আগেকার দিন হলে বলা যেত, মিলনান্ত প্রেমের মধুর উপন্যাস। কিন্তু এ-জাতীয় বিশেষণ-ভূষিত উপন্যাসের অনুষঙ্গে বহু ক্ষেত্রেই জড়িয়ে আছে যেসব বস্তাপচা কাহিনীর অনিবার্য স্মৃতি, তার সঙ্গে কি কোনও মিল রয়েছে এই ‘হৃদয়বৃত্তান্ত’-এর? থাকা কি সম্ভব? বিশেষত, যে-উপন্যাসের লেখক স্বয়ং শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়? বলা হয় বটে, প্রেম যুগে যুগে। কিন্তু যুগোপযোগী প্রেমের ভিতরের চেহারাটা সবাই দেখাতে পারেন না। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় কিন্তু পারেন। তাঁর এই পারঙ্গম তারই অনুপম দৃষ্টান্ত ‘হৃদয়বৃত্তান্ত’। আমেরিকা-প্রবাসী এক বাঙালি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের জটিলতা, স্ক্যান্ডাল ও আসন্ন বিচ্ছেদ থেকে সূচনা হলেও এ-কাহিনীতে ক্রমশ যুক্ত হয়েছে হৃদয় সম্পর্কের নতুন-নতুন মাত্রা ও এই কলকাতা শহর। আধুনিক যুবক-যুবতীদের অস্থিরচিত্ততা, নিষ্ঠুরতা, প্রতিশোধ-প্রবণতা ও মূল্যবোধহীনতার আপাতকাহিনীকে একস্তরে রেখেও অতিসুনিপুণ ও সার্থকভাবে অন্যস্তরে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বুনে গিয়েছেন চিরন্তন মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের, চিরকালীন প্রেম-ভালবাসা-আবেগ ও নির্ভরতার এক অসামান্য বৃত্তান্ত।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একজন ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক।
তিনি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ময়মনসিংহে (বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ) জন্মগ্রহণ করেন—যেখানে তাঁর জীবনের প্রথম এগারো বছর কাটে। ভারত বিভাজনের সময় তাঁর পরিবার কলকাতা চলে আসে। এই সময় রেলওয়েতে চাকুরিরত পিতার সঙ্গে তিনি অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শীর্ষেন্দু একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত।
তাঁর প্রথম গল্প জলতরঙ্গ শিরোনামে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাত বছর পরে সেই একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে তাঁর প্রথম উপন্যাস ঘুণ পোকা প্রকাশিত হয়। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি।
গাট ফিলিং মশাই। নির্ভেজাল গাট ফিলিং। স্রেফ 'জয় মা কালী' বলে ব্লার্ব না পড়ে বই কেনার পুরোনো অভ্যেস। এ জিনিস আমায় বরাবর ভোগায়। নিজেকে গালাগালও করি মনের সুখে। কিন্তু মাঝেমধ্যেই আমার এই দিকভ্রান্ত কয়লাখনিতে হদিশ মেলে স্পেশাল কিছুর। যা একেবারে হীরে-জহরত না হলেও, সংগ্রহযোগ্য বটে। ফলস্বরুপ, স্মরণীয় কোনো বইয়ের সান্নিধ্যে কিছু সন্ধ্যা কেটে যায় ঝুপুশ করে। সাথে, মনটাও ভালো হয় দিব্যি, সেটা উপরি পাওনা।
'হৃদয়বৃত্তান্ত' নব্বুইয়ের দশকের বই। সাইজে নেহাতই ছোট। গল্পের গতিপ্রকৃতি নিয়ে তাই বেশি বকছি না আজ। এমনিতেই লিলিপুট গোছের উপন্যাস। বেশি বলে দিলে মূল আনন্দই না ভাগলবা হয়।
কেবল বলা যায় যে লেখকের এই চটজলদি পৃথিবীখানা নাগরিক জীবনের পরিচিত গন্ডিতেই আবদ্ধ। যা লঘু, সরেস, ও বেজায় সিনেমাটিক। যার মূল উপজীব্য হাতেগোনা কজন মানব-মানবীর সম্পর্ক সমূহ। ঠিক-বেঠিকের হিসেব পেরিয়ে 'পেয়ারের' কীর্তিকলাপ। সাথে লেখকের সাবলীল গদ্য, চতুর নো-ননসেন্স সংলাপ ও বাসন্তী-রঙা দাবার বোর্ডে অপ্রেমের চাল! পড়তে গিয়ে হাসলাম অনেক। বিশেষত, বইয়ের ভারতীয় অংশটি অনেকদিন মনে থাকবে, হলফনামা দিচ্ছি।
