______________
অন্তর্জলী যাত্রা
______________
"আলো ক্রমে আসিতেছে। এ নভোমণ্ডল মুক্তাফলের ছায়াবৎ হিম নীলাভ। আর অল্পকাল গত হইলে রক্তিমতা প্রভাব বিস্তার করিবে, পুনর্ব্বার আমরা, প্রাকৃতজনেরা, পুষ্পের উষ্ণতা চিহ্নিত হইব। ক্রমে আলো আসিতেছে।"
কমলকুমার মজুমদার এর এই উপন্যাসের প্রথম এই ৩ লাইনের ভেতর কি আছে আসলে? ১৬৬ পৃষ্ঠার পুরো বই পাঠ শেষেও স্পষ্ট ২ টা ভাগ করতে পারি। এই ৩ টা লাইন ও বাকি উপন্যাস। কী অদ্ভূত, সত্য, সুন্দর, গভীর ভোর যেন এখানে!
১৯৫৯ সালে উন্মুক্ত হয় যখন এই উপন্যাস তখন কমলকুমার মজুমদার এর বয়স ৪৪ বা ৪৫ বছর। তাঁর ৮ টি উপন্যাসের মধ্যে সবচেয়ে সার্থক উপন্যাস নাকি 'অন্তর্জলী যাত্রা।'
"আমাদের স্নেহের এ জগৎ নশ্বর, তথা চৈত্ররুক্ষ অগণন অন্ধকার সকলই, মৃন্ময় এবং অনিত্য; তথাপি ইহার, এই জগতের, স্থাবর ও জঙ্গমে পূর্ণিমা;"
এই ৩ লাইনেও কি যেন আছে, জানি না। তবে টানেলের ভেতর নিয়ে যায় কেমন নিখাদ সৌন্দর্য সমেত, এইটুকু বুঝি।
প্রথম দিকে পাঠে মনে হচ্ছিলো, কোন মঞ্চ নাটক দেখছি যেখানে রিয়েলিস্টিক অভিনয় হচ্ছে। স্টেজের অপজিটে দর্শকদের ডার্ক সাইটে বসে কিছু বুঝতে পারছি, কিছু বুঝতে পারছি না কাহিনী। তবে এই বোঝা না বোঝার অনুভূতিটাও ভিন্নরকম যত্নের আর মধুর লেগেছে।
"একথা সত্য যে, মৃত্যুর গভীরতায়, এক মুহূর্তের জন্য চন্দ্র সূর্য্যকে হারাইবার মত স্থিরতা তাহার নাই। যদিচ, সবুজতা তাহার কাছে নিশুতি রাত্রের ঝিঁ ঝিঁ স্বর এমত, যদিও আপনার নিঃশ্বাস পরিদৃশ্যমান আলোকে আড়াল করিয়াছিল, যদিও স্পর্শবোধ ভোরের পাখির কণ্ঠস্বরে উধাও।"
তো অনেকটা পড়েই খেয়াল করি মঞ্চ নাটক না। আমিই কখন চরিত্রগুলোর একজন হয়ে গঙ্গার ধারের শ্মশানে বসে আছি চরিত্রগুলোর সাথে। হাভাতে অবস্থা যেন আমার এবং বুড়ো সীতারামের মৃত্যুর অপেক্ষা করছি যেন। কখন জ্বলবে চিতা?
"বৈজুনাত যশোবতীর দিকে তাকাইল। ঘাসে মুখ রাখিয়া হরিণী যেমত চাহিয়া থাকে, সেইরুপ দৃষ্টি দেখিতে পাইয়া সে থ' হইয়া গেল।"
কিছুক্ষণ পর পড়তে পড়তে খেয়াল করি, আমি উপন্যাসে নাই। উপন্যাসের পাশ দিয়ে হাঁটছি। বার-বার খেই হারিয়ে ফেলছি। আরেকটু পর দেখি চেষ্টা করছি আপ্রাণ মিশে যেতে উপন্যাসে কিন্তু লেখক এই মিশতে দিচ্ছেন এই বের করে দিচ্ছেন উপন্যাস থেকে। তখন মনে হল উপন্যাসটা কী তাহলে কোন মঞ্চ নাটকের দলের রিহার্সেল রুমের মত যেখানে যা খুশি করতে পারবে শুধুু অভিনেতা-অভিনেত্রীরা?
