১৯২৯ সালে আইসিএসে প্রথম হয়ে অবিভক্ত বঙ্গে সিভিলিয়ান হিসেবে যোগ দিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়। ১৯২৯-৪৭ পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলায় কর্মরত থাকাকালীন আত্মস্মৃতির চারণই "যুক্তবঙ্গের স্মৃতি"র উৎস। এবইতে তিনি নিজস্ব চিন্তা ও যা দেখেছেন, ভেবেছেন তা দিয়ে বিশ্লেষণ করতে চেয়েছেন ভারতভাগ, বিশেষত বঙ্গভাগের ঘটনাকে।
"ভাবতে অবাক লাগে বঙ্গ তখন অবিভক্ত ছিল।" স্মৃতিচারণের শুরুটা এভাবেই করেছেন অন্নদাশঙ্কর রায়। কার্যক্ষেত্রে পূর্ববঙ্গে যোগ দিয়ে চাকরির শুরু।তাই স্বভাবতই তৎকালীন অস্থির রাজনৈতিক অঙ্গনে পূর্ববাংলার মানুষদের ভূমিকা কেমন ছিলো তার কিছুটা ধারণা পাই অন্নদাশঙ্করের কল্যাণে।
তবে ভুললে হবে না, লেখক একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্তা ছিলেন আবার একই সাথে তার কাঁধে সওয়ার ছিল সাহিত্যের ভূত।সেই ভূতের তাড়নায় বারবার চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সুপ্ত ইচ্ছা কতকবার পাঠককে জানাতে দ্বিধা করেন নি।
অন্নদাশঙ্কর যখন নওগাঁতে কর্তারূপে আবির্ভূত হন, তখন নাকী সেখানে হাজার হাজার একর জমিতে গাঁজার চাষ হতো এবং গাঁজা সোসাইটি গড়ে উঠেছিল যার সরকারি প্রতিনিধি ছিলেন লেখক নিজে! নওগাঁর সেই সোসাইটিময় দিনগুলো বড্ড রঙিন ছিল।
ময়মনসিংহে যখন আসেন, তখন সেখানকার চমৎকার আবহাওয়া আর পরিবেশের তারিফ করেন (দুইদফায় ময়মনসিংহ ছিলেন)। সেখানকার বেশিরভাগ বাসিন্দা মুসলমান কিন্তু জমিদার হিন্দু। এই চিত্র তখন পুরো পূর্ববঙ্গে।
চাটগাঁয়ে যখন কর্তা অন্নদাশঙ্কর তখনও সূর্যসেনদের অভিযানের কথা লোকে ভোলে নি, ভোলে নি ইংরেজরাও। তাই সেই ঘুমোট চাটগাঁওকে পাই অন্নদার লেখায়। পুঁথি সংগ্রাহক আব্দুর করিম সাহিত্যবিশারদের সাথে তার সাক্ষাৎ হয় আরেক সাহিত্যিক আবুল ফজলের কল্যাণে। দেখা পান এক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রাণী অথচ নামে রাজার! তিরিশের দশকের চট্টলার জীবনযাপনের চিত্র পাই সহজেই।
ঢাকায় সল্পকাল থাকাকালীন ঢাবিতে তার আনাগোনা। "শিখা" পত্রিকার জিনিয়াসদের সাথে আলাপচারীতার স্মৃতি উল্লেখযোগ্য। আর ঢাকার নবাব পরিবারের খাজা নাজিমুদ্দিনের প্রতি কিঞ্চিত দূর্বলতা কিংবা খাজা শাহাবুদ্দিন বা হাবীবুল্লার কথাও স্মরণ করেছেন।
পশ্চিমবঙ্গের সময়কালকে কেন যেন সেভাবে লিখেন নি অন্নদাশঙ্কর। তখন বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ ইত্যাদি এলাকায় কর্মরত থাকাকালীন নানা ঘটনা তুলে ধরেছেন, লিখেছেন বহুব্যক্তির সাথে তার ব্যক্তিগত স্মৃতির নানাকথা।
এ বইটি অন্নদাশঙ্কর লিখেছেন একজন "কংগ্রেসি,বাঙালি হিন্দুর" দৃষ্টিকোণ থেকে। ভারতভাগ বা বঙ্গভাগের রাজনীতিকে তিনি দেখেছেন একজন কংগ্রেস সমর্থক হিসেবে।তাই সারা বইতে একপক্ষীয়ভাবে তিনি ভারতভাগের জন্য দায়ী করেছেন মুসলিমলীগকে। তার চোখে শেরেবাংলা একে ফজলুল হক একজন "দলান্তরিত ", সোহরাওয়ার্দী একজন কমিউনাল ও তার প্রধানমন্ত্রিত্বের শাসনকাল "গুন্ডার্কি"।
কতগুলো ঘটনা এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন বঙ্গভাগের দায় শুধু বাঙালি মুসলমানদের আর সবাই ধোয়া তুলসী! সমস্যাটা এখানেই ভারতভাগের দায় মুসলিমলীগ আর কংগ্রেস কেউই এড়াতে পারেনা নির্মোহ ইতিহাসে তাই বলে। কিন্তু অন্নদাশঙ্করের কাছে মোহময় ইতিহাস অন্যরকম, যা তার মতো ব্যক্তিত্বের কাছে অপ্রত্যাশিত।
ঘটনার পর ঘটনাকে কতো সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন তা পড়তে গিয়ে বুঝতে পেরেছি। অন্নদাশঙ্কর শুধু ভ্রমণকাহিনী লিখিয়ে হিসেবে গতিময় নন,সুস্বাদু (ক্ষেত্র বিশেষে বিস্বাদময়) গদ্যলিখেয়ে হিসেবেও তিনি কম নন!