সূচিপত্র উম্মাহ ও খেলাফতের সিলসিলা খলিফার কালো পতাকা ও মাওয়ালি মুসলমানের গল্প মুসলমানদের ইহুদিত্ব ও সাবেইনদের বিলুপ্তি ইবনে তাইমিয়ার ঢিলা স্ক্রু ও সালাফিদের উত্থানের ইতিহাস জর্জ বুশ, ইবনে তাইমিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের খ্রিস্টান সম্প্রদায় গেম অফ ইসলামিক থ্রোন সালাফি সেক্যুলারিজম প্রসঙ্গে কোরআনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত নির্ভর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে মুতাজিলা থেকে মর্ডানিটি : মুসলমানের আক্কেল ও বেয়াক্কেলের ইসলাম প্রসঙ্গে মাহদিবাদের সিলসিলা ও জগতের লাঞ্ছিত আত্মপরিচয়ের রাজনীতি ও শোষিতের দীর্ঘশ্বাস
Parvez Alam is a Bangladeshi writer and activist. He uses blog platforms to write on history, religion and politics and also writes for newspapers and magazines. His first book ‘Muslim jogoter gyantattik lorai’ (epoistemological battle in the Muslim world, 2011) is about the history of battle between liberal and conservative thoughts during the rise and fall of Islamic golden age of science and philosophy. His second book Shagbager Rashtroprokolpo’ (State-project of shahbag, 2014) deals with the question of secularism in Bangladesh and provides a historical narrative of Shahbag movement. His third and foruth book ‘Jihad O Khelafoter Silsila’ (Geneology of Jihad and Caliphate,2015) and 'Muslim Duniar Khomota Shomporker Itihash' (History of power-relation in the Muslim world,2016) does historical analysis of some of the political Islamist and jihadist ideas and beliefs that are central to many debates in the contemporary world, and a historical analysis of plurality and diversity in the Muslim world. Parvez recently also wrote an English book titled 'Disappearing Public Spheres' which is a brief history of the rise and decline of internet era public spheres in Bangladesh.
লেসলি হ্যাজেলটনের 'আফটার দা প্রফেট' কিংবা ইবনে কাসীর প্রণীত 'আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া' পড়েছিলাম বেশ আগে, নবী (সঃ) এর প্রয়াণের পরবর্তী রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছিলো তখন। পাশ্চাত্য দুনিয়ার একাডেমিকরা এ প্রসঙ্গে নানা ধরনের বইপত্র লিখেছেন, তবে বাংলা ভাষায় এ সংক্রান্ত ভালো লেখার অভাব বোধ করি পাঠকের দৃষ্টিতে। সেদিক দিয়ে পারভেজ আলমের বইটি চমৎকার, পরিশ্রমের ছাপ স্পষ্ট, নানা তথ্যসূত্র উল্লেখ করে নবীজীর পরবর্তী সময় থেকে আধুনিক বিশ্বের আইসিস পর্যন্ত জিহাদ বা খেলাফতের উত্তরাধিকার ভাবনার বিবর্তনের একটা ধারাবাহিক চিত্র দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা ছিলো লেখকের।
