Mashiul Alam was born in northern Bangladesh in 1966. He graduated in journalism from the Peoples’ Friendship University of Russia in Moscow in 1993. He works at Prothom Alo, the leading Bengali daily in Bangladesh. He is the author of a dozen books including Second Night with Tanushree (a novel), Ghora Masud (a novella), Mangsher Karbar (The Meat Market, short stories), and Pakistan (short stories).
মশিউল আলমের ম্যাগনাম ওপাস 'ঘোড়া মাসুদ' নয়। এই মেধাবী লেখকের সেরা কাজ 'তনুশ্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় রাত '। রাজনীতি, সামাজিক জীবন, সোভিয়েটের পতনপূর্ব অবস্থা এবং প্রেমের আখ্যান নিয়ে ভাষাগত দক্ষতার অপূর্ব সমন্বয় 'তনুশ্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় রাত '।
মিখাইল গর্বাচেভ সোভিয়েটের রাষ্ট্রপতি। তিনি অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি গ্লাসনস্ত, পেরেইস্ত্রিইকা ঘোষণা করেছেন। সোভিয়েট ইউনিয়ন যে সাম্যের পতাকাবহন করছিল তা দিনকেদিন হয়ে পড়ছে কালিমালিপ্ত। ধীরে ধীরে ভাঙার দিন ঘনিয়ে আসছে সোভিয়েট ইউনিয়নের।
সাবেক সোভিয়েটের এই সংকটকালীন সময়ে রাশিয়ার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে বাংলাদেশর ছেলে হাবিব। তারই সহপাঠী কলকাতার মেয়ে তনুশ্রী রায়চৌধুরী। অনেক দেশের ছেলে-মেয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছিল সোভিয়েট রাশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো থেকে আগত শিক্ষার্থীই বেশি। মূলত, মশিউল আলম দাবি করেছেন বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সুপারিশেই সুযোগ পাওয়া যেত, রাশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে।
তনুশ্রী এবং হাবিব ভালো বন্ধু। হঠাৎই এক রাতে দু'জন ভুল করে বসে। মদ খেয়ে মাতাল হয়ে বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তৈরি হয় শারীরিক সম্পর্ক। পরেরদিন এই অযাচিত 'ভুলের' জন্য দুইজনই অনুতপ্ত হতে থাকে। তনুশ্রী অনেকবেশি দূরে চলে যায় হাবিবের থেকে। হাবিবও পারছিল না নিজেকে ক্ষমা করতে।
সোভিয়েট রাশিয়ার সংস্কৃতি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চিত্র এবং রুশ সরকারের বৃত্তিতে পড়তে আসা ভিনদেশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন, হলজীবনের বিচিত্রসব ঘটনা এই উপন্যাসের সিংহভাগ জুড়ে আছে।
বাঙালি শিক্ষার্থীরা ডলারের ব্যবসা করছে। দেদারসে টাকা কামাচ্ছে। রুশিদের মনে সোভিয়েট নিয়ে হতাশা এবং পশ্চিমা সমাজের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণের কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়েই এসেছে। ওদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো এদেশের মতো নয়। ছেলে-মেয়ে সবাই সবার রুমে যেতে পারে। মদ্যপানকে ঘৃণার চোখে দেখা হয় না। প্রেম,কাম সবকিছুকেই অনেকটাই স্বাভাবিক সেই সমাজের প্রক্ষাপটে।
হাবিব চাচ্ছে তনুশ্রীর কাছে যেতে। এদিকে তনুশ্রী মা হতে চলেছে - এটা জানার পর কাহিনির মোড় বদলে গেল। তৃতীয় পুরুষের জবানিতে পুরো উপন্যাস। একদিকে যেমন হাবিবের অস্থিরতা, তনুশ্রীর নিস্পৃহতা। অন্যদিকে, ধসে পড়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সোভিয়েট ইউনিয়ন। ফাঁকে -ফাঁকে কমিউনিজম নিয়ে আত্মসমালোচনা। বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতির পুরোধা মণি সিংহ, ফরহাদ হোসেন এবং সিপিবি নিয়ে বিভিন্ন পর্যালোচনা।
প্রথম রাতে তনুশ্রীর সাথে নিজের অজান্তেই মিশে গিয়েছিল হাবিব। আজ দ্বিতীয় রাত। তনু নিজেই এসেছে হাবিবের কাছে। সত্যিই কি সবকিছু মেনে নিয়ে হাবিবকেই গ্রহণ করবে তনুশ্রী? নাকী প্রথম রাতের 'ভুল' সংশোধন করতে চায় তনুশ্রী?