"মানুষের কখনই কেহ নাই একথা সত্য, নিকটে কেহ নাই একথা ভয়ঙ্কর সত্য।"
ততক্ষণে কাহিনী বুঝতে আমি হাল ছেড়ে দিয়েছি। কিশোরী বধূ যশোবতীর আগমন আরও আগে হয়ে গিয়েছে। আমি মত্থিত হচ্ছি তখন এই বইয়ের সুরে। যে নিজস্ব স্বর, বলয় একমাত্র কমলকুমার মজুমদার এর।
কীভাবে একজন এভাবে একটা সার্কেলের ভেতর পাঠককে রেখে দিয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে থামালেন? প্রাকৃতজনেরা কত স্পষ্ট চরিত্র হয়ে নিজস্ব কংক্রীট ধর্মবিশ্বাস নিয়ে এসেছে! অঅনুকরণীয় নিজস্ব এই স্বর যেন কাঠ খোদাই শিল্পীর ন্যায় নিমগ্ন কাজ। পুরো উপন্যাস ফ্লোলেস পড়া অসম্ভব। খেই হারাতেই হবেই খানিক বাদে বাদেই। একটা সময় কাহিনী আমি আর খুঁজি নাই। থেকে গেছি এর নিদারুণ বহতা সুরে। হঠাৎ হঠাৎ এক পশলা ভরাট বৃষ্টির পরের আবহ��ওয়ার মত কী গহীন সুন্দর উপমা, বর্ণনা এই বইতে!
আচ্ছা, উপন্যাসও তাহলে এমন হতে পারে? আমার কাছে মনে হয়েছে, যে টিপিকাল ধারণা আছে উপন্যাস, নাটক, কবিতা নিয়ে তার কিছুই না 'অন্তর্জলী যাত্রা'। 'অন্তর্জলী যাত্রা' বা শেষ যাত্রা আসলে অন্তর্জলী যাত্রাই। 'অন্তর্জলী যাত্রা' যেন একাধারে উপন্যাস, নাটক, কবিতাও এবং একদম দেশজ!
এখন শেষ করি দীর্ঘ এই বাক্য দিয়ে। বার বার ফিরে আসতে চাই "অন্তর্জলী যাত্রা" তে।
"তাঁহার আজন্ম সযত্নে রক্ষিত অভিমান, দেহের মধ্যে পলকেই কুম্ভকের সৃষ্টি করিল, প্রথমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নিঃশ্বাস এবং তদনন্তর নেত্রে অশ্রু দেখা দিল, এখন বিগলিত হয়; তবু এ সত্য অনস্বীকার্য্য যে, অষ্টলক্ষণ সমুদয় প্রভাবসম্পন্ন, ফলত ললাটে স্বেদবিন্দু ও অন্তরের পুলক আকল্প-নবীন একভাবের সূচনা-নয়নে উন্মীলন আকাঙ্ক্ষায়, কৃষ্ণ মেঘোদয়ে ময়ূরসমান; এবং ধীরা, নবোঢ়া, লাজুক, শীলা, বিহবলা, বিড়ম্বিত, মুহ্যমান-বিষাদময়ী যশোবতী প্রগলভা হইলেন, আপনকার দেহ হইতে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হইল; তিনি মুহুর্মুহুঃ বলিতে লাগিলেন, 'সত্যিই...সত্যিই মায়া হয়" বলিতে বলিতে আপনার ভগ্নস্বরে আপনি সম্মোহিত হইয়া, জরাজীর্ণ কালাহত স্বামীর কণ্ঠ ঝটিতি আবেষ্টন করত রমণী জীবনের, প্রকৃতির জীবনের, প্রথম, মধ্য এবং শেষ এবং শ্রেষ্ঠ আশ্রয় গ্রহণ করিলেন।
__________