বইটার একাধিক সংস্করণ (বলা ভালো নানা রকম সংযোজন করে পুনঃমুদ্রণ) হয়েছে বলে জানি। তবে বিষয়বস্তুর কারণেই, এখনো আরো ম্যালা কিছু সংযোজনের সুযোগ আছে। এছাড়া পড়তে গিয়ে সম্পাদকের প্রয়োজনীয়তায় কপাল কুঁচকায় খানিক পরপর। বানান ভুল, ফন্টের ঝামেলা বা পুর্বে বর্ণিত ঘটনা পরম্পরাকে পাঠকের কাছে পুনরায় নিয়ে আসার ব্যাপারে ভালো একজন সম্পাদক ভূমিকা রাখতে পারতেন।
সামাজিক মাধ্যমে কত ধরনের বই নিয়ে মাতামাতি দেখি। অথচ ২০১৬ সালে লেখা পারভেজ আলমের এমন অসাধারণ তথ্যবহুল বই নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
আখেরি নবির 'জিহাদ' এবং হজরত মুহাম্মদ(স.)-এর মৃত্যু-পরবর্তী ক্ষমতারকেন্দ্রিক রাজনীতি সবকিছুকে প্রভাবিত করেছিল। যা প্রথম চারজন খলিফার শাসনামলের নানান ঘটন-অঘটনকে উৎসাহিত করে। বদলে দেয় ইসলামের গতিপথকে।
আখেরি নবি তার পরে কে নেতৃত্ব দেবেন তা নির্ধারণ করে যাননি বা যেতে পারেননি। তখন থেকেই ক্ষমতা নিয়ে বিরোধের সূচনা। খুম পুকুরের সমাবেশ নবি বলেছিলেন,
' আমি যার মওলা, আলিও তার মওলা।'
এই 'মওলা' শব্দের অর্থ কী হবে তা নিয়ে বিরোধের মীমাংসা এখনও হয়নি। কেননা এই ভাষণসহ আরও কিছু ঘটনা ও বক্তব্যকে সামনে রেখে মুসলমানদের একটি বড় অংশের দাবি ছিল নবির পর নেতৃত্ব দেওয়ার অধিকার একমাত্র হজরত আলির। কেননা তিনি আহল আল বায়াত তথা নবির পরিবারের সদস্য, তিনি অনেকক্ষেত্রেই নবিকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সুতরাং, নবি-পরবর্তী মুসলিম উম্মাহকে পরিচালিত করার অধিকার একমাত্র হজরত আলির। হাসান-হোসেনের মৃত্যু আলির সমর্থকদের আলাদাভাবে চিন্তা করার খোরাক দেয়। যারা পরবর্তীতে শিয়া নামে পরিচিত হন।
হজরত আলি সাহসী ছিলেন। ছিলেন দরাজ দিলের ইনসান। তবে, রাজনীতির কূটচাল কতটা বুঝতেন তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। নবিকে দাফনের ব্যবস্থার নিতে নিতেই হজরত উমর ও আবু বকর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন নেতৃত্ব কোনোমতেই আলির হাতে যাবে না। এদিকে মদিনার আনসাররা নিজেদের মধ্যে থেকে নেতা নির্বাচন করছে এমন সংবাদ পরিস্থিতিকে জটিলতর করে তোলে৷ নবির পরম সুহৃদ ও প্রিয়তমা স্ত্রী আয়েশার পিতা আবু বকর প্রথম খলিফা হয়ে যান।
আবু বকরকে আলির পক্ষের লোকজন মানতে পারেননি। আলি ও ফাতিমা বিশেষ খুশি হয়েছিলেন এমনটি মনে করার কারণ নেই। তা সত্ত্বেও কয়েকমাস পর আবু বকরকে সমর্থন জানিয়েছিলেন আলি।
