ছয় বছরের দাম্পত্যজীবন শিহাব-নাঈমার। ফুটফুটে একটি শিশুকে নিয়ে ফ্রেমে বাঁধাই করা তাদের ছবিটি সুখী ও সুন্দর। এই সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার দৈনন্দিন ব্যস্ততা ও কোলাহলের নিচে চাপা পড়ে থাকে পুরোনো জীবনের কত কিছু! হাওয়ার উসকানি পেলে যেমন নিভু নিভু প্রদীপের সলতেও জ্বলে ওঠে দপ করে, সেরকম হঠাৎ একদিন স্মৃতির সূত্রে হু হু হাওয়ায় ফিরে আসে শিহাবের অতীত। নবীন যৌবনের স্মৃতি। চন্দনাকে মনে পড়ে। ফিরে আসে দুর্বার প্রেমের দিনগুলো। প্রবল জলের তোড় যেন ভাসিয়ে নিতে চায় সবকিছু। শহরের কলেজে পড়তে আসা এক গ্রাম্য কিশোরের নানা রঙের দিন, চৌকস সহপাঠিনীর সঙ্গে বন্ধুত্ব ও প্রেমের টুকরো টুকুরো ঘটনা ভিড় করে আসে মনে। উল্টো দিকে চলতে থাকা সিনেমার দৃশ্যের মতো যেন ফিরে আসে সব। এক দৈবদুর্ঘটনা এলোমেলো করে দিয়েছিল সবকিছু। কিন্তু তার নিজেরও কি কোনো দায় নেই? আজ নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক দায়িত্বহীন, স্বার্থপর মানুষকে আবিষ্কার করে শিহাব। গ্লানি, বিষাদ ও অপরাধবোধ বিপর্যস্ত করে দেয় তার আপাত-সুখী বর্তমানকে।
প্রেম ও বেদনার এই উপন্যাসে একবার চোখ রাখলে শেষ না করে উপায় নেই।
বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশা সাংবাদিকতা, কর্মক্ষেত্র চট্টগ্রাম। শিশুসাহিত্য দিয়ে লেখালেখি শুরু। উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতাসহ সৃজনশীল সাহিত্যে তাঁর অবাধ বিচরণ। নিয়মিত কলাম লেখেন সংবাদপত্রে। তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি নাটক প্রচারিত হয়েছে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে। এ পর্যন্ত বই বেরিয়েছে কুড়িটির বেশি। ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে তাঁর লেখা উপন্যাস "নার্গিস"।
শেষ করলাম বিশ্বজিৎ চৌধুরীর 'হে চন্দনা পাখি'। আমার পড়া লেখকের এটিই প্রথম বই। হে চন্দনা পাখি কেমন উপন্যাস? সোজা কথায়, হাহাকার জাগানিয়া। হুমায়ুন আহমেদের অপেক্ষা পড়ার পর শেষ কবে এমন শূন্যতা জেগেছে মনের ভেতর, স্মরণে নেই। উপন্যাসের কাহিনি খুব সাদামাটা। মূল চরিত্র শিহাবের জবানে গল্প এগোতে থাকে। দুটো টাইমলাইন ধরে এগিয়েছে কাহিনি-শিহাবের অতীত কলেজ জীবন আর বর্তমান দাম্পত্য জীবন। নাঈমার সাথে সংসার শিহাবের, আছে ছোট্ট এক মেয়েও-তৃণা। সরকারী চাকুরীজীবী শিহাবের কোন অভাব নেই। তবুও কেন যেন ছন্দ নেই সংসারে, কোথাও যেন সুর কেটে গেছে, অদৃশ্য কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে ওর আর নাঈমার মাঝে। গ্রাম থেকে উঠে এসে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হয়েছে শিহাব। মায়ের দু:খ ঘোচাবে বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। পড়াশোনায় কেটে যায় ওর সময়। ধরাবাঁধা এই জীবনে আচমকা আসে পরিবর্তন, অসময়ে ডেকে ওঠে কোকিল। কলেজ দাপিয়ে বেড়ানো বড়লোকের মেয়ে চন্দনার সাথে কিভাবে যেন প্রেম হয়ে যায় ওর। চন্দনাকে নিয়ে ঘর করা হয়ে ওঠে না শিহাবের। (কেন ওঠে না? বইটা পড়ুন।) কিন্তু চন্দনা ছেড়ে যায় না ওকে। এমনই এক টানাপোড়নের গল্প 'হে চন্দনা পাখি'। উপন্যাসের কাহিনি খুবই সাধারণ। কিন্তু লেখকের উপস্থাপনা পুরো উপন্যাসকে এক ভিন্নমাত্রা এনে দিয়েছে। মনের মধ্যে চাপা বেদনা জাগিয়ে তুলতে চাইলে বসে পড়তে পারেন প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত বইটি নিয়ে।