বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে কলিকাতার এক ব্রাহ্মণ কন্যা মানদা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করেন ও সেই গ্লানিময় জীবনের আদ্যোপান্ত নিয়েই এ বই।
যারা এ বইকে ''রসময় গুপ্ত" জাতীয় কিছু ঠাহর করে পড়বার ধান্ধা করছেন। আগেই বলে দেই, তাদের যথেষ্ট নিরাশ হতে হবে।
বিশ শতকের প্রথমার্ধের পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতিতে নারীদের অবস্থা বিশেষত হিন্দু নারীকুলের জীবনযাপন নিয়ে একটি ধারণা দিয়েছেন মানদা ব্যানার্জী।
১৯০০ সালে কলিকাতার এক ধনী উকিলের ঘরে জন্মান মানদা। বাড়ির পরিবেশ তখনকার দিনের উঠতি মধ্যবিত্তের মতোই।বাঁধা-নিষেধ খুব একটা নেই। ধর্মচর্চা যেমন আছে থিয়েটারও বাদ নেই। একাধিক মাস্টার আছে বাড়িতে। কাজের লোকের অভাব নেই, খানাপিনাও হরদম চলছে - মানদা ব্যানার্জীর বাড়ির এই চিত্র তৎকালীন মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্ত পরিবারগুলো কেমন ছিল তার একটা সরলরৈখিক ধারণা দেয়।
দশ বছর বয়সে লেখকের মা মারা যান। উকিলবাবু পিতা প্রায় কন্যারই সমবয়সী পত্নী গ্রহণ করে ঘরকে আলোকিত করেন। এদিকে নিজের মেয়ের দিকে মনোযোগ পিতার নেই। কন্যা মানদা দেবীও এই অবহেলায় নিজেকে সরিয়ে নিতে থাকেন পিতার কাছ থেকে, নতুন মায়ের কাছ থেকে।
মানদা দেবীকে পড়াতে আসলেন নতুন মাস্টার মুকুল দা। সেই মুকুল দা কিশোরী মানদাকে রবীন্দ্রনাথ, শরৎ, বঙ্কিমের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, কাব্যচর্চা আর থিয়েটার নিয়ে মেতে থাকতো মানু। নিজেও পত্রিকা পড়তেন, খবর রাখতেন রাজনীতির হালচালের। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে তারও আঁচ পাই এই লেখায়।
হঠাৎ কিশোরী মানুদের বাড়িতে এলেন তার আত্মীয় রমেশ (ছদ্মনাম)। রমেশ আবার মানুর শিক্ষক মুকুলদার বন্ধুও বটে। নিজের দ্বিগুণ বয়সের রমেশের সাথে একটি সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠতে থাকে কিশোরী মানুর। এদিকে মানুর বাবা রমেশের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। চাকরি পেয়ে গ্রামে বিয়েও করে রমেশ।মানু জানে সবই। তবুও মন মানে না। সবে বয়স চৌদ্দ পেরিয়েছে। স্কুলে পরীক্ষা দেবার নাম করে বাড়ি ছাড়ে মানু। উদ্দেশ্য প্রাণেশ্বর রমেশের সাথে জীবনসমুদ্র পাড়ি দেওয়া।
তারা নানা জায়গায় পালিয়ে বেড়াতে থাকে। সময় মন্দ কাটেনি। কিন্তু পালিয়ে আর কদ্দিন? মানু গর্ভবতী। অফিস থেকে চুরি করে তিন হাজার টাকা নিয়ে এসেছিল রমেশ। মানু তা জানতে পারে। মদ্যপ, চরিত্রহীন আর ধুরন্ধর রমেশের অত্যাচার বাড়তে থাকে। একসময় গর্ভবতী মানুকে অসুস্থ অবস্থায় ফেলে পালিয়ে যায় রমেশ। এবার কী হবে?
অসুস্থ মানু আশ্রয় নেয় কাশীতে এক সাধুর আশ্রমে। সেখানেই তার মৃত সন্তান জন্মায়। মানু চায় বাড়ি ফিরতে, সব ভুলে নতুন করে শুরু করতে। পিতা ফিরিয়ে নেবে না অসতী মেয়েকে। সাধু জানান তিনিও দীক্ষা দিতে গররাজি মানুকে। তবে তিনি কলিকাতার এক নারী আশ্রয় কেন্দ্রে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। এই নারী আশ্রয় কেন্দ্রের কর্তারাই আবার মানুকে ব্যবহার করতে থাকে সুযোগ-সুবিধা দেয়ার নাম করে। সেখান থেকে পালিয়ে আরও দু'চারজন মেয়েসহ যান ব্রাহ্ম হতে। তারাও এই 'পতিত' দের নিতে নারাজ। এবার একেবারে সরাসরি পতিতাবৃত্তি নেয় মানু।
বারবার এই গ্লানিকর জীবনের জন্য আফসোস করেছেন লেখক মানু। বলেছেন সেই সময়কার সমাজের কতো উঁচু শ্রেণির লোক তাদের সান্নিধ্য পেতে আসত। অথচ বাইরে ঘুরে বেড়াত 'ভদ্দরলোক' বলে, কেউ কেউ তো নিজেকে চিরকুমার দাবি করতো!
আবার, অনেকে যখন তাঁদের ঘৃণার চোখে দেখত, তখন চিত্তরঞ্জন দাশ এই পতিতাদের দেশের কাজে এগিয়ে আসতে বলে । তাঁরাও দেশবন্ধুর ডাকে সাড়া দেন। কিন্তু এখানেও তাঁদের ফাঁদে পড়ে কতো সমাজব্রতীর সর্বনাশ হয়েছে তার লেখাজোখা নেই - এ নিয়ে অনুতাপ প্রকাশ করেছেন লেখক। কত রাজাগজা পায়ের কাছে পড়ে থাকতো তাও বিস্ময়কর বটে!
কেন মানুরা এই পথে নামে?
মানদা দেবীর মতে, তিনি নাটক-নভেল না পড়লে, থিয়েটার না জানলে রমেশদার ফাঁদে পড়তেন না। অবাধে নারীদের চলাফেরার সুযোগ না দিলে আর অল্পবয়সে বিয়ে হলে আর মানুদের জন্ম হবে না বলেই মনে করেন মানদা দেবী।
অথচ এটি কতো ভ্রান্তধারণা তা আমরা এই বইতেই পাব। নিজেও অনেক পতিতার কথা বলেছেন যাঁরা ওপরের শর্তগুলো পূরণ করেও এই পথে এসেছেন।তাঁদের কথা তিনি এড়িয়ে গিয়েছেন।
হ্যাঁ, নিজে অনুতাপের অনলে জ্বলেছেন, পুড়েছেন। আর শেষটায় এই পেশা ছেড়েছেন। যে রমেশ তাকে এ পথে নামতে বাধ্য করেছিল সেও কিন্তু নিজের সাফাই গেয়ে " রমেশদার আত্মকথা" লিখেছে বেশ সগৌরবে।