আবু বকরের পর ওমর খলিফা হন। মৃত্যুকালে ওমর শর্ত দেন তাকেই খলিফা নির্বাচন করবেন যিনি আবু বকর ও ওমরের নীতি শতভাগ অনুসরণ করবেন। আলি এই শর্তে রাজি ছিলেন না। কিন্তু উমাইয়া গোত্রের বুদ্ধিমান ওসমান তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেলেন এবং শপথ নিলেন তৃতীয় খলিফা হিসেবে। আলি কিন্তু এবারও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দেননি। যার ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী।
ওসমান তার উমাইয়া গোত্রকে বড় বড় পদগুলিতে পদায়ন করেন। সিরিয়ার গর্ভনর হন আবু সুফিয়ানের ছেলে উমাইয়া গোত্রের মুয়াবিয়া। মিশরেও ওসমানের বংশের কেউ পদায়িত হন।
এই পদ-পদবি নিয়ে নবির হাশেমি গোত্রসহ অনেকেই অখুশি ছিলেন। এরইমধ্যে অভিযোগ আসে ওসমানের সৎ ভাই কুফার শাসক আল ওয়ালিদকে নিয়ে। মদ খেয়ে মাতাল অবস্থায় ফজরের নামাজে ইমামতি করার সময় দু'রাকাত বেশি নামাজ পড়িয়েছে আল ওয়ালিদ - এই অভিযোগ ওসমানের কাছে দেওয়া হয়। হজরত আয়েশাও খলিফা ওসমানকে এর বিচার করতে বলেন। কিন্তু ওসমান কার্যত ব্যবস্থা নেননি এবং আয়েশাকে স্মরণ করিয়ে দেন,
' আল্লাহ নবির স্ত্রীদের ঘরে থাকতে বলেছেন। রাজনীতির ময়দানে নয়। '
নবির জীবিত স্ত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী আয়েশা এই কথায় রুষ্ট হন। মুসলমানদের আয়েশাপন্থি গ্রুপ ও ওসমানপন্থিদের মধ্যে জুতা মারামারির মধ্যে দিয়ে সাময়িকভাবে সমাপ্ত হয় এই বিবাদ।
আলি আবু বকরের বিধবা স্ত্রীকে বিয়ে করেছিলেন। আবু বকরের পুত্রকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন আলি। নিজেই তাকে বড় করেন। এই পুত্রের নেতৃত্বে স্বজনপ্রীতি, কুরান সংকলন ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানা ইস্যুতে ওসমানের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। তখনকার টালমাটাল পরিস্থিতিতে এমনই একটি ঘেরাও আন্দোলনে মুসলিম বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হন হজরত ওসমান৷ তাকে রক্ষা করতে গিয়ে তার স্ত্রীর চারটি আঙুল কাটা পড়ে।
নিহত ওসমানের রক্তমাখা জামা এবং স্ত্রীর কাটা আঙুল নিয়ে প্রকাশ্যে তার হত্যার বিচার চাইতে থাকেন উমাইয়া গোত্রের মুয়াবিয়া। বুদ্ধিমান মুয়াবিয়া বেশ সমর্থন আদায় করেন৷
এদিকে আয়েশার নেতৃত্বে জুবায়ের ও তালহাসহ যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া হয় আলির বিরুদ্ধে। তাদের অভিযোগ আলি ওসমান হত্যার বিচার করছেন না। এই অভিযোগে সত্যতা ছিল। কেননা ওসমান বিরোধী ও উমাইয়া বিরোধী সবাই সমর্থন দিয়েছিল আলিকে। তাই আলি চাইলেও তখনই ওসমানের হত্যাকারীদের শায়েস্তা করতে পারছিলেন না। এদিকে রাজনীতিতে কাঁচা আলি তার দুই প্রবল প্রতিপক্ষ জুবায়ের আর তালহাকে মক্কায় যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার মতো ভুল পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
