লেখক, গীতিকার আর পেশায় চিকিৎসাবিজ্ঞানী সেজান মাহমুদের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার ও ইয়াঙ্কিদের দেশকে অন্যদৃষ্টিতে আবিষ্কারের কাহিনি এই বই। একে ভ্রমণকথা নয় বরং স্মৃতিকথা বলাই সমীচীন হবে।
নব্বইয়ের দশক চলছে। মেডিকেল কলেজে পড়া শেষ করেছেন সেজান মাহমুদ। কি করবেন তখনও ঠিক করে উঠতে পারেন নি। হঠাৎ ঘটনাচক্রে এক প্রতিবেশীর যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার ফর্ম পূরণ করতে গিয়ে উৎসাহ পেলেন নিজেই উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার। আবেদন করলেন মার্কিনমুলুকের অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে। জবাব আসে না, আসে না। জবাব যখন আসল তখন দেখলেন পড়ার সুযোগ হয়েছে মলিকিউলার বায়োলজিতে। এই বিষয় সম্পর্কে ধারণা নিতে গবেষণার সুযোগ পেলেন বারডেম হাসপাতালে। তখনও দেশে বহুমূত্র ওরফে ডায়াবেটিক ব্যাধিটি প্রকট আকার নেয় নি। লোকেও ততটা জানে না। সেই প্রেক্ষাপটে ধারণা দিতে চেয়েছেন তখনকার পরিস্থিতি নিয়ে।
সুযোগ পেয়েছেন বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয় হার্ভাডের মেডিকেল স্কুল তথা ফ্যাকাল্টির অন্তর্গত জেসলিন মেডিকেল সেন্টারে পড়ার।
কোনোভাবে টাকা-পয়সার ব্যবস্থা করে পাড়ি জমালেন যুক্তরাষ্ট্রে। গিয়ে আবিষ্কার করলেন এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সেদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক ফারাকটা প্রথমেই বুঝতে পারলেন। দেখলেন "প্রাইমাল স্ক্রিম" নামক নামক এক অনুষ্ঠান পালনের রীতির। এই অনুষ্ঠান পালনের নিয়ম হল সকল শিক্ষার্থীরা পুরো উদোম হয়ে ক্যামব্রিজ থেকে বের হয়ে আসবে হার্ভাডে। তখন হার্ভাডের শিক্ষার্থীরাও শামিল হয় এই নাঙ্গা কর্মসূচিতে। তা শেষ হয় হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয় যে পাদ্রির নামে সেই জন হার্ভাজের মূর্তিতে মূত্র বিসর্জনের মধ্যদিয়ে।
মেডিকেলের শিক্ষার্থী হলেও সামাজিক বিজ্ঞান ও মানবিক বিষয়ক কিছু কোর্সও পড়েছেন হার্ভাডে। মুগ্ধ হয়ে সেখানকার শিক্ষকদের আন্তরিকতা দেখে। যাঁরা প্রতিনিয়ত ক্লাসে শিক্ষার্থীদের কথা বলার, মুক্তভাবে প্রশ্ন উত্থাপন করার, এমনকি বির্তক করার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করেন। ছাত্রের যুক্তি জোরদার হলে তা মেনে নেন নিঃশঙ্কচে।
যেহেতু সেজান মাহমুদ চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়তে গিয়েছেন। আর তাঁর আগ্রহের জায়গাও সেটি। তাই পুরো বইতে বারবার চিকিৎসাবিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট স্বনামধন্য মার্কিনমুলুকের ব্যক্তিবর্গের নাম এসেছে। যারা লেখকের সরাসরি শিক্ষক ছিলেন হার্ভাডে কিংবা যাদের সাথে তিনি কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। যেমনটি বারডেমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চিকিৎসকদের কথা লিখেছেন। আবার মার্কিনমুলুকের চিকিৎসাব্যবস্থার সাথে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর চিকিৎসাপ্রণালির তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। নিজের স্মৃতি হাতড়ে জড় করেছেন এমন প্রমাণ যেখানে কট্টর রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যানও মেনে নিয়েছেন ডেমোক্রেটপন্থী সেজান মাহমুদের যুক্তি।
বইটি তিনি লিখেছেন অধ্যায়ভিত্তিতে। সেখানে আছে নিজের এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে একেবারে নিজস্ব চেষ্টায় সামনে এগিয়ে যাওয়ার গল্পের। আছে যুক্তরাষ্ট্রে বাঙালিদের কথা। যেমনটি নিজে দেখেছেন মুক্তচিন্তার সূতিকাগার বলে কথিত দেশটির নিজেদের মধ্যেই সাদা-কালোর বৈষম্য। যা তারা ঢেকে রেখেছে "ফাইন আর আইন" এর জোরে। দেখেছেন বিজ্ঞানমনস্ক বলে কথিত মার্কিনিদের দেশেই টিভি চ্যানেলগুলোতে গণকদের আধিপত্য। অবাক হয়েছেন ডারউইনের বিবর্তনবাদ পড়ানো নিয়ে দক্ষিণের রাজ্যগুলোর রক্ষণশীলতা।অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করেছেন নোম চমস্কির মতো মনীষীর অনুষ্ঠানেও লোকে হারিয়ে ফেলছে তাঁর কথা শোনার উৎসাহ!
