেলে দেখা যেতো সে পৃথিবী প্রদক্ষিন করে এসেছে অসংখ্য বার। যদিও কাশ্মীরের ভাগ্য বদলায়নি। বরং বেড়েছে আর্তনাদ ও ক্রন্দন। হয়তো এই- ই তার নিয়তি। নিজের শিকলে নিজেই বন্দী।
পাকিস্তানের সমকালে জন্ম নেয়া সেই ইজরাইলের সাথে এই কাশ্মীরের কত মিল। যেখানে দুই পক্ষ, কিন্তু জাতি এক, দুই ধর্ম, কিন্তু বর্ণ এক।
আঠাস বছর আগে ফেলে যাওয়া নাজনীনের সাথে স্মৃতি জড়ানো বেশীরভাগ স্থানে গুলোই লেখকের মানসপটে উজ্বল হয়ে আছে , তাইতো তিনি আগের বার ভ্রমনের সাথে বারবারই মিলাতে চেষ্টা করেছেন এবারের অবস্থাকে। কিন্তু অনেক কিছুতে পরিবর্ত আসলেও কাশ্মীরের সৌন্দর্য্যে একটুও ভাটা পড়ে নি।সূর্যদয় থেকে সূর্য অস্ত পর্য়ন্ত কাশ্মীরের সৌন্দর্য্যে সবাই মুগ্ধ, তাই এ কে ভূস্বর্গ বলা হয়।
এটি মূলত একটি পারিবারিক ভ্রমন কাহিনী। ভ্রমন সাহিত্যে যাদের আগ্রহ প্রচুর তারা বইটা পড়ে নিঃসন্দেহে ঘুরে আসতে পারবেন কাশ্মীরের মনেমুগ্ধকর সব জায়গায়, খেতে পারবেন মজার সব খাবার আর চিনতে পারবেন বিচিত্র কাশ্মীরি শীতের পোশাক।।
বেশ হতাশই হলাম বইটা পড়তে গিয়ে। ‘ঝিলাম নদীর দেশ' যে অসাধারণ একটা স্বাদ দিয়েছিল তার তুলনায় এটা রীতিমতো পানসে। সেই কাশ্মীর, ডাল লেক, শালিমার বাগ, হযরতবাল, পেহেলগাম মব থাকলেও ছিল না সেই অসাধারণ বর্ণনাভঙ্গি, ছিল না সেই মায়াবিনী নাজনীন। যদিও লেখক ভূমিকাতে ২৮ বছর পর সেই নাজনীনকেই খুঁজতে যাওযার কথা বলেছেন কিন্তু বইয়ে তেমন কোনো বর্ণনা ছিল না। ছিল না তাবাস্সুম, নয়ীমরা তাইতো ইতিহাসকে সেভাবে জানা যায় নি যদিও ছিল লেখকের স্ত্রী, পুত্র, কন্যাসহ বিশাল এক বহর। বলা হতে পারে যে, বইটিকে পৃথক একটা বই হিসেবে পড়লেই তো হয় কিন্তু যেখানে আপনার হাতে একই লেখকেরই একই স্থান ভ্রমণের আরেকটা বই থাকে এবং পরের বইয়ে বারবার সেই বইয়ের কথা উঠে আসে তখন তা আর সম্ভব হয় না। তাইতো বইটা সামগ্রিকভাবেই হয়ে পড়েছে সীমাবদ্ধ ; আগেরটা যদি ( সন্দেহ থাকার কথা না তাও যদি বললাম) মাস্টারপিস হয় এই বই তাহলে নিতান্তই গড়পড়তা একটা বই।
তবুও বইটা পড়ে আপনি মুগ্ধ হবেন। আগের বইয়ের মতো এই বইয়ে অতটা ইতিহাস, কাব্য না থাকলেও এখানে আছে পারিবারিক একটা আবহ। স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, শ্যালক, শ্যালিকা, শাশুড়িদের মজার সংলাপ আর অভিজ্ঞতা। আটাশ বছর তো আসলেই দীর্ঘ একটা সময় তাই এই দীর্ঘ সময়ে লেখকের চিন্তার, মননের যে রূপান্তর তাও স্পষ্ট হয় বইটাতে। আগের সব দেখে লেখক মুগ্ধ হন না, তারুণ্যের সেই চোখ যে লেখকের আর নেই। তবু স্মৃতি বারবারই লেখককে তাড়া করেছে, তাইতো পারিবারিক আবহে থেকেও লেখক হাতড়ে বেড়িয়েছেন নাজনীনদের, তাবাস্সুমদের, নয়ীমদের। আগে যেখানে গাইডদের সাথে গল্পে গল্পে বইটা বর্ণনা করেছিলেন এখানে সেই বর্ণনাটা করতে হয়েছে স্বজনদের প্রশ্নোত্তরে কেননা ‘ঝিলম' যে সবার পড়া তাইতো কখনো ছেলে, কখনো মেয়ে কখনো বা স্ত্রীর কাছে জবাবদিহিতা করতে হয়েছে তারুণ্যের প্রেমিকা নাজনীন সম্পর্কে! তাইতো মাঝে মাঝে প্রশ্নগুলো শুনে আমিই লজ্জাবোধ করেছি সেখানে লেখকের স্ত্রী-সন্তানদের কাছে দেওয়া লজ্জামিশ্রিত উত্তরগুলো মজারই ছিল!
বইটাতে কাশ্মীরের ইতিহাসের বর্ণনায় লেখকের কাশ্মীরের স্বাধীনতার সমর্থনের প্রতি ও মুঘলদের প্রতি যে টান তা স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে যেমন কাশ্মীরীদের অবস্থা দেখে লেখক আকূল হয়েছেন অন্যদিকে তেমনি কাশ্মীরের সৌন্দর্যে বারংবার হয়েছেন মুগ্ধ। কিন্তু ভূ-স্বর্গের প্রতি মুগ্ধতা তো শেষ হওয়ার নয় তাইতো ফেরার সময়ও লেখকের কন্ঠে ধ্বণিত হয়েছে আবার সেখানে ফেরার আকুতি তবে এর পাশাপাশি তাঁর কন্ঠে ধ্বণিত হয়েছে কাশ্মীরীদের স্বাধীনতার প্রতি পূর্ণাঙ্গ সমর্থন কেননা লেখক যে পরেরবার যেতে চান স্বাধীন কাশ্মীরে। পড়তে পারেস বইটা, কাশ্মীরকে ভিন্ন এক চোখে দেখতে!