সাগরময় ঘোষ (২২ জুন, ১৯১২ - ১৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৯) একজন স্বনামখ্যাত ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক যিনি কলকাতা থেকে প্রকাশিত দেশ পত্রিকার সম্পাদকীয় দায়িত্ব পালন করে জীবন্ত কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিলেন। ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যুতে লন্ডনের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত শোকসংবাদে তাঁকে বাংলার ‘সাহিত্য ব্যাঘ্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। মৃত্যুর কিছু পূর্বে ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে দীর্ঘজীবী বাংলা সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
তাঁর জন্ম ব্রিটিশ ভারতের পূর্ব বঙ্গে, বর্তমান বাংলাদেশের চাঁদপুরে, ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের ২২শে জুন তারিখে। চাঁদপুরেই ছিল তাদের পৈতৃক ভিটা। কালক্রমে নদী ভাঙনে হারিয়ে গেছে সেই পৈতৃক ভিটা। তাঁর পিতা কালিমোহন ঘোষ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ সহচর। মায়ের নাম মনোরমা দেবী। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা শান্তিদেব ঘোষ ছিলেন রবীন্দ্র সঙ্গীতের বিশিষ্ট সাধক এবং ভারতের জাতীয় পণ্ডিত হিসেবে স্বীকৃত। সাগরময় ঘোষ শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করেন, তিনি রবীন্দ্রনাথের সরাসরি ছাত্র ছিলেন। শান্তিনিকেতনে অধ্যয়নকালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে সাহিত্য ও সঙ্গীত, সর্বোপরি শিল্পের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ জন্মে যা প্রয়াণাবধি তাঁর মানসপ্রতিভাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।
১৯৯৯ খৃষ্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারি ৮৬ বছর বয়সে সাগরময় ঘোষ মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য হারায় এক অসামান্য সম্পাদককে।
ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের প্রতি একসময় প্রবল রাগ ছিল—রবীন্দ্রনাথের স্পষ্ট অনিচ্ছা সত্ত্বেও চিকিৎসার সিদ্ধান্ত সেই ক্ষোভের মূল।
কিন্তু ‘একটি পেরেকের কাহিনী’ পড়ে সেই রাগ অনেকটাই নরম হয়ে আসে। নতুন চোখে আবিষ্কার করি বিধানচন্দ্রকে—একজন মানবিক, সংবেদনশীল ও দায়িত্বনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে। সাগরময় ঘোষের লেখা এতটাই সহজ ও প্রাণবন্ত যে শুরু করলে শেষ না করে ওঠা যায় না; আর শেষ হলে রয়ে যায় একরাশ আফসোস—এই সুন্দর পাঠ এত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল বলে।
উপন্যাসটা প্রখ্যাত চিকিৎসক ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় ও বৈদ্যনাথ নামের জনৈক এক ব্যক্তিকে নিয়ে।
ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়কে নিয়ে বেশ কৌতুহল ছিল। কারণ, তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন, পশ্চিম বঙ্গের ক্ষমতা ধরে রেখেছিল কংগ্রেস। তিনি সম্ভবত ব্যারিস্টার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীকে পরাজিত করে প্রথম বিধানসভায় যান।
এ উপন্যাসে মূলতঃ ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের চিকিৎসক জীবনের কথা বেশি আলোকপাত করা হয়েছে। সবমিলিয়ে পড়ে বেশ ভালো লাগলো।
'দেশ'- এর সাগরময় ঘোষ গপ্পো শোনাতে লাগলেন। সে কাহিনী এক ধন্বন্তরী ডাক্তারবাবু আর বৈদ্যনাথের।ডাক্তারটি আবার রাজনীতিও করে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী প্রখ্যাত ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় মারা গেছেন। ডাক্তার ও রাজনীতিক হিসেবে তাঁর মাহাত্ম্য বর্ণন করতে সাগরময় ঘোষ জনৈক গরীব যুবক বৈদ্যনাথ কীভাবে ডাক্তার বিধান রায়ের আনুকূল্য পেয়েছিল সেই ঘটনাই লিখেছেন "একটি পেরেকের কাহিনী" তে। কেন নাম পেরেক হল তার যথার্থতম উত্তর পেতে বইটা পড়া যেতে পারে। তবে-
আমি পশ্চিমবঙ্গের কেউ নই। তাই স্বভাবতই ডাক্তার বিধান রায়ের গুণকীর্তনে আমার আগ্রহের যথেষ্ট অভাব থাকাতে বইটি ভালো পাইনি। যাঁরা কলিকাতার তাঁদের হয়তো আলাদা আকর্ষণ জাগাতে পারে বইটি!
গ্রামের দরিদ্র যুবক বৈদ্যনাথ মায়ের দুঃখের অবসান ঘটাতে শহরে আসে কাজের খোঁজে।এই কাজ করতে গিয়ে পায়ে পেরেকের আঘাত লাগে।আর তাতেই পায়ে গ্যাংগ্রিন,পা কাটার হাত বৈদ্যনাথকে বাঁচিয়ে দিলেন ডা. বিধানচন্দ্র রায়।সেই থেকে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ বৈদ্যনাথ। বিধানচন্দ্রের আনুকূল্যে দরিদ্র বৈদ্যনাথের ভাগ্যের চাকা বদলাতে থাকে।এর মধ্যে তাদের সম্পর্কে যেমন ভাঙ্গন আসে তেমনি পরমুহূর্তেই আবার পিতা-পুত্রের মতো গভীর সম্পর্কও গড়ে উঠে। সুচিকিৎসক হিসেবে খ্যাতিমান বিধানচন্দ্র রাজনীতিতে প্রবেশ করলেও বৈদ্যনাথকে কখনো ভুলেন নি।তাই তার অন্তিম যাত্রায় বৈদ্যনাথ ও তার পরিবার শোকে কিভাবে কাতর হয়ে পড়ল সেই গল্পই লেখককে শোনাতে আসেন বিশুদা।
ছোট একটি বই। অসাধারণ লেখা,এক বসাতেই শেষ করার মতো একটি বই। বিধানচন্দ্রের চরিত্রের বিভিন্ন দিক লেখক তুলে ধরেছেন। একজন অসাধারণ ও বিশেষ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়েও সাধারণ মানুষের প্রতি ছিল ভালোবাসা।তাই তো তিনি স্মরণীয়।
#পাঠকের_চোখে বই ~ ♦#একটি_পেরেকের_কাহিনী♦ লেখক ~ #সাগরময়_ঘোষ প্রচ্ছদ ~ #পূর্ণেন্দ_পত্রী প্রকাশক ~ #আনন্দ_পাবলিশার্স প্রথম প্রকাশ ~ #জানুয়ারি_১৯৭১
- বিশ্রাম, বিশ্রাম, বিশ্রাম। কানের কাছে সবসময় শুনছি বিশ্রাম নিন, বিশ্রাম নিন। বিশ্রাম তো আমি একদিন নেবই, অনন্তকালের জন্য বিশ্রাম। বোধহয় সে দিনের আর বেশি দেরি নেই। তবে কী জানো, কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে পারলেই আমার মন ভালো থাকে।
- কিন্তু শরীর তা মানবে কেন?
