পূর্ববঙ্গে ইংরেজ সিভিলিয়ানদের জীবনচর্চা, কর্মকাণ্ড নিয়ে ইতোপূ্র্বে কোনো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। পূর্ববঙ্গের ইতিহাস রচনার পথিকৃৎ ড. মুনতাসীর মামুনের বর্তমান গ্রন্থ সেই অচেনা অজানা বিষয় নিয়ে। দীর্ঘদিন গবেষণার পর পূর্ববঙ্গ সম্পর্কিত সিভিলিয়ানদের লেখা ১৯টি স্মৃতিকাহিনীর ওপর ভিত্তি করে রচিত ‘কোই হ্যায়’। গ্রন্থের প্রথম পর্বে ইংরেজ বা ইউরোপিয়দের এ দেশে আগমন, ক্ষমতাদখল ও ঔপনিবেশিক শাসন বিস্তারের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া হয়েছে। গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের বিকাশ, সিভিলিয়ানদের জীবন ও কর্মপদ্ধতি এবং আমলাতন্ত্রের বিভিন্ন কর্মের মাধ্যমে ঔপনিবেশিকতার প্রকাশ ও বীজ বপন ইত্যাদি। দ্বিতীয় পর্বে সিভিলিয়ানদের রচিত পূর্ববঙ্গ সম্পর্কিত বিবরণ। সময়কাল ১৭৭২ থেকে ১৯৪৭।
Muntassir Mamoon (Bangla: মুনতাসীর মামুন) is a Bangladeshi author, historian, scholar, translator and professor of University of Dhaka. He earned his M.A. and PhD degree from University of Dhaka. Literary works
Mamoon mainly worked on the historical city of Dhaka. He wrote several books about this city, took part in movements to protect Dhaka. Among his historical works on 1971 is his Sei Sob Pakistani, in which many interviews with leading Pakistanis was published. Most of them were the leading Pakistani characters during the liberation war of Bangladesh.
জন্ম এবং পরিবার মুনতাসীর মামুনের জন্ম ১৯৫১ সালের ২৪ মে ঢাকার ইসলামপুরে নানার বাড়িতে। তাঁর গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার গুলবাহার গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মিসবাহউদ্দিন এবং মায়ের নাম জাহানারা খান। পিতামাতার তিন পুত্রের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ। তিনি ১৯৭৫ সালে বিয়ে করেন। তার স্ত্রী ফাতেমা মামুন একজন ব্যাংকার। মুনতাসির মামুনের দুই ছেলে মিসবাহউদ্দিন মুনতাসীর ও নাবীল মুনতাসীর এবং কন্যা রয়া মুনতাসীর।
কর্মজীবন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই দৈনিক বাংলা/বিচিত্রায় সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন মুনতাসীর মামুন। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপক পদে কর্মরত আছেন। এর পাশাপাশি ঢাকা শহরের অতীত ইতিহাস নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। এছাড়া তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের 'মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ গবেষণা ইন্সটিটিউটে' সন্মানিক প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে ১৯৯৯-২০০২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। কৈশর থেকে লেখালেখির সাথে জড়িত হয়ে ১৯৬৩ সালে পাকিস্তানে বাংলা ভাষায় সেরা শিশু লেখক হিসেবে প্রেসিডেন্ট পুরস্কার লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার পর অনুবাদ, চিত্র সমালোচনা ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রচনা করেন অনেক বই। তাঁর লেখালেখি ও গবেষনার বিষয় উনিশ, বিশ ও একুশ শতকের পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশ ও ঢাকা শহর।
সাংগঠনিক কর্মকান্ড স্বাধীন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ডাকসুর প্রথম নির্বাচনে মুনতাসীর মামুন ছিলেন সম্পাদক। একই সময়ে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাংস্কৃতিক সংসদের সভাপতি। ডাকসুর মুখপত্র "ছাত্রবার্তা" প্রথম প্রকাশিত হয় তাঁর সম্পাদনায়। তিনি বাংলাদেশ লেখক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও যথাক্রমে প্রথম যুগ্ম আহ্ববায়ক ও যুগ্ম সম্পাদক। তিনি জাতীয় জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ড ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী এবং জাতীয় আর্কাইভসের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন। ঢাকা নগর জাদুঘরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। ঢাকার ইতিহাস চর্চার জ্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন সেন্টার ফর ঢাকা ষ্টাডিজ (ঢাকা চর্চা কেন্দ্র)। এ কেন্দ্র থেকে ঢাকা ওপর ধারাবাহিক ভাবে ১২টি গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি বাংলা একাডেমীর একজন ফেলো এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল ও সিনেটের নির্বাচিত সদস্য হয়েছেন কয়েকবার। '৭১-এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির তিনি একজন প্রতিষ্ঠাতা ও সক্রিয় সদস্য। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী ফাতেমা মামুন প্রতিষ্ঠা করেছেন মুনতাসীর মামুন-ফাতেমা মামুন ট্রাস্ট। এ ট্রাস্ট গরিব শিক্ষার্থী ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারদের নিয়মিত সাহায্য করছে।