আয়েশা বনাম আলির যুদ্ধ ইতিহাসে উটের যুদ্ধ বা জঙ্গে জামাল নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে আলি জয়ী হন। পরাজিত আয়েশা রাজনীতি থেকে নিজেকে চিরদিনের জন্য গুটিয়ে নেন। আরও বিশ বছর জীবিত ছিলেন তিনি। কিন্তু একেবারেই নীরব ও নিস্পৃহ।
আবু বাকরা নামে একজন সাহাবী ছিলেন৷ তিনি নবির মৃত্যুর মাত্র দুই বছর আগে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং দ্রুতই প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন৷ অবশ্য ওমরের রাজত্বকালে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার অপরাধে তাকে সাজা দেওয়া হয়। আলি ও আয়েশার দ্বন্দ্বে নিরপেক্ষ আবু বাকরা আলির জয়ের পর একটি হাদিস বর্ণনা করেন। তা হলো-
ইসলামে নারী নেতৃত্ব গ্রহণযোগ্য নয়।
নবির মৃত্যুর বিশ বছর পর এই কথা প্রথম শোনা গেল। আগে কখনো কেউ এমনটি শোনেনি। মূলত, আবু বাকরা আলির আনুকুল্যে পেতেই এমন মিথ্যা একটি কথাকে হাদিস হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন বললে অত্যুক্তি হবে না। ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে স্বার্থ হাসিলের জন্য হাদিসের ব্যবহার আমরা আরও দেখব। সবচেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনা করেছেন আবু হুরায়রা। তিনি পাঁচ হাজারের বেশি হাদিস বর্ণনা করেছেন। যা নবির ঘনিষ্ঠ আয়েশা, আলি, আবু বকর, ওসমানের বর্ণিত সবগুলো হাদিসের যোগফলের চাইতে অধিক। অথচ আবু হুরায়রা নবির সাহচর্য পেয়েছেন মাত্র শেষের তিনবছর। উল্লেখ্য, ক্ষমতার রাজনীতিতে তিনি উমাইয়া বংশকে সমর্থন করেছেন এবং তাদের সমর্থনে তিনি নিজে হয়েছিলেন মক্কার প্রশাসক।
ওসমানের মৃত্যু নিয়ে বেক���য়দায় ছিলেন আলি। তখন সিরিয়ার গর্ভনর মুয়াবিয়া আক্রমণ করেন আলিকে। যুদ্ধে আলি এগিয়ে থাকলেও বুদ্ধিমত্তা ও চাতুর্যে মুয়াবিয়ার তুলনা মেলা ভার। পরাজিত নিশ্চিত জেনে তিনি তার বাহিনীর সম্মুখভাগকে কুরআনের বিভিন্ন পৃষ্ঠা দিয়ে সাজান। রণক্ষেত্রে ধর্মের এমন অভূতপূর্ব ব্যবহারে আলির বাহিনি বিভ্রান্ত হয়। আলি নিজেও বোধহয় যুদ্ধ করতে উৎসাহী ছিলেন না। তাই সিদ্ধান্ত হয় যুদ্ধের ফয়সালা হবে আলোচনার মাধ্যমে। এই যুদ্ধের ছয়মাস বাদে আলোচনার টেবিলে মুয়াবিয়াপন্থি আমর ইবনুল আস কূটনীতির চালে ধরাশায়ী হন হজরত আলি। সিদ্ধান্ত হয় আলির পরে নেতৃত্ব দেবেন মুয়াবিয়া। আলোচনার টেবিলে মীমাংসাকারী আমর ইবনুল আসকে আমরা মুয়াবিয়ার আমলে পাই মিশরের গর্ভনর হিসেবে!
মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর আলির পুত্র হাসানের খলিফা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ধারণা করা হয় উমাইয়াদের চক্রান্তে বিষপানে নিহত হন হাসান। মুয়াবিয়া নিজের ছেলে এজিদকে তার উত্তরসূরী ঘোষণা করে যান। আর, এভাবেই ইসলামে পারিবারিক রাজতন্ত্রের সূচনা হয় উমাইয়াদের মাধ্যমে। আলির পুত্র হোসেন এজিদকে নেতা মানতে রাজি ছিল না। এদিকে কুফার জনগণ তাকে জানান তিনি কুফায় এলে তারা তাকে এজিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে। হাশেমি গোত্রের ৭২ জনকে নিয়ে হোসেন কুফার উদ্দেশ্য যাত্রা করেন।
হোসেনের এই পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। এজিদ কুফার শাসককে নির্দেশ দেন হোসেনকে রুখে দেওয়ার। এজিদের বিশাল বাহিনির কাছে হোসেনের প্রতিরোধ ছিল নিতান্তই সামান্য। বলা যায়, একপ্রকার গণহত্যা চালানো হয় হাশেমিদের ওপর। ৭২ জন হাশেমির কর্তিত মাথা নেওয়া হয় দামেস্কে, এজিদের দরবারে। তিনি সেগুলো প্রকাশ্যে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন। নবির দৌহিত্রসহ হাশেমিদের ওপর এমন হত্যাযজ্ঞ সাধারণ মুসলমানদের ক্ষুব্ধ করে তোলে।
মুয়াবিয়ার পুত্র এজিদ বেশ রঙিন চরিত্র ছিলেন৷ অন্তত গল্প-গাঁথায় এভাবেই তাকে চিত্রিত করা হয়েছে। এজিদের মা ছিলেন সিরিয় খ্রিস্টান। তার বেড়ে ওঠা সিরিয়াতেই। মক্কা-মদিনার সাথে এজিদের কোনো সম্পর্ক ছিল না বললেই চলে। সিরিয়ান সেনাবাহিনি এজিদের ক্ষমতার উৎস। যার একটি বড় অংশ ছিল খ্রিস্টান। এমনকি এজিদের প্রিয়তম স্ত্রী, যার পুত্র দ্বিতীয় মুয়াবিয়া নামে অল্পসময় রাজত্ব করে করেছিল সে-ও ছিল সিরিয়ার একটি খ্রিস্টান রাজবংশের সন্তান। মোটকথা, মুয়াবিয়া ও উমাইয়াদের সাথে সিরিয়াবাসী খ্রিস্টানদের অত্যন্ত সুসম্পর্ক ছিল।
হোসেনের হত্যাকাণ্ড উমাইয়া শাসক এজিদের জন্য সুফল বয়ে আনেনি। মক্কা-মদিনা এজিদের নাগালের বাইরে চলে যায়। মক্কায় জুবায়ের শাসক হয়ে বসেন। মদিনার জন্মগ্রহণকারী প্রথম মুসলমান শিশু হিসেবে জুবায়ের যথেষ্ট পরিচিত ছিলেন। এই জুবায়েরকে শায়েস্তা করতে এজিদ সেনাবাহিনী পাঠান। মক্কা অবরোধ করে তারা এবং হামলা চালায়। তাতে কাবাঘর একপ্রকার ধ্বংস হয়ে যায়। অর্থাৎ মুসলমানদের কেবলা কাবা কোনো অমুসলিমদের হাতে প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বরং উমাইয়া খলিফা এজিদের সেনাবাহিনীর হাতে বিধ্বস্ত হয়। উমাইয়াদের সেনাপতি ইউসুফ বিন হাজ্জাজের হাতে আরও একবার বিধ্বস্ত হয় কাবাঘর।
মক্কা অবরোধ চলাকালেই মারা যান এজিদ। তার পুত্র অল্পসময়ের জন্য রাজা বনে যায়। এই কিশোর রাজাকে সরিয়ে আরেক ক্ষমতা দখল করেন আরেক উমাইয়া মারওয়ান। এখানেই মুয়াবিয়া বংশের রাজত্ব খতম ও মারওয়ান বংশের সূচনা হয়।
উমাইয়ারা ধর্মকে ক্ষমতা সুসংহতকরণের কৌশল হিসেবে চমৎকারভাবে ব্যবহার করেন। কোরান ও হাদিসের ব্যাখাকে আক্ষরিকভাবে নেওয়ার একটি প্রবণতা এখান থেকেই দেখা যায়। উমাইয়ারা আরব মুসলমান ব্যতীত অনারব সকল মুসলমানের ওপর জিজিয়া কর আরোপ করেছিল। এরা ভাবত শুধু আরবরাই খাঁটি মুসলমান। বাকিরা ততো সাচ্চা মুসলিম নয়। বাকিদের এরা মাওয়ালি সম্বোধন করত। মজার ব্যাপার হলো, অনারব মুসলমানদের ওপর জিজিয়া ধার্য থাকলেও উমাইয়াদের মিত্র খ্রিস্টানদের ওপর জিজিয়া আরোপ করা হতো না!
