রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নের শান্তিনিকেতনসংস্কৃতিবান বাঙালির প্রিয় তীর্থক্ষেত্র। কেমন ছিল শান্তিনিকেতনের পুরনো সেইসব দিন, তা জানতে আজও সকলে উৎসুক। শান্তিনিকেতনে বড় হওয়া সেদিনের ভাগ্যবান মানুষদের স্মৃতিকথা আজকের পাঠকের কাছে অমূল্য সম্পদ। সুপ্রিয় ঠাকুরের ‘ছেলেবেলার শান্তিনিকেতন’ তেমনই এক অপরূপ স্মৃতির জলছবি। ১৯৪৭ সালে তিনি পাঠভবনে ভরতি হন। উত্তরায়ণের পুনশ্চ বাড়িতে তাঁরা তখন থাকতেন। সেদিনের শান্তিনিকেতন ছিল নির্জন। পাখির ডাকে ভরে থাকত সারাটা সকাল। চাঁদের আলোয় বেড়াতে যাওয়া হত। ক্লাস শুরুর আগে বটগাছের ঝুরি ধরে দোল খেয়ে নিত পড়ুয়ারা। শান্তিনিকেতনে লেখক দেখেছিলেন উন্মুক্ত প্রকৃতির কোলে বড় হয়ে ওঠার স্বপ্নশিবির। সেকালের পৌষমেলা, বসন্তোৎসবের বর্ণনার পাশাপাশি তাঁর কলমে এসেছে রথীন্দ্রনাথ, প্রতিমা দেবী, ইন্দিরা দেবী, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, নীলিমা সেন, অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্নদাশঙ্কর রায়, শান্তিদেব ঘোষ প্রমুখের প্রসঙ্গ। আছে পূজনীয় শিক্ষকবৃন্দের কথাও। ‘ছেলেবেলার শান্তিনিকেতন’ হারিয়ে-যাওয়া এক সোনালি যুগের গল্প, পাঠকের মনে যা চিরন্তন স্পর্শ রেখে যায়।
সুপ্রিয় ঠাকুরের জন্ম নভেম্বর ১৯৩৮। তিনি রবীন্দ্রনাথের মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরেরপ্রপৌত্র, সুরেন্দ্রনাথের পৌত্র, সুবীরেন্দ্র ও পূর্ণিমা ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র। তাঁর মাতুল-সম্পর্কে রয়েছেন স্যর আশুতোষ চৌধুরী, প্রমথ চৌধুরীর পরিবার। আশৈশব শিক্ষা শান্তিনিকেতনে। সেখান থেকে বি এড উপাধিলাভের পর লন্ডন ইউনিভার্সিটির এম এ ও ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন। স্বদেশেপ্রত্যাগমনের পরে শ্রীনিকেতন, দেরাদুন ও মুসৌরির বিভিন্ন শিক্ষালয়ে উপাধ্যক্ষ ওঅধ্যক্ষ। শান্তিনিকেতন পাঠভবনের প্রাক্তন অধ্যক্ষ। বিশ্বভারতী কর্মসমিতি ওশান্তিনিকেতন ট্রাস্ট ডিডের সদস্য। পাঠআবৃত্তি ও নাট্যাভিনয়ে সুখ্যাত। একদা ক্রিকেট ও টেনিস খেলায় দক্ষ ছিলেন। প্রিয় বিষয়, দেশি-বিদেশি সংগীত ও দাবা। বিবাহ করেছেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌত্রবংশে।
সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রপৌত্র সুপ্রিয় ঠাকুরের জন্ম ১৯৩৮এর নভেম্বরে। কলকাতার আদিবাড়ি 'লাল বাংলো' থেকে লাল সুড়কি ছাওয়া পথের শান্তিনিকেতনে যাত্রা ১৯৪৬এ, বাকি দু' ভাই-বোনের সংগে পাঠভবনের ছাত্র হবার বছরখানেক আগে। তার আগের সময়টা পাম প্লেসের লাল বাংলায়, যুক্ত জমজমাট পরিবারে। বাসিন্দা ছিলেন পিতা সুবীরেন্দ্রনাথ এবং তার বাকি তিন ভাইয়ের পরিবার, রবীন্দ্রনাথের অতি প্রিয় ভ্রাতৃকন্যা ইন্দিরা দেবী এবং তার স্বামী বীরবল ওরফে প্রমথ চৌধুরী। শেষবয়সে এ বাংলার বাসিন্দা ছিলেন এক সময়ের দোদণ্ডপ্রতাপ সুন্দরী-সাহসিনী জ্ঞানদানন্দিনী দেবীও। পাশে ছিলো মুসলমান পাড়া, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জেরে বাড়ি পুড়ে ছাই হওয়ায় পুরো পরিবারকে 'উত্তরায়নে' পাড়ি দিতে হয় বাধ্য হয়ে। সেই থেকে সুপ্রিয়'র শান্তিনিকেতন জীবন শুরু।
আশৈশব শিক্ষা শান্তিনিকেতনে, বিএড সেরে লন্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স এবং এডুকেশনে ডিপ্লোমা নিয়েছিলেন সুপ্রিয়। গুরুদেবের বংশধর, বেড়ে ওঠা তাঁর আশ্রমে, ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক শিক্ষকতায়, স্বভাবে বেশ সুশীল হবার কথা না তাহলে?
