কালোবাবুর নামে সাত সাতটা খুনের মামলা রয়েছে। লোকটা ডেঞ্জার বলে ডেঞ্জার, অ্যাঙ্গার বলে অ্যাঙ্গার! খেপলেই রক্তগঙ্গা বইয়ে দেয়। কালোবাবুর প্রতিদ্বন্দ্বী ল্যাংড়া গেনু আর ফুটু সর্দারও কম যায় না, কানু দারোগা এদের যেন সর্পাঘাতে মৃত্যু হয়ে যায় সেজন্য দুটো পাঁঠা মানত করে রেখেছেন। তো এতো এলেমদার মানুষরা সব খেপে উঠেছে জাদুকর মদন তপাদারের পুরনো ছেঁড়া স্যুটকেসের জন্যে।
বাক্সটা কোথায়? মন্টুরাম সিংহের কাছে। প্রতিদিন বাক্স খুলে দেখে মন্টুরাম, তবু ফেলনা জিনিসগুলোর মধ্যে কী যে এতো লোক খুঁজে বেড়াচ্ছে বুঝে পায় না। মন্টুরামের আলমারি থেকে একদিন হামা দিয়ে বেড়িয়ে এল এক চোর। সে-ও নাকি মদন তপাদারের জাদুর বাক্স খুঁজছে।
লোকে বলে চৈতন্যপুরের রাজবাড়িতে নাকি সকলের জন্য দ্বার অবারিত। কথাটা খুব ভুল নয়, সিংহদুয়ারের অর্ধেকটাই যে ভেঙ্গে পড়েছে! রাজবাড়ির আগের ঠাঁটবাট না রইলেও, রাজা হরিশ্চন্দ্র এখনো জীবিত। ছেঁড়া জরির পোশাক পরে মাঝে মধ্যে আগাছায় ভরা বাগানে হাঁটাহাঁটি করেন তিনি।
রাজবাড়িতে রাজামশায় আর পুরনো কর্মচারী সহ মোটে ছয়টি জীবিত প্রাণীর বাস, তবে বাতাসে ফিসফিস আর গুজগুজানির কমতি নেই। হরিশ্চন্দ্রের পিসিরা দেড়শো বছর আগে দেহ রেখেছেন, কিন্তু ওঁদের দাপটে কারো তিনতলায় যাবার জো নেই। মাঝরাত্তিরে হরিশ্চন্দ্র এর শোবার ঘরে কে জানি ট্র্যাপিজের খেলাও দেখিয়ে যায়। গত রাজারাও অনেকে এখনো নশ্বর দুনিয়ার মায়া কাটাতে পারেননি।
হরিশ্চন্দ্রের রাজবাড়িতে একদিন আশ্রয় নিলে এক ছোকরা, নাম হিরু। পিছে তার কালোবাবু লেগেছে। ছোকরারও একটা মতলব যে আছে রাজা নিশ্চিত, তা ভালো না মন্দ কে জানে! তারও কি সেই বাক্সটাই চাই?
গরীব ম্যাজিশিয়ান মদন তপাদারের জাদু দেখানোর বাক্সে কী এমন আছে?
চোর-ডাকাত, রাজবাড়ি, ভূত আর আজব বাক্সের কথা শুনে অনেকেই নিশ্চয়ই বুঝে গিয়েছেন যে গল্পটা অদ্ভুতুড়ে। সিরিজের মার্কামারা সব কিছুই এই গল্পেও আছে, তবে আগের সেই স্বাদটা ঠিক জমে উঠেনি। শীর্ষেন্দু এখনো অদ্ভুতুড়ে লিখে যাচ্ছেন, তবে বৈচিত্র্য হারিয়ে গিয়েছে। সেই যে পাগলা সাহেবের কবর, ষোলো নম্বর ফটিক ঘোষ বা বনির মতো ভিন্ন ভিন্ন দুর্দান্ত কাহিনী, ওরকম আর পাই না। গল্পগুলো এখন যেন সব নতুন বোতলে পুরনো মদ। রাজার তিন পিসির কথা পড়তে গিয়ে হাসিরাশি মাসি, কাশীবাসি মাসি, আর হাসিখুশি মাসির কথা মনে পড়ছিল বারবার, চোর সুধীর গায়েন আর বটগাছের বুড়োর চোরের মহিমার আলাপও পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছিলো এই একই কথা আগে কতোবারই না পড়েছি!
তা সত্বেও, অদ্ভুতুড়ে পড়ে কখনো পাঠকরা হতাশ হবেন না। শীর্ষেন্দু প্রতিটি গল্পই এমন ভাবে হাসি-মজা আর রহস্যের মোড়কে উপস্থাপন করেন যে, বইটি হাতে নিলে ছেলে-বুড়ো সকলের কিছুটা চমৎকার সময় কাটতে বাধ্য।
বইঃ মদন তপাদারের বাক্স (অদ্ভুতুড়ে সিরিজ)
লেখকঃ শীর্ষেন্দু মুখ্যোপাধ্যায়
প্রকাশনায়ঃ আনন্দ পাবলিশার্স
প্রথম প্রকাশঃ ২০১৩
প্রচ্ছদ ও অলংকরণঃ দেবাশীষ দেব
পৃষ্ঠাসংখ্যাঃ ১১১
ভারতীয় মূল্যঃ ১০০ টাকা
রকমারি মূল্যঃ ১৯০ টাকা