- (হেসে বললেন) সারাজীবন ধরে বহু রুগী নিয়ে নাড়াচাড়া করেছি। শুনেছি লোকে নাকি বলে আমি সাক্ষাৎ ধন্বন্তরী। আসলে ব্যাপারটা কী জানো? ওসব কিছু নয়। মানুষের রোগ থাকে মনে, শরীরে নয়। মনটাকে যদি রোগমুক্ত করা যায়, শরীরও সুস্থ হয়ে ওঠে। আমার চিকিৎসাবিদ্যার চাবিকাঠি ছিল সেটিই।
বিস্মিত হয়ে ডাঃ রায়ের কথা শুনছিল সে। এমন অন্তরঙ্গভাবে কথা বলতে তাঁকে এর আগে কোনোদিন সে দেখেনি। ওঁর পক্ষে এত কথা বলাটাও যে এখন উচিৎ নয় সেটাও সে জানে। বিদায় নেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
১৯৬২ সালের ২৪শে জুন। ওয়েলিংটন স্কোয়ারে নিজের বাড়ির শোওয়ার ঘরে পিঠের তলায় দুটো বালিশ নিয়ে শুয়ে কথাগুলো বলছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়। যাকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন, সেই ব্যক্তিকে আমরা কেউ চিনি না, জানি না। অথচ দেশ পত্রিকার লেখক ও সম্পাদক হিসেবে যে সাগরময় ঘোষকে আমরা এক ডাকে চিনি, তার কলমেই ডাক্তারবাবুর সামনে বসা সেই লোকটির কথা আমরা জানতে পারলাম। নাম তার বৈদ্যনাথ। অতি দরিদ্র নগণ্য এক সাধারণ মানুষ, বিধান রায় যার কাছে একজন ভগবানের সমান। বৈদ্যনাথ জানেও না এক সপ্তাহ পর ডাক্তারবাবুর জন্মদিনের দিন কী সংবাদ তার জন্য অপেক্ষা করে আছে। জানতে চায়নি সে সেই খবর, শুনতেও চায়নি। কিন্তু ভাগ্যের লেখা কে খণ্ডায়।
এই বৈদ্যনাথকে পাঠকের সঙ্গে পরিচয় করালেন লেখক এক অদ্ভুত ভঙ্গীতে। যদিও মাঝখানে মাধ্যম হিসেবে রইলেন বিশুদা। কিন্তু বিশুদার স্মৃতিচারণে আর বৈদ্যনাথের জীবনকথা শুনতে শুনতে আমরা জেনে গেলাম বিরাট ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এক অসাধারণ পুরুষকে।
জানলাম ডঃ বিধানচন্দ্র রায়কে!
সত্যজিৎ রায়-কে নিয়ে একটা গবেষণামূলক কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ মনে হল তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সাধারণ মানুষের সঙ্গে সামনাসামনি কীভাবে কথা বলতেন, সেটা জানা দরকার। ওঁর ম্যানারিজম, চালচলন নিয়ে সম্যক ধারনা পাওয়ার আশায় খোঁজ করতে শুরু করলাম বইয়ের, আর ফেসবুকেই দেখলাম ঋজুদা (মানে আমাদের সবার পরিচিত লেখক ও বইপাগল শ্রী ঋজু গাঙ্গুলি) একটা পোস্টের কমেন্টে সাজেস্ট করেছেন এই বইটি পড়ে দেখার। "একটি পেরেকের কাহিনী"। নাম শুনে বোঝার উপায় নেই যে এর বিষয়বস্তু কী। কিন্তু শুরু করেই বুঝতে পারলাম যে ঠিক যেমনটা চাইছিলাম, তাই আছে এই বইতে।
বাষট্টি সালের পয়লা জুলাই রবিবার সকালে শুরু হচ্ছে গল্প। নতুন বাংলার রূপকার ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা কলকাতা জুড়ে। লেখকের খুব ইচ্ছা যে তিনিও সবার সঙ্গে পথে নেমে সেই শেষ শোভাযাত্রায় পা মেলান, কিন্তু ভিড়কে বড় ভয় তাঁর। কোলাহল থেকে যতটা পারেন দূরে থাকেন। তাই বিষন্ন ও ভারাক্রান্ত মন নিয়ে তিনি উল্টেপাল্টে দেখছেন নানান সংবাদপত্র, যার পাতায় পাতায় আজ শুধু একটাই লোকের নাম, তাঁর ছবি, তাঁর কর্মজীবনের ঘটনাবলী। কাগজের হেডলাইনে লেখা,
"জন্মদিন মৃত্যুদিন, একাসনে দোঁহে বসিয়াছে, দুই আলো মুখোমুখি মিলেছে জীবন-প্রান্তে।"
লেখকের মনে পড়ে যাচ্ছে ১৯২৩ সালের পয়লা ডিসেম্বরে আনন্দবাজার পত্রিকার সেই হেডলাইন।
সেইদিন থেকে বাংলার রাজনীতিতে পদার্পণ বিলেতফেরত "এম আর সি পি" আর "এফ আর সি এস" ডিগ্রীধারী ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের। যদিও তার অনেক আগে থেকেই চিকিৎসাক্ষেত্রে তাঁর অবদান আর বিভিন্ন ঘটনা লোকমুখে ঘুরতে শুরু করে দিয়েছে।
মানুষটাকে শেষবার দেখার জন্য পুরো কলকাতা যেন নেমে এসেছে রাস্তায়। অফিসে বেরনোর পথে লেখক আটকে গেলেন রসা রোডে এসেই। "জনস্রোত বন্যার মতো ছুটে চলেছে রাসবিহারী অ্যাভিনিউর দিকে।" সাদার্ন অ্যাভেনিউতে একটা মেহগনি গাছের তলায় দাঁড়িয়ে গেলেন লেখক। আর এগোনো যাচ্ছে না। কাটফাটা রোদে গরমের মধ্যে দাঁড়িয়ে লোকজন আশেপাশের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকদের দিকে তাকিয়ে চেঁচাচ্ছেন, "জল ঢালুন, জল ঢালুন।" বালতি বালতি জল এসে পড়ছে ভিড়ের মধ্যে। গরম থেকে মিলছে ক্ষণিকের শান্তি। কিন্তু অপেক্ষা শববাহী গাড়ির।