মশিউল আলম নিজে সোভিয়েট ইউনিয়নের মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তাই তৎকালীন রাশিয়া এবং কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ে ঔপন্যাসিক মশিউল আমলের মূল্যায়ন ফেলনা নয়। বরং যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলা সাহিত্যে অনেকটা চাপা পড়ে যাওয়া লেখক মশিউল আলম। আলোচনা নেই তেমন। তবুও নিভু নিভু প্রদীপের মতো মানুষের মুখে ফেরে তাঁর লেখা। প্রিসিলা'র মাধ্যমে লেখকের সাথে পরিচয়। এবার পড়লাম 'তনুশ্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় রাত'। সমাজতন্ত্রের পতনের পূর্ব সময়, প্রেম, সোভিয়েত রাশিয়ায় শিক্ষার্থীদের গমন, শিক্ষার্থীদের তৎকালীন মনোভাব সবই পাওয়া যায় নাতিদীর্ঘ উপন্যাসটিতে।
সময়টা ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বর মাস। সোভিয়েত ইউনিয়নে চলছে গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রোইকা কর্মসূচি। অনেকের মতে গর্বাচেভ সোভিয়েত ইউনিয়নের কফিনে পেরেক ঠুকে দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, সমাজতন্ত্র আরো শক্তিশালী হবে। মস্কোর প্যাট্রিস লুমুম্বা মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে সিপিবির বৃত্তি নিয়ে পড়তে গিয়েছে বাংলাদেশের ছাত্র হাবিবুর রহমান। বিশ্ববিদ্যালয় লাগোয়া হোস্টেলেই তার বসবাস। অন্যদিকে কলকাতার মেয়ে তনুশ্রী চক্রবর্তীও একই ক্লাসের ছাত্রী। তনুশ্রীর পূর্বপুরুষ বাংলাদেশের সামন্ত জমিদার ছিলেন কিন্তু সাতচল্লিশে ভারতে চলে যায়। অন্যদিকে হাবিবের পূর্বপুরুষ ছিলেন সাধারণ কৃষক। হাবিবের পূর্বপুরুষ তনুশ্রীর পূর্বপুরুষের প্রজা হওয়ার সম্ভাবনা অস্বাভাবিক কিছু না। হাবিব ও তনুশ্রীর মধ্যকার সম্পর্ক নয় প্রেমের, ছিল না কোনো আকাঙ্খার; শুধুই বন্ধুত্বের। কিন্তু একদিন এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা তাদের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করে দেয়। হাবিবকে তনুশ্রী এড়িয়ে চলে সেই ঘটনার পর। কোনোভাবেই নাগাল পাওয়া যায়না। একসময় তনুশ্রীর প্রতি বিতৃষ্ণা ভাবও চলে আসে। কিন্তু চাইলেও তাকে জীবন থেকে বাদ দিতে পারেনা হাবিব। নিজের ভুল অন্বেষণ করতে থাকে সে।
সমাজতন্ত্র যখন ভেঙে পড়া শুরু করলো তখন অনেকেই নিজেদের আসল চেহারাকে উন্মোচিত করলেন। নিজ নিজ অবস্থান থেকে পূর্ববর্তী শাসনকালকে গালমন্দ শুরু করলেন। দেশের মাঝে দুর্নীতি বেড়ে গেল। রেশনের দোকানে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়েও খাদ্যসামগ্রী পাওয়া যাচ্ছিল না। আবার যারা আসলেই রাষ্ট্রের স্বরূপ দেখেছে তারা এই অবস্থাকে স্বাগত জানালো। সমাজতন্ত্র শাসনব্যবস্থায় তারা দেখেছে নির্দিষ্ট একটি শ্রেণির সম্পত্তি বৃদ্ধি পেয়েছে অথচ শ্রমিকদের মাঝে বৈষম্য কমানোর