উমাইয়াদের উৎখাত করে আব্বাসিয়রা ক্ষমতা লাভ করে৷ তারাও পারিবারিক রাজতন্ত্র অব্যহত রাখে৷ আব্বাসিয়দের পতাকা ছিল কালো রঙের। মূলত, জঙ্গিরা এটিকেই তাদের পতাকা হিসেবে প্রচলন করে। আব্বাসিয়দের এই পতাকা ছিল তৎকালীন রাজনীতির অনুষঙ্গ। এখানে ধর্মের সাথে সম্পর্ক ছিল না। অর্থাৎ, আইসিসের কালো পতাকার সাথে ইসলামের কোনো যোগসূত্র নেই।
উমাইয়াদের আমলে কোরানের ব্যাখা নিয়ে যে কট্টরপন্থার সূচনা হয় তা মাজহাবের মর্যাদা লাভ করে ইমাম হাম্বলের হাতে। চারটি মাজহাবের মধ্যে এটি সবচেয়ে নতুন। এই মাজহাবেই হাদিসের প্রভাব সবশেষে বেশি। যেখানে ইমান আবু হানিফা মাত্র ১৭টি হাদিস উল্লেখ করেছেন, সেখানে হাম্বল ৫০ হাজারের বেশি হাদিস উদ্ধৃত করেন! আবু হানিফা কোরানের আক্ষরিক ব্যাখার পক্ষে নন। তিনি হাদিসের চাইতে নিজের আক্কেল তথা কাণ্ডজ্ঞান, উপস্থিতবুদ্ধি এগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। পক্ষান্তরে, হাম্বল কোরান ও হাদিসের প্রতিটি অক্ষরকে আক্ষরিকভাবে নেওয়ার পক্ষে। এই হাম্বলের কট্টরপন্থাকে অতি উচ্চস্তরে নিয়ে যান দ্বাদশ শতকের ইবনে তাইমিয়া।
কোরান-হাদিসের প্রতিটি অক্ষরকে কঠোরভাবে অনুশীলন এবং নবির বিরুদ্ধে কটূক্তির শাস্তি মৃত্যুদণ্ডকে প্রবলভাবে প্রচার করেন। আজকে যারা নবির সমালোচনা বা কটূক্তির সাজা মৃত্যুদণ্ড দাবি করে, তারা মূলত ইবনে তাইমিয়ার অনুসারী। ইবনে বতুতার সাথে মসজিদে তাইমিয়ার দেখা হয়েছিল। তিনি তাইমিয়াকে 'অস্বাভাবিক ব্যক্তি' বলে উল্লেখ করেন।
আরবে সপ্তদশ শতকে আবদুল ওয়াহাব নামে একজন ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রচার করেন নবির আমল এবং পরবর্তী তিন প্রজন্মে যেভাবে ইসলাম পালিত হতো সেভাবেই ইসলাম পালন করতে হবে। এর কোনো নড়চড় করা যাবে না। যারা এই নিয়মের ব্যতিক্রম করবে, তারা আর মুসলমান থাকতে পারবে না এবং হয়ে যাবে তাকফিরি।
মুসলমানদের প্রথম তিন প্রজন্মকে সালাফ তথা পূর্বপুরুষ এবং কট্টরভাবে এদের অনুসরণকারীদের সালাফি বলে। ইসলামের সবচেয়ে গোঁড়া দল হলো এই সালাফিরা। আবদুল ওয়াহাবিপন্থিদের ওয়াহাবি কিংবা তরিকা-ই-মোহাম্মদি বলেও উল্লেখ করা হয়। সালাফি আবদুল ওয়াহাবের দর্শনগুরু হলেন ইবনে তাইমিয়া ও হাম্বল। আবদুল ওয়াহাব তার কট্টর মতাদর্শের সহযোগী হিসেবে পান বর্তমান সৌদি রাজবংশের পূর্বপুরুষ ইবনে সৌদ। আবদুল ওয়াহাবকে ধর্মীয় গুরু হিসেবে মানতেন ইবনে সৌদ। এই গোঁড়া সালাফিদের হাতেই বিধ্বস্ত হতে থাকে মদিনার জান্নাতুল বাকি গোরস্থানের নবি পরিবারের সদস্যদের কবর৷ তারা নবির মা আমিনার সমাধি, ফাতিমার বাড়ি ধ্বংস করে। ১৮০৬ সালে সালাফি সেনাবাহিনী খোদ আখেরি নবির কবর ধ্বংস করার পরিকল্পনা করলে বিশ্বব্যাপী সমালোচনা তৈরি হলে ক্ষান্ত হয় সালাফিরা।
