হাসনাত আবদুল হাইয়ের প্রেরণা মানুষের শক্তি মানুষের ক্ষমতা ও মানুষের সাহস। প্রতিভাবান, শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব নিয়ে উপন্যাস লেখার উদ্যোগ হাসনাত আগেও নিয়েছেন এবং তাদের আবগে ও প্রেরণা, স্বভাব, ভাবনা এবং ক্ষোভ ও বৈশিষ্ট্যচিহ্নিত করার জন্য উপন্যাসরে প্রচলিত রীতির বাইরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে হাসনাত আলাপ করেন, দিনের পর দিন তাদের কথা শোনেন। তিনি নিজেও কথা বলেন, কেবল প্রশ্ন করা নয়, মতামত দেন, মন্তব্য করেন এবং এইসব সংলাপেই পাঠক আরজ আলীর সংশয়, তাঁর বিদ্যাচর্চা, সংকট, তাঁর লাখো লাখো ছাপা, বই প্রকাশ, বইয়ের প্রচার প্রভৃতি বিষয়ে জানতে নায়ককে চিনতে পারেন। বলতে গেলে এইসব সংলাপের বিন্যাসেই গড়ে ওঠে উপন্যাস। -আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
হাসনাত আব্দুল হাই (English: Hasnat Abdul Hye) একজন বাংলাদেশি লেখক এবং প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক। তিনি ঢাকা, ওয়াশিংটন, লন্ডন ও কেমব্রিজে লেখাপড়া করেন। তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, জগদীশ চন্দ্র বসু পুরস্কার, শের-ই-বাংলা পুরস্কার, এস.এম. সুলতান পুরস্কার, শিল্পাচার্য জয়নুল পুরস্কারে ভূষিত হন।
আরেকটু বিস্তারিত হলে ভালো লাগত। তবে আরজ আলীকে নিয়ে যতই জানি বিস্মিত হই বারবার। এত সুযোগ সুবিধা পেয়েও আমরা তাঁর মতো দৃঢ়চেতা হতে পারিনি। এত সাহসী আর এত অন্ত:র্দৃষ্টিসম্পন্নও না।
জীবনীভিত্তিক উপন্যাস রচনায় হাসানাত আবদুল হাইয়ের বিশেষ পারদর্শীতা লক্ষণীয় । ছোট্ট পরিসরেও একজন দৃঢ়চেতা আরজ আলী কে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন । বইটা পাঠকের আগ্রহ উস্কে দেয় আরজ আলী মাতুব্বর এর রচনাবলীর প্রতি।
This book is scatter like a film of nolan.Writer wants to parallel Galileo and aroz ali in a same format.But those who read aroz ali omnibus found nothing new.This book is a concise version of aroz ali's autobiography.those who don't know aroz ali, they will be motivated
বইটিতে আরজ আলীর বহু বৈচিত্রময় জীবনের কথা বলা আছে। কিন্তু আমার ধারণা ছিলো অনেকটা হিস্টোরিক্যাল ফিকশান ধাঁচে লেখা হবে। সেরকম কিছু হতে গিয়েও হয়নি। আরেকটা লক্ষণীয় ব্যপার, পাঠক সমাবেশের মতো প্রকাশনীর বইতে এতো পরিমাণ বানান ভুল আগে চোখে পড়েনি। পুরো বইয়ের অন্তত চল্লিশ শতাংশেরও বেশি পৃষ্ঠায় দৃষ্টিকটু রকমের বানান ভুল চোখে পড়েছে, যেটা প্রুফরিডিং এর উদাসীনতা মনে হয়েছে। উল্লেখ্য, আমার সংগ্রহের বইটি ৩য় সংস্করণের।
১৬৩৩ সাল। গ্যালিলিওকে রোমান ক্যাথলিক পোপরা বন্দী করে নিয়ে গেলো, তাকে দিয়ে মিথ্যা কনফেস করালো এই বলে যে : সূর্য সৌরজগতের কেন্দ্র, এ কথা মিথ্যা, সে ভুলে এই কথা বলেছে। তারপর তাকে শর্ত দেয়া হয়, বেঁচে থাকতে চাইলে সারাজীবন তাকে তার ঘরে বন্দী থাকতে হবে - সে বিজ্ঞানসাধনা করতে পারবে, কিন্ত কাউকে তা প্রকাশ করতে পারবে নাহ। বেঁচে থাকার জন্যে সে তা মেনে নেয়। কিন্ত গোপণে তার বই " ডিসকোর্স " সে হল্যান্ডে পাঠায়ে দেয়।
১৯৫০ সাল। পাকিস্তান মাত্রই ক্ষমতা পেল বর্তমান বাংলাদেশের। নতুন এই দেশের শুরুতেই সরকার অনেক রক্ষণশীলতার আশ্রয় নিলো : প্রচলিত কথার বাহিরে কথা বলা সবাইকেই ধরে ধরে কমিউনিস্ট ট্যাগ দিয়ে জেলে ঢুকানো শুরু করলো।
এভাবেই একদিন বরিশালের এক পুলিশ থানায় ধরে আনা হলো প্রত্যন্ত গ্রামের এক কৃষককে। অভিযুক্ত করা হলো,সে সমাজে বিদ্রোহ করতেসে, অপ্রচলিত কথা বলে মানুষকে উত্তপ্ত করে তুলছে। তাকে বলা হলো রাষ্ট্রবিরোধী, কমিউনিস্ট।