হরি হরি, সে আশায় গুড়ে বালি! ক্যাবলা ছেলে ছিলেন বলে নানা জায়গায় দাবিটাবি করলেও আদতে ছিলেন গেছো বাঁদর বিশেষ। গাছের গাব, আম-জাম-লিচু থেকে শুরু করে খেজুরের রস চুরি, লুকিয়ে বন্দুক জুটিয়ে পাখি শিকার, চুরি করে চুরুট খেতে গিয়ে মাথা ঘুরে প্রায় অক্কা পাওয়া --এরকম অসংখ্য দুরন্তপনায় শিক্ষকদের হাড় জ্বালিয়ে ছেড়েছেন। আর পাঠভবনের ক্লাসে কিংবা আশ্রমের নানা অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির ফাঁকফোকরে করা দস্যিপনা তো ছিলোই।
সুবিধে ছিল যাদের সঙ্গে মিলে বা যাদের জন্য সেসব করতেন, তারাও তো সব হরেদরেকাশ্যপগোত্রে সেসময়কার ক্রিম অফ সোসাইটির কেউ না কেউ-ই, রস বোঝার মতো মন ও মগজ রাখতেন। অতএব, সঙ্গগুণে উৎরে যেতো সব-ই। একটা উদাহরণ দিই বরং-- ''একদিন সারাদিন বেড়িয়ে সন্ধ্যায় ফিরছি। শৌচাগারের পাশের জায়গা থেকে খুব করুণ কন্ঠে অঞ্জন বলছে-- সুপ্রিয়, আমায় একটু জল এনে দেবে? সে রাতের গল্প বলার আসরেই সত্যেন সেনের ছড়া এলো-- 'অঞ্জন শুক্ল, বাস থেকে নেমে সোজা বিনা মগে ঢুকল। কাছে জল ছিল বলে কাজ তার চুকল।' সারা ঘর একেবারে হাসিতে ফেটে পড়লো, অঞ্জন আর লেপের নিচ থেকে বের হলো না।''
হাসিখুশি, চাঁদের হাটের সেই গল্পগুলো আছে পুরো বইটা জুড়ে। আছে নন্দলাল বসু, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, তেজেশচন্দ্র সেন, শৈলরঞ্জন মজুমদার, নীলিমা সেন, রামকিঙ্কর বেইজ, ক্ষিতিমোহন সেন, শান্তিদেব ঘোষ, নিত্যানন্দবিনোদ গোস্বামী, অন্নদাশংকর রায়, সুচিত্রা মিত্রের মতো বহু সুবিখ্যাত শিক্ষক ও গুণী শিল্পীর গল্প আর ছবি। সঙ্গে সঙ্গে, অমলিন জলছবি, আদি ছাতিমতলার, কোপাইয়ের তীর, সবুজে ছাওয়া, লাল অশোকে রাঙানো সে কালের পৌষমেলা, বৈতালিক আর বসন্ত উৎসবের।
সেইসঙ্গে আক্ষেপ-...মেঘ ঘনিয়ে আসা খেলার মাঠ, যেখানে চাঁদের আলোয় সারা মাঠ ভেসে যেতো, হয়তো যেখানে গভীর রাতে পরীরা খেলে বেড়াতো, সেই আদিগন্ত বিস্তৃত খোয়াই আর শ্যামলিমা হারিয়ে ঘিঞ্জি, ঠাসাঠাসি শহুরে ধাঁচের বাড়িঘরে মূল রূপ হারিয়ে ক্রমশ বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে ওঠা শান্তিনিকেতনকে নিয়ে। আরো আক্ষেপ, অতি নায্য, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়েও। পিতার বিশাল ব্যাক্তিত্ব আর খ্যাতির ছায়ায় যিনি কোনদিন আপন আসনটি পাননি। অপুত্রক রথির মুখাগ্নি করেন সুপ্রিয়-ই, শেষ সময়ে। চির পথের সঙ্গী আমার, চির সখা হে...
আনন্দের বই, গটমটে বাঁধাই আর খেয়ে ফেলতে মঞ্চায় টাইপ তেল চুকচুকে কাগজ-- সে তো আছেই। সৌরিশ মিত্রের প্রচ্ছদগুণে বুককেস সাজানোর জন্য উৎকৃষ্ট জিনিস-ও বটে। আর ঠাকুরবাড়ি নিয়ে আগ্রহী পাঠক যারা -- অতি অবশ্যপাঠ্য। :)