হঠাৎ লেখককে ডাকলেন ওঁরই পত্রিকা অফিসের কলিগ, একজন "না-লিখে-সাহিত্যিক", বিশুদা। তার জোরাজোরিতেই অফিস কামাই করে দুজনে ফিরে এলেন লেখকের বাড়ি। দুগ্লাস জল খেয়ে বিশুদা বলতে শুরু করলেন একটা অতি সাধারণ ছেলে বৈদ্যনাথের গল্প। যা আসলে এই "একটি পেরেকের কাহিনী"। যথার্থভাবেই, রাস্তায় পড়ে থাকা একটা মরচে ধরা পেরেক কীভাবে বৈদ্যনাথের জীবন বদলে দিয়েছিল, তার গল্প। আর সেই গল্পের ছলেই আমরা পরিচিত হলাম আপামর বাঙালির গর্বের মানুষ বিধানচন্দ্র রায়ের বাহ্যিক সত্ত্বার পিছনেও লুকিয়ে থাকা অপর এক সত্ত্বার সাথে। সাগরময় ঘোষের এই বই মানুষ বিধানচন্দ্রকে অনেকটা কাছে এনে দিল পাঠকের। মন ছুঁয়ে গেল প্রতিটা পাতা। একবার ধরেই পুরো বইটা শেষ করে দশ মিনিট চোখ বন্ধ করে শুয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল এই রত্নটি খুঁজে পেতে এতদিন দেরি করে কী ভুলটাই না করে ফেলেছি।
এতদূর পড়ে যাঁদের মনে হতে পারে যে বইয়ের অর্ধেক গল্প তো এখানেই বলে দিলাম, স্পয়লারে ভর্তি, তাঁদের নিশ্চিন্ত করতে বলি যে এটা শতকরা এক ভাগও নয়। অনুরোধ করব সবাইকে এই বইটা মিস না করার জন্য।
সাগরময় ঘোষকে প্রধানত সম্পাদক হিসেবে আমরা চিনলেও ওঁর লেখা বই প্রথমবার পড়েই চমকে গেলাম। হয়তো আমার সিনিয়রদের মনে হতে পারে যে এ ছোকরা কী আর জানে সাগরময় নিয়ে, তাকে তো আমরা বেশি চিনি। সত্যি বলছি তেমন কিছুই জানতাম না। কিন্তু অনেক কিছু এবার জানতে ইচ্ছে করছে। রবিবাসরীয়তে একটা দারুণ আর্টিকেল পড়লাম "আমি তো স্টেজের মালিক" নামে। স্মৃতিচারণা করেছেন দেবাশিষ ভট্টাচার্য। সেই লেখা থেকেই একটা ছোট জায়গা তুলে দিলাম নীচে।
📑
তখন শংকর ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে এক নামী সংস্থায় বড় পদে চাকরি করেন। দেশ-এ একটি ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছেন। তাতে কোনও এক বিশেষ ব্যবসায়ী সম্প্রদায় সম্পর্কে ‘পেটমোটা’ বিশেষণ ব্যবহার করেছিলেন তিনি। একদিন সকাল ন’টায় অফিসে ঢুকতে গিয়ে দেখেন লিফ্টের কাছে সাগরময় ঘোষ দাঁড়িয়ে। তাঁকে ওই ভাবে দেখে ঘোর বিস্ময় শংকরের। সাগরবাবু বললেন, ‘‘তোমাকে ধরব বলেই এখানে দাঁড়িয়ে আছি। তোমার লেখায় দু’ জায়গায় ‘পেটমোটা’ শব্দটা আছে। ওটা না থাকাই ভাল। বদলে দাও।’’ কুণ্ঠিত শংকর বলেন, ‘‘সাগরদা, এটুকুর জন্য আপনি এভাবে এলেন! অন্য কোনও শব্দ নিজে বসিয়ে দিলেই পারতেন।’’ সাগরময় তাঁকে বুঝিয়েছিলেন, কী লিখবেন, সেটা লেখকের স্বাধীনতা। তাঁকে না জানিয়ে একটি শব্দও পরিবর্তন করা ঠিক নয়।
📑
এই আর্টিকেলের পুরোটা পড়তে হলে নিচে লিঙ্ক দিয়ে রাখলাম।
এই দেখুন, একটা বইয়ের পাঠপ্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে কত কথা বলে ফেললাম। আসলে কোনও লেখা মন থেকে ভালো লাগলে নিজের অজান্তেই সেটা নিয়ে আরও ঘাঁটতে ইচ্ছে করে, আর সেই সুযোগে অনেক মণিমানিক্য আপনা হতেই বেরিয়ে আসে।
লেখকের ভাষাতেই শেষ করি।
"বৈদ্যনাথ ও তার পরিবার আমার কাছে বিরাট রহস্য হয়ে দেখা দিল। কৌতূহল আর চেপে রাখতে না পেরে বৈদ্যনাথের পরিচয় জানবার জন্য উৎসুক হয়ে বিশুদাকে প্রশ্ন করতে যে কাহিনী সেদিন বিশুদা আমাকে শুনিয়েছিলেন, তা যেমন বিস্ময়কর, তেমনই মর্মস্পর্শী!"
একটি পেরেকের বদৌলতে প্রখ্যাত ব্যাক্তিত্ব ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের সান্নিধ্য পেয়ে সহায়-সম্বলহীন যুবক বৈদ্যনাথের জীবনের আমূল পরিবর্তবনের গল্প — একটি পেরেকের কাহিনী। তবে, সম্পর্কটা কেবল সান্নিধ্য (কিংবা চেনা-জানা) এর মধ্যই সীমাবন্ধ ছিল না, বরং বৈদ্যনাথের শ্রদ্ধার চোখে ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় পিতৃতুল্য — ডাঃ রায়ও অত্যন্ত স্নেহ করতেন বৈদ্যনাথকে। জীবনের নানান বিপদসংকুলান সময়ে ডাঃ রায় ছিলেন বটবৃক্ষের ছায়ার মত। আরেকটা ব্যাপার হলো, খ্যাতিমান চিকিৎসকের পরিচয় ছাড়াও তিনি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী। তাই ডাক্তারী সময়কালে অথবা রাজনীতির সুবাদে নিশ্চয়ই আরো শতকয়েক নাম-না-জানা-বৈদ্যনাথের জীবনে এই নিষ্ঠাবান ভদ্রলোক মঙ্গল সাধন করেছিলেন। বইয়ে জনমনে ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের নিষ্কলুষ প্রভাবের আঁচ ঠাহর করা যায় — কলেজ জীবনের ছোটখাটো ঘটনার সংযোজনে চারিত্রিক বিশিষ্টতার আভাস মেলে — বৈদ্যনাথের কিস্যা না-লিখে-সাহিত্যিক বিশুদা'র কথ্য এবং সাগরময় ঘোষের মিঠা গদ্য মিলে বইটা ছোট পরিসরে সুপাঠ্য।
ডা. বিধানচন্দ্র রায় আর বৈদ্যনাথ বলে এক লোকের পারস্পরিক সম্পর্কের কাহিনী এটি। একটি পেরেকের আঘাত থেকে শুরু হওয়া এই গল্প বদলে দিয়েছিল একটি পুরো পরিবারের জীবন। সাগরময় ঘোষের প্রাঞ্জল লেখায় পুরো কাহিনীটি খুব উপভোগ করেছি। ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৩.৫/৫
