আমি মশিউল আলমের লেখার ভক্ত। তার লেখা প্রথম নজরে পড়ে কোন এক ঈদ সংখ্যায়। এতদিনে লেখাটার নাম ভুলে গেছি। সরদার ফজলুল করিমকে নিয়ে লিখেছিলেন, এটা মনে আছে। ভাল লেগেছিল লেখাটা।
পরে আবারো কোন এক ঈদ সংখ্যায় আরেকটা লেখা চোখে পড়ে। এবারও নাম মনে নাই। কোন এক কবিকে নিয়ে লেখা। এটাও ভালো লেগে যায়। প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যাতেই হয়তোবা পড়ে থাকবো "জুবোভস্কি বুলভার" নামে মশিউল আলমের আরেকটা ছোট্ট উপন্যাস (নভেলা?)। স্মৃতিচারণের আদলে লেখা বইটা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন নিয়ে লেখকের ব্যক্তিগত হাহাকারের ফসল বলে মনে হয়েছিল। মনে রাখা ভালো, লেখক ক'বছর রাশিয়ায় ছিলেন। তার এম.এ ডিগ্রি ওখানেই সম্পন্ন করা।
পরে কোন এক বইমেলা থেকে সংগ্রহ করি আমার মতে মশিউল আলমের সবচেয়ে সেরা কাজ, তার ম্যাগনাম ওপাস, "ঘোড়ামাসুদ"। ঘোড়ামাসুদ নামের এক শীর্ষ সন্ত্রাসী ক্রসফায়ারে পড়ে মরে গেছে না বেঁচে আছে, এ নিয়ে এক অসাধারণ আখ্যান ঘোড়ামাসুদ।
লম্বা গৌড়চন্দ্রিকা দেখে এতক্ষণে বুঝে যাওয়ার কথা মশিউল আলমেরই কোন একটা বই নিয়ে প্যাঁচাল পাড়তে বসেছি। বইয়ের নাম- তনুশ্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় রাত।
জুবোভস্কি বুলভারের মত এটাতেও সোভিয়েত ইউনিয়ন আছে। ইন ফ্যাক্ট কাহিনীর সেটিংই রাশিয়াতে। নায়ক হাবিবুর রহমান। পেশায় ছাত্র, পড়ে রাশিয়ার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে। যেখানে তৃতীয় বিশ্বের আরো অনেক গরীব-গুর্বা ছাত্র-ছাত্রী স্ব স্ব দেশের কমিউনিস্ট পার্টির পৃষ্ঠপোষকতায় স্টাইপেন্ড/বৃত্তি পেয়ে পড়তে এসেছে। রাশিয়ায় তখন কমিউনিজমের পতন অত্যাসন্ন। ক্ষমতার তখতে মিখাইল গর্বাচেভ। লৌহযবনিকার অবসান ঘটতে চলেছে। এখন সময় গ্লাসনস্ত, পেরেস্ত্রোইকা'র। অবাধে বিদেশী পণ্য ঢুকছে, ডলারের বিপরীতে রুবলের দাম কমছে হুড়মুড়িয়ে। সকালে যেটার দাম ছিল পাঁচ রুবল, বিকালেই ওটার দাম দশ। লাইনে দাঁড়িয়ে রুটি, দুধ সংগ্রহ করা লাগছে। অনেকে এভাবে কম দামে রুটি, দুধ কিনে চড়া দামে বাইরে বিক্রি করে দিচ্ছে।
গল্পের নায়ক হাবিবুর রহমান বেশ অলস প্রকৃতির। শুয়ে, বসে, ভদকা গিলে সময় কাটে তার। অন্য ছাত্ররা যে রকম হালকা ব্যবসাপাতি করে টু পাইস কামিয়ে নিচ্ছে, তেমনটা করে না ও। নীতিবান মানুষ বলা যায় তাকে। স্টাইপেন্ড পেয়ে রাশিয়ায় এসেছে। তার সহপাঠী তনুশ্রী। কলকাতার মেয়ে, আদি নিবাস বাংলাদেশ। ৪৭ সালে দেশভাগের সময় তার পরিবার ভারতে পাড়ি জমায়।
ভয়ানক মেধাবী এক ছাত্রী তনুশ্রী। হাবিবের সাথে ভালো একটা সম্পর্ক আছে তার। ঠিক প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ক না, আবার "জাস্ট ফ্রেন্ডও" না! আর তনুশ্রীর সাথে হাবিবের অদ্ভুত সম্পর্কই এই কাহিনীর উপজীব্য। এক রাতের উদ্দামতায় শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে দু'জন। কনসিভ করে বসে তনুশ্রী। ঘটনার ঘনঘটায় তনুশ্রীর প্রতি আচমকা প্রেমের উদয় হয় হাবিবের, ভবিষ্যত সন্তান নিয়ে নানান ফ্যান্টাসিতে ভোগে ও। তনুশ্রী আবার সে রাতের ঘটনায় গভীর মনস্তাপে ভুগছে। তার মনে আবার কোন ধরণের প্রেমের উদয় ঘটে নাই। একেবারেই উদাসীন ও, নির্বিকার। তনুশ্রীর এই শীতল আচরণ ঠিক মেনে নিতে পারে না হাবিব। তার ভেতর খানিকটা সমস্যা দেখা দেয়, বাস্তবতা ও কল্পনার ফারাক ভুলে যায় ও। বাস্তবতা মিশে যায় কল্পনার সাগরে...
এভাবেই কাহিনী এগিয়েছে। প্লট আহামরি কিছু না। হাবিবের ওপর একসময় মেজাজ খিঁচড়ে যেতে পারে ভ্যাবদা মার্কা প্রেমিক হয়ে গেছে বলে। মেজাজ খিঁচড়ে যেতে পারে তনুশ্রীর ওপরও। কেন সে এরকম ভাবলেশহীন?
মৃতপ্রায় সমাজতন্ত্রের প্রতি সমবেদনায় গাঢ় বইটি। 'সোভিয়েত ইউনিয়ন একসময় কী ছিল আর কী হয়ে গেল'- এ ধরণের হাহাকার প্রায়ই উঁকি মারে। তবে তৎকালীন সোভিয়েত সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য বইটা বেশ দরকারি। আর উপরি হিসেবে মশিউল আলমের ঝরঝরে গদ্য তো আছেই। তাই সময়টা ভালোই কাটার কথা।
তবে আমি মনে করেছিলাম ঘোড়ামাসুদের চেয়ে ভালো কিছু পাবো। কিন্ত না। এখনো আমার ধারণা, ঘোড়ামাসুদ-ই মশিউল আলমের সেরা কাজ।