লেনিন কেন জরুরি- নাম থেকেই পরিষ্কার যে বইটি সমাজতন্ত্রকে উপজীব্য করেই লেখা হয়েছে। তবে সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদ নিয়ে লেখক যা বলতে চেয়েছেন তা বলার জন্য তিনি যে পথটি নিয়েছেন সেটি বেশ অভিনব আর দারুণ চিত্তাকর্ষক।
প্রথম প্রবন্ধটি অস্কার ওয়াইল্ড আর আইনস্টাইনকে নিয়ে। একজন সাহিত্যিক অন্যজন বিজ্ঞানী। দুজনের মধ্যে মিল খুঁজলে পাওয়া যাবে সেই সাম্যবাদী ভাবনাতেই। দুজনেই মানুষ নিয়ে ভেবেছেন এবং নিজেদের কাজের মাধ্যমে এবং লেখার মাধ্যমে নিজেদের ভাবনার পাশাপাশি সাম্যবাদের গুরুত্ব নিয়ে বলে গেছেন।
মজার ব্যাপার, স্কুলে পড়াকালীন দৈত্য, শিশু আর বাগানের গল্পটি যে পুঁজিবাদ আর সমাজতন্ত্রের রূপক তা আমি জানতাম না। গল্পটা যে অস্কার ওয়াইল্ড এর তাও না।
পরবর্তী তুলনাটি আরো কৌতূহল উদ্রেককারী। ভলতেয়ার আর নজরুল। দুজনের মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে কোন মিল হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু তাঁদের মিল ছিল তাঁদের কাজের উদ্দেশ্যে। দুজনেই ছিলেন সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার।
পরের প্রবন্ধগুলো রাজনৈতিক। জিন্নাহ ও আজাদের তুলনাতে সেই প্রাচীন অথচ প্রয়োজনীয় প্রশ্নটাই আবার এসেছে। একজন ধর্মে অবিশ্বাসী রাজনীতিক হওয়া সত্ত্বেও কেন জিন্নাহ দ্বিজাতিতত্ত্ব আনলেন অন্য দিকে আজাদ, যিনি ছিলেন আপাদমস্তক ধার্মিক এবং মাওলানা, তিনি কেন সেই তত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করলেন? এর উত্তর আজকের দিনে আরো অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক বলেই আমার মনে হয়।
তাজউদ্দিন আহমেদ আর আবু তাহেরের রাজনৈতিক অবস্থান আর পরিণতি এবং পরবর্তী প্রবন্ধগুলোতে গোলাম আযমের রাজনীতি এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর মূলনীতি এবং তার সাথে কীভাবে পুঁজিবাদ সম্পর্কিত সে আলোচনা রয়েছে।
অন্য একটি প্রবন্ধে, পৃথিবীর প্রথম যুগের বুদ্ধিজীবীরা কেন গণতন্ত্রবিমুখ ছিলেন? এই প্রশ্ন তুলেছেন লেখক। সত্যিই তো, সক্রেটিস, প্লেটো বা অ্যারিস্টটল কারোর কাছেই গণতন্ত্র গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাঁরা প্রজাতন্ত্র বা অভিজাততন্ত্রতেই বিশ্বাসী ছিলেন অথচ তাঁদের ভাবনা এখনো আমাদের আলোড়িত এবং আলোকিত উভয়ই করে। কিংবা ধর্মপ্রাণ ডারউইন এমন এক আবিষ্কার করে বসলেন যে ধর্মের ভিত্তিমূলটাই কেঁপে গেল। তিনি কি তা সজ্ঞানে করেছিলেন? কেবল তো গবেষণা করে যা পেয়েছিলেন তা-ই বলেছিলেন। অথচ ধর্মে অবিশ্বাসী মার্কসের চাইতেও তাঁর আবিষ্কারটাই ধর্মীয় ভিত্তিকে বেশি আঘাত করেছিল।
পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে এক ধরনের বিপ্লবই চালিয়ে যাচ্ছেন লেখক তাঁর লেখার মাধ্যমে। তাঁর অধিকাংশ প্রবন্ধই পুঁজিবাদের ভ্রান্ত আদর্শের বিরুদ্ধে আর তা অত্যন্ত সহজ ভাষায়। লেখক একটি প্রবন্ধে এই প্রশ্নও তুলেছেন যে আমাদের তরুণেরা যেভাবে খেলা, কনসার্ট ইত্যাদিতে আগ্রহ দেখায় কেন বই পড়ার ক্ষেত্রে ততটা নয়? ভারী বইগুলো একটু সহজভাষায় পাওয়া যায় না আর সহজ বইগুলো কেবল শোনার আনন্দেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই হয়তো তিনি তাঁর প্রবন্ধগুলোকে যতটা সম্ভব সহজবোধ্য করতে চেষ্টা করেন সবসময় যেন সেগুলো পড়ে কিছু চিন্তার খোরাক অন্তত পেতে পারেন একজন সাধারণ নবীন পাঠকও।
একটা ভালো প্রবন্ধ কি কেবল নতুন ভাবনারই যোগান দেয়? মাঝে মাঝে ভালো ভালো প্রবন্ধগুলো একজন পাঠকের চিন্তাধারাকে সুসংহত করে। যা ভাবি, তা যখন ছাপার অক্ষরে আরো ঐশ্বর্যমণ্ডিতরূপে দেখতে পাই তখন একধরনের সাফল্যের অনুভূতি হয়। মনে হয় ভাবতে পারছি আর যে জাতি ভাবে, তাকে দমানো যে মুশকিল তা কে না জানে।