সাহিত্য কর্ম মুনতাসীর মামুনের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২২০+। গল্প, কিশোর সাহিত্য, প্রবন্ধ, গবেষনা, চিত্র সমালোচনা, অনুবাদ সাহিত্যের প্রায় সব ক্ষেত্রেই মুনতাসীর মামুনের বিচরণ থাকলেও ইতিহাসই তার প্রধান কর্মক্ষেত্র। ।
পুরস্কার বাংলা একাডেমী পুরস্কার, লেখক শিবির পুরস্কার, সিটি আনন্দ আলো পুরস্কার, একুশে পদক, নূরুল কাদের ফাউন্ডেশন পুরস্কার, হাকিম হাবিবুর রহমান ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক পুরস্কার, ইতিহাস পরিষদ পুরস্কা, অগ্রণী ব্যাংক পুরস্কার, অলক্ত স্বর্ণপদক পুরস্কার, ডঃ হিলালী স্বর্ণপদক, প্রেসিডেন্ট পুরস্কার (১৯৬৩), মার্কেন্টাইল ব্যাংক স্বর্ণপদক, এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অর্লিয়েন্স শহর তাঁকে 'অনারেবল ইন্টারন্যাশনাল অনারারী সিটিজেনশিপ' প্রদান করে।
অষ্টাদশ থেকে বিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত যেসব ইংরেজ সিভিলিয়ান পূর্ববঙ্গে এসেছেন তাঁদের প্রকাশিত/অপ্রকাশিত আত্মস্মৃতি অবলম্বনে রচিত। ঔপনিবেশিক বিভিন্ন ফর্ম তারা আরোপ করেছিলেন এ দেশে। তার বিশ্লেষণ সহ সিভিলিয়ানদের ২০০ বছরের দেখা পূর্ববঙ্গ বিষয়। সিভিলিয়ানদের নিয়ে ইংরেজি অনেক বই বেরিয়েছে। বাংলা অল্প কিছু। কিন্তু শুধু পূর্ববঙ্গের সিভিলিয়ানদের নিয়ে কোনো বই এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। সে পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ববঙ্গের সিভিলিয়ানদের নিয়ে এটিই প্রথম বই।
প্রায় পাঁচশ পৃষ্ঠার এই বইটি প্রচুর খাটুনি এবং গবেষণার ফলাফল! বইতে উঠে এসেছে ব্রিটিশ কর্তৃক নিয়োজিত আইসিএস অফিসারদের পূর্ববঙ্গে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ের বিশাল অভিজ্ঞতা! ব্রিটিশদের চোখে আমরা কেমন ছিলাম, জাতি হিসেবে কিভাবে পরিবর্তন এলো, তৎকালীন সময়ের চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, নোয়াখালি, রাজশাহী, ফরিদপুর, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট সহ আরও অনেক স্থানের প্রশাসনিক কাঠামো, জনগণের জীবনযাত্রা, আচরণগত অভ্যেস, ধর্মের সাথে আচরণগত পরিক্রমা ইত্যাদি তুলে ধরা হয়েছে এই বইয়ে!
বইটি পড়ার পরে অনেকগুলো ভুল ধারণা দূর হয়েছে, অনেক কিছু স্পষ্ট হয়েছে, অনেক অজানাকে জানা হয়েছে! ইতিহাস বা অতীত নিয়ে আগ্রহী যে কারোর জন্যই বইটি পড়া আবশ্যক মনে করি!
ভারী চমৎকার, উপভোগ্য, এবং জ্ঞান অর্জন করার মাধ্যমে নতুন দৃষ্টিভঙ্গী উন্মোচিত হবার মত বই এটি!
লিন্ডসের সিলেট, বুখাননের দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা, রবারদিউর ময়মনসিংহ, পোগসনের চট্টগ্রাম, ডেভিডসনের ঢাকাসহ ১৯ টি স্মৃতিকাহিনীর উপর ভিত্তি করে লেখা বই। প্রচুর ভৃত্য ও চাপরাশী বেষ্টিত বিলাসী জীবনাচারের পাশাপাশি ব্যবসার অবারিত সুযোগের কারণে ভারতবর্ষে আইসিএস ছিল ইংরেজ ভাগ্যান্বেষীদের জন্য পরম আকাঙ্ক্ষিত চাকরি। বলা হয় এখন যেমন বাংলাদেশিরা মধ্যপ্রাচ্যে যায়, তখন ব্রিটিশরা সেরকম চাইত ভারতবর্ষে আসতে, যদিও মাতৃভূমি থেকে বহুদূরে অপরিচিত পরিবেশে জীবনযাপন করা ছিল চ্যালেঞ্জিং এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিষন্ন। পূর্ববঙ্গ অঞ্চলকে তারা বর্ণনা করেছেন অস্বাস্থ্যকর আর পেনাল স্টেশন হিসেবে আর এ অঞ্চলের মানুষদের বর্ণনা করেছেন মামলাবাজ, দাঙ্গাবাজ হিসেবে। তাদের ভাষ্যে বঙ্গদেশীরা একটা স্ট্যাম্প পেপার নিয়ে জন্মে এবং হাঁটতে শিখা শুরু করার পরপরই মামলা ঠুকা শুরু করতো। সিভিলিয়ানদের ট্রেনিং ও জীবনাচরণের পাশাপাশি বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে শিকার, পিগ স্টিকিং, সেকালের বাংলার পরিবেশ-প্রকৃতি, কিছু উপজাতির হান্টার-গেদারার ধরনের জীবন আর শেষাংশে সিভিলিয়ানদের আঁকা বেশ কিছু ছবিসহ প্রচুর ইন্টারেস্টিং ঘটনাতে ভর্তি বই। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় থেকে পাওয়া চমৎকার একটা গিফট।