নামে প্রহসন করা হয়েছে। শহরের মাঝে যে সকল বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার কোনো উত্তরাধিকার নেই, তাদেরকে সেবা করতে একদল স্বেচ্ছাসেবী কাজ করতো। কিন্তু বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার মৃত্যুর পর সম্পত্তি নিয়ে যেত তারা। এমনটা সোভিয়েত সময়কালে ছিল না। এছাড়া এই সময়টাতে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। হোস্টেলগুলোতে ঢুকে প্রকাশ্যে ডাকাতির শিকারও হয় অনেকে। ক্লাসে পড়ানোর সময় যখন সমাজতন্ত্রের নিন্দা করা হয় তখন তৃতীয় বিশ্বের ছাত্রগুলো জানান দেয় এসব ত তাদের দেশেই রয়েছে, তাহলে এখানে কেন পড়তে এসেছে তারা? রাজনৈতিক সুবিধার জন্য অনেকেই পড়তে এসেছিল কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। সেই উদ্দেশ্য পূরণে সদা সচেষ্ট তারা।
সোভিয়েত আমলে বিভিন্ন দেশ হতে কমিউনিস্ট কিংবা কমিউনিস্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সন্তানরা বৃত্তি নিয়ে পড়ালেখা করতে যেত। আবার অনেকে টাকা দিয়ে সোভিয়েতে ঢুকতো এবং পরবর্তী সময়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশে চলে যেত উন্নত জীবনযাপনের আশায়। এই সময়টাতে বাঙালি ছাত্ররা অনেকেই ডলারের ব্যবসা শুরু করে। হাবিবের বন্ধু অনিমেষ ইংল্যান্ড গিয়ে কয়েক মাসে অনেক টাকা নিয়ে আসে এবং সেই ডলার দিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে জিনিসপত্র এনে বেশি দামে বিক্রি করে। কারণ সরকারিভাবে জিনিসপত্র পাওয়া যেত না এবং বাইরে থেকে কিনলে বেশি দামেই কিনতে হতো। সিঙ্গাপুর গিয়ে যারা জিনিসপত্র কিনে মস্কোতে বিক্রি করতো তাদের 'হজে যাওয়া' বোঝানো হতো। আবার কারো বাসায় দাওয়াত খাওয়াকে 'আজান মারা' বলা হতো। কমিউনিস্টরা সম্ভবত ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ থেকেই এমন শব্দ ব্যবহার করতেন। বাঙালিরা ডলার ব্যবসার পাশাপাশি আরেকটি ব্যবসা করতেন; ইউরোপের অন্যান্য দেশে মানুষ পাঠানো।
সোভিয়েতে যাবেন আর ভদকা চেখে দেখবেন না তা কি হয়! উপন্যাসজুড়ে ভদকা, হুইস্কিসহ ��িভিন্ন মদপানের অনেক ফিরিস্তি রয়েছে। কো-এডুকেশন হওয়ায় সহজেই ছেলে মেয়ের মাঝে সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। দুই বছরের মাঝে কেউ যদি একা থাকে তাহলে ধরে নেওয়া হয় সে আকর্ষণীয় নয় বলেই এমন অবস্থা। সোভিয়েত আমলে লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার নেওয়ার সংস্কৃতিও ভেঙে পড়তে থাকে। দোকানে খাবার পাওয়া যাচ্ছেনা বলে জানানো হলেও অনেকে ঘুষ দিয়ে সকলের সামনে দিয়ে যখন খাবার কিনে নিয়ে যায় তখন বৃদ্ধরা আফসোস করেন; সমাজতন্ত্রই ভালো ছিল। ঘটি ও বাঙালদের মাঝে যেমন বিরোধ ছিল তেমনি বাঙালিদের সাথে পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের বিরোধও দৃশ্যমান ছিল।