বর্তমান সৌদি রাজবংশ কঠোরভাবে সালাফিপন্থি তথা ওয়াহাবি মতবাদে বিশ্বাসী। ঐতিহাসিকভাবে সৌদি রাজবংশ আক্ষরিকভাবে ইসলাম ও সালাফিবাদ অনুসরণে আস্থা রাখে।
বর্তমানে যারা ইসলামের সমালোচনা করেন, তাদের কাছে ইসলাম মানে ইবনে তাইমিয়া আর আবদুল ওয়াহাবের গোঁড়া ইসলাম। আইসিস আর আল-কায়েদার মতো জঙ্গি সংগঠনগুলো সৌদির এই সালাফি ইসলাম প্রচার করে। পৃথিবীর বেশির ভাগ মুসলমান সুন্নিপন্থি হানাফি মাজহাবের। তারা আক্ষরিক ইসলাম আর এসব সালাফি গোঁড়ামিতে আস্থাশীল না হলেও প্রচার-প্রচারণার বদৌলতে উপমহাদেশে সালাফি ইসলামের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ছে। মওদুদী, মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডের বান্না এবং বাংলাদেশের আহলে কিতাব, হাট হাজারী ও কওমি মাদরাসাপন্থিরা প্রবলভাবে সালাফি।
ইসলামি রাষ্ট্র বলে পৃথিবীতে কিছু নেই। কখন ছিল না। চার খলিফার রাজত্বে খাঁটি ইসলাম বনাম রাজনৈতিক ইসলামের মধ্যে কোনটা বেশি ছিল তা গবেষণার বিষয়। অপরদিকে, রাষ্ট্রের ধারণা বিকশিত হলে সপ্তাদশ থেকে অষ্টাদশ শতকে। মানে চার খলিফার রাজত্ব বড়োজোর রাজ্য কিংবা সাম্রাজ্য, রাষ্ট্র নয়।
শিয়া ও সুন্নি ধারণাগুলোর সাথে ধর্মের চাইতে রাজনীতির যোগ অনেক অনেক বেশি।
পারভেজ আলম পড়াশোনা করে বইটি লিখেছেন। তবে, শেষের অধ্যায়ে গোলমাল হয়ে গেছে। কী বোঝাতে চেয়েছেন এটি স্পষ্ট নয়। পারভেজ আলমের ��েখায় হাতের প্রশংসা আমি করব না। তথ্য-উপাত্তের গুণে বইটি উতরে গেছে।
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধং পরিস্থিতি বুঝতে হলে মুসলমানের নিজেদের বিভেদকরণের মূল ইতিহাসে ফেরা ছাড়া উপায় নেই। কিভাবে ' শান্তির ধর্ম' 'ইসলামের অনুসারী দাবী করা মুসলমানরা হয়ে যায় সন্ত্রাসবাদী বা ' টেরোরিস্ট' শব্দের প্রায় সমার্থক তা বুঝতে এই বই সাহায্য করবে। মুসলমানদের মাঝে নিজ ধর্ম সম্পর্কে এক অদ্ভুত স্বেচ্ছা-অজ্ঞতা রয়েছে। তাদের ধর্ম সম্পর্কে ধারণা ও জ্ঞান বাস্তবতারহিত, এক আজব ডিল্যুশনে ভোগে সবসময়। জিহাদ ও খেলাফত নামক জিনিস বলতে অধিকাংশ মুসলমানরা যা বোঝে ইতিহাস ঘাটলে তার সাথে সত্যের সম্পৃক্তা খু্ব অল্পই মেলে। ধর্ম কোন অলীক জিনিস নয় ; এই ধুলোমাটির পৃথিবীর ক্ষমতা ও দ্বন্দ্বের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে ভাবে জড়িত এক ফেনোমেনা, সেট অস্বীকার করবার কোন উপায় নেই। বাংলা ভাষায় এসব বিষয়ে বইপুস্তকের কমতি বলেই আমি জানি। এরকম বই আরো লেখা দরকার...