এক বসায় শেষ করে ফেলার মত ছোট একটা বই। পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ডা বিধান চন্দ্র রায়, তার সাথে অপরিচিত অসহায় একটা যুবক এর সম্পর্ক গড়ে ওঠা ও সে সম্পর্ক পিতা-পুত্রের সম্পর্কের মত ওজনদার হওয়ার গল্প সাগরময় ঘোষের এই "একটি পেরেকের কাহিনী"। সুখপাঠ্য।
আমি প্রথম ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের নাম শুনি আমার ইংরেজির প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে। পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, সারা ভারতবর্ষ এমন কি বাংলাদেশেও এই বিখ্যাত চিকিৎসক এবং সফল রাজনীতিবিদের বিচিত্র চিকিৎসা এবং অভিজ্ঞতার ��ল্প সমানে চালু আছে। আমার ইংরেজি স্যার আমাকে শুধু ওনার নাম বলেননি, বলেছিলেন ওনার চিকিৎসা পদ্ধতির একটি গল্পও। গল্পটি বলি,
" একবার একজন স্থুলকায় ব্যক্তি ডাক্তার বিধানচন্দ্রকে দেখাতে গেলেন। বিধান বাবু গম্ভীর মুখ করে বললেন, অন্তত দুঃখের সাথে জানাতে হচ্ছে আমাকে আপনার হাতে খুব বেশি সময় অবশিষ্ট নেই। তবু আমার দেওয়া ঔষধপথ্য নিয়মিত খেতে থাকুন আর একমাস পরে আসুন। একবার শেষ চেষ্টা করে দেখব।
ঠিক একমাস পর ভদ্রলোক আবার এলেন। তবে এবার পুরাতন রোগীকে চিনতে ডাক্তারবাবুকে বেগ পেতে হলো। একবারে শুকিয়ে কাঠ যাকে বলে। ডাক্তারবাবু এবার হেসে বললেন, আপনার চিকিৎসা সম্পন্ন। আপনার এই চর্বি ছিল আপনার মরণ রোগের উৎস যা এখন আর নেই।"
ওঁনাকে নিয়ে দ্বিতীয় গল্পটি শুনি আবার একজন বন্ধুর কাছ থেকে যে এখন পশ্চিমবঙ্গের একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। গল্প না বলে একে ঘটনা বলাই শ্রেয়। বন্ধু এই ঘটনাটি বলার আগে আমার কাছে উৎসের সীমাবদ্ধতা আগেই প্রকাশ করেছিল। ঘটনাটি হলো,
"ডাক্তার বিধানচন্দ্র একবার একটি খাবার হোটেলে গিয়েছিলেন। শুনেছিলেন সেখানকার রান্না মাংসের বেশ সুনাম। তিনি সেই হোটেলে মাংসের স্বাদ গ্রহণ করার পর একটি অদ্ভুত কাজ করেন। পুলিশে রিপোর্ট। রিপোর্টে তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর ধারণা এই মাংস ভোজ্য কোন প্রাণীর নয়, মানুষের মাংস। পরবর্তীতে পুলিশও নাকি বিধানবাবুর এই অভিযোগের সত্যতা পেয়েছিল।"
এবার শেষ গল্পে আসি। যেটা শুনেছি কিছুদিন আগে এক সিনিয়র ভাইয়ের কাছে। একটু গা শিরশিরে গল্প। তবে আগ্রহোদ্দীপক।
"একটি ছেলে হঠাৎ তীব্র মাথায় যন্ত্রণায় ভুগতে শুরু করলো। চিন্তিত বাবা মা অনেক ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে হতাশ হয়েছেন। তাই অবশেষে এলেন বিধানবাবুর কাছে। ডাক্তার রায় সব প্রেসক্রিপশন এবং মেডিসিন দেখে ছেলেটির অভ্যাস আর চালচলন সম্পর্কে জানতে চাইলেন। যেমন ছেলেটি শান্ত প্রকৃতির, পড়াশোনায় ভাল, কুকুর পোষে, আদরের কুকুরের সাথেই ঘুমায়। তারপর বিধানবাবু বাবা মাকে দুটি উদ্ভট নির্দেশ দিলেন। প্রথমত ছেলেটি মাথার সব চুল ফেলে দিয়ে আসতে, দ্বিতীয়তম একটি পাকা কুমড়ো নিয়ে আসতে, যাকে সাবধানে কেটে একটি হেলমেটের আকার দিতে হবে।
দুটো নির্দেশ ঠিকঠাক পালিত হলে, ডাক্তার রায় কুমড়োর হেলমেটটি ছেলেটির মাথায় পরিয়ে গিয়ে ঘুমের মেডিসিন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। কয়েক ঘটনার ভেতর দেখা গেলে ছেলেটির মাথায় ছোট ছোট পোকায় কিলবিল করে ভরে গেছে। ডাক্তার রায় জানালেন, মূলত কুকুরের শরীর থেকে একধরনের পরজীবী ছেলেটির মাথায় সংক্রামণ ঘটিয়েছিল। সেখান থেকেই এই মাথা যন্ত্রণা। কুমড়োর মিষ্টি পদার্থে আকর্ষিত হয়ে ওরা সব বেরিয়েে এসেছে।"
এমন গল্প আমি আরও দু চারটে শুনেছি তবে আমার এই মুহূর্তে মনে নেই। এই গল্পগুলো সত্যি না মিথ্যে সে বিতর্কে যাবার এখন আর কোন প্রয়োজন নেই বলেই মনে হয় আমার। তবে একটা ব্যাপার এই গল্পগুলি থেকে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায়, নিজের সময়ে বিধানচন্দ্র রায় চিকিৎসা খ্যাতির প্রায় শীর্ষে আহোরণ করতে পেরেছিলেন আর রাজনৈতিক জীবন এই শীর্ষ স্থানকে আরও বলিষ্ঠ করে দিয়ে গেছে।
আজ একবসাতে শেষ করলাম একটি পেরেকের কাহিনী। বইটি শেষ করে প্রথমে আমার মনে হয়েছে বইটির নামকরণ খুবই উপযুক্ত হয়েছে। এই বইটি কাহিনী লেখক দেশ পত্রিকার প্রখ্যাত সম্পাদক সাগরময় ঘোষ হলেও কথক বিশুদা। তার মুখেই আমরা জানতে পারি চাঁদপুরের বৈদ্যনাথের কথা।
