Syed Mustafa Siraj (Bengali: সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ) is an eminent Bengali writer. In 1994, he received the Sahitya Akademi award for his novel Aleek Manush (অলীক মানুষ). In 2005, his short story Ranirghater Brittanto (রানীরঘাটের বৃত্তান্ত) was made into the film "Faltu" by Anjan Das.
He was born in a village named Khoshbaspur in the district of Murshidabad in 1930. In his early days, he enjoyed a bohemian life style. Once he joined a folk drama group 'Aalkaap' (আলকাপ) and travelled the districts of Murshidabad, Malda, Burdwan, Birbhum and also performed in Kolkata. In those days, he used to perform whole night and sleep in day time. He used to play flute. He was a teacher of folk dance and drama. But oneday he got tired of this life and felt he had a wider life spreading around him. He turned his face to writing poetry and short stories. Later he came to Kolkata and enter the world of serious writings and immediately became famous for his short stories. Inti pisi o ghatbabu (ইন্তি পিসি ও ঘাটবাবু), Bhalobasa o down train (ভালবাসা ও ডাউন ট্রেন), Hizal Biler Rakhalera (হিজল বিলের রাখালেরা) and Taranginir Chokh (তরঙ্গিনীর চোখ) brought fame for him. He joined one Bengali daily news paper as a journalist and minded in serious and creative writing. He wrote around 150 novels and 300 short stories. His short stories Uro pakhir Chhaya (উড়ো পাখির ছায়া), Manusher Janma (মানুষের জন্ম), Ranabhumi (রণভূমি), Rakter Pratyasha (রক্তের প্রত্যাশা), Maati (মাটি), Goghna (গোঘ্ন), Mrityur Ghora (মৃত্যুর ঘোড়া) immediately attaracted the bengali readers and intellectuals. He got "Ananda Puraskar", "Bankim Puraskar", "Sahitya Akademy Puraskar", "Bhualka Puraskar", "Narsingdas Puraskar" and a lot of awards for his literary excellence. His first novel is Neel Gharer Nati (নীলঘরের নটী). The other novel Trinabhumi (তৃণভূমি) (and also Kingbadantir nayak (কিংবদন্তীর নায়ক), Aleek Manush (অলীক মানুষ) and Uttar Jahnabi (উত্তর জাহ্ণবী)) was a big success and was translated into all major Indian languages. His short stories "Mrityur Ghora (মৃত্যুর ঘোড়া)", "Rakter Pratyasha (রক্তের প্রত্যাশা)", "Goghna (গোঘ্ন)" and many other stories have been translated in different languages. He is also a creator of a detective character "Goenda Colonel (গোয়েন্দা কর্নেল)" - Detective Colonel. An ex-Colonel Niladri Sarkar is the hero to find out the culprit or killer. The stories are so interesting that Siraj has got own fan followings. From children to old people, there are huge number of readers who are fond of Colonel Niladri Sarkar. A retired Colonel – Niladri Sarkar – was the eccentric sleuth in Syed Mustafa Siraj’s stories, narrated by a lazy journalist (Jayanta) who accompanied him on his missions. The colonel was a butterfly collector and ornithologist, smoked pipes and had a Santa beard. He was also jovial and liked quoting Bengali proverbs & nursery rhymes. Siraj did not start his career writing for children. His reputation was built on writing novels & short stories for adults. He started writing for children to respond the huge demand for that genre in Bengali.
"মেয়েদের মতো দীঘল কেশ, দুহাতে চাঁদির চুড়ি, নীলচে শার্ট আর পাজামা, পায়ে কাবুলি চপ্পল, ফরসা মুখের চাপা চিবুক, মসৃণ নিটোল গাল, টানা চোখ, পুরুষ তবু পুরুষ নয়, নারী - অথচ নারীও না; সে কিম্পুরুষও নয় - সে এক অমর্ত্য মায়া।তাকে নিয়েই দেশে দেশে মৃদঙ্গ বাজে।"
বিষয়বস্তু দুঃসাহসী। লেখকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রচিত বলে বেশ প্রামাণিক। কিন্তু ওই পর্যন্তই। গভীরতর কোনো বোধ বা অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায় না।
১. একটাই অপরাধ আমি বারবার করি পুরুষ হয়েও পুরুষের প্রেমে পড়ি
পুরুষের প্রতি পুরুষের প্রেম কেমন হতে পারে? হতে পারে বন্ধুত্ব এক রকম, কতই তো থাকে আমাদের মাঝে। একটা ভালোবাসা, ভরসা, স্বস্তির জায়গা তৈরি হয়। কিন্তু সেটা নিছক বন্ধুত্ব, সেখানে কাম থাকে না। যখনই সমলিঙ্গের প্রতি একটা কামজ তাড়না চলে আসে, তখনই তার নাম 'সমকামিতা'। কিন্তু এর বাইরেও কি কিছু হতে পারে?
