বরেন বসুকে অনেকে 'আমাদের রেমার্ক' বলে আখ্যা দিয়েছেন। 'রঙরুট' বইটা উপমহাদেশের 'All Quiet on the Western Front' হিসেবে খ্যাত। অনুবাদ হয়েছে বহু ভাষায়। কিন্তু এতো কিছুর পরও বইটা দুর্লভ, কেননা রিপ্রিন্ট হয় না। রেমার্ক পড়া আমার শুরু 'সেবা'র অনুবাদে 'থ্রি কমরেডস' দিয়ে। মাসুদ মাহমুদের অনুবাদ করা বইটা আমার সারাজীবনের পছন্দের একটা হয়ে থাকবে। তারপর একে একে রেমার্কের আরও বই পড়লাম। All Quiet on the Western Front পড়ার পর সম্ভবত দুই তিন দিন মাথায় কেবল যুদ্ধের ময়দান ছাড়া মাথায় আর কিছু ছিল না।
'রংরুট' বলে আসলে কোন শব্দ নাই। ইংরেজি রিক্রুট শব্দটা অশিক্ষিত মিলিটারি সুবেদার ধরনের মানুষের মুখে বদলে গিয়ে 'রংরুট' হয়ে গেছে। আর রংরুট বলতে আর্মিতে ঢোকা সৈন্যদের বোঝায়। বরেন বসুর বইটা সেই সৈন্যদের নিয়েই লেখা। পটভূমি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। প্রধান একটি চরিত্র, অমলকে কেন্দ্র করে তিনি উপন্যাসের গল্প সাজিয়ে দেখিয়েছেন অনেক কিছু।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উপমহাদেশে তখন ব্রিটিশ শাসন। এদিকে জাপানীরা বর্মা আক্রমন করে ক্রমে ভারতের দিকে আসছে। দুর্ধর্ষ জাপানীদের রুখতে ব্রিটিশদের দরকার আরও সৈন্য। তাই সারা ভারতবর্ষের জায়গায় জায়গায় তারা সৈন্যদলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পোস্টার সাঁটিয়ে রেখেছে। এদিকে চাকরির বাজার শূন্য। একদিকে 'ভারতীয় সৈন্য দলে যোগ দিন', অন্যদিকে 'কর্ম খালি নাই'। জিনিসপত্রের দাম ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। শেষমেশ কোন উপায় না পেয়ে অমল যোগ দেয় সৈন্যদলে, রেলের গার্ড হিসেবে।
সে সময়ে সৈন্যদলে যোগ দেওয়া কোন মহৎ বিষয় ছিল না। একে তো ভারত পরাধীন, সেই পরাধীন দেশের ছেলেরা যখন পেটের দায়ে সৈন্য দলে যোগ দিচ্ছে তখন সমাজ তাদের এক রকম ব্রাত্য হিসেবেই দেখছে। মানুষের ধারনা, দেশে যখন চালের দাম বাড়তে বাড়তে দুর্ভিক্ষ লেগে যাচ্ছে, তখন সেনা ক্যাম্পে অমলদের মত ছেলেরা খেয়ে-ঘুমিয়ে সময় কাটাচ্ছে। অথচ, ক্যাম্পে তাদের জোটে পোকায় কাটা চালের ভাত, আর ডাল। সেই সঙ্গে চলে অমানসিক পরিশ্রম।
'একজন সৈনিকের কাজ কেবল হুকুম মানা'। যদিও অমল চাকরি পায় রেলের গার্ড হিসেবে, তবুও তাকে নিতে হয় সামরিক প্রশিক্ষণ। আর এই প্রশিক্ষণ মানে 'রংরুট'দের উপর ল্যান্স নায়েক, সুবেদার মেজর, হাবিলদার প্রভৃতি ব্যক্তির অত্যাচার। গালি গালাজ, অকারন শাস্তি, অতিরিক্ত পরিশ্রম করিয়ে নেওয়াই যেন ক্যাম্পের রুল। এসব সম্পর্কে কিছুই না জানা অমল ক্রমে অবাক, ভীত, কখনও প্রতিবাদী। সেই সঙ্গে সে দেখতে পায় ছেলেরা ক্যাম্পের অত্যাচার থেকে শান্তি খুঁজতে মদ-মেয়েমানুষ নিয়ে কীভাবে ব্যস্ত হয়।
বইয়ে সম্মুখ সমরের কোন বর্ণনা নেই, যেমন ছিল রেমার্কের 'All quiet on the western front'-এ। কিন্তু এই বইয়ে ক্যাম্পে অফিসারদের শেচ্ছাচারিতা্ সিভিলিয়ান থেকে হঠাৎ পাওয়া সৈনিক জীবনকে খুব ভেতর থেকে দেখানো হয়েছে। যুদ্ধের ফলে ইচ্ছে করে তৈরি করা কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের কথা আছে। যুদ্ধের বিভীষিকার কথা আছে। বর্মা থেকে চলে আশা মানুষদের দুর্দশা, এক টুকরো রুটির আশায় যুবতীর সম্ভ্রম বিকিয়ে দেওয়া, পালিয়ে আসা মানুষদের কথা, মরে যাওয়া সাথীকে পায়ে দলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথা আছে। আছে আর্মি অফিসারদের স্বার্থপরতা, নোংরামির কথা। আছে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের কথা। কিছুটা কমিউনিজমের বুলিও আছে। একটা বিপ্লবের আভাস দিয়ে যার শেষ।