কোনভাবে মেট্রিক পাশ করে বিশুদাদের বাড়িতে আশ্রয় নেয়া বৈদ্যনাথের ঋজু ব্যক্তিত্ব পাঠককে মুগ্ধ করে আর ধরে রাখে বইয়ের শেষ পাতা অবধি। বারান্দার কোণে কোনরকমে রাতে শুয়ে সকালবেলা দুটো ডালভাত খেয়ে চাকুরী খুঁজতে বের হতো বৈদ্যনাথ। রাতে না খেয়ে এসে বলতো খেয়ে এসেছি। অন্যের গলগ্রহ হয়েও নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রাখা যায় সেটা আমরা বৈদ্যনাথের চরিত্র থেকে জানতে পারি। একরোখা বৈদ্যনাথ অবশেষে একটি চাকুরী জুটিয়ে ফেলে। মাইসে কুড়ি টাকা। মাকে টাকা পাঠিয়ে মোটামুটি চলছিল। কিন্তু একদিন বিপত্তি বাঁধাল বৈদ্যনাথের অজস্র ছিন্ন আর জীর্ণ একমাত্র চটিটার একটা পেরেক। কাহিনীর সামনে আর যাব না। পাঠক পড়ে নেবেন।
খুব তুচ্ছ একটি ঘটনায় জীবনের মোড় কত বিশালভাবে ঘুরে যায়। একটা জীবন হয়তো পুরোটা বদলে যায়। সেই বদল কখনো উঠে আসার আবার কখনো ভেঙ্গে পড়ার। তবে একটি পেরেকের কাহিনী একটি চারার মহীরুহ হয়ে ওঠার গল্প হয়তো না। তবে চারাটির শত পদদলনের থেকে রক্ষার গল্প অবশ্যই। চারাটি বৈদ্যনাথ আর রক্ষাকর্তা ধন্বন্তরী ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়।
আমি তখন স্কুলে পড়ি। সম্ভব দশম শ্রেনীতে, তখন স্যারের কাছে শুনেছিলাম ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় এই নামটি। স্যার বেশ সমীহের সাথেই এই নামটি উচ্চারণ করেন। কি কারণে সেটা আমি তখন জানি না। আর জানার মতো তেমন সুযোগ ছিল না। স্যারের মুখেই শুনেছি তিনি নাকি রোগীর মুখ দেখেই রোগ নির্ণয় করতে পারতেন। . এরপর তো তার সম্পর্কে অনেক কিছুই পরেছি। এই বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ডাক্তারী এবং রাজনীতি দুটোই করেছেন সমান তালে। তার ডাক্তারী জীবনের অসংখ্য ঘটনা রয়েছে যা বলে শেষ করার মতো নয়। এখন তার কতটা সত্য কতটা মিথ্যা সেটা বলা বেশ কষ্টসাধ্য বলা যায়। তবুও একটি ঘটনা বলা যায়, ঘটনা বিধান চন্দ্র রায় এর কাছে একজন সম্ভ্রান্ত দম্পতি এলেন চিকিতসা করাতে ।সমস্যা হল গিয়ে মহিলাটির মাথায় অসম্ভব যন্ত্রনা । বেশ কয়েক নামীদামী ডাঃ ,নামী হসপিটাল ঘুরে ঘুরে ধৈর্য্য যখন একেবারেই শেষ ,সব আশাই ছেড়ে দিয়েছেন স্ত্রী মাথার যন্ত্রনার অবসান ঘটাতে ,সেই সময় এলেন বিধান চন্দ্র রায় এর চেম্বারে ।দেখালেন দেশ বিদেশ থেকে আনা নানা পরীক্ষার রিপোর্ট ও। ডঃ বাবু ওসব দিকে বিশেষ নজর দিলেন না । বেশ কিছুক্ষন মহিলার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বললেন ,সেরে যাবে কিছুদিনের মধ্যেই।ভদ্রলোক ভাবলেন সব ডাঃ ই তো বলেন ইনিও বলছেন। অবাক হয়ে দেখলেন ডাঃ বাবু কোন প্রেসক্রিপসন দিলেন না আর কোন ওষুধও । বিধান বাবু বললেন ,এবার আপনারা আসুন ।দম্পতি তো হতবাক একে অপরের দিকে চাওয়া চায়ই করছেন ।তাদের অবস্থা দেখে মৃদু হেসে চেয়ার খেকে মাথাটা এগিয়ে এসে মহিলাকে বললেন আপনি একটা কাজ করুন ।মাথায় ঐ সিন্দুর পরাটা কিছু দিনের জন্য বন্ধ করে দিন। এর ঠিক মাস দুই পরে সেই দম্পতি এসে হাত জড়ো করে ডাঃ রায় কে বললেন একান্ত অনুগত হয়ে গদগদ স্বরে বললেন আপনি ছিলেন বলেই আমার মিসেস এ যাত্রায় বেঁচে গেলেন। আসলে মহিলার মারকিউরাস ঘটিত একপ্রকার এলার্জি ছিল ।যার কারনেই সিঁদুর পরলেই মাথার যন্ত্রনা হত। মহান ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় এক লহমায় দেখেই বুঝতে পেরেছিলে। এবার তার রাজনৈতিক জীবনের একটি ঘটনা বলা যাক – একবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির সঙ্গে বিধান রায়ের মিটিং চলছে। মিটিং শেষে বিধান রায় বললেন, মিস্টার প্রেসিডেন্ট আমার মনে হচ্ছে আপনার পিঠে মারাত্মক পেইন আছে। কেনেডি অবাক বিস্ময়ে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, How do you know that? বিধান রায় বিনীতভাবে বললেন, আমি পেশায় ডাক্তার, নেশায় রাজনীতিবিদ। কেনেডি তাঁর সেক্রেটারিকে চিকিৎসা সংক্রান্ত সকল কাগজ বিধান রায়কে দেখাতে বললেন। বিধান রায় নতুন করে প্রেসক্রিপশন দিলেন। দৃঢ়চিত্তে বললেন, নিয়ম করে খাবেন। না সারলে আমাকে জানাবেন। আমি আবার আসবো আমার নিজ খরচে। মিটিং শেষে বিদায় ��েয়ার আগে হ্যান্ডশেক করতে করতে বললেন, মিস্টার প্রেসিডেন্ট আমার ফী তো দিলেন না! কেনেডি জানতে চাইলেন, কত দিতে হবে ফী? বিধান রায় মওকা পেয়ে পশ্চিম বঙ্গের উন্নয়নের জন্য ৩০০ কোটি টাকা চাইলেন। সাথে সাথে মঞ্জুর করে দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এই ধরনের অনেক ঘটনাই রয়েছে যার সাথে বিধান চন্দ্র রায়ের জীবন জড়িত। তবে আজকে আমাদের মুল ব্যক্তি বিধান চন্দ্র রায় নন। তিনি অন্য একজন ব্যক্তি। যার নাম বৈদ্যনাথাক। . এখন প্রশ্ন হতে পারে কে এই বৈদ্যনাথ। আর ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের সাথে এই লোকটি সম্পর্ক কি। আর এই গল্পে, আচ্ছা এটা ঠিক গল্প নয় আবার আত্মজীবনীও নয়। এই লেখায় তার সম্পর্ক কি। . সব প্রশ্নের উত্তর একটু পরে দিচ্ছি। এক বসাতেই শেষ করলাম “একটি পেরেকের কাহিনী”, বইটি লিখেছেন বিখ্যাত লেখক ও সম্পাদক সাগরময় ঘোষ। যদিও ভাবতে পারেন এই কাহিনী সাগরময় ঘোষ লিখেছেন, তবে কাহিনীটির ধারক ও বাহক হচ্ছেন বিশুদা। ওইযে যিনি না লিখে সাহিত্যিক তিনি। . আসলে বৈদ্যনাথ বাংলাদেশের চাঁদপুরের কোন এক এলাকায় থাকত। সেখান থেকেই তার মেট্রিক পাশ দেয়া। এরপর আর অবস্থা খারাপ থাকার কারনে পড়াশোনা হয়নি। জীবন ও জীবিকার তাগিদে কলকাতায় আগমন। ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন হবার কারণে আত্মীয়ের বাসায় না গিয়ে বিশুদার সাথেই থাকতেন। বৈদ্যনাথ তার একরোখা জীদ ও ব্যক্তিত্বের কারণে কারো কাছেই বোঝা হয়ে থাকতে চাইত না। সে সকালে কাজের খোজে বের হয়ে রাতে ফিরে আসত। সারাদিন ঘুরে বেড়াত। অবশেষে পেয়েও যায় কাজ। ২০ টাকার মাইনে তে সে চাকরি জুটিয়ে ফেলে। তার লক্ষ্য থাকে মাইনে বাড়লেই মাকে নিয়ে আসবে কলকাতায়। বৈদ্যনাথ এক জোড়া চটি পরত। চটির অবস্থা বেশ করুন। সেটা পেরেক দিয়ে দিয়ে কোন ভাবে চালিয়ে নিচ্ছিল। তবে এই পেরেকটাই বদলে দিয়েছিল বৈদ্যনাথের জীবন। . কিছু কিছু ঘটনা ও কিছু সময় মানুষের জীবন পুরোটাই বদলে দেয়। যেমন বদলে দিয়েছে বৈদ্যনাথের। সেই পেরেকের কারণেই অতি ক্ষুদ্র থেকে বিরাট বৃক্ষে পরিণত হয়েছিল সে। সেই বৃক্ষকে যিনি বড় করেছেন, যত্ন করেছেন সেই মানুষটি ছিলেন ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়। যিনি তার শেষ দিন পর্যন্ত তাকে আগলে রেখে ছিলেন। আর এভাবেই হয়ত একজন সাধারণ মানুষ ও একজন বিরাট অসাধারণ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ এক হয়ে ছিল। যেন তারা এই বাংলার প্রতিচ্ছবি।
আমি প্রথমেই বলে নিচ্ছি যে আমি বইটি পড়েছি একজন পাঠক হিসেবে, এবং বইটিকেও বই হিসেবে ধরে নিয়েছি। কারণ এখানে অনেক কথা থাকতে পারে। যেহেতু সাগরময় বাবু একজন সম্পাদক ছিলেন, এবং তিনি পশ্চিম বঙ্গের দ্বিতীয় মূখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়কে নিয়ে লিখেছেন, সেহেতু সেখানে পক্ষপাতীতা থাকবেই এটাই স্বাভাবিক। তাই আমি সেদিকে যাচ্ছি না।
ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় প্রথমে একজন স্বনামধন্য চিকিৎসক ছিলেন। সেই কাজ করতে করতে তিনি ভারতের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে ভারতের মূখ্যমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হলেন। ডাঃ রায় চিকিৎসক হিসেবে কেমন ছিলেন এবং মন্ত্রী হবার পর তিনি কেমন ছিলেন তার চমৎকার এক গল্প বলে গেলেন সাগরময় বাবু। গল্পটি শুরু হয় যেদিন ডাঃ রায় ইহলোক ত্যাগ করেন ঐ দিনকে কেন্দ্র করে।
ঐদিন তার সাথে দেখা হয়ে যায় তার সাংবাদিক বন্ধু বিশুদার সাথে। বিশুদা এমন দিনেও চিন্তিত ছিলেন কোথার এক বৈদ্যনাথকে নিয়ে। সাগরময় বাবু আশ্চর্য হলেন। এবং সেই সাথে হলেন চিন্তিত। কেই এই বৈদ্যনাথ। তখন বিশুদা শুরু করলেন বৈদ্যনাথের গল্প।
বৈদ্যনাথ বাংলাদেশের চাঁদপুরের ছেলে। মেট্রিক পাস করেন সেখানেই, প্রচুন্ড অভাবী ছিলেন সেই সাথে ছিলেন প্রচুন্ড অভিমানী, আত্মমর্যাদাজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ। সেই বৈদ্যনাথ চাকরি করার জন্য কলকাতায় বিশুদার কাছে চলে আসেন। খেয়ে না খেয়ে চাকরি করছেন। এরই মধ্যে তিনি এক মারাত্মক অসুখে পড়েন, যার দরুন তার একটি পা হারাতে হতো। কিন্তু ঠিক তখন ডাঃ রায়ের চোখে তিনি পড়েন। এবং সেই থেকেই বৈদ্যনাথের জীবনে পরিবর্তন শুরু হতে থাকে।
বৈদ্যনাথের কাছে ডাঃ রায় ছিলেন ভগবান তুল্য, এবং পিতার মতন সম্মান করতেন তাকে। ডাঃ রায়কে নিয়ে কেউ কুৎসা করলে তিনি তাকে হয়তো খুনও করতে পিছপা হতেন না। এমন ছিলো তার প্রতি বৈদ্যনাথের ভালোবাসা।
ডাঃ রায়ও কম যেতেন না। তিনি এতো বড় মানুষ ছিলেন এবং সেই সাথে তার পদমর্যাদা দিনকে দিন বাড়ছিল। তার বাড়িতে জহরলাল, সরোজিনী নাইডু, অশ্বিনীকুমার দত্ত, মহাত্মা গান্ধীর মতন মানুষরা যাতায়াত করতেন। কিন্তু তার সেটা নিয়ে কোনো রকম গর্ব ছিলো না। অহংকার করতেন না। তখনও তিনি সেই আগের মতই বৈদ্যনাথের খোঁজখবর নিতেন। এবং বিপদে আপদে সাহায্য করে যেতেন। মৃত্যুর আগের সপ্তাহেও তিনি বৈদ্যনাথের সাথে কথা বলেছেন এবং আগামী সপ্তাহে তার জন্মদিন তার জন্য দাওয়াতও করেছিলেন। কিন্তু কে জানতো ঐ জন্মদিনেই তার শেষ দিন। কিন্তু এদিকে তখন বৈদ্যনাথে কি অবস্থা!