২. এই বাংলায় এককালে ছিল কবি গান, ছিল যাত্রা-পালা। তারপ সিনেমা বায়স্কোপ এসে সে সবের জায়গা নিয়ে নিলো। ভারতবর্ষে সিনেমা যেদিনই আসুক, প্রান্তিক মানুষের কাছে তা পৌঁছেছিল অনেক অনেক পরে। তারা তখনও মেতেছিল যাত্রা নিয়ে। খুব বেশীদিন না, তিরিশ চল্লিশ বছর পেছনে গেলেই হয়ত যাত্রার জন্য উন্মুখ দর্শক ছিল। কিন্তু যাত্রা, কবিগান বলতে আমরা বাইরে থেকে কিংবা 'একাডেমিক' ভাবে যা জানি, তার বাইরেও কিছু ছিল।
আলকেপ বা আলকাপ; যাত্রাও নয় কবিগানও নয়। এ এক অন্য রকম অনুষ্ঠান। অনেকটা যাত্রা আর অনেকটা কবিগানের মিশেলে তৈরি এই আলকাপ এক সময় জনপ্রিয় হয়েছিল রাঢ় অঞ্চলের মানুষের কাছে। কাপ এর অর্থ করা যায় নাটক, ব্যঙ্গাত্মক নাটক। যেখানে একজন সঙ্গের অভিনয় করে মানুষকে হাসায়। আলকাপ এমন সব নাটক করতো যা ছিল কবিগানের মতো দুই পক্ষের লড়াই কিন্তু সেখানে সঙের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতো। বিভিন্ন মেলায় রাতভর চলতো আলকাপ।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়, আলকাপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল 'ছোকড়ার নাচ'।
যাত্রায় এককালে পুরুষকে মেয়ের বেশে সাজানো হতো, একথা সবাই জানে। এর অন্যতম কারণ ছিল সেকালে নারীর আব্রু রক্ষার প্রবণতা। লোকচক্ষুর সামনে নাচার কথা তারা ভাবতেও পারতো না, আবার বরাঙ্গনাকে আসরে নামানোও তাদের রুচির বাইরে ছিল। অগত্যা পুরুষকেই নিতে হতো নারীর বেশ। কিন্তু আলকাপ তা নয়। সেখানে নারী-বেশে এই পুরুষ এক মায়ার নাম।
হ্যাঁ, 'মায়া' শব্দটাই ব্যবহার করেছেন সৈয়দ সিরাজ। উপন্যাসের শুরুতে যাকে প্রধান চরিত্র মনে হয়, সে আলকাপ দলের ওস্তাদ ধনঞ্জয় সরকার, যে ওস্তাদ ঝাকসা বা ঝাকসু নামে পরিচিত। ধনঞ্জয়ের তিন স্ত্রী। শেষটি গঙ্গা, নিজে এসে জুটেছে, কাপ (নাটক) সেরে ফেরার সময়। ধনঞ্জয় তাকে ফেলে দেয়নি, রেখেছে স্ত্রীর মতো কিন্তু মন্ত্র সে পড়েনি।
অদ্ভুত লোক এই ওস্তাদ ঝাকসা। কখনও সে উচ্চতর দর্শনের কথা বলে, পর মুহূর্তেই মুখ-খিস্তি করে ওঠে। আসরে নামলে একদম অন্য মানুষ। গানে গানে আসর মাতিয়ে রাখে। চারদিকে প্রচুর নামডাক ওস্তাদ ধনঞ্জয়ের। সে ঝাকসুর দলের নাচিয়ে ছোকরার নাম শান্তি। অল্প বয়েস, পেলব দেহের শান্তি আসরে নামলে মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয় চাঞ্চল্য। দলের মধ্যেও শান্তিকে নিয়ে ঈর্ষা চলে। এমনকি ডাকাবুকো ওস্তাদ ঝাকসুও শান্তির গা ঘেঁষে ঘুমায়।