উপন্যাসটি আয়তনে ছোট হলেও সমাজতন্ত্রের পতনের প্রাক্কালে যে চিত্রটি পাই তা ভাবনার যোগান দেয়। গর্ভাচেভের সামাজিক গণতন্ত্র সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিয়েছিল। যে সকল ছাত্ররা বিভিন্ন দেশ হতে বৃত্তি নিয়ে পড়তে গিয়েছিল তারা বুঝে গিয়েছিল আসলে কী হতে যাচ্ছে! সকল বিভাগেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছিল। এই সুযোগে দুই পয়সা কামিয়েও নিচ্ছিল কেউ কেউ। রুশ নারীদের প্রতি সকলেরই আলাদা সমীহ ছিল। এক বাঙালি ছাত্রের সন্তান জন্ম দিয়ে বিপদে পড়ে এক রুশ নারীর হাহাকারও দেখতে পাই আমরা। কেজিবির প্রাক্তন গোয়েন্দা যখন বঙ্গবন্ধুকে বুর্জোয়া আখ্যা দেয় তখন হাবিব ও তনুশ্রীরা নিশ্চুপ থাকে। ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে কিন্তু যখন একজন ভারতীয় ছাত্র দাবি করে বসে ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীনতা দান করেছে, তখন তার মুখে ঘুষি বসিয়ে দিতে দ্বিধা বোধ করেনা বাংলাদেশি ছাত্রটি।
আমার মতে মশিউল আলমের সেরা একটি কাজ 'তনুশ্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় রাত'। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সেখানে পড়তে যাওয়া বাঙালি ছাত্রসমাজের জীবনযাপন দেখতে পাই আমার। দুই দেশের দুই ধর্মের দুই শ্রেনির নর-নারীর জটিল সম্পর্কের রসায়ন পাঠককে আন্দোলিত করবে। লেখক যেহেতু সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়ালেখা করেছেন তাই তাঁর ব্যক্তিজীবনের ছাপ রয়েছে উপন্যাসটিতে। সুন্দর ভিন্নধর্মী একটি উপন্যাসের স্বাদ নিতে চাইলে অবশ্যপাঠ্য। হ্যাপি রিডিং।
আগাগোড়া আক্ষেপে মোড়ানো একটি উপন্যাস। সম্ভাব্য পতনের মুখোমুখি গর্বাচভের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত ইউনিয়িনের শেষ দিনগুলো নিয়ে লেখকের আক্ষেপ, তনুশ্রীর নিস্পৃহতা নিয়ে হাবিবের আক্ষেপ এবং হাবিবের সাথে কাটানো প্রথম রাত নিয়ে তনুশ্রীর আক্ষেপ।
আমি মশিউল আলমের লেখার ভক্ত। তার লেখা প্রথম নজরে পড়ে কোন এক ঈদ সংখ্যায়। এতদিনে লেখাটার নাম ভুলে গেছি। সরদার ফজলুল করিমকে নিয়ে লিখেছিলেন, এটা মনে আছে। ভাল লেগেছিল লেখাটা।
পরে আবারো কোন এক ঈদ সংখ্যায় আরেকটা লেখা চোখে পড়ে। এবারও নাম মনে নাই। কোন এক কবিকে নিয়ে লেখা। এটাও ভালো লেগে যায়। প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যাতেই হয়তোবা পড়ে থাকবো "জুবোভস্কি বুলভার" নামে মশিউল আলমের আরেকটা ছোট্ট উপন্যাস (নভেলা?)। স্মৃতিচারণের আদলে লেখা বইটা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন নিয়ে লেখকের ব্যক্তিগত হাহাকারের ফসল বলে মনে হয়েছিল। মনে রাখা ভালো, লেখক ক'বছর রাশিয়ায় ছিলেন। তার এম.এ ডিগ্রি ওখানেই সম্পন্ন করা।
