দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে উপমহাদেশীয়-অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রণ্ট হিসেবে বিখ্যাত ও প্রশংসিত একটা মহাকাব্যিক উপন্যাস।
‘রঙরুট’ কথাটা এসেছে ইংরেজি রিক্রুট থেকে, রিক্রুটই ফৌজি জিহ্বাতে বিকৃত হয়ে রঙরুটে রূপান্তরিত। হিটলার-স্টালিনের ১৯৩৯-এ সম্পন্ন মৈত্রী চুক্তি ভেঙে ১৯৪১-এ জার্মানির রাশিয়া আক্রমণ আর পয়লা ডিসেম্বর জাপানের আমেরিকার পার্ল হারবারে বোমাবর্ষণের ঘটনা থেকে ‘রঙরুট’-এর শুরু। একদিকে তখন জাতীয় কংগ্রেস যুদ্ধে ভারতীয়দের যোগ দিতে বারণ করছে, কারণ যুদ্ধে যোগ দেওয়া বা সৈন্যবাহিনীতে নাম লেখানো মানে ব্রিটিশ শাসনকে শক্তি জোগানো, অন্যদিকে কমিউনিস্ট পার্টি ডাক দিচ্ছে ফ্যাসিস্ট-নাৎসিদের অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে লড়বার জন্য মিত্র বাহিনীতে তথা জনযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্যে। এই দুই বিপরীতমুখী আকর্ষণে দীর্ণ হতে হতে ‘রঙরুট’-এর নায়ক অমল বেকারত্বের জন্য বাড়ির গঞ্জনা সহ্য করতে না পেরে, যুদ্ধের বাজারে মওকা বুঝে দাঁও মারার পথে যাওয়ার সুযোগ ছেড়ে, শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীতেই যোগ দেয়।
অনেক নাটকীয় ঘটনা, বিচিত্র বিভিন্ন চরিত্রের কুশীলব, কাহিনিস্রোতে প্রচুর মোড়-মোচড় ১৯৫০-এ প্রকাশিত এই উপন্যাসে। অভিজ্ঞতার অভিনবত্বে, ঘটনার ঘনঘটায়, পটভূমির বিশালতায়, চরিত্রের প্রাচুর্যে ও বর্ণাঢ্যতায়, যুদ্ধের বিরোধিতায় ও শান্তির সমাচারে ‘রঙরুট’ পেয়েছে এক মহাকাব্যিক উচ্চতা।
বরেন বসুকে অনেকে 'আমাদের রেমার্ক' বলে আখ্যা দিয়েছেন। 'রঙরুট' বইটা উপমহাদেশের 'All Quiet on the Western Front' হিসেবে খ্যাত। অনুবাদ হয়েছে বহু ভাষায়। কিন্তু এতো কিছুর পরও বইটা দুর্লভ, কেননা রিপ্রিন্ট হয় না। রেমার্ক পড়া আমার শুরু 'সেবা'র অনুবাদে 'থ্রি কমরেডস' দিয়ে। মাসুদ মাহমুদের অনুবাদ করা বইটা আমার সারাজীবনের পছন্দের একটা হয়ে থাকবে। তারপর একে একে রেমার্কের আরও বই পড়লাম। All Quiet on the Western Front পড়ার পর সম্ভবত দুই তিন দিন মাথায় কেবল যুদ্ধের ময়দান ছাড়া মাথায় আর কিছু ছিল না।
'রংরুট' বলে আসলে কোন শব্দ নাই। ইংরেজি রিক্রুট শব্দটা অশিক্ষিত মিলিটারি সুবেদার ধরনের মানুষের মুখে বদলে গিয়ে 'রংরুট' হয়ে গেছে। আর রংরুট বলতে আর্মিতে ঢোকা সৈন্যদের বোঝায়। বরেন বসুর বইটা সেই সৈন্যদের নিয়েই লেখা। পটভূমি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। প্রধান একটি চরিত্র, অমলকে কেন্দ্র করে তিনি উপন্যাসের গল্প সাজিয়ে দেখিয়েছেন অনেক কিছু।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উপমহাদেশে তখন ব্রিটিশ শাসন। এদিকে জাপানীরা বর্মা আক্রমন করে ক্রমে ভারতের দিকে আসছে। দুর্ধর্ষ জাপানীদের রুখতে ব্রিটিশদের দরকার আরও সৈন্য। তাই সারা ভারতবর্ষের জায়গায় জায়গায় তারা সৈন্যদলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পোস্টার সাঁটিয়ে রেখেছে। এদিকে চাকরির বাজার শূন্য। একদিকে 'ভারতীয় সৈন্য দলে যোগ দিন', অন্যদিকে 'কর্ম খালি নাই'। জিনিসপত্রের দাম ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। শেষমেশ কোন উপায় না পেয়ে অমল যোগ দেয় সৈন্যদলে, রেলের গার্ড হিসেবে।