গুরত্বপূর্ণ বই৷ যদিও লেসলি হ্যাজেলটনের বই পড়ার সুবাদে শিয়া-সুন্নীর ঐতিহাসিক বিভক্তি নিয়ে জানাশোনা ছিল। কিন্তু এই বইতে লেখক বর্তমান সময়ের খেলাফত ও জিহাদ বিষয়ে পূর্ববর্তী ঘটনার সিলসিলা খোঁজার চেষ্টা করেছেন৷ এসব বিষয়ে যাদের জানার আগ্রহ আছে তাদের জন্য চমৎকার একটা বই৷
মুসলিম দুনিয়ার ক্ষমতা সম্পর্কের ইতিহাসঃ- জিহাদ ও খেলাফতের সিলসিলা।
বর্তমান সময়ের সবথেকে অালোচিত বিষয় ইসলামি রাষ্ট্র শাসন ব্যবস্থা। জিহাদ এবং খেলাফত বর্তমান দুনিয়ার প্রধান রাজনৈতিক দুই ফেনোমেনা। বিভিন্ন পক্ষ এই জিহাদের অাদি উৎস সম্পর্কে নানা ব্যাখ্যা করেছেন। এই বই থেকে মূলত অামরা জিহাদের অাদী উৎস ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবো। মুহাম্মাদের সময়কার জিহাদ থেকে শুরু করে তাঁর মৃত্যু পরবর্তী ইসলামি জিহাদের ইতিহাস অালোচনা করে হয়েছে বইয়ের পরতে পরতে।
জিহাদ এবং খেলাফত ইসলামিক জগতে পরিচিত দুইটি শব্দ। নবী মুহাম্মাদের সময়কার জিহাদ থেকে কিভাবে বর্তমান সময়ের জিহাদ কিভাবে পরিবর্তিত হয়েছে তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদের রোপিত এই বিক্ষোভে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু রাষ্ট্র তার ভারসাম্য হারিয়েছে। অন্তর্গত জনগণ অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছে। অধুনা গোদের উপর বিষফোড়ার মতো জন্ম নিয়েছে খেলাফত রাষ্ট্র। এই বিক্ষোভ সাম্রাজ্যবাদের আপন ঘরে সিদ কাটতেও সময় নেয় নাই অনেকে। আর উলুখাগড়ার মতো নির্বিচারে বলি হয়েছে মহাজনগণ।
জিহাদ ও খেলাফত এমন দুটি প্রপঞ্চ যার উত্তেজনা আমাদের সমাজেও ক্রমবর্ধমান। বিশ্বব্যাপী এই উত্তেজনার অংশীদার মহাজনগণ। যে মানুষ এই উত্তেজনার বলি সেও মহাজনগণের অংশ। তাই এই প্রপঞ্চদ্বয়ের ইতিহাস যে বিভিন্ন সাপেক্ষ প্রকল্পের আওতাধীন তা অনুধাবন করা এখন সময়ের দাবি। বইয়ে এসব সম্পর্কে একটা ধারণা দিয়ে গেছেন লেখক।