পরে কোন এক বইমেলা থেকে সংগ্রহ করি আমার মতে মশিউল আলমের সবচেয়ে সেরা কাজ, তার ম্যাগনাম ওপাস, "ঘোড়ামাসুদ"। ঘোড়ামাসুদ নামের এক শীর্ষ সন্ত্রাসী ক্রসফায়ারে পড়ে মরে গেছে না বেঁচে আছে, এ নিয়ে এক অসাধারণ আখ্যান ঘোড়ামাসুদ।
লম্বা গৌড়চন্দ্রিকা দেখে এতক্ষণে বুঝে যাওয়ার কথা মশিউল আলমেরই কোন একটা বই নিয়ে প্যাঁচাল পাড়তে বসেছি। বইয়ের নাম- তনুশ্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় রাত।
জুবোভস্কি বুলভারের মত এটাতেও সোভিয়েত ইউনিয়ন আছে। ইন ফ্যাক্ট কাহিনীর সেটিংই রাশিয়াতে। নায়ক হাবিবুর রহমান। পেশায় ছাত্র, পড়ে রাশিয়ার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে। যেখানে তৃতীয় বিশ্বের আরো অনেক গরীব-গুর্বা ছাত্র-ছাত্রী স্ব স্ব দেশের কমিউনিস্ট পার্টির পৃষ্ঠপোষকতায় স্টাইপেন্ড/বৃত্তি পেয়ে পড়তে এসেছে। রাশিয়ায় তখন কমিউনিজমের পতন অত্যাসন্ন। ক্ষমতার তখতে মিখাইল গর্বাচেভ। লৌহযবনিকার অবসান ঘটতে চলেছে। এখন সময় গ্লাসনস্ত, পেরেস্ত্রোইকা'র। অবাধে বিদেশী পণ্য ঢুকছে, ডলারের বিপরীতে রুবলের দাম কমছে হুড়মুড়িয়ে। সকালে যেটার দাম ছিল পাঁচ রুবল, বিকালেই ওটার দাম দশ। লাইনে দাঁড়িয়ে রুটি, দুধ সংগ্রহ করা লাগছে। অনেকে এভাবে কম দামে রুটি, দুধ কিনে চড়া দামে বাইরে বিক্রি করে দিচ্ছে।
গল্পের নায়ক হাবিবুর রহমান বেশ অলস প্রকৃতির। শুয়ে, বসে, ভদকা গিলে সময় কাটে তার। অন্য ছাত্ররা যে রকম হালকা ব্যবসাপাতি করে টু পাইস কামিয়ে নিচ্ছে, তেমনটা করে না ও। নীতিবান মানুষ বলা যায় তাকে। স্টাইপেন্ড পেয়ে রাশিয়ায় এসেছে। তার সহপাঠী তনুশ্রী। কলকাতার মেয়ে, আদি নিবাস বাংলাদেশ। ৪৭ সালে দেশভাগের সময় তার পরিবার ভারতে পাড়ি জমায়।
ভয়ানক মেধাবী এক ছাত্রী তনুশ্রী। হাবিবের সাথে ভালো একটা সম্পর্ক আছে তার। ঠিক প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ক না, আবার "জাস্ট ফ্রেন্ডও" না! আর তনুশ্রীর সাথে হাবিবের অদ্ভুত সম্পর্কই এই কাহিনীর উপজীব্য। এক রাতের উদ্দামতায় শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে দু'জন। কনসিভ করে বসে তনুশ্রী। ঘটনার ঘনঘটায় তনুশ্রীর প্রতি আচমকা প্রেমের উদয় হয় হাবিবের, ভবিষ্যত সন্তান নিয়ে নানান ফ্যান্টাসিতে ভোগে ও। তনুশ্রী আবার সে রাতের ঘটনায় গভীর মনস্তাপে ভুগছে। তার মনে আবার কোন ধরণের প্রেমের উদয় ঘটে নাই। একেবারেই উদাসীন ও, নির্বিকার। তনুশ্রীর এই শীতল আচরণ ঠিক মেনে নিতে পারে না হাবিব। তার ভেতর খানিকটা সমস্যা দেখা দেয়, বাস্তবতা ও কল্পনার ফারাক ভুলে যায় ও। বাস্তবতা মিশে যায় কল্পনার সাগরে...
এভাবেই কাহিনী এগিয়েছে। প্লট আহামরি কিছু না। হাবিবের ওপর একসময় মেজাজ খিঁচড়ে যেতে পারে ভ্যাবদা মার্কা প্রেমিক হয়ে গেছে বলে। মেজাজ খিঁচড়ে যেতে পারে তনুশ্রীর ওপরও। কেন সে এরকম ভাবলেশহীন?
