আধা-গ্রাম, আধা-শহর নয়, নিছক মফস্বল এলাকা। ঘোড়া-টানা টাংগা আছে। বাংলাদেশের অখ্যাত জরিপ-বহির্ভূত এই এলাকার অন্য পরিচয় আপাতত অবান্তর। একদম নরকের কুণ্ড নেমেছিল গোটা গৌড়গ্রাম অঞ্চলে। এমনই কাঠফাটা রোদ্দুর। সকাল আটটার পর আর সূর্যের চাঁটি সামলানো দায়। সর্দিগর্মিতে বেশ কিছু লোক মারা গেল। সামান্য বেলা উঠলে রাস্তায় লোকজন কমতে থাকে। কিন্তু সবাই তো ঘরে বসে দিন কাটাতে পারে না। পেটের ধান্দা আছে। তা বাদ দিলেও বাজার-হাট আছে। ছ- মাসের রসদ বেঁধে কেউ সংসার চালায় না। তলা-ফাঁক চাষিমজুরের সংখ্যা অনেক। হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে তাদের জগৎ অন্ধকার। অসহ্য গরম। ত্রাহি-রব ছাড়তে লাগল গোটা গ্রাম। রহিম গাড়োয়ান প্যাসেঞ্জার আর মাল নিয়ে গিয়েছিল ভিন গাঁয়ে পাঁচদিন পূর্বে। এলাকায় ঢুকে সে অস্থির হয়ে ওঠে। বলদ জোড়া এক পা এগোতে নারাজ, হাজার চাবুকের চোট সত্ত্বেও। গাছতলায় সে শেষ বলদ দুটো খুলে দিয়ে জিরোতে লেগেছিল। কিন্তু ছায়া পর্যন্ত গরম। চারপাশে তাতা মাটি, ছায়া অসহায়। নির্বায় সমুদ্রে চতুর্দিক খাবি খাচ্ছিল। বুড়ো গাড়োয়ান আধঘণ্টার মধ্যে নিজে খাবি খেতে লাগল।
Shawkat Osman (Bengali: শওকত ওসমান; Sheikh Azizur Rahman; 1917 – 1998) was a Bangladeshi novelist and short story writer.Osman's first prominent novel was Janani. Janani (Mother)is a portrait of the disintegration of a family because of the rural and urban divide. In Kritadaser Hasi (Laugh of a Slave), Osman explores the darkness of contemporary politics and reality of dictatorship.
Awards Bangla Academy Award (1962) Adamjee Literary Award (1966) President Award (1967) Ekushey Padak (1983) Mahbubullah Foundation Prize (1983) Muktadhara Literary Award (1991) Independence Day Award (1997)
উপন্যাসের শুরু হয় - "আধা-গ্রাম, আধা-শহর নয়, নিছক মফঃস্বল এলাকা। ঘোড়া টানা টাঙ্গা আছে, বাংলাদেশের অখ্যাত জরিপ বহির্ভূত এই এলাকার অন্য পরিচয় আপাতত অবান্তর।"
অন্য কোন পরিচয় না দিয়ে উপন্যাসিক হয়তো বাংলার সকল মফঃস্বলের সাথেই একটা মিল দেখাতে চেয়েছেন। উপন্যাসের শুরুতে দেখা যায় প্রচন্ড গরমে গায়ের লোক মারা যাচ্ছে, পুকুরের পানি এতোটাই ততা (গরম) হয়ে উঠেছে যে মাছ মরে ভেসে উঠছে। এতো গরম কেন পড়েছে জানতে চাইলে আধুনিক চিন্তাধারার কবি আর প্রাচীনত্বকে আঁকড়ে থাকা ইমাম সাহেব দুইজন-ই দোষ চাপিয়ে দেন গ্রামবাসীর উপরে, গ্রামবাসীর পাপের কারণেই নেমে এসেছে এই গজব। গ্রামে এরপর আবির্ভাব ঘটে পঙ্গপালের, উজার করে দেয় মাইলের পর মাইল ফসলী জমি, দোষ আবারো সেই গ্রামবাসীর উপরে, আবারো তাদের উপরে গজব নেমে এসেছে। পঙ্গপালের