আলোচনা করেছেন হুমায়ূন আহমেদের "দেয়াল" উপন্যাসে ইতিহাস বিকৃতি নিয়েও। শ্রদ্ধা জানাতেও ভোলেন নি।
সেজান মাহমুদের এই বইতে প্রচুর অপ্রাসঙ্গিক কথা আছে। স্মৃতি তো নয়, যেন নিজের আত্মকথা লিখতে বসেছিলেন। কিন্তু লেখার প্রেক্ষাপট কোনদিকে চলে যাচ্ছে তা খেয়াল করেন নি। নাম বেশ চটকদার। যেকেউ মনে করবে হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে হয়ত বিশেষ কিছু থাকবে বইতে। কিন্তু বিধিবাম! লেখক পড়েছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানে। তা নিয়ে বলতে বলতে যেন পাঠককে সাপের পাঁচ পা দেখিয়ে দেওয়ার উপক্রম করেছেন। তিনি ধরেই নিয়েছেন এই বইয়ের পাঠক হবে চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্পর্কে জ্ঞানধারী। তাই সেসব ঘটনাকে এমনভাবে লিখেছেন আমার মত আমপাঠকের বোঝার নাগালের বাইরে তা। যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নিয়ে লিখছেন, "কল্যাণমূলক রাষ্ট্র" হিসেবে একপ্রকার ঘোষণাই দিতে চাইলেন। অথচ এর আগ্রাসী ভূমিকা নিয়ে কিছুই লিখলেন না।
সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল লেখকের লেখায় সারল্যের বড় কমতি। পাঠককে ধরে রাখার মত এমন কিছু নেই এই বইতে যা ১৮৩ পৃষ্ঠা( প্লাস অনেকগুলো ছবি) পর্যন্ত ধরে রাখবে একজন পাঠককে। শুধুই নামসম্বল একটি দামি বই (টাকার অঙ্কে)।
অনেকদিন উচ্চমার্গের ক্লাসিক বই পড়লে যা হয় আরকি, সাধারণ অপরিচিত বই ছুঁতেও ভয় লাগে, এত কিছু আছে পৃথিবীতে পড়ার জন্য, নতুন বইয়ের পরীক্ষা করতে সাহসের দরকার আছে বৈকি! তাই বইমেলায় ঘোড়াঘুড়ি করতে গিয়ে যে কয়েকটা বইয়ের ওপরে চোখ পড়ে গিয়েছিল, তার মধ্যে এই বইটি অন্যতম ছিল। ‘হার্ভার্ড’ নামটা প্রথমত চোখের দৃষ্টি কেড়ে নেয়ার জন্য যথেষ্ট, দ্বিতীয়ত পাতা উল্টে যখন ‘পাবলিক’ হেলথ’ এ তার পড়াশোনা জানলাম, তখন আমাকে আর আটকায় কে! কিন্তু বইয়ের দাম ৩৩৭ টাকা জেনে আরও একবার ভাবলাম, আমার জন্য এই ঝুকি নেয়াটা ঠিক হচ্ছে কিনা। একটু পরে, নিজেকে আর আটকাতে পারলাম না, লেখকের সাথে অমর্ত্য সেন, নওম চমস্কির ছবিগুলো দেখে এই ঝুকিটা নিয়েই ফেললাম। সত্যি বলতে বইয়ের ৩ ভাগের ১ ভাগ পড়েই মনে হয়েছে বইটির দাম হাজার দু’য়েক হলেও নেয়া উচিৎ হবে। বইটা পড়ে প্রথম যে ধাক্কাটা খেয়েছি তা হল- সেজান মাহমুদ আমার কাছে অপরিচিত একজন হলেও তিনি আসলে অনেকের কাছেই বেশ পরিচিত এবং মোটেই কোন অখ্যাত নবীন লেখক নন। সেজান মাহমুদ বাংলাদেশের একজন সাহিত্যিক, গীতিকবি, ছড়াকার