ঝাকসুর স্ত্রী গঙ্গা, যুবতী। নিজ গ্রাম, মানুষ ছেড়ে চলে এসেছিল ওস্তাদের পিছু পিছু। সেই গঙ্গাকে একদিন ধনঞ্জয় দেখলো পুকুরপাড়ে, শান্তির সঙ্গে জোর মিলিয়েছে।
যে ধনঞ্জয়কে ভয় করে দলের লোক, ভক্তি গদগদ হয়ে প্রণাম করে অনেক মানুষ, সেই ধনঞ্জয় এই দৃশ্য দেখে যৌন ঈর্ষায় কাতর। সে ঈর্ষা, তার নারীটিকে অন্য পুরুষকে ভোগ করেছে বলে নয়, বরং তার কাঙ্ক্ষিত পুরুষটি অন্য নারীতে উপগত বলে।
আলকাপে এই এক অদ্ভুত কাণ্ড। মারদাঙ্গা পুরুষগুলো দলের নাচিয়ে ছোকরার জন্য পাগল। তা যে কেবল ঝাকসুর দলে, তা নয়। অন্য সব আলকাপের দলেও একই দশা।
শান্তি পালিয়ে যায় দল থেকে, বিষ খায় গঙ্গা। কিন্তু ঝাকসুর আলকাপ থেমে থাকে না। সেখানে এসে যোগ দেয় সনাতন মাস্টার আর সুবর্ণ।
সুবর্ণ আরেকটি ছোকরা। সে সনাতনের সঙ্গী। কিন্তু ঝাকসুর দলে আসতেই যেন সবাই তার দিকে হাট বাড়িয়ে বসে আছে। এমনকি এক সময় ঝাকসুও কিছুটা দুর্বলতা দেখায় তার প্রতি। কিসের এই দুর্বলতা, পুরুষের প্রতি পুরুষের? যৌনতা? সমকামিতা?
৩. আমরা সাদা কথায় সমকামিতা বলে আজ যা বুঝি, তা হলো পুরুষের প্রতি পুরুষের যৌন আকর্ষণ। সেখানে কাম প্রধান। অর্থাৎ, দুটি পুরুষ এমন সম্পর্কে আবদ্ধ থাকলে তাদের মাঝে যৌন ক্রিয়া সংঘটিত হবে। এমনকি সমলিঙ্গের মানুষের মাঝে এই সম্পর্কের মূলে থাকে শরীরী প্রবৃত্তি। কিন্তু আলকাপের মানুষদের এই প্রীতি, সমকামিতার শরীরী আকর্ষণ নয়।
সৈয়দ সিরাজ, ঝাকসুর মুখ দিয়ে এই আকর্ষণকে বলেছেন 'মায়া'। অর্থাৎ, নৈবক্তিক এক সম্পর্ক। যেখানে পাশাপাশি কাজ করা মানুষের মাঝে সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
শান্তি কিংবা সুবর্ণ, দুজনেই পুরুষ। তাদের মাঝে পৌরুষ আছে। সেটি গঙ্গার সাথে শান্তির সঙ্গমে প্রমাণিত। শান্তি, সুবর্ণ-র দেহের গঠন, বাচনে নারীদের ছাপ আছে। কিন্তু তারা নারী নয় এমনকি আজ যাদের তৃতীয় লিঙ্গ (হিজড়া) বলা হয়, এরা তা-ও না। কেবল এক কিশোর, যার মাঝে কিছু নারীসুলভ আচরণ, ভঙ্গিমা রয়েছে। তাতেই তাদের প্রতি আকর্ষিত হয় পুরুষেরা।
তাহলে কি ওইসব পুরুষেরা সমকামী?
মোটেই না। ঝাকসা ওস্তাদের তিন স্ত্রী ছিল। তার সাঙ্গাল (যে সঙ সাজে) ফজলের স্ত্রী সন্তান আছে। আখ্যানের শেষে সনাতন পালিয়ে যায় সুবর্ণকে নিয়ে, অথচ সেও সুধামুখীর প্রতি আকর্ষিত। অর্থাৎ নারীর প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ তাদের আছে। তবে কি উভকামিতা?