পাখায় আরবী লেখা দেখা যায়, কাজেই এই পঙ্গপালকে ধরা যাবেনা, ছোঁয়া যাবে না, মারা যাবে না। পঙ্গপালের পাখায় যেহেতু আরবী হরফ, কাজেই এটা যে ছদ্মবেশী আশীর্বাদ নয়, তা মূর্খ বাঙালি কি করে বুঝবে? দুধের অভাবে শিশু মরে, ইমাম সাহেব জানান এটা আল্লাহর মর্জি, তার বান্দা তিনি নিয়া গেছেন। লোকজন গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে আশ্রয় নিতে চাইলে আধুনিক কবির জবানীতে ভেসে আসে, মাঠে মারা যাওয়ার চাইতে নিজের ঘরে মরা ভালো।
দৃশ্যত উপন্যাসটি পতঙ্গ আক্রমনের কাহিনী হলেও উপন্যাস রচনার পিছনে ছিলো বাঙ্গালীর উপর বিভিন্ন জাতির আক্রমন আর স্বাধীনতা হরণের ভাবনা। পাকিস্তান হানাদার পতঙ্গদের রুখতে লাখ লাখ বাঙ্গালী পতঙ্গের মতোই জীবন দিয়েছে, আর সেখানেও সেই হানাদার পতঙ্গের পক্ষে সাফাই গেয়ে বেড়িয়েছে কিছু আধুনিক ও প্রাচীন চিন্তাধারার নিজেদের লোক।
১. এ উপন্যাসের গল্পটা স্বতঃসিদ্ধ। পতঙ্গের আগমনের পূর্ব অবধি ঘটনাপ্রবাহ ঘটনাপ্রবাহের মতোই চলতে থাকে — যে খালটাকে আমরা চিনি — সেভাবে বইতে থাকে। দুঃসাহসী মেটামর্ফোসিসটা হয় পতঙ্গের আবির্ভাবের পর। লেখকের বর্ণনাভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে গৌড়গ্ৰামের অদৃষ্টের মতোন। ঘটনাবিশ্লেষী বর্ণনাভঙ্গি রূপান্তরিত হয় প্রতিভাসাচ্ছন্ন বর্ণনাভঙ্গিতে। ঘটনাপ্রবাহে এটা হচ্ছিল, সেটা হচ্ছিল — এবং এই হয়, সেই হয় — এমন নির্ঝঞ্ঝাট বর্ণনার মধ্যে থেকে লেখক একটা ধাত বের করে আনেন। সেই ধাত সংশ্লিষ্ট তার চারিপাশের যতো উপাদান, সম্ভাবনা, চিন্তা, ভাব ও আপনি-আমি মিলিয়ে একটা প্রতিভাস সৃষ্টি করেন লেখক। তা বর্ণনা হয়ে ওঠে। অবশ্যই ঘটনাপ্রবাহের ঘটনা উবে যায়নি। কিন্তু তা "জল পড়ে পাতা নড়ে" নিয়মে বর্ণিত না, বরং কি পড়ছে, কি নড়ছে, এবং কিভাবে কেন কতোভাবে কতো কি হচ্ছে — তার একটা গদ্যময় অভিব্যক্তি দিয়ে প্রকাশিত হয়। সেই প্রতিভাসাচ্ছন্নতার মধ্যে "জলের পড়া" এবং "পাতার নড়া" বুঝে নিতে হয়। এতে ঘটনাও রইলো আর প্রতিভাসের ভাষাও। তবে এতো কথা বলার পর এটা বলতে খারাপ লাগে যে এই প্রতিভাসাচ্ছন্নতা সবটা সময় পুরোপুরি হজম হয় না। মাঝেমধ্যে কাটছাট করে কথার জায়গায় কথা পেড়ে দিলেই হয়ে যেতো — হয়তো — কোথাও কোথাও। যাক গে। তা নিয়ে নালিশ করার কোনো মানে হয় না। লেখক যেভাবে লিখতে চেয়েছেন — লিখেছেন।
২. অ্যালেগোরি জিনিসটা হয়তো অতোটা বুঝি না। কিংবা নিজের মতো করে বুঝি। তাই এ নিয়ে কিছু সমস্যা আছে। অ্যালেগোরি জিনিসটা আমার কাছে মেটাফোর, বা টেক্সটের অন্যান্য উপাদানের মতো স্ট্যাটিক আইডিয়া মনে হয় না। ওটা যেন একটা প্রসেস, অবিরাম সিগনিফিকেশন। প্রতীক হিসেবে বাঘ মানুষ হতে পারে — মানুষ জানোয়ার হতে পারে। এখন আছে তো এখনই আছে। রূপকে কিন্তু ওভাবে মূর্ত স্থিতাবস্থা থাকে না। রূপকে রাখাল মিছে কথা বলে চলে, বাঘ তাকে খেয়ে যায় খেয়ে যায় বারাবার। অবিরাম প্রসেস।