মৃতপ্রায় সমাজতন্ত্রের প্রতি সমবেদনায় গাঢ় বইটি। 'সোভিয়েত ইউনিয়ন একসময় কী ছিল আর কী হয়ে গেল'- এ ধরণের হাহাকার প্রায়ই উঁকি মারে। তবে তৎকালীন সোভিয়েত সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য বইটা বেশ দরকারি। আর উপরি হিসেবে মশিউল আলমের ঝরঝরে গদ্য তো আছেই। তাই সময়টা ভালোই কাটার কথা।
তবে আমি মনে করেছিলাম ঘোড়ামাসুদের চেয়ে ভালো কিছু পাবো। কিন্ত না। এখনো আমার ধারণা, ঘোড়ামাসুদ-ই মশিউল আলমের সেরা কাজ।
ভিন্ন সময়ের ভিন্ন পটভূমির এই উপন্যাস, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং সেসময়কার সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে এর আগেও মশিউল আলম, দ্বিজেন শর্মার লেখা পড়েছি, সেসব আক্ষেপ কিংবা দ্বিধাবোধ ছাড়াও এই উপন্যাস মূলত এক বাঙলাদেশী ও কলকাতার মেয়ে তনুশ্রীর সম্পর্ক সংক্রান্ত জটিলতা। নি:সন্দেহে মশিউল আলমের অন্যতম সেরা কাজ, বাঙলা উপন্যাসের মধ্যেও নানা বিচারে উল্লেখযোগ্য কাজ হওয়া উচিত।
অবশেষে পড়ে ফেললাম মশিউল আলমের ম্যাগনাম ওপাস খ্যাত উপন্যাস "তনুশ্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় রাত"। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনপূর্ব পটভূমিকায় রচিত এই উপন্যাসটি অত্যন্ত সুখপাঠ্য। পড়ে আরাম পাওয়া যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়তে যাওয়া ভিনদেশী শিক্ষার্থীদের বেশ সুন্দর একটি চিত্র পাই এই বইয়ে। আর, লেনিনের সংগ্রহে রবীন্দ্রনাথের যে দুইটা বই ছিল— ন্যাশনালিজম এবং ঘরে বাইরে— তাও জানতে পারি। রবীন্দ্রনাথের "রাশিয়ার চিঠি" সম্পর্কে সুন্দর একটা আলোচনা আছে। বলশেভিক নীতিই যে চিকিৎসার পদ্ধতি তা বুঝেও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন জবরদস্তটা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে। ভাবা যায়, রবীন্দ্রনাথ সেই ১৯৩০ সালেই কেমন আঁচ করেছিলেন সোভিয়েত রাশিয়ার সমস্যাটা। সর্বোপরি বেশ ভালো বই। মশিউল আলম লেখেনও দারুণ। একটানা পড়ে ফেলা যায়। কিন্তু একটাই সমস্যা। সামাজিক রাজনৈতিক ও ইতিহাস তত্বের আলাপ আলোচনার সাথে নর-নারীর জটিল রসায়নের যে আখ্যান তাতে বয়ানকারীর "আমি বাবা হয়ে গেছি, দেখো আকাশ বাতাস গাছ পাখালি" টাইপ সাবানা যুগের বাংলা সিনেমার মতো হাত পা ছোড়াছুড়ি না করলে খুব ক্ষতি কি হতো!!?
তনুশ্রীকে নিয়ে যে গল্পটা পড়লাম, আমার সচরাচর পাঠ্যর সাথে এর চোখে পড়ার মত ভিন্নতা। রাশিয়ায় পড়াশোনা করার সুবাদে লেখক থেকে রুশ দেশীয় অনেকগুলো কাজ আমরা পেয়েছি। সোভিয়েত রাশিয়া ভাঙার সময়কালীন একটি গল্প 'জুবফস্কি বুলভার' পড়ে এই বছর শুরু করেছিলাম। রুশ দেশের সমাজতান্ত্রিকতা নিয়ে এই বইয়ের অধিকাংশ অংশই আলোচনা করেছে। স্তালিন, গর্ভাচভ, লেলিন দের মতবাদ নিয়ে চলেছে পরতে পরতে বিতর্ক। আমি ঠিক জানিনা রাশিয়ানরা সকলেই কি এমন ভাতেপাতে আলোচনায়ও রাজনীতি, কম্যুনিজম চর্চা করেন কিনা! তবে প্রবাসী রাশানদের জীবন বা ইয়াং রাশান কালচার নিয়ে একটা সুন্দর ধারণা পাওয়া গেল। সব মিলে ব্যাপারটা ক্যাপটিভেটিং। মাঝে যদিও হারিয়ে যাচ্ছিলাম, কি হচ্ছে? কি ব্যাপারে গল্প করছিলাম যেন আমরা? বেশ কমপ্লেক্স গল্প! তারপরও গুরুগম্ভীর রাশান আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে কলকাতার মেয়ে তনুশ্রী চক্রবর্তীর সাথে আমাদের দেশীয় কমরেড হাবিবের গল্পটা খুব জমছিল। তাদের মাঝে তো প্রেম নাই, লুকায়িত ভালোবাসার সম্পর্ক নাই, তাহলে এই সম্পর্ককে আমরা কি বলবো? এ আবার কেমন টান? কম্যুনিস্ট চর্চা করে, কম্যুনিস্ট দেশে এসে, সম্পর্কের মাঝে সেই বংশমর্যাদার সেই ক্যাপিটালিস্টিক চিন্তাচেতনার একটা তীর্যক ট্র্যাজিক গল্পই কি শোনাতে চাইলেন লেখক?