থানার ওসি কৃষককে ভালোভাবে লক্ষ্য করলেন। দরিদ্র, অতি সাধারণ এক চাষী। কতটুক পড়াশোনা করছে জিগেস করলে জানায়, মক্তবে ক্লাস টু পর্যন্ত পড়াশোনা হয়েছে, অক্ষরজ্ঞান আছে। মার্কস, এঙ্গেলসের লেখা পড়েছে কিনা জিগেস করলে জানায় সে এসব পড়েনি : কিন্ত রবীন্দ্রনাথ, বা সমসাময়িক লেখকদের লেখা পড়েছে, বরিশাল লাইব্রেরীতে পড়াশোনা করে। সত্যের অনুসন্ধান করে, জ্ঞান অর্জনের তীব্র আকাঙ্গা তার মধ্যে।
কথা বলে ওসি বুঝলেন, এ রাষ্ট্রবিরোধী নাহ। এলেমদার এক সহজ সরল নিরীহ মানুষ।মানুষদেরকে সে কেন বিগড়ায় জানালে সে জানায়, সে মানুষকে কোনোভাবে আঘাত করে নাহ, বরং তার প্রশ্ন শুনেই মানুষ আঘাত পায়। কিসব লেখালেখি সে করে,সেসব এর কথা শুনেই তারা তাকে মারতে আসে।
তখনকার সময়ে এক অখ্যাত কৃষক থেকে এসব শুনে ওসি ঘাবড়ায়ে যায়। বুঝে, মানুষটা নির্দোষ, কিন্ত হাকিম তহ ইতিমধ্যেই তাকে জেলে ভরার নির্দেশ দিয়ে গেসে। কোন ধারায় তাকে জেলে ভরবে সেটাও সে বুঝে পায় নাহ। তখন ওসি তাকে দিয়ে বন্ড সাইন লেখায়, পাকিস্তানে বসে সে যেন আর লেখালেখি নাহ করে - কিংবা করলেও প্রকাশ নাহ করে,কাউকে পড়তে নাহ দেয়।
এতক্ষণ যার কথা বলছিলাম, তিনি হলেন আরজ আলী মাতুব্বর, একজন অখ্যাত অশিক্ষিত চাষা,যে পরবর্তীতে তৎকালীন বুদ্ধিজীবী সমাজের ভিতই নড়িয়ে দেয়।
আরজ আলী তার কথা রেখেছিলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরেই তার লেখা বই "সত্যের দর্শন" প্রকাশ করা হয়।
" একজন আরজ আলী " বরিশালের লাউছড়া গ্রামের সেই অশিক্ষিত কিন্ত স্বশিক্ষিত চাষা আরজ আলীকে নিয়েই, তার জীবনী নিয়ে লেখা জীবনী উপন্যাস। উপন্যাসটিকে খুব গোছানো বলে আমার মনে হয়নি যদিও : তবে আরজ আলীকে চেনার জন্যে, তার লেখা পড়তে আগ্রহী করতে বইটির গুরুত্ব অনেক। ১৯৮০ - ৯০ এর দশকে যার লেখা পুরো শিক্ষিত সমাজের ভিত নড়িয়ে দিয়েছিলো : একজন বাঙ্গাল অশিক্ষিত চাষীও যে নিজ থেকে পড়াশোনা করে এমন লেখা লেখতে পারে,তা কেউই কল্পনা করতে পারেনি। কিন্ত আফসোসের বিষয় এই যে,এখন কেউই তার কথা মনে রাখেনি।
একজন প্রথাবিরুদ্ধ বিনম্র মানুষ, প্রথম জীবনে বই কেনার টাকা ছিল নাহ, আগের ক্লাসের পাশ করে ফেলা পাড়া পড়শির বই মাঠে কাজ করার সময়ে বসে বসে পড়ে শিখেছেন, ১২ মাইল পথ পায়ে হেঁটে লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়তেন, শেষ বয়সে গ্রামে লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করেন, নিজের শরীর দান করে বিজ্ঞান সাধনায়। নতুন প্রজন্মের তার লেখা পড়ে শেখার আছে অনেক কিছুই।
আরজ আলী মাতুব্বর সমগ্র পড়ার সুবাদে যা জানতাম তার চেয়ে খুব নতুন কোন তথ্য পাওয়া গেল বলে মনে হল না।আর খুব বেশিই স্বল্প পরিসরে লিখা মনে হল।যদিও গ্যালিলিও ও আরজ আলীর কাহিনী সমান্তরালে নেওয়ার পরিকল্পনাটি ভালো কিন্তু ঠিক মত যেন প্রয়োগ হয় নি।অন্তত আরজ আলী মাতুব্বরের মত একজন চরিত্রকে নিয়ে লিখা আরো বৃহৎ ও তথ্যবহুল আশা করেছিলাম।
গণতান্ত্রিক একটা দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে প্রোপাগান্ডা। আর সেটা যদি হয় বাংলাদেশের মত কোন দেশ তাহলে তো কোন কথাই নেই। আরজ আলী বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক লোক যিনি বাল্যকালে নানা কারণে শিক্ষার সুযোগ সুবুধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। পরবর্তীতে তার একক প্রচেষ্টায় তিনি শিক্ষিত হয়ে ওঠেন। তারই এক অনবদ্য সংগ্রামের কাহিনী এবং সংগ্রাম পরবর্তী নানা উপাখ্যান ঠাই পেয়েছে এই লেখায়।