মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যারা দেশের ভেতরে ছিলেন অথবা যারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন রণক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা যাই থাক না কেন, সবারই অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারন।
সেই অভিজ্ঞতার আলোকে লেখকের দেখা ও শোনা মানুষের দুর্গতি এবং আত্মত্যাগের স্মৃতি উঠে এসেছে এই বইতে।
Ghulam Murshid (Bengali: গোলাম মুরশিদ) is a Bangladeshi author, scholar and journalist, based in London, England.
জন্ম ১৯৪০, বরিশালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম. এ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে। পি এইচ ডি— ঐতিহাসিক ডেইভিড কফের তত্ত্বাবধানে। গবেষণার বিষয়, ঊনবিংশ শতাব্দীর হিন্দু সমাজ সংস্কার আন্দোলন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দু দশক ধরে অধ্যাপনা । মাঝখানে দু বছর কেটেছে মেলবোর্নে, শিবনারায়ণ রায়ের তত্ত্বাবধানে, পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা কর্মে। ১৯৮৪ সাল থেকে লন্ডন-প্রবাসী। | বেতার-সাংবাদিকতা এবং শিক্ষকতার অবসরে প্রধানত আঠারো শতকের বাংলা গদ্য এবং মাইকেল-জীবন নিয়ে গবেষণা। প্রধান নেশা গবেষণার— অতীতকে আবিষ্কারের । বারোটি গ্রন্থ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রদত্ত বিদ্যাসাগর বক্তৃতামালার ওপর ভিত্তি করে রচিত গ্রন্থ: রবীন্দ্রবিশ্বে পূর্ববঙ্গ, পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রচর্চা (১৯৮১)। পিএইচ ডি. অভিসন্দর্ভের ওপর ভিত্তি করে লেখা সমাজ সংস্কার আন্দোলন ও বাংলা নাটক (১৯৮৫)। মহিলাদের নিয়ে লেখা Reluctant Debutante: Response of Bengali Women to Modernization (১৯৮৩) (বাংলা অনুবাদ: সংকোচের বিহ্বলতা [১৯৮৫]) এবং রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া : নারীপ্রগতির একশো বছর (১৯৯৩)। অন্য উল্লেখযোগ্য রচনা, কালান্তরে বাংলা গদ্য (১৯৯২), যখন পলাতক (১৯৯৩) এবং বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনার আদি-পর্ব (১৯৮৬)। প্রবন্ধ সাহিত্যের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮২)। আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে বক্তৃতা দান (১৯৯১-৯২)। ছদ্মনাম হাসান মুরশিদ। এই নামে একটি উপন্যাসও লিখেছেন।
'৭১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন গোলাম মুরশিদ। ২৫ মার্চের পর দেশে থাকার সাহস হয়নি। অগণিত মানুষের মতো নিজের জীবন বাঁচাতে পরিবারকে নিয়ে বেছে নেন শরণার্থীর জীবন। প্রাণের মায়ায় দেশেছাড়া এক পলাতক মানুষের উপাখ্যান লিখতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক ঘটনা বিবৃত করেছেন মাত্র দু'শ পাতার এই বইতে।
সাধারণ মানুষকে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। কিন্তু এদেশের নেতা এবং বুদ্ধিজীবীদের সেই তকলিফে পড়তে হয়নি। অনেকেই তাদের আশ্রয় দিয়েছিল। প্রবাসী সরকারের পরিকল্পনা কমিশনে কেউ-বা চাকরি পেয়েছিলেন। গোলাম মুরশিদ মৈত্রেয়ী দেবীর সুবাদে বিচারপতি মাসুদের ফ্ল্যাটে থাকার সুযোগ পান। তখন জয় বাংলার পক্ষে পুরো ভারতবাসী ( উল্লেখ্য, ভারতের মুসলমানদের বড় অংশ জয় বাংলার বিপক্ষে ছিল)। গণমাধ্যমও জয় বাংলার সপক্ষে। আনন্দবাজার পত্রিকায় কলাম লিখে এবং বক্তৃতা দিয়ে মোটামুটি জীবন চলে গেছে গোলাম মুরশিদের।
পূর্ববঙ্গের বুদ্ধিজীবীদের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার বর্ণনা এই বইতে পাবেন। অনেকের মতো নিজের আসল নামে লেখালেখি বা প্রচারণা চালানোর সাহস হয়নি গোলাম মুরশিদের। হাসান মুরশিদ ছদ্মনামেই চলতো লেখালেখি। মুরশিদ সাহেব সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশার চিত্র পরিষ্কার আঁকতে পারেননি। হয়তো নিজে ওদের চাইতে ভালো অবস্থায় ছিলেন বলেই।
গোলাম মুরশিদ নিজের মুক্তিযুদ্ধকালীন পলাতক জীবনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন মুক্তির বিভিন্ন ঘটনাবলি বর্ণনাকে। কীভাবে মুক্তিফৌজ গড়ে উঠলো, পাকিস্তানিদের নির্যাতন, ভারতবাসীর অকুণ্ঠ সহযোগিতার কথা গোলাম মুরশিদ স্মরণ করেছেন। আবার প্রবাসী সরকারের ভেতরকার দ্বন্দ্ব, পাকিস্তানের পক্ষে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের শেষ মুহূর্তপর্যন্ত সমর্থনদানের ঘটনাকে নিজস্ব আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। তার বিশ্লেষণে সবসময় একমত হওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু পড়তে ভালো লেগেছে। কিছুক্ষেত্রে লেখকের অর্ন্তদৃষ্টির পরিচয় পেয়েছি, যা প্রশংসনীয়।
এই বইতে ব্যক্তিজীবন নয়; মুখ্য হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন অনেক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয়-আন্তর্জাতিক ঘটনা৷ তবু একজন পলাতক মানুষের জবানিতে ভারতে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ মানুষের খন্ড চিত্র কম-বেশি এসেছে।
বইয়ের নাম পড়লে ধারণা হয়, জীবন বাঁচাতে ভারতে পালানোর কারণে লেখক শরমিন্দা হয়েছেন। কিন্তু তা সত্য নয়। নিজেরই দু'জন সহকর্মী, যাঁরা প্রাণের দায়ে স্বদেশ ত্যাগ করেননি, শহিদ হয়েছিলেন। লেখক তাঁদের উদ্দেশে বক্রোক্তি করেছেন। যা অত্যন্ত অশালীন।