আফ্রিকার ছোট্ট রাজ্য লিসোটোতে বেড়াতে গিয়ে রাত্রিবাস বন্দোবস্ত করতে না পেরে লেখক ম্যাডলক সাহেবের কটেজে আশ্রয় নেন। কথাবার্তায় জানতে পারেন, ম্যাডলক যে সুদর্শনা নারীর জন্য শৌখিন কটেজ তৈরি করেছিলেন, সে তাকে ত্যাগ করে ঘর বেঁধেছে এ কটেজের স্থপতির সঙ্গে। পাঠকদের সঙ্গে লেখক পরিচয় করিয়ে দেন তাঁর এইডসগ্রস্ত গাইডের। স্বভাবে কবিয়াল মানুষটি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে মৃত্যুর। বর্ণ্না করেন ব্ল্যাকম্যাজিকের জাদুটোনায় ব্যবহারের জন্য শ্বেতীগ্রস্ত এক মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নির্মমভাবে কেটে নেওয়ার ঘটনা। এক জমানায় যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হয়েছিলেন শরীরে তীব্র আবেদন ছড়ানো এক রূপসী। এ যাত্রায় পাঠক তারও দেখা পান উপত্যকার নিভৃত এক কুটিরে। বাক্শক্তিহীন স্ট্রোকে জর্জরিত মহিলা সেখানে একাকী বাস করছেন। কাউকে দেখাতে চান না তার মুখাবয়ব, তাই তিনি মুখে তুলে নিয়েছেন মুখোশ। লেখক মইনুস সুলতানের অতুলনীয় বর্ণনায় পাঠক নানা ধরনের মানুষের দেখা পাবেন এবং উপভোগ করবেন তাদের বিচিত্র দিনযাপন।
মঈনুস সুলতানের জন্ম ১৯৫৬ সালে, সিলেট জেলার ফুলবাড়ী গ্রামে। তাঁর পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ে পিএইচডি। খণ্ডকালীন অধ্যাপক ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস এবং স্কুল অব হিউম্যান সার্ভিসেসের। ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকার ভিজিটিং স্কলার। শিক্ষকতা, গবেষণা ও কনসালট্যান্সির কাজে বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তাঁর ‘জিম্বাবুয়ে : বোবা পাথর সালানিনি’ গ্রন্থটি প্রথম আলো বর্ষসেরা বই হিসেবে পুরস্কৃত হয়। ২০১৪ সালে ভ্রমণসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। প্রাচীন মুদ্রা, সূচিশিল্প, পাণ্ডুলিপি, ফসিল ও পুরোনো মানচিত্র সংগ্রহের নেশা আছে মঈনুস সুলতানের।
বাসেটো, সিসেটো, লিসেটো এই তিনটা শব্দই খালি মাথায় ঘুরছে বইটা পড়ার পর থেকে। লেখকের বই কাবুলের ক্যারাভান সরাই আগে পড়ার ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু পড়তে পারি নি। মুজতবা আলীর ঢঙে লেখার একটা প্রবণতা আছে লেখকের। আরবি শব্দও অনেক ব্যবহার করেন। কিন্তু পড়তে ভালো লাগে। প্রথম দিকে প্রকৃতি, পরিবেশের বর্ণনা বেশি থাকলেও লিসেটোর কবি নাকাতুলেকে নিয়ে লেখকের বেশি আগ্রহ চোখে পড়েছে। এমনকি লেখক যেন প্রকৃতি দেখছেন নাকাতুলের মধ্যে দিয়ে এমন মনে হয়েছে। বাকি বইগুলো পড়লে অবশ্য বোঝা যাবে, কিভাবে দেখছেন বিশ্বকে। তবে যাদের ভ্রমণ বিষয়ে আগ্রহ আছে, তাদের ভালোই লাগবে। আর একটা বিষয় আফ্রিকার দেশগুলোর আর্থ-সামাজিক অবস্থার একটা খতিয়ান পাওয়া যায়। কুষ্ঠ রোগীদের আফ্রিকান সমাজ কিভাবে দেখছে তাও জানা যায়। বলতে গেলে দেশটাকে মোটামুটি মেজার করতে পারা যায় বইটা পড়লে।
মাঈনুস সুলতানের বিচিত্র সফর বৃত্তান্তগুলোকে প্রথাগত ভ্রমণ কাহিনীর ধরাবাঁধা ছাঁচের আদলে ফেলা মুশকিল। পেশাদারী দায়িত্বের সুবাদে লেখকের যাত্রাপথ নিছকই পর্যটকপ্রিয় দর্শনীয় লোকেশন এড়িয়ে তাঁকে নিয়ে যায় অপ্রচলিত গন্তব্যে। তাই দর্শনার্থীর ভবঘুরের চোখে দেখা অগভীর মনোজ্ঞ বর্ণনা নয়, তাঁর রচনার মূল ভাব আটপৌরে মানুষের যাপিত জীবনের মিথস্ক্রিয়া। তার মধ্যে দিয়ে ফুটে ওঠে স্থানীয় সামাজিক কৃষ্টি, রীতিনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার আলেখ্য।
আফ্রিকার ছোট্ট পাহাড়ি রাজ্য লেসোথোতে লেখকের দিনকয়েক অবকাশ যাপনের ফিরিস্তি 'আকাশরাজ্য' বইটি। ঢেঁকি যেমন স্বর্গে গেলেও ধান ভানে, মাঈনুস সুলতানও তেমনই চেষ্টা করেছেন মুসাফিরির উসিলায় দেশটির হাঁড়ির খবর বের করে আনতে। ড. মোজাফেলা মোজেসে, নাকাতুলে মোপালেসা- এঁরা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত পরিচিতজন নয়, লেসোথোর জনমানসের অভ্যন্তরে পাঠককে দৃষ্টিপাত করার সুযোগ করে দেয়া একেকটি জানালা স্বরূপ। তাঁদের সাথে লেখকের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার ঘাত- অন্তর্ঘাতে উঠে আসে দেশটির পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা, এমনকি "সামাজিক মাটাটা"গুলোও।