গঙ্গা বিষ খেয়েছিল, কেননা ধনঞ্জয় শুয়ে থাকে শান্তির সঙ্গে। পতিসুখ তার হয়নি। তাই একদিন পরীক্ষা করেছিল, শান্তির পুরুষত্ব। প্রমাণও পেয়েছিল। সেদিনই গঙ্গা বুঝেছিল, পুরুষের প্রতি পুরুষের এই আকর্ষণের মাঝে এমন কোন রহস্য আছে, যা ভেদ করা তার সাধ্য নেই। আটকানোরও না।
এই এক ধরনের সম্পর্ক, যার কোন ব্যাখ্যা সহজে দেওয়া যায় না। যেখানে পুরুষেরা আকর্ষিত হয় এক পুরুষের প্রতি, যার মাঝে রয়েছে নারীসুলভ আচরণ। ঘর সংসার ছেড়ে দিয়ে পড়ে থাকে তার পিছে। এমনকি অনেকে দল ছাড়ে না কেবল তার সঙ্গ সাধের জন্য। অনেকটা আজ যেমন নায়িকাদের জন্য আমাদের আকুতি, তেমন। ঘেঁটু গানের কথা লিখেছেন হুমায়ুন আহমেদ, লিখেছেন ঘেঁটুপুত্রদের কথা। ঘেঁটুপুত্র-র সাথে মিল থাকলেও সেখানে যে যৌনতার কথা আছে, সে রকম কিছুর ইঙ্গিত পরিষ্কার ভাবে এই উপন্যাসে নেই।
৪. বাংলা সাহিত্যে নতুন নতুন বিষয় নিয়ে নিরীক্ষা ধর্মী উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ একটি উল্লেখযোগ্য নাম। মুর্শিদাবাদের খোশবাসপুরে জন্ম এই লেখক নিজেই একটা সময় আলকাপের সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৫ সালে নিজ গ্রাম খোশবাসপুরে একটি আলকাপ দল গঠন করেন তিনি। ১৯৫০ সালে সৈয়দ সিরাজ সাঁওতাপাড়ার আধুনিক আলকাপ দলে যোগ দেন। আধুনিক আলকাপের বৈশিষ্ট্য হলো, এরা পুরনো ধাঁচের কাপ (নাটক) ছেড়ে নতুনত্ব আনছিলো। তবে দলের সঙ্গে ভুল বঝাবুঝিতে সাঁওতাপাড়ার দল থেকে ১৯৫৩ সালে তিনি চলে যান মহালন্দির সন্নিকটস্থ ডাঙাপাড়ার দলে। ১৯৫৪ সালে আবার যোগ দেন নবগ্রাম থানার পলাশগ্রামের আলকাপে। দু’ বছরেরও পর সাহিত্য চর্চার তাগিদে সৈয়দ সিরাজ আলকাপ ছেড়ে দেন।
কর্ণসূবর্ণের কাছে ভরাট-এ ওস্তাদ ঝাঁকসার দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য সাঁওতাপাড়ার দল বায়না পেয়ে সিরাজ মাষ্টারের ডাক পড়েছিল। সেখানে তার গান শুনে ওস্তাদ ঝাঁকসা প্রশংসা করেন, এবং ঝাঁকসার গান শুনে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেন। তারপর দুজনে নলহাটির নিকটে গোবিন্দপুরের কাছাকাছি কোনো এক জায়গায় গান গাইতে যায় সাঁওতাপাড়ার দল। বিপক্ষে ছিলেন গোবিন্দপুরের মনকির হোসেন। দু’দিন গান গাওয়ার পর ঝাঁকসা চলে যায়, সাঁওতাপাড়ার দল গান করতে থাকে। সেখানে এক বাল্যসঙ্গিনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় সিরাজের, তারা একসময় হাবোল গোঁসায়ের কাছে গান শিখতো একসঙ্গে, সেই সঙ্গিনী তখন এক প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষকের স্ত্রী, তাদের বাড়ি যাওয়ার এবং খাওয়ার নিমন্ত্রণ পায়, সিরাজ দলের ছোকরা সুধীর দাসকে সঙ্গে নিয়ে খেতে যায়, ১৯৫৩ সালে সুধীর সাঁওতাপাড়ার দল ছেড়ে চলে যায়, সিরাজও ওইসময় দল ছাড়েন।