সে সময়ে সৈন্যদলে যোগ দেওয়া কোন মহৎ বিষয় ছিল না। একে তো ভারত পরাধীন, সেই পরাধীন দেশের ছেলেরা যখন পেটের দায়ে সৈন্য দলে যোগ দিচ্ছে তখন সমাজ তাদের এক রকম ব্রাত্য হিসেবেই দেখছে। মানুষের ধারনা, দেশে যখন চালের দাম বাড়তে বাড়তে দুর্ভিক্ষ লেগে যাচ্ছে, তখন সেনা ক্যাম্পে অমলদের মত ছেলেরা খেয়ে-ঘুমিয়ে সময় কাটাচ্ছে। অথচ, ক্যাম্পে তাদের জোটে পোকায় কাটা চালের ভাত, আর ডাল। সেই সঙ্গে চলে অমানসিক পরিশ্রম।
'একজন সৈনিকের কাজ কেবল হুকুম মানা'। যদিও অমল চাকরি পায় রেলের গার্ড হিসেবে, তবুও তাকে নিতে হয় সামরিক প্রশিক্ষণ। আর এই প্রশিক্ষণ মানে 'রংরুট'দের উপর ল্যান্স নায়েক, সুবেদার মেজর, হাবিলদার প্রভৃতি ব্যক্তির অত্যাচার। গালি গালাজ, অকারন শাস্তি, অতিরিক্ত পরিশ্রম করিয়ে নেওয়াই যেন ক্যাম্পের রুল। এসব সম্পর্কে কিছুই না জানা অমল ক্রমে অবাক, ভীত, কখনও প্রতিবাদী। সেই সঙ্গে সে দেখতে পায় ছেলেরা ক্যাম্পের অত্যাচার থেকে শান্তি খুঁজতে মদ-মেয়েমানুষ নিয়ে কীভাবে ব্যস্ত হয়।
বইয়ে সম্মুখ সমরের কোন বর্ণনা নেই, যেমন ছিল রেমার্কের 'All quiet on the western front'-এ। কিন্তু এই বইয়ে ক্যাম্পে অফিসারদের শেচ্ছাচারিতা্ সিভিলিয়ান থেকে হঠাৎ পাওয়া সৈনিক জীবনকে খুব ভেতর থেকে দেখানো হয়েছে। যুদ্ধের ফলে ইচ্ছে করে তৈরি করা কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের কথা আছে। যুদ্ধের বিভীষিকার কথা আছে। বর্মা থেকে চলে আশা মানুষদের দুর্দশা, এক টুকরো রুটির আশায় যুবতীর সম্ভ্রম বিকিয়ে দেওয়া, পালিয়ে আসা মানুষদের কথা, মরে যাওয়া সাথীকে পায়ে দলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথা আছে। আছে আর্মি অফিসারদের স্বার্থপরতা, নোংরামির কথা। আছে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের কথা। কিছুটা কমিউনিজমের বুলিও আছে। একটা বিপ্লবের আভাস দিয়ে যার শেষ।
রঙরুট শেষ করে অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলাম। কোনো সম্মুখ সমরের বর্ণনা না দিয়েও এমন একটা বই লেখা যায়! বলতে বাধ্য হচ্ছি, ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ লেভেলের একটি বই পড়ে ফেললাম। বরেন বসুর তীক্ষ্ণ বর্ণনায় দৃশ্যগুলো জ্যান্ত হয়ে উঠেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, সৈনিক জীবনের আগাগোড়া,মানুষের দানব হয়ে ওঠা এবং সবশেষে দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তির গানের এই গল্প আমায় স্তব্ধ করার পাশাপাশি মুগ্ধ করেছে। মনে করিয়েছে এরিক মারিয়া রেমার্কের সেই অবিস্মরণীয় উক্তি “যুদ্ধের প্রথম বোমাটা পড়ে মানুষের হৃদয়ে”।
যদিও বই এর পরিচিতিতে একে বাংলা ভাষার All quite on Western Front বলা হয়েছে , তবে বই হিসেবে All quite on Western Front অনেক উপরে। কিন্তু এতে বইটির গুনগত মান খারাপ বলছি না। নিঃসন্দেহে বাংলা ভাষায় লেখা সেরা উপন্যাসগুলুর একটা। All quite on Western Front এর পল বমারের সাথে অমলের তুলনা হয় না।কিন্তু অমল ও পল বমারের মত একজন সাধারন সৈনিক এবং অমলের position বমারের তুলনায় নিম্নতর। বমার জানত সে যুদ্ধ করছে দেশের জন্য যদিও সে দেশ, জাতি এই সব নিয়ে প্রশ্ন করেছে। অন্যদিকে অমল উপনেবিশিক শক্তির যোদ্ধা। সে যুদ্ধক্ষেত্রে নির্যাতিত, দেশবাসীর কাছে অবাঞ্চিত। বই এর প্রতি পাতায় আছে উপনেবিশিক শক্তির প্রতি ঘৃণা আর উপনেবিশিক শক্তি কর্তৃক লাঞ্চনার বর্ননা।