এবং কলামিস্ট। পেশাগতভাবে তিনি একজন চিকিৎসা বিজ্ঞানী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা কলেজ অব মেডিসিনে অধ্যাপক হিসাবে কর্মরত আছেন। পুরোদস্তর অ্যাকাডেমিক মানুষদের নন-ফিকশন যাদের ভালো লাগে, তাদের বইটি ভালো লাগতে বাধ্য (যেমন শাহাদুজ্জামানের আর্মস্টারডাম ডায়েরী ও অন্যান্য‘) বইটি তার নামের দাবি অক্ষুন্ন রেখেছে শেষ অবধি, নিছক ভ্রমণ কাহিনী বা স্মৃতিচারণ নয় বরং তার অভিজ্ঞ কলমের বিশ্লেষণ ও আলোচনামুলক এক অমুল্য আখ্যান হয়ে উঠেছে। বইটি শুরু হয়, সদ্য এম বি বি এস পাশ করা একজন যুবকের বর্ণনা দিয়ে যে নিজের আদর্শ অক্ষুণ্ণ রেখে, স্বপ্ন ছোঁয়ার যাত্রায় অবগাহন করতে চায়, এজন্য তাকে অর্থবিত্তের নিত্তনৈমিত্তিক ডাক্তারি জীবন ছেড়ে বারডেম-এ ছোট চাকুরি শুরু করতে হয়। কিন্তু, জ্ঞানের তীব্র তৃষ্ণা তাকে নিয়ে যায় হার্ভার্ডের মত বিশ্বখ্যাত জ্ঞানের চারণভূমিতে। প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের জগতের নানা দিকপালরা কিভাবে তাঁর চিন্তার জগতে আমূল পরিবর্তন আনে, প্রগতিশীলতার উঁচু শিখরে নিয়ে যায় কিংবা পশ্চিমের মনিষীদের মানবতাবাদ কিভাবে গড়ে তুলে বারডেম কিংবা আইসি ডি ডি আর বি- এর মত বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান, তাঁর একটা প্রামান্য ধারণা পাঠক পাবেন। দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো এমনকি মুক্তিযুদ্ধের মত বিষয়গুলো নিয়েও তাঁর অন্যরকম বিশ্লেষণ বইটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সবমিলিয়ে দেশ, সমাজ, বিশ্বকে ছাপিয়ে মানবতা ও জীবন দর্শন নিয়ে ভাবার নতুন এক রসদ যোগাবে। পাঠককে চমকে দেয়ার অনেক উপাদান আছে বইটিতে, যখন প্রফেসর রেহমান সোবহান বলবেন “’অপারেশন জ্যাকপট’ বইটা তোমার লেখা- আমিতো ভেবেছিলাম, লেখক বয়সে আরও তরুণ!” তখন তাঁর সাথে অপরিচিতরা চমকে উঠতে বাধ্য!
মাত্র শেষ করলাম বইটা।আমার কাছে অনেক ভালো লেগেছে বইটা।অনেক অনুপ্রেরণাদায়ক।সবচেয়ে বেশি মন কেড়েছে নাতালির জীবনের গল্পটা আর হার্ভার্ডের নোবেল লরিয়েটস অধ্যায়টির নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীদের জীবনী।আশা করি এই একটা অধ্যায় আপনার চিন্তার জগৎকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দেবে।আর মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্নক্ষেত্রে আমাদের দেশটার জন্য অনেক মানুষ অনেক কাজ করে গেছেন,তাদের সম্পর্কেও জানতে পারবেন।হ্যাপি রিডিং!