নিজের সেই অভিজ্ঞতা আর কল্পনাকে কাজে লাগিয়ে আলকাপের মানুষদের নিয়ে 'মায়ামৃদঙ্গ' উপন্যাস লিখেছেন সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ। বাস্তবের সিরাজ, সুধীর থেকেই উপন্যাসের সনাতন আর সুবর্ণ চরিত্ররের সৃষ্টি। ঝাঁকসা, ফজল, শান্তি, গঙ্গা, সনাতন, ফজল, সুবর্ণদের জীবন নিয়েই এই উপন্যাস রচিত। আমরা কখনও আলকাপের সঙ্গে চলে যাই তারাশঙ্করের কবিয়াল নিতাইয় আর বসন্তের কাছে। এই উপন্যাস যখন রুক্ষ রাঢ়ের কথা বলে, সেখানকার মানুষদের কথা বলে, কথা বলে আলকাপের, তখন পাঠককে একবার হলেও হাঁসুলী বাঁকের কাহারদের কথা মনে পড়বে।
৫. মানুষের সম্পর্কের যে রহস্যের কথা লিখেছেন, রহস্য ভেদ করেননি ঔপন্যাসিক নিজেও। অবশ্য করবেনই বা কেন, তিনি ঔপন্যাসিক। যৌন কিংবা মনোবিজ্ঞানের গবেষক নন। কিংবা '৭২ সালে সে কথা সবিস্তারে আলোচনা সম্ভবও ছিল না। মুস্তফা সিরাজ উপন্যাস লিখেছেন। লিখেছেন রুক্ষ রাঢ়ের মানুষের কথা। আলকাপ দলের মানুষদের কথা। তাদের সুখ দুঃখ, চাওয়া পাওয়া, হাসি কান্নার গল্প। আমরা এই উপন্যাসে একটা সময়কে দেখতে পাই। সেই সময়ের সামাজিক অবস্থা দেখতে পাই। আমরা ফিরে যাই সেই মেলা আর সার্কাসের দিনগুলিতে। যখন ইলেকট্রিকের আলো ছিল না, সিনেমা বায়স্কোপ এতো জনপ্রিয় হয়নি। কয়েকটা হ্যাজাগ জ্বালিয়ে রাতভর যাত্রা, কবি আলকাপের আসর হতো।
সেই আলোর নিচেই এক অদ্ভুত আঁধার। এক মায়ার আকর্ষণ যা ছাড়িয়ে যাওয়া দুষ্কর। সেই মায়া সাথে নিয়ে যারা পথ চলে, তাদের বুকে মৃদঙ্গ বাজে। মায়ামৃদঙ্গ।
*২০১৬ সালে রাজা সেনের পরিচালনা, দেবশঙ্কর হালদার, ঋতুপর্ণা, পাওলি দামের অভিনয়ে 'মায়ামৃদঙ্গ' সিনেমা তৈরি হয়।
"আলকাপ" রঙ্গরসের এক আঁধার এই আলকাপ। অদ্ভুত এই লোকনাট্যরীতি রাঢ় বাংলার ধূসর মাটির খেটে খাওয়া মানুষদেরকে জাগিয়ে রাখতো রাতের পর রাত। যাত্রা, পালা, কিংবা বায়োস্কোপের মতোন মুখস্ত বুলির কোনো নাচ গান নয় এই 'কাপ'। তৎক্ষনাৎ বানানো সুর, তাল,লয় আর গানের সাথে মায়াময় ছোকরার নাচের মাধ্যমে চলে আলকাপ। মন্ত্রমুগ্ধের মতো আবেশ ছড়ায় আসর জুড়ে। পাঁচের দশকে রাঢ় বাংলা আর কর্ণসুবর্নের মাটিতে দাপিয়ে বেড়ানো আলকাপ নামক লোকনাট্যের বাস্তব অভিজ্ঞতার ছাঁচে বসানো কুশীলবদের জীবনের 'কাপময়' ক্যানভাসে লেখা এই উপন্যাসের স্রষ্টা সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ। লেখক নিজেও ছিলেন বাস্তব জীবনে আলকাপের দলের সদস্য। নিজের জীবনে যা যা দেখেছেন তা ই তুলে এনেছেন এই উপন্যাসের পাতায়। বিলুপ্ত এই লোকনাট্য বহু আগেই স্মৃতি হয়ে গেছে। লেখকের ভাষ্যমতে উনিই ছিলেন আদি অকৃত্তিম আলকাপের সর্বশেষ জীবিত সদস্য।
