" 'দর্শন' তো বিদগ্ধ ও পণ্ডিতজনের মননচর্চার বিষয়। অবিদগ্ধ প্রাকৃতজনের কোনো দর্শনের কথা বলা, প্রকৃত প্রস্তাবে, একান্ত প্রথাবহির্ভূত আচরণ। তবে, পণ্ডিতজনের মতো প্রণালিবদ্ধ না হলেও প্রাকৃতজনও যে জগৎ-সংসারকে তার নিজের মতো করে দেখে এবং নিজের বোধ অনুযায়ীই তার অর্থ নিষ্কাশনে ব্রতী হয়- এ কথাও একান্ত সত্য । তাই, ‘দর্শন' শব্দটির আক্ষরিক অর্থবিচারে প্রত্যেকেই যেমন ‘দার্শনিক’, তেমনি .শব্দটির বিশেষ অর্থ বিচার করেও কাউকে দর্শনহীন বলা চলে না। আক্ষরিক অর্থে 'দর্শন' মানে দেখা। শব্দটির বিশেষ অর্থও এর আক্ষরিক অর্থকে যে একেবারে খারিজ করে দিয়েছে— এমন কথা নিশ্চয়ই বলা যাবে না। ‘যুক্তি দ্বারা কারণ থেকে কার্যে এবং কার্য থেকে কারণে পৌঁছবার নামই দর্শন', কিংবা ‘দর্শন হলো কার্যকারণ সম্বন্ধীয় বিজ্ঞান’- দর্শনের পণ্ডিতজন-সমর্থিত এ রকম বিশেষ অর্থগুলো লক্ষ করলেও প্রতীতী জন্মে যে, কোনো বিষয়কে ভালো করে দেখা বা দেখতে চাওয়াই আসলে দর্শন । গ্রিক ভাষা থেকে গৃহীত ইংরেজি Philosophy কথাটার যে আক্ষরিক অর্থ ‘জ্ঞানানুসন্ধান’, তাতেও এই ‘ভালো করে দেখা'র ব্যঞ্জনাটাই উপস্থিত। প্রাকৃতজনও অবশ্যই তাদের নিজেদের সাধ্যমতো পরিপার্শ্বের বা জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়কে ভালো করে দেখতে চায়, সেসব বিষয়ের কার্যকারণ সম্পর্ককে খুঁজে বার করতে চায় । এই চাওয়ার আর্তি থেকেই গড়ে ওঠে প্রাকৃতজনদের দর্শন, বিদগ্ধ পণ্ডিতজনের নিকট তা যতই হোক না কেন অবজ্ঞার বিষয় । এই হিসেবে বাংলার প্রাকৃতজনেরও নিশ্চয়ই দর্শন আছে । তবে সেটি বিদগ্ধজনের দর্শনের মতো নিছক বিশুদ্ধ জ্ঞানানুসন্ধান নয়, যে কঠোর শ্রম দিয়ে প্রাকৃতজন জীবিকা অর্জন করে সেই শ্রম-প্রক্রিয়ার সঙ্গে একান্তভাবে যুক্ত তার দর্শন।"