তবে, বইতে বিরক্তির অবকাশ একেবারে নেই, সেটা বলা কঠিন। শীর্ষেন্দুর উপন্যাস বলে কথা। খচখচানি সামান্য রয়েই যায়। আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগে লেখা উপন্যাসটিতে ডোমেস্টিক অ্যাবিউজ নিয়ে লেখকের মনোভাব কিছুটা আপত্তিকর ঠেকে। হয়তো বা স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের এক অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন লেখক। তবুও, বইয়ের মার্কিনী অংশটি, খুব একটা মনে ধরলো না আমার। স্রেফ এটার জেরেই অনেকে বইটিকে আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করতে পারেন। করলে, তাদেরকে খুব একটা দোষ দেবো না আমি।
এছাড়াও, হ্যাপি এন্ডিংয়ের প্রতি লেখকের সামান্য অতি-উদগ্রীবতা বইয়ের পাতায় দৃশ্যমান। (Not that I'm complaining...ওই নিয়ে আমার খুব একটা আক্ষেপও নেই!) তবে চরিত্রাঙ্কনের ক্ষেত্রে আরেকটু খাটাখাটনি করলে গল্পটি আরও ভারসাম্য পেত, এই যা।
তবুও, আজ সাত খুন মাফ। স্রেফ ওই তোতন, লোটন ও যশোধরাদের খাতিরেই নাহয় মাফিনামা মঞ্জুর করলাম! বইটা পড়ে, আর কিছু না হোক, মনটা ফুরফুরে হয়ে গেলো দিব্যি। বুকের কাছটাও একটু...ওই আরকি। তাই, আগেও বলেছি, এবারও বলবো, শীর্ষেন্দুর এই মাইক্রো উপন্যাসগুলোর টনিক-মাফিক কাজে দেওয়ার ক্ষমতা অনস্বীকার্য। হাতের কাছে দু-একটা না রেখে দিলে, দিনশেষে আপনারই লোকসান।
মানুষের পৃথিবীটা প্রবৃত্তির খেলায় মত্ত। জীবনের নাটকীয়তায়ও এ নিয়ামকটা অমোঘ। দিনশেষে ঠিক পাখি ঠিক ঘরে ফিরে। ঠিক ঘরে ফেরার জন্য যে জীবনশিক্ষাটুকুন পাথেয় হিসেবে পায় তা নাটকের অর্জন। জীবন নাটকের। মান-অপমান-অতৃপ্তি-ভুলবোঝা-অসন্তুষ্টি-ক্রোধ এই এই জিনিসগুলো না থাকলে একেবারে না-ই হয়। জাগতিক মানুষের থাকা লাগে। There is no such standard human, everybody is a constituent figure of an average human.
শুরুটা ভালো, কাহিনী চিত্রায়ণ ভালো, আস্তে আস্তে ভালো পথে এগিয়েছে, কিন্তু শেষে হ্যাপি-এন্ডিং টা পছন্দ হয় নাই। ক্লাস টেন এ নিপুণ মণ্ডল স্যার একদিন ট্র্যাজেডি নাটক পড়ানোর সময় বলেছিলেন, নায়ক যদি মারা যায়, তাহলে সেটা আর ট্র্যাজেডি থাকে না, কারণ মৃত্যুতে সে এক রকম মুক্তি পায় কষ্ট থেকে। এখানে প্রধান চরিত্র বা protagonist, সে তার জীবনের উত্থান পতন (উত্থান কম পতন বেশি) নিয়ে ভালই এগোচ্ছিল। এবং তার সাফারিংস নিয়ে একটা ডার্ক কমেডি টাইপ Netflix মুভি বানানো যাবে। কিন্তু শেষে হ্যাপি এন্ডিং দিতে গিয়ে করুণরস প্রশমিত করে একটা কেমনজানি ফিলিংস এনে দিল। শীর্ষেন্দু টাইপ সুন্দর বর্ণনা, তবে গুবলেট পাকানো এন্ডিং। কয়েকটা চরিত্র আজাইরা ভাবে গঠন করা হয়েছে। এইতো। সংক্ষিপ্ত আর সহজ ভাষা। পড়তে দুইঘন্টার বেশি লাগবে না। হ্যাপি রিডিং।
একটি প্রেমের কাহিনী। এখানে লেখকের পরিচিত চমক আছে প্রথম পরিচ্ছেদ এই। বহু চরিত্রের সমাহার এখানে, তার মধ্যে অনেক চরিত্র তার প্রাপ্য মর্যাদা পায়নি বলে আমার মনে হয়েছে। হয়তো পুজোর লেখার তাড়ায় দ্রুত শেষ করতে হয়েছে। বহু শহরে বিস্তৃত এই উপাখ্যান, সুন্দরবন থেকে কলকাতা হয়ে New Jersey। প্রধান চরিত্র কিছুটা অন্যমনস্ক বা পাগলাটে। তার দাদার চরিত্র খুবই চমকপ্রদ কিন্তু সে গল্পে প্রাপ্য উল্লেখ পায়নি। প্রথম দিকে এক যুগ বদলের আশা জাগিয়ে শুরু করেও এই গল্পের শেষে এক নায়িকা তার অত্যাচারকারী স্বামীর কাছেই ফিরে যান। অন্যজন নায়ককে একবার দেখেই বিয়ে করে ফেলেন। তবে শীর্ষেন্দু বাবুর লেখার গুণে পড়তে মন্দ লাগেনা, বরং পরিনতি দেখে পুরুষ হিসাবে ভালই লাগে।
This entire review has been hidden because of spoilers.