কিছু কিছু বই পড়ে একইসাথে অবাক ও ব্যথিত হতে হয়। "সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা" তেমনই একটি বই। সমাজতন্ত্র কেন স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হয়েছিলো তার একটা আদর্শ উদাহরণ হচ্ছে লেখকের মতামত। নিজেদের সবকিছু ভালো আর ভিন্নমত মানেই খারাপ - এমন সংকীর্ণ চিন্তাধারা আর যার কাছ থেকেই হোক, যতীন সরকারের কাছ থেকে আশা করিনি। মানুষের মন খারাপ হতে পারবে না, এদেশে বসে কেউ নিজেকে একা বলতে পারবে না, বিষণ্ণ হতে পারবে না, কেউ হতাশ হতে পারবে না। হলেই সে অপসংস্কৃতির ধারক, তার মধ্যে দেশীয় ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নেই। এক জায়গায় আছে , "কবির কাছে দেশের দাবি : সুস্থ, সবল, প্রেরণাদায়ী, কর্মিষ্ঠ ভণ্ডামি উন্মোচক, সত্যসাধক, নৈরাশ্যবিদূরক, শোষণ উৎসাদক কবিতা চাই।" একটু বেশি হয়ে গেল না দাবি? এ দাবির সাথে না মিললেই সেই কবি বা লেখক "পশ্চিমা ভাবাদর্শের কাছে মাথানত করেছে" "তাদের চিন্তাজগত বিকৃত" ইত্যাদি ইত্যাদি বলে উষ্মা প্রকাশিত হয়েছে। তিরিশের কবিদের একচেটিয়া সমালোচনা করেছেন লেখক। তাদের সমস্ত ঐতিহ্যবোধ নাকি "পুঁথি-পঠন-জাত" আর রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাদের আছে "অক্ষমতাজনিত অসূয়া!" (অর্থাৎ, রবীন্দ্রনাথের মতো ভালো লিখতে পারেন না বলে পঞ্চপাণ্ডব তার প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিলেন।) মাতলাব, কুচ ভি!
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ "লালসালু " লেখার পর কেন "চাঁদের অমাবস্যা" বা "কাঁদো নদী কাঁদো"র মতো অস্তিত্ববাদী উপন্যাস কেন লিখলেন তা নিয়েও বিস্তর অভিযোগ লেখকের। তারপরই তার অভিমত "সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদের দিকে না যেয়ে আত্মমুখী ভাববাদের নিকট আত্মসমর্পণ" করেছেন ওয়ালীউল্লাহ। মানুষের আলাদা অস্তিত্ব স্বীকার না করে তাকে সমষ্টিগত জীব ভাবার মধ্যেই আছে সমাজতন্ত্রের ধ্বংসের বীজ। মানুষ আন্দোলন করবে, সংগ্রাম করবে বলে সে কাঁদতে পারবে না? "আমার মন ভালো নেই" বলতে পারবে না? এ কেমন বিচিত্র দাবি?
বাংলাদেশের (বিশেষত পঞ্চাশ, ষাট ও সত্তর দশকের) কবিরা আজীবন দেশের মানুষের সংগ্রামে সহযাত্রী ছিলেন।এ যাত্রায় তারা নিজেদের লেখার ক্ষতিও করেছেন। এদিকে যতীন সরকার সেই সত্তর দশকে বসে অভিযোগ করেছেন কবিরা দেশবিমুখ, আত্মমগ্ন! মানে, একেবারে মিথ্যাচার হয়ে যাচ্ছে না ব্যাপারটা?
বইতে ভালো প্রবন্ধও আছে।যেমন "ইকবাল আমাদের।" শরৎচন্দ্রকে নিয়ে লেখাটাও ভালো। কিন্তু লেখকের একচেটিয়া অভিযোগ আর বাগাড়ম্বর পড়ে মেজাজটাই বিগড়ে গেলো।