জীবনের কিছু ঘটনা আছে ঘটতেই থাকে। যার ক্ষেত্রে ঘটে সে যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো হাঁটতেই থাকে ঘটনার ভেতর দিয়ে; অথবা যেন ঘটনাই তাকে হাঁটিয়ে নিয়ে যায়। সেসব ঘটনার নিয়ন্ত্রণ কিংবা বিশ্লেষণ কিংবা ভালোমন্দের বিচার যেন অপ্রাসঙ্গিক কিংবা অসম্ভব হয়ে পড়ে ঘটনা ঘটা সময়ে। ঘটনা চলতে থাকে; মানুষও চলতে তাকে নির্লিপ্তভাবে ঘটনার সাথে...
জীবনে কিংবা ভাবনায় ঘটে যাওয়া এইসব ঘটনা দ্বিতীয়বার স্মরণ করতে গেলে কষ্টও হয়; হাসিও পায়। এরকমই সাতটি গল্পের বই- নিম নাখারা; তেতো কৌতুক...
গল্প বলি বাংলার পালাকার ও বয়াতি-বাউলের মতো বৈঠকি ঢংয়ে। কবিতা, গল্প ও মঞ্চ নাটক মিলিয়ে প্রকাশিত বই এক ডজনের বেশি। সম্প্রতি লিখছি রামায়ণের লোকায়ত আখ্যান...
সচলায়তন ব্লগে মাহবুব লীলেন এর লেখা পড়া হলেও মলাটে বাধা ছাপার অক্ষরে কোন লেখা হিসেবে লেখকের ’নিম নাখারা’ প্রথম পাঠ আমার। যদিও বইটির প্রকাশ ২০০৭ সালে অর্থাৎ নয় বছর আগে। প্রথম দিকের লেখা বলেই হয়তো কোন ঘটনা কিংবা কোন স্থানের বর্ণনা করতে গিয়ে অনেক বেশি শব্দ আর বাক্য ব্যবহার করেছেন লেখক, যা পাঠক হিসেবে আমাকে বিরক্ত করেছে।
’নিম নাখারা’য়, ’বৈরাত , নাটাঙ্গি , ভূমিলক্ষী , প্লানচেট , অন্তর্যান , আন্ডুল , মাটি‘ শিরোনামে মোট সাতটি গল্প আছে। ’বৈরাত’ গল্পটি আমাকে মুগ্ধ করেছে তার বয়ানে, তার সততায়নে। গল্প-উপন্যাসে আমরা যেমন কতগুলো নিদিষ্ট ফ্রেমের মাঝে বন্দি মানুষের ভালো-খারাপ দেখি এই গল্পে সেই ফ্রেমের মাঝে থাকেন নি লেখক। অর্থাৎ যাপিত জীবনে আমরা ঠিক যেমন থাকি ঠিক তেমনি এঁকেছেন। গল্পের চরিত্রের মাঝে সততা, সৎ, মহৎ, উদার দেখানোর যে প্রবণতা আমাদের লেখকদের থাকে সেটির কোন রেশ ছিলো না এ গল্পে এটাই এ গল্পের সবচেয়ে বড় মুগ্ধতা। স্কুলের ক্লাসে সবচেয়ে ভদ্রছেলেটা ও যে বন্ধুদের সাথে পাংটা হতে পারে, ঘরে দায়িত্বশীল বড় ভাইটাও যে বন্ধুদের সাথে থাকাকালীন এ নারী থেকে ও নারী তে মেতে থাকতে পারে এ সত্য সবাই প্রকাশ করতে চায় না। মাহবুব লীলেন তার বৈরাত গল্পে ঠিক সেটিই করেছেন। তিনবন্ধুর মাঝে এক বন্ধুর আত্নহত্যা করা এবং আত্নহত্যা পরবর্তী কাছের মানুষের নানান রূপ একেঁছেন লেখক এ গল্পে। সবকিছু মিলিয়ে অন্য ধারার উপাস্থনায় গল্পটি পাঠক কে আকৃষ্ট করবে বলেই আশা করি।
’নাটাঙ্গি’ গল্পটি খুব সম্ভব এ গ্রন্থের সেরা রচনা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের মানুষের মাঝে যেমন অজ্ঞতা আছে ঠিক তেমনি আছে অন্ধভক্তি। সেই অন্ধভক্তি, অতি মিথ্যে আবেগ যে মুক্তিযুদ্ধের অনেক সত্যের মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করাতে দেয়না তাই এ গল্পের মূল বক্তব্য। মুক্তিযুদ্ধ কে ফ্যান্টাসির মতো যারা জেনেছেন, যারা রূপকথার মতো ভেবেছেন তাদের জন্য এ গল্প একটি বড় ধাক্কা। যুদ্ধকালীন সময় এক পাকসেনা সাধারণ মানুষের হাতে ধরা পড়ার পর তাকে হত্যার বর্ণনা নিয়ে মূলত গল্পটি সৃষ্টি হয়েছে। মিথ্যে অনুভূতি আর মিথ্যে অজ্ঞতার জন্য আঘাত হয়ে গল্প নাটাঙ্গি জেগে থাকবে অনেকদিন।
এ গল্পগ্রন্থের সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো প্রথম দুটি গল্পের গল্পকার কে আমি তার পরবর্তী গুল্পগুলো তে খুঁজে পাইনি। গল্পহীন গল্পে অতি কথন, অতি বর্ণনায় সবগুলো গল্প বিরক্তির জন্ম দিয়েছে শেষ পর্যন্ত। গল্পগুলো আর গল্প থাকেনি, এলোমেলো বক্তব্য আর অতি ব্যাখ্যায়িত স্মৃতিকথনে লেখাগুলো হতাশ করেছে। শেষের পাঁচটি গল্প সত্যি হতাশ করেছে।