পতঙ্গ পিঞ্জর যারা পড়েন, তারা ধরে ফেলেন যে এটা মুক্তিযুদ্ধের রূপক। একটা বিচ্ছিন্ন সেটিং, হানাদারের প্রতীক, গৃহ-দ্বন্দ্বের প্রতীক, গেরিলা হামলার প্রতীক — সব গতিময়, উপস্থিত, এবং মুক্তিযুদ্ধের রূপক গল্প হিসেবে আমি এর প্রশংসা করতে পারি। যা বাস্তব, যা উপলব্ধ করা যায় — তা ভিন্ন আয়নায় দেখলে উপলব্ধির বিস্তার বাড়ে। রূপকে অবশ্যই নতুন সত্য ধরা পড়ে। এবং সেই দৃষ্টিভঙ্গি আমি অনায়াসেই গ্ৰহন করি।
কিন্তু এখানে আমি একটা জিনিস একটু প্রবলেম্যাটিক পাই। এই উপন্যাসটার "শুধু মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক রূপক উপন্যাস" হয়ে থাকাটা আমার কাছে প্রবলেম্যাটি লাগে। কেউ অবশ্য জবরদস্তি করে বলছে না যে এটাকে ঐ একই তফসিরে দেখতে হবে সবার। বরং বিষয়টা এমন যে — অ্যালেগোরিকাল ফিকশনে আমরা একবার "মিনিং" খুঁজে বের করার পর সেটা যেন আয়রন ব্র্যান্ডিংয়ের মতো ফিকশনে ছেপে দিতে চাই, তফসিরকারের মালিকানা আরোপের মতো। যেন, অরওয়েলের Animal Farm কেবলই 1917 কে কেন্দ্র করে লেখা — বিপ্লব বিফলে যাওয়ার থিম টা যেন মূখ্য না। পতঙ্গ পিঞ্জর কেন "কেবলই 1971" হবে? উপন্যাস তো এক প্রকার আধার। অ্যালেগোরি হলে তা আরো বেশি আধার — তার ফাংশনই তো ধারণ করা। এই উপন্যাসটা কেন আর গূঢ়তর থিম ধারণ করতে পারবে না? উপন্যাসে বাস্তবের মিল পেয়ে আমরা আনন্দ পাই, আমিও পাই, এখানেও পেয়েছি। তাই বলে কেবল ঐ বাছা বাছা মিল গুলিই কেন উপন্যাসের সর্বস্ব হবে? মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, তা অনস্বীকার্য বাস্তবতা। বাস্তবতা অবশই উপন্যাস ধারণ করবে — তবে কেবল একটা বাস্তবতা কেন? কেন অ্যালেগোরি ইউনিভার্সালিটির পথে পা বাড়াবে না — কেবল আমরা কিছু "মিনিং" খুঁজে পেয়ে সন্তুষ্ট হয়ে গিয়েছি বলে।
আমাদের এই সময়টাতে কি কোনো গৌড়গ্ৰাম নেই? এই যে ২০২৪ সালের মে মাস এটা — গত আট মাসে কি আমরা দেখিনি কোনো নিষ্পাপ গ্ৰামে পতঙ্গের হামলা? পঙ্গপালের ঝাঁক কিভাবে সব সবুজ ছারখার করে — জ্যান্ত প্রাণ কুঁড়ে কুঁড়ে খায় — একটা সমগ্র জনগোষ্ঠীকে সারা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাদের তিলে তিলে নিঃশেষ করে? আর বাকি সকলে কোনো দৈব আশির্বাদের প্রতিক্ষায় ধ্বংসলীলা চেয়ে চেয়ে দেখে? আমরা কি কিছু দেখছি না এই মুহুর্তে? যা হচ্ছে — যা আমাদের বাস্তবতা? এরকম নতুন তফসিরের দৃষ্টিতে দেখতে চাওয়া কি খুব ভুল হবে? আমি তো আগের সব তফসির বাতিল করে দিচ্ছি না, আমি বলছি একাধিক তফসির একই সাথে ভ্যালিড হতে পারে। এবং হতে হবে। আমরা আমাদের উপন্যাসগুলিকে মুক্ত না করতে পারলে উপন্যাস আমাদের মুক্তি দেবে কি করে?
