আমি ২০১৬ এর বইমেলায় এই বইটার নাম কোথায় যেন শুনেছিলাম । ইচ্ছা ছিল কেনার, কিন্তু তখন কেনা হয়ে উঠেনি । কিন্তু এবার ২০১৭ তে আর মিস করিনি ।
জেনারেল ও নারীরা - নামেই কিছুটা আভাস পাওয়া যায় এই বই হয়তো সব বয়সী পাঠকের জন্য নয় । কারণ অসংখ্য বার নগ্নতা , যৌনতা ইত্যাদি নিয়ে লেখালেখি করা হয়েছে এতে । লেখক অবশ্য বইয়ের ভূমিকাতে উল্লেখও করেছেন এটা বলে যে, বইটি তরুণতর পাঠকের জন্য উপযোগী নয় । কিন্তু পুরোটা পড়ার পর আমার এটাই মনে হয়েছে , বইটি সকলেরই পড়া উচিৎ । পড়ার জন্য বয়স লাগেনা :) তাইনা ?
বইটিতে প্রাধান্য পেয়েছে ,অসংখ্য প্রেমিকার সাথে নোংরা সম্পর্ক রাখা পাকিস্তানী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কথা , আছে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে সুবিধা পাওয়ার জন্য স্বেচ্ছায় ইয়াহিয়ার বিছানায় আসা সমাজের উচু ঘরের মেয়েদের কথা , আর আছে আইয়ুব খান , ইয়াহিয়া খান আর ভুট্টোর হাজারও ষড়যন্ত্রের পরেও শেখ মুজিবের নেতৃত্বে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয়া বাংলাদেশের কথা ।
কিছুটা কাল্পনিক , কিছুটা আগে থেকে জানা গল্পের মাধ্যমে শুরু বইটির প্রথম পাতা । এ্যারাবিয়ান নাইটস্ এর শাহেরজাদি তাঁর সুলতানকে গল্প বলা শুরু করে , গল্প শেষ হলেই সুন্দরী শাহেরজাদিকে মেরে ফেলবে সুলতান , এটা জানে সে , তাও বলতে থাকে গল্প , সুলতানের মতোই নারীভোগী আরেকটা চরিত্র , ইয়াহিয়া খানের গল্প ।
বঙ্গবন্ধু আর জেনারেল ইয়াহিয়া ছাড়াও এই গল্পের বিশেষ একটা চরিত্র আমার মনে হয়েছে 'আকলিম' অর্থাৎ 'জেনারেল রানী' কে । অনেক আগে এক পুলিশের স্ত্রী ছিলেন তিনি । ঘটনাক্রমে সন্তান নিয়ে সংসার থেকে আলাদা হয়ে যান আকলিম আর তার দেখা হয় জেনারেল ইয়াহিয়ার সাথে । গল্পের অন্যান্য নারী চরিত্রের উপর বলা চলে এক প্রকার প্রভাবই ছিল এই 'জেনারেল রানী'র ।
ইয়াহিয়া যখন বিভিন্ন মহলে নিন্দিত হচ্ছিলেন তাঁর নারী সঙ্গের কারণে , নিজের অধিনস্ত অফিসারদের স্ত্রীদের সাথে বিকৃত ভাব আদান প্রদানের কারণে , ঠিক সেসময়েই বাহ বাহ পাচ্ছিলেন তৎকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও তাঁর এডভাইজার কিসিঞ্জারের । এমনকি পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানে নির্বাচনের সময়ে থেকে নিক্সন কর্তৃক অন্যায় ভাবে ইয়াহিয়াকে অস্ত্র দিয়ে সাহায্য ও সমর্থন দেয়ার ঘটনাও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার মাধ্যমে সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক এই বইয়ে ।
আমি ইতিহাস টাইপের বই সাধারণত কম পড়ি । আর আমার মনে হয়েছে , আমার মতো যারা আছেন, তাদের জন্য বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের ইতিহাস একেবারে সংক্ষেপে জানার জন্য এই বইটা ভালো । বইয়ের শেষে উল্লেখ করা আছে ৩৩ টা রেফারেন্স এরও তালিকা । যদিও আগেই বললাম যে বইটা সংক্ষেপে বাংলার ইতিহাস জানার জন্য পড়া যেতে পারে , তবুও একটা জিনিস আমার মনের মধ্যে খচখচ করছে । আনিসুল হক অনেক বড় মাপের লেখক ,যার লেখার ব্যাপারে কিছু বলার এখতিয়ার আমার নাই , তবে একজন ছোট পোকা পাঠক হিসেবে মনে হয়েছে , বইটিতে ১৯৭১ এর মার্চের ঘটনার পরের কাহিনী গুলি খুব দ্রুত দেখানো হয়েছে এবং পড়তে না পড়তেই ডিসেম্বর ১৯৭১ এর কাহিনী চলে এসেছে । তাও ভালো লাগবে আশা করি ।
আমার এই রিভিউ এখন শেষ করা উচিৎ , নয়তো পুরো গল্পের স্পয়লার হয়ে যেতে পারে :p তবে বইটার শেষের দিকে ১৯৭১ এর সময়কার এক সুইপারের ভাষ্য উল্লেখ করা আছে , তৎকালীন সিটি কর্পোরেশনের এক সুইপারের ভাষ্য । পড়েই দেখুন , নিজের চোখের সামনে ভাসবে অনেক কিছু ...