মানুষ আসলে তার কাজে মাধ্যমে বেঁচে থাকে। ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ও বোধহয় তেমন মানুষ ছিলেন। আর বৈদ্যনাথরা সেসব কাজের ফল। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বইটি পড়ে শেষ করেছি। এবং সাগরময় বাবুর লেখাটাও বেশ উপভোগ করেছি। ধন্যবাদ।
আমি "বইতরণী" গ্রুপেও রিভিউ দিই। সেখানেও দেখতে পারেন। #পাঠ_প্রতিক্রিয়া
বইটির নাম শুনেই বইটি পড়ার প্রতি ইন্টারেস্ট জেগেছিল। কিন্তু কালপক্ষেও ভাবিনি তখন কাহিনীটি এরকম হতে পারে। অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ডা: বিধানচন্দ্র রায়ের প্রতি লেখকের শেষ প্রণতি নিবেদন হল এই উপন্যাসটি। সাথে এটাও বলতে হয় দুই ভিন্ন মেরুর ব্যাক্তির একসূত্রে গাঁথার কাহিনী বর্ণিত উপন্যাস এটি।
১৯৬২ সালের ১লা জুলাই, নিজের জন্মজয়ন্তী উৎসবের দিনেই খুব অপ্রত্যাশিতভাবে চিরতরে বিশ্রাম নিলেন ডা: বিধানচন্দ্র রায়। মহানগরীর সকলে স্তম্ভিত। রাস্তায় রাস্তায় মানুষের ভীড় জমেছে তাদের মহানায়ককে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। লেখক নিজেও সেই ভীড়ে উপস্থিত। ভীড়ের মধ্যে থেকেই লেখকের সাথে সাক্ষাৎ হয় তার অফিসের বন্ধু বিশুদার সাথে। বিশুদার কাছ থেকেই লেখক জানতে পারেন ডা: বিধানচন্দ্র রায় এবং বৈদ্যনাথের একসূত্রে গেঁথে যাওয়ার কাহিনীটি।
চাঁদপুর গ্রামের সাধারণ ছেলে বৈদ্যনাথ, ছোটোবেলায় বাবা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকে মায়ের সঙ্গে মামাবাড়িতে থাকতেন। কিন্তু মামার কাছে তাদের লাঞ্ছনার শেষ নেই। তিনি সংকল্প নিয়েছিলেন বড়ো হয়ে উপার্জন করে মাকে কলকাতায় নিয়ে যাবেন। বড়ো হয়ে বৈদ্যনাথ কলকাতায় এসে কাজের সন্ধান করলেও সেরকম কাজ তিনি পেলেন না। শেষপর্যন্ত একটি পেরেক তার জীবন পরিবর্তন করে দিল।
ধন্বন্তরী ডা: বিধানচন্দ্র রায় একাধারে ছিলেন শিক্ষক, ডাক্তার, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, সর্বোপরি এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। আর বৈদ্যনাথ ছিলেন ম্যাট্রিক পাস করা অতি দরিদ্র এক সাধারণ মানুষ। তা সত্ত্বেও দুজনের মধ্যে চরিত্রগত এক আশ্চর্য মিল ছিল। সেটি ছিল আশা, আকাঙ্ক্ষা আর সংকল্পের।
"বৈদ্যনাথ চেয়েছিল সে তার মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দেবে, একটি সচ্ছল সুখী সংসার গড়ে নিজেকে সার্থক করে তুলবে। এইটুকুই ছিল বৈদ্যনাথের আশা, আকাঙ্ক্ষা আর সংকল্প।" "ডা: রায়েরও ছিল স��ই একই আশা, আকাঙ্ক্ষা আর সংকল্প। বঙ্গজননীর চোখের জল তিনিও মুছিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশ ছিল তাঁর সংসার। সেই সংসারকে সচ্ছল সুখী করে গড়ে তোলাই ছিল তাঁর আশা, আকাঙ্ক্ষা আর সংকল্প।"
খুব ছোটো উপন্যাস হওয়ায় বিষয়বস্তু এর থেকে বেশি আর লিখলাম না। তবে এটা ভাবতেই অবাক লাগছে যে একটি পেরেকও কারোর জীবনে আশির্বাদ হয়ে উঠতে পারে। অসাধারণ লাগলো উপন্যাসটি। যারা বইটি পড়েননি পড়ে দেখবেন ভালো লাগবে।
একটি পেরেকের কাহিনী বইটির প্রধান দুই চরিত্র ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় আর বৈদ্যনাথ বোস নামের একটি যুবক যে ভাগ্যান্বেষণে পূর্ব বাংলা থেকে কলকাতা এসেছে। কাহিনীর শুরু দোসরা জুলাই 1962। আগেরদিন ডাঃ বিধান রায় মারা গেছেন। আজ তাঁর শেষ যাত্রা বেরোবে। পুরো শহর অচল, লেখক অফিস যাবেন কীভাবে ভাবছেন। এমন সময় তাঁর সঙ্গে দেখা হল তাঁর এক পরিচিত মানুষ বিশ্বনাথ ওরফে বিশুদার সঙ্গে।
বিশুদার থেকে লেখক জানতে পারলেন এক প্রায় অবিশ্বাস্য কাহিনী, যাকে বলা যায় গল্প হলেও সত্যি। বৈদ্যনাথ হল বিশুদার গ্রাম সম্পর্কে পরিচিত। সে চাঁদপুর থেকে কলকাতায় এসেছে কাজের সন্ধানে। কিন্তু অফিসের দরজায় দরজায় ঘুরেও সে কোনো কাজ পাচ্ছে না।
হেঁটে হেঁটে চাকরির সন্ধান করার সময় তার পায়ে ফোঁটে একটা পেরেক। তারপর সেই ক্ষত বিষিয়ে উঠে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় কারমাইকেল (বর্তমানে আর জি কর মেডিকেল কলেজ) হাসপাতালে। সেখানেই বৈদ্যনাথের চিকিৎসা করতে আসেন ডাঃ বিধান রায়।
তারপর সুস্থ হয়ে যায় বৈদ্যনাথ। পড়ে যায় ডাঃ বিধান রায়ের সুনজরে। স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর গল্পের মতো জীবনের মোড়ে মোড়ে বৈদ্যনাথের সঙ্গে দেখা হতে থাকে বিধান রায়ের। মোড় ঘুরে যায় বৈদ্যনাথের জীবনের। বাকিটা বইয়ে পড়তে হবে।
ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের সম্পর্কে প্রচুর সত্যি মিথ্যা আর মিথ চালু আছে। কিছু মানুষ তাঁকে ভগবানের আসনে বসান। সমস্ত রাজনীতির মানুষ সম্পর্কে এরকম শোনাই যায়। সাগরময় ঘোষ সেই সব গল্পের উল্লেখ করে সেসব সত্যি মিথ্যা বা মিথের গল্পকে একটা স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন।
সম্পাদক সাগরময়ের আড়ালে চাপা পড়ে আছেন লেখক সাগরময়, যেটুকু লিখেছেন পড়লে মনে হয় আরো বেশি কেন লিখলেন না।
বাংলার রূপকার ও ধন্বন্তরী ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের জীবনের বেশ কিছু দুর্লভ মুহূর্ত দিয়ে সাজানো এই বই "একটি পেরেকের কাহিনী".. লেখক কিন্তু এই বইতে রাজনীতিবিদ বা ডাক্তার বিধানচন্দ্রের থেকেও বেশি করে তুলে ধরেছেন মানুষ বিধানচন্দ্রকে.. একদিকে লেখক যেমন এক সাধারণ অখ্যাত যুবক বৈদ্যনাথের প্রতি বিধানচন্দ্রের উদারমনস্কতা ও মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন, ঠিক তেমনই আবার মেজর রাইটের প্রতি তাঁর ব্যবহারে একপ্রকার কঠোরতা ও বুদ্ধিদীপ্ত স্বভাবের বর্ণনা তুলে ধরে বিধানচন্দ্রের চরিত্রের একটি বিশেষ দিক পাঠকের সামনে নিয়ে এসেছেন.. ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধার থেকে ভালোবাসায় ভরা শ্রদ্ধার দাম যে অনেক বেশি সেটা বারবার তাঁর এই ছোট্ট জীবনীর পাতায় পাতায় ফুটে উঠেছে.. মানুষ বিধানচন্দ্র কেমন ছিলেন? কেনই বা তাঁর মানবিকসত্ত্বা অনেক এগিয়ে ডাক্তারসত্ত্বা ও রাজনৈতিকসত্ত্বার থেকে? কেনই বা তাঁর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছিল আপামর বাংলার মানুষ? লেখক সাগরময় ঘোষের কলমে ফুটে উঠেছে এক "অন্য মানুষ" বিধানচন্দ্র রায়ের জীবনের এক খন্ডচিত্র..
পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী ডা বিধানচন্দ্র রায় এর জীবনী বলা চলে এটাকে।
জুতায় গেঁথে থাকা একটি পেরেকের খোঁচায় চাকরি সন্ধানী ভীষণ আত্মমর্যাদাসম্পন্ন যুবক বৈদ্যনাথ এর পা প্রায় কাটা পড়তে নিয়েছিল। ডা বিধানচন্দ্র তাকে সুস্থ করে তোলেন। বৈদ্যনাথ এর চাকরির ব্যাবস্থাও করে দেন তিনি। সেই থেকে ডা বিধানচন্দ্রের একজন শ্রেষ্ঠ ডাক্তার থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে উঠার গল্প আমরা জানতে পারি বৈদ্যনাথ এর মাধ্যমে।
সচরাচর এ ধরণের লেখা আমি বেশি একটা পড়ি না। কিন্তু এই বইটির অনাড়ম্বর, সাবলীল বর্ণনা যেন শুরু থেকেই আমাকে চুম্বকের মত ধরে রেখেছিল।
লেখাটা হয়ত একটু বেশি তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে গেল। কিংবা হয়তো এক্সপেক্টেশনটা একটু বেশিই ছিল বোধয়। বাংলার রূপকার ডঃ বিধান চন্দ্র রায়ের জীবনীর ক্ষুদ্র অংশই রয়েছে এই বইয়ে। কত মানুষ যে তাঁর কাছে উপকৃত হয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। এই বই পড়তে গিয়ে তার এক শতাংশও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। তবুও একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ না জানিয়ে পারা যায় না।
একবারে বসে শেষ করা যায় এমন একটি বই। কোনো রকম আগ্রহ ছাড়াই পড়তে শুরু করেছিলাম। ছিমছাম ভাষায় লেখা সাবলীল গতিতে এগিয়ে চলা একটা গল্প। যে গল্প আছে এক ভক্ত বৈদ্যনাথ আর তার পশ্চিমবঙ্গের দ্বীতিয় মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়। খুব বেশি জানা নেই এনার সম্পর্কে, তাই এই বই ভালোই লেগেছে, একটা ধারণা জন্মালো।
পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্রকে নিয়ে লেখা বই
যেই জীবনটা শুরু হয়েছিল এক পেরেকের গল্প দিয়ে, সেখান থেকেই যেন নতুন জীবনের গল্প। স্বভাবতই পশ্চিমবঙ্গের সেসময়কার সংস্কৃতি ও ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকায় খুব বেশি আবেগাপ্লুত হইনি। তবে বইটি প্রথম বেরিয়েছিল সম্ভবত ১৯৭১ সালে। সেসময়ে লেখা একজন অসাধারণ মানুষকে নিয়ে লেখা বই যারপরনাই পড়ে আগ্রহী হয়েছি আমি।
নভেলাটি মেদহীন, স্বাদু এবং সুপাঠ্য৷ তাড়াতাড়ি শেষও হয়ে যায়। কিন্তু সমস্যা হলো কেন্দ্রীয় চরিত্রদুটি একমাত্রিক, এবং গভীরতাহীন। তৎকালীন অগ্নিগর্ভ রাজনৈতিক পটভূমিগুলি খুব একটা সামনে আসে নি, তবুও সাগরময় ঘোষের বলিষ্ঠ কলমে বিষয়বস্তু উপভোগ্য হয়ে উঠেছে।
খুবই সুন্দর মনের মানুষ ছিলেন বিধান যার কিনা জন্মদিন ও মৃত্যুদিন একই দিনে। আমার বাবার নামও বিধান সম্ভবত মূখ্যমন্ত্রীর নামানুসারেই। বাবাকে জিজ্ঞেস করতে হবে
"একটি পেরেকের কাহিনী" কোনো ঐতিহাসিক জীবনী নয়, আবার নিছক গল্পও নয়। এটি একাধারে এক সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতিকূলতা, এক মহান ব্যক্তিত্বের ছায়া, এবং সেই ছায়ায় বেড়ে ওঠা বিশ্বাস, কর্তব্য ও আত্মমর্যাদার এক সংবেদনশীল দলিল।
বইটির কেন্দ্রীয় চরিত্র বৈদ্যনাথ—পূর্ববঙ্গের চাঁদপুর থেকে জীবিকার সন্ধানে কলকাতায় আসা এক যুবক। একদিন তার পায়ে একটি পেরেক বিধে যায়। সেখান থেকে শুরু হয় তার শারীরিক অবনতির পাশাপাশি জীবনবদলের এক অনিবার্য পথচলা। চিকিৎসার সূত্রে তার পরিচয় হয় ডা. বিধান চন্দ্র রায়ের সঙ্গে—বাংলার ইতিহাসে এক অসাধারণ চিকিৎসক, রাজনীতিবিদ এবং মানবিক নেতা।
তাদের সম্পর্ক একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়—যেখানে একদিকে আছে অসহায়তা, অন্যদিকে সহমর্মিতা; একদিকে নিঃস্বতা, অন্যদিকে নির্ভরতা। ডা. রায় বৈদ্যনাথের শুধু শারীরিক ক্ষত সারাননি, তাকে নৈতিকতা, কর্তব্যবোধ এবং আত্মবিশ্বাসের অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।
এই বইয়ের প্রকৃত সাফল্য এখানেই—এটি কেবল ডা. রায়ের মহানতা নয়, বরং সাধারণ বৈদ্যনাথের মধ্য দিয়ে সত্যিকারের "মানুষ" হয়ে ওঠার গল্প বলে।
সাহিত্যিক গদ্যের চেয়ে বইটির ভাষা অনেক বেশি স্পষ্ট, সংবেদনশীল এবং নিবিড়। এটি পড়ে মনে হয় না, কোনো কিংবদন্তির কীর্তিগাথা পড়ছি; বরং অনুভব করি, সত্যিকারের মানুষ খুঁজে পাওয়ার এক প্রক্রিয়ার অংশ হচ্ছি।
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অবিচার, দুর্নীতির এই সময়ে বইটি যেন একরকম আশার আলো। যখন আমরা প্রায়ই হতাশ হয়ে বলি—মানুষের মতো মানুষ আর নেই, তখন এই বইটি নীরবে কিন্তু জোরালোভাবে জানায়—মানুষ এখনও আছে, শুধু খুঁজে নিতে হয়। পড়া না থাকলে অবশ্যই পড়ুন। নমস্কার!
বইটি পড়ে চুপ হয়ে গিয়েছি। অনবদ্য, এককথায় অনবদ্য। বৈদ্যনাথ এর চারিত্রিক গুণাবলী, একাধারে দৃঢ়তা অপরপক্ষে কুসুমসম কোমল্য, আর্তের সেবায় নিয়োজিত প্রাণ এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বের নানা জানা অজানা তথ্য লেখক অসাধারণ মুন্সিয়ানার সাথে তুলে ধরেছেন।
সম্প্রতি সম্পাদকের বৈঠকে আর হীরের নাকছাবি পড়া শেষ করেছি। তাই এই বইটি পড়ার আগেই জানতাম, একটা এক বসায় শেষ করা বই ধরতে যাচ্ছি। আনন্দ থেকে উনার রচনাসমগ্র আছে, সবগুলোই সেখানে আছে। খুবই কম লিখেছেন, কিন্তু বোঝা যায় নিয়মিত লিখলে আমরা পাঠকরা আরো অসাধারন সব লেখা লেখকের কাছ থেকে পেতাম।