"" একটা প্রাকৃতিক বিপর্যয় কত রকম আপদ বিপদ এবং লেজুড়ে লেজুড়ে নানা হাঙ্গামা আর অসোয়াস্তি ডেকে আনতে পারে তা মজকুর এলাকায় থাকলে আপনার বোধগম্য হত। কেয়ামত তক আর ভুলতেন না। ""
গৌড়গ্রাম অঞ্চল জুড়ে হিট ওয়েবের কারনে পুরো গ্রাম বিপর্যস্ত। গরমে মাথার ঘিলু টগবগ করে পুড়ছে। মানুষ মরে রাস্তাঘাটে পড়ে আছে। মাছগুলো মরে ভেসে উঠছে। পশুপাখি মরে সাফ হয়ে যাচ্ছে। অসহ্য গরম আল্লাহর নাম নিতেও বাধা দিচ্ছে। কবি মোহাম্মদ আলী এই পরিবেশে এসে আটকে পড়লেন। গ্রাম ত্যাগ করতে চাইলেও কোন উপায় নেই, কারন এই গরমে গো-শকট নিয়ে কোন গাড়িয়াল গ্রামের বাইরে যেতে রাজি নয়। ইতিপূর্বে অসহ্য গরমে এক গাড়িয়াল মারা গিয়াছে। বউ ঝিরা চুলোর কাছে পর্যন্ত যেতে পারেনা। নদী, মাঠ - ঘাট, খাল-বিল, পুকুর শুকিয়ে খা খা করছে। চারিদিকে শুধু একটাই হাহাকার, বৃষ্টি চাই বৃষ্টি। এরপরেই ধেয়ে এলো পঙ্গপাল। মাঠ ক্ষেত ফসল সবুজ যা কিছু ছিলো সব উজাড় হয়ে গেলো। গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে গেলো তাদের আক্রমনে। মানুষ, পশুপাখি সবার একই অবস্থা। মৃত্যুর মিছিলে যোগ দিল মানুষ পশুপাখি সবাই। সবাই ক্ষুধায় পাগল। খাবার চাই খাবার। আর চাই এই পঙ্গপাল থেকে মুক্তি।
মানব মনের বিচিত্র অনুভুতি গুলোকে লেখক খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন বইটিতে। অসাধারন একটা কাব্যিক উপন্যাস। বইয়ের প্রিয় সংলাপ কবি মোহাম্মদ আলীকে উদ্দেশ্য করে গফুর , "" ধর হালারে, পঙ্গপাল চেনেনা আবার কবিতা লেখে "" আমার মনে হয়েছে এটি একটি রূপক উপন্যাস যা মুক্তিযুদ্ধকে নির্দেশ করে। রেটিং ৫/৫
শীত, বৃষ্টি, গরম বা যেকোনো প্রাকৃতিক দূর্যোগে গ্রামের মুরব্বিদের প্রায়শই যে কথাটি বলতে শোনা যায়, 'এমন অবস্থা আমার জন্মে দেখিনি।' মানুষ মূলত সবসময় তার বর্তমান পরিস্থিতির মূল্যায়ন করেই এমন মন্তব্য করে। কারণ পেছনে কাটিয়ে আসা দুঃসহ সময় অনেকেরই স্মৃতিরেখায় ধূসর হয়ে আসে। তখন যাপিত জীবনের চাইতে যাপনের সময়টাই অসহ্যকর হয়ে ধরা দেয়।
গৌড়গ্রাম কোনো শহর না, আবার গ্রামও না। যাকে আমরা মফস্বল বলতে পারি, কারণ সেখানে ঘোড়ায় টানা গাড়িও আছে। কোনো এক ক্রান্তিকালে সূর্য যেন এক বিঘৎ নিচে নেমে এসেছিল। অগ্নিবর্ষণ হচ্ছিল পুরো এলাকা জুড়ে। প্রাণ তিষ্টানো দায়। গ্রামের পথ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় মানুষের রুহ যেন এক ফোঁটা পানির জন্য ছটফট করতে থাকে। তবুও জীবনযাত্রা থেমে থাকে না। স্থবিরতা আসে মাত্র। প্রৌঢ় কবি মোহাম্মদ আলীর কাছে সকলে যখন এই দূর্যোগের কারণ জানতে যায়, তিনি বলে দেন এটা গজব। কবি'র বক্তব্য মানুষের পাপের ফলই তারা ভোগ করছে পৃথিবীতে। কিন্তু কবিও যখন হুজুরদের মতো গজবের কথা উচ্চারণ করে তখন মানুষ তার উপর বিশ্বাস হারায়। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে মসজিদের ইমাম নামাজের আয়োজন করতে বলেন। তোলা হয় চাঁদা, ঠিক হয় জায়গা। আকাশে মেঘ ভেসে বেড়ায় কিন্তু বৃষ্টির দেখা নেই।