সোভিয়েত এর শেষ দিনগুলির প্রতি আর্কষণ ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে লিখা বলেই হাত দিয়েছিলাম। সেটুকু ভালই ফুটে উঠেছে। তনুশ্রী আর হাবিবের কেচ্ছা বোনাস হিসেবে পেয়েছি। সেও ভাল। তবে মাঝের কিছু অংশ খাপছাড়া মনে হল। লেখক ঠিক কী বুঝাতে চেয়েছেন ঐ অংশটুকুতে বুঝতে পারিনি। সব মিলিয়ে মন্দ নয়।
বাংলা ভাষার এক লেখকের লেখায় রাশিয়া অন্যরকম ভালো লাগলো। মশিউল আলমের সাহিত্যের সাথে পরিচয় হলো। বেশ ভাল লাগলো এই বইটি। লেখকের আরও কিছু লেখা সামনে পড়তে হবে
বড় গল্প হিসেবে বেশ ভালো, হাবিব-তনুশ্রীর মানসিক দ্বন্দ্বটা এগিয়েছে থ্রিলারের গতিতে। কিন্তু অন্য চরিত্রগুলো ঠিক পূর্ণতা পায়নি, রেড হেরিংয়ের মত মিলিয়ে গেছে অতলান্তে। অনেক সম্ভাবনার পরেও বইটা দিন শেষে ঠিক উপন্যাস হয়ে উঠতে পারেনি
আশির দশকে তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন কমিউনিস্ট পার্টি থেকে সোভিয়েত ইউনিয়িন সরকারের পক্ষ থেকে রাশিয়াতে পড়তে যাওয়ার বৃত্তি দেওয়া হতো। উদ্দেশ্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সুসম্পর্ক এবং তাদের প্রতি কর্তিত করা। লেখক মশিউল আলমও সম্ভবত একই ধরণের বৃত্তি নিয়ে রাশিয়ায় পড়তে যান। ঠিক ওই সময়ে সুবিশাল সোভিয়েত ইউনিয়িন ভাঙার দ্বারপ্রান্তে । রাশিয়ার ওই সময়ের আর্থ সামাজিক অবস্থা এবং সমাজতন্ত্র নিয়ে উনার ব্যক্তিগত হাহাকার এবং উনি তখন যা দেখেছেন এই বিষয় উপজীব্য করে লিখেছেন এই বইটি।
কাহিনী আবর্তিত হয় হাবিব নামের বাংলাদেশ থেকে বৃত্তি নিয়ে যাওয়া একটি ছেলেকে কেন্দ্র করে। ভাঙনের সুর লাগা সোভিয়েত ইউনিয়িনে রাজ্যের দুর্নীতি। যে যেভাবে পারছে টাকা কামাচ্ছে। কিন্তু সহজ সরল হাবিব বৃত্তির কটা টাকা দিয়েই দিন গুলজার করছে। ক্লাস করছে তো করছে না,আড্ডা দিছে। তার বন্ধুদের মাঝে একজন হচ্ছে কলকাতার মেয়ে তনুশ্রী চক্রবর্তী। তনুশ্রী সাথে তার সম্পর্কটা নেহায়তেই বন্ধুত্বের। কিন্তু একসাথে মাতাল হয়ে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পরে তারা। প্রেমবিহীন এই সম্পর্কের ফলাফল হচ্ছে তনুশ্রীর প্রেগনেন্ট হয়ে যাওয়া। এই সম্পর্ক তনুশ্রী মেনে নিতে পারে না। নিজের প্রতি ঘৃণা এবং ভুলের আক্ষেপ তাড়া করে ফিরে তাকে। ওদিকে বাবা হওয়ার খবর শুনে হাবিব প্রেমে পড়ে তনুশ্রীর। ছ্যাবলার মত তাড়া করে ফেরে তনুশ্রীকে। তনুশ্রীর এই দ্বিধাদন্ধ এবং হাবিবের জোঁকের মত লেগে থাকা এবং এর ফাঁকে ফাঁকে সমাজতন্ত্রের পাঠ। এই নিয়েি হচ্ছে "তনুশ্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় রাত" বইয়ের কাহিনী।
বইটি মশিউল আলমের সেরা কাজ না হলেও দারুণ একটা কাজ। আমার কাছে বেশ ভালো লাগল।