ধনঞ্জয় সরকার। লোকে ডাকে ওস্তাদ ঝাঁকসা। আশ্বিনের শেষে যার বায়না থাকে দিকে দিকে। আলকাপের আসর জমায় শীত থেকে বসন্ত অবদি। ঘরে তিন স্ত্রী। কিন্তু পাষাণের মতো রাতের পর রাত দল সাথে নিয়ে রুখো মাটির গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে আলকাপের উত্তাপ ছড়ায় নিজের দরাজ কন্ঠে। আলকাপের সিংহ পুরুষ বলে লোকে তাকে এক ডাকে চেনে। দলের 'শান্তি' নামক নাচিয়ে ছোকরা যার প্রধান অস্ত্র।এই নাচিয়ে ছোকরা থাকলে আলকাপের আসর জমে যায় নিমিষেই। এই শান্তিকে নিয়ে অশান্তি দিয়ে উপন্যাসের সূচনা পর্ব। ধীরে ধীরে লেখক দেখিয়ে দেন, কিভাবে আলকাপের আসর থেকে মানব প্রেম শরীর ছাড়িয়ে মনের গোপন অলিন্দে খেলা করে। শান্তি কিংবা সুবর্ন, ধনঞ্জয় কিংবা সনাতন, সঙদার ফজল কিংবা জগু সবার চোখেমুখে প্রেম।মনে প্রেম। আর তাদের জীবন জুড়ে আলকাপ। এক অদ্ভুত জগতের কথকতা আর মায়ময় বর্ণনা সাথে নিয়ে উপন্যাসের যাত্রা চলতে থাকে। আলকাপের জগতে নারী পুরুষের বিভেদটা ক্ষীণ। শরীর ছাপিয়ে মন যেখানে প্রধাণ। এই আলকাপ,এই নাচিয়ে ছোকরার নিষিদ্ধ আবেশ সব মিলিয়ে গঙ্গার ধারের ধনপতনগরের ওস্তাদ ধনঞ্জয় সরকারের ভাষায় এক 'বিরল মায়া' চিত্রিত হয়েছে গোটা উপন্যাসজুড়ে। যেখানে ছোকরাটা নারী কিংবা নারী নয়। পুরুষ কিন্তু পুরুষ নয়। এমন এক মায়ায় 'ধরে নেয়া' -র একটা বোধ গড়ে ওঠে। আর এই বোধটাই সত্যি হয়ে ধরা দেয় সবার কাছে। আলকেপেদের অদ্ভুত বোহেমিয়ান জীবনাচরণ আর মায়াময় পরিভ্রমণের সাথী হতে হলে 'মায়া মৃদঙ্গ' উপন্যাসের শেষ পাতা পর্যন্ত আটকে থাকতে হবে। পরীক্ষণ মূলক লেখনীতে সিদ্ধহস্ত সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ। এই উপন্যাসটা তার সবচেয়ে বড় প্রমান।
"কী দিয়ে মন বুঝাব, এখন আমি কার কাছে যাব। আমার হৃদয়মন্দিরে বাঁশি বাজত দিনো-রাতে রে এখন আমি কী নাম ধরে বাঁশরী আর বাজাব— এখন আমি কার কাছে যাব।।"
গত দুদিন ধরে ধীরে ধীরে পড়ে শেষ করেছি সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের এই 'মায়ামৃদঙ্গ' উপন্যাসটি। উপন্যাসটি প্রথম দিকে আমায় ভালোমতো বেগ দিয়েছে। তাই মন্থর গতিতে না পড়লে হয়তো ঠিক বুঝতে পারতাম না। এই উপন্যাসের সম্পূর্ণ জায়গা জুড়ে রয়েছে 'আলকাপ', তাই উপন্যাসের বিষয়বস্তু বলতে গেলে আগে জানতে হবে 'আলকাপ' কী? 'আলকাপ' বা 'আলকাটাকাপ' হলো রঙ্গরসাত্মক নাটক বা ব্যঙ্গরসাত্মক নাটক। যা কিম্ভূত, যা হাস্যকর, যা উদ্ভট কিংবা যা আদিখ্যেতা—সুরসিকা তাকেই বলে 'আলকাপ' বা 'আলকাটাকাপ'। এই আলকাপে গানের সাথে যাত্রা পালাও হয়, তবে এর সবথেকে আকর্ষণীয় বিষয় হলো 'ছোকরা নাচ'। অর্থাৎ পুরুষদের নারী সাজিয়ে নাচ। "রাত্রির শোভা চাঁদ আর আলোকাপের শোভা এই ছোকরা। পুরুষ—তবু পুরুষ নয়, নারী—তবু নারীও না। তবে কী?"
এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আলকাপের ওস্তাদ, ওস্তাদ ঝাঁকসা অর্থাৎ ধনঞ্জয় সরকার, যিনি এমনিতে খুব কঠোর মানুষ, কথায় কথায় তার আলকাপের দলের লোকদের গালিগালাজ করেন, আসর চলাকালীন পরিবারের কেউ অসুস্থ হলেও তার খোঁজ নিতে তিনি যান না, কিন্তু তিনি তার দলের নাচনী ছোকরাদের প্রতি খুবই দুর্বল, বিশেষকরে ছোকরা শান্তির প্রতি। শান্তিকে তিনি খাইয়ে দেন, হাত ধুইয়ে দেন, তার পাশে সারারাত শুয়ে থাকেন। কিন্তু এই শান্তির সঙ্গেই যখন তিনি তার তৃতীয় স্ত্রী গঙ্গামণীকে আপত্তিজনক অবস্থায় দেখেন, তখন তার বিশ্বাস ভঙ্গ হয়। শান্তি পালিয়ে যায় আলকাপের দল ছেড়ে আর অন্যদিকে গঙ্গামণী বিষ খেয়ে মরে। ���িন্তু গঙ্গামণী যদি শান্তিকে ভালোইবাসতো তাহলে সে বিষ খেল কেন? আর ওস্তাদ ঝাঁকসা, তিনি কী করেন এতকিছুর পর? আলকাপের দলে ফিরে যান নাকি অন্য কোনো পথ বেছে নেন?
উপন্যাসের আরেক অন্যতম প্রধান চরিত্র আলকাপের সনাতন মাস্টার অর্থাৎ সনাতনকুমার রায়। ওস্তাদ ঝাঁকসার শান্তির মতো তার দলে রয়েছে সুবর্ণ। যে রূপে কোনো যৌবনাবতী কিশোরী মেয়ের চেয়ে কম সুন্দর নয়। এমনকি তার কন্ঠস্বরও অনেকটা মেয়েদের মতো। সনাতন মাস্টার হাতে বাঁশের বাঁশি নিয়ে ঘুরে বেড়াতো এদেশ থেকে ওদেশ, মেলা থেকে মেলা। হঠাৎ একদিন সোনাডাঙ্গার মেলার আসরে আলকাপের ছোকরা সুবর্ণর সাথে তার প্রথম দেখা হয়। সুবর্ণর গান শুনে থমকে গিয়েছিল। "সুবর্ণর কন্ঠের গানে কী যেন যাদু আছে।" ওর নাচগানের মধ্যে কাকে যেন খুঁজে পাচ্ছিল সনাতন মাস্টার, কিন্তু সে বড়ো আবছা। তাকে স্পষ্ট করার লোভ জেগেছিল। বাঁশি বাজাতে বাজাতে তার ইচ্ছে করতো আকাশ থে���ে পরী নামুক। হয়তো এগুলোর কোনো মানে নেই। আসলে বাউন্ডুলে চালচুলোহীন জীবনে সে একটা আশ্রয় খুঁজছিল। পেল কি শেষপর্যন্ত আশ্রয়?
ঝিঁঝিডাঙ্গা গ্রামের মেলায় একদিন আলকাপের আসর চলাকালীন সনাতন মাস্টারের সাথে দেখা হয় সুধার। সুধা আর সনাতন মাস্টার তাদের গ্রাম ভদ্রপুরে এক গোঁসাইজীর কাছে একসাথে গান শিখতো। বর্তমানে সুধা গ্রামের সাধুপদ পন্ডিতের বউ। গানের সাথে তার এখন আর কোনো সম্পর্ক নেই। অনেক পরিবর্তনও এসে গেছে তার মধ্যে। সুধার আমন্ত্রণে তার বাড়িতে গিয়ে সনাতন মাস্টার যেন তার ঘরকন্নাটা ভন্ডুল করে দেয়। বৃদ্ধ পন্ডিতকে বিয়ে করে সে সুখী নয়, সে এখনও ভালোবাসে সনাতন মাস্টারকে, তাই সে পালিয়ে যেতে চায় সনাতন মাস্টারের সাথে। অন্যদিকে আলকাপের ছোকরা সুবর্ণ, তার প্রতিও সনাতন মাস্টার ছিল খুবই দুর্বল। পুরুষ নয়, নারী নয়, সে যেন এক মায়া। কার কাছে যাবে সনাতন মাস্টার, সুধা নাকি সুবর্ণ?