গৌড়গ্রামের ফসলের মাঠগুলো গ্রাম হতে মাইলখানেক দূর থেকে শুরু। বিরাট বড় মাঠ। অনেকেই সারাদিন চাষবাস করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরত আসে আবার কেউ কেউ ক্ষেতের সাথেই খামার বাড়ি বানিয়ে রাত থাকে। ঈশ্বর পণ্ডিত দীর্ঘদিন যাবত এমনই এক খামার বাড়ির বাসিন্দা। গ্রামে থাকার চাইতে খামার বাড়িতেই তিনি স্বস্তি পান। বয়স তখন সত্তরের বেশি। সন্তানেরা স্ত্রী-সন্তান নিয়ে গ্রামেই থাকে। একদিন রাতে তার সাথে থাকার জন্য এসেছিল মেজো ছেলের ছেলে বুলান। সে আবার দাদার বড় ন্যাওটা। ভোর রাতে ঈশ্বর পণ্ডিত গিয়েছিল তরমুজ ক্ষেত তদারকি করতে। সে রাতেই দাদার চিৎকার দৌড়ে গিয়েছিল বাইরে। কিন্তু ঈশ্বর পণ্ডিত পালিয়ে যেতে বলেছিলেন নাতিকে। সব নাকি খেয়ে ফেলবে! দৌড়ে গ্রামে গিয়ে খবর দিয়েছিল বুলান। সবাই এসে দেখেছিল মুখ থুবড়ে পড়া ঈশ্বর পণ্ডিতকে, সাথে তরমুজ ক্ষেতও যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে। চিহ্ন ছিল শুধু কিছু পোকার ডানা। চিনতে পারেনি কেউ ফসলখেকো পঙ্গপালকে।
একজন জলজ্যান্ত মানুষ যেন নাই হয়ে গেল। রেখে গেল আরো রহস্য। কবি মোহাম্মদ আলীকে সবাই জ্ঞানী মানে। তাই পতঙ্গের ডানা নিয়ে তারা কাছেই যায় সবাই। কবি সবাইকে বলে এটা সাধারণ কোনো পতঙ্গ না, কারণ পতঙ্গের গায়ে রয়েছে অক্ষর। গ্রামের সকলেই এই ইঙ্গিতকে পবিত্র জ্ঞান করতে শুরু করে। পতঙ্গের আক্রমণ থেকে ফসল ও নিজেদের রক্ষা করতে কার্যকর কোনো সমাধান তারা খুঁজে পায় না। গৌড়গ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় অন্যান্য এলাকা থেকে। এবার যেন সত্যিই তাদের জীবনের চাকা থেমে যায়। তবুও কী তারা রক্ষা পাবে?
শওকত ওসমানের 'ক্রীতদাসের হাসি' যারা পড়েছেন তারা লেখকের প্রতীকী উপন্যাস রচনার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। আলোচ্য উপন্যাসটিও একটি প্রতীকী রচনা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপলক্ষ্য হিসেবে পাঠক লেখাটিকে আবিষ্কার করবেন। যেখানে পঙ্গলপালকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং কবি মোহাম্মদ আলীকে এদেশীয় দোসরদের প্রতিভূ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষ হত্যাকে বৈধতা দিয়েছিল পাকিস্তানপন্থী খুনীরা। তবে বইটার গল্পকে শুধু মুক্তিযুদ্ধ দিয়ে আটকে রাখলে বইয়ের প্রাসঙ্গিকতা হারায়। বড় কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের কালেও আমরা এমন ঘটনার সম্মুখীন হই। নাতিদীর্ঘ এই উপন্যাস আমাদের সামনে সমাজ তথা রাষ্ট্রের পরিবর্তনের সময়কালে ঘটে যাওয়া প্রবাহের চিত্র উপস্থাপন করে। সংলাপ তেমন নেই তবে এক বসায় পড়া যায়। হ্যাপি রিডিং।