এ এক অদ্ভুত জগতের কথকতা। এক মায়াময় জগৎ। যেখানে নারী-পুরুষের ভেদরেখাটা যেন ফিকে হয়ে যেতে যেতে প্রায় মিলিয়ে যায়। একটা শরীর যখন আর একটা শরীরকে ছোঁয়, কে যেন পিছন থেকে হুঁশিয়ারি দেয়। কিন্তু মন মানে কি?... এ এক জাদু পৃথিবী। সমকামিতার মতো বিষয়টি এখানে তুলে ধরা হয়েছে। সমকামিতা বলতে যে শুধু যৌন আকর্ষণকেই বোঝানো হয় না, সেটিই লেখক এখানে তুলে ধরেছেন। পুরুষ হয়েও সে পুরুষের মধ্যেই খুঁজে পেতে চায় তার কাম্য নারীকে। ঘরের নারী তার মন টানতে পারে না। তার মনের সবটুকু জুড়ে থাকে, সেই ছোকরা। যাকে সে হয়তো পায়, হয়তো পায় না। এ এক অদ্ভুত মায়াময় জগৎ। আলকাপের ছোকরা বড়ো কঠিন মায়ায় বেঁধে রাখে পদ্মার এপার-ওপার। সে পুরুষ তবু পুরুষ নয়, নারী অথচ নারীও না, সে কিম্পুরুষও নয়—সে এক অমর্ত্য মায়া!
প্রথম দিকে পড়তে গিয়ে কয়েক জায়গায় বেশ বেগ পেয়েছি, তাই সেই জায়গাগুলো আরও ১-২ বার পড়তে হয়েছে। ধীর গতিতেই পড়েছি উপন্যাসটা এর স্বাদটাকে ভালো মতো উপভোগ করার জন্য। কারণ দ্রুত পড়লে হয়তো কিছু জায়গা বুঝতে পারতাম না।আমি নিজেই যেহেতু বানান ভুল করি, তাই হয়তো বলা উচিত নয়, কিন্তু কিছু বানান ভুল চোখে পড়লো, তবে পড়তে খুব একটা অসুবিধা হয় নি। সবশেষে বলি উপন্যাসটি ভালো লেগেছে, সাথে বইয়ের প্রচ্ছদটিও আমার বেশ ভালো লেগেছে। পাঠকেরা যদি একটু অন্যরকম স্বাদের উপন্যাস পড়তে চান, তাহলে এই উপন্যাসটি অবশ্যই একবার পড়ে দেখবেন।
"কী আনন্দ দেখে গো নভে নবীন চাঁদের উদয়। মায়ায় মায়ায় যাক না জন্ম, যদি আরেক জন্মে সত্যি হয়।"
বাংলা সাহিত্যে পুরুষের প্রতি পুরুষের প্রেম নিয়ে উপন্যাস বোধহয় হাতে গোনা। তাদেরই অন্যতম একটি মায়ামৃদঙ্গ। যদিও শারিরীক প্রেমের চেয়েও আত্মিক, বা মনস্তাত্ত্বিক দিকটাতেই লেখক বেশি আলোকপাত করেছেন। আর, আলকাপের দিকেই নজরটা ছিল বেশি, ফলে আলাদা করে এ দিকটা অনভ্যস্ত পাঠকের মনে তেমন অস্বস্তি জাগায় না। বরং গঙ্গামনি, কিংবা সুধার পরিনতি মনকে বিষণ্ণ করে, ছুঁয়ে যায় কালাচাঁদ খুঁড়োর জীবনটাও। কাপের ছোকরা হিসেবে সুবর্ন বা শান্তির ভেতরকার মানসিক টানাপোড়েনটা বোধহয় আরেকটু ফোকাস করা যেতো, পুরুষ হয়েও নারী সাজার, কিংবা মননে নারী হয়েও পুরুষ শরীরে আটকা পড়ার দুর্বিষহ দিকটা বাদ পরে গেছে মনে হলো... তবুও, সব মিলিয়ে চমৎকার এই মায়া, মায়ামৃদঙ্গ।
অনবদ্য ভাষা এবং প্রকৃতি ও মানুষের মনের অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে সুখপাঠ্য উপন্যাস। কেবল শেষবেলায় নৈতিক সংকট থেকে গেল একটা, কাঁটার মতো বিবেকে বিঁধছে। এমন প্রবল সংকটে সাহিত্যিকের একটা অবস্থান নেওয়া উচিত। এই উপন্যাসে সেই অবস্থান অস্বস্তিকর। না, নৈতিক সংকট বলতে আলকাপের ছোকরা ব্যবস্থার কথা বলছি না।