ইমদাদুল হক মিলন-এর জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৫৫, ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে। পৈতৃক গ্রাম— লৌহজং থানার ‘পয়শা’। ঢাকার গেন্ডারিয়া হাইস্কুল থেকে এস এস সি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে অনার্সসহ অর্থনীতিতে স্নাতক।প্রথম রচনা, ছোটদের গল্প ‘বন্ধু’, ১৯৭৩ সালে। প্রথম উপন্যাস যাবজ্জীবন। ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে। প্রথম গ্রন্থ ভালবাসার গল্প (১৯৭৭) থেকেই তিনি বিপুলভাবে সংবর্ধিত, পাঠকপ্রিয়। ১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কার। এ ছাড়া পেয়েছেন বিশ্ব জ্যোতিষ সমিতি পুরস্কার(১৯৮৬), ইকো সাহিত্য পুরস্কার(১৯৮৭), হুমায়ূন কাদির সাহিত্য পুরস্কার(১৯৯২), নাট্যসভা পুরস্কার(১৯৯৩), পূরবী পদক(১৯৯৩), বিজয় পদক(১৯৯৪), মনু থিয়েটার পদক(১৯৯৫), যায় যায় দিন পত্রিকা পুরস্কার (১৯৯৫)। ২০১১ সালে ‘নূরজাহান’ উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন আই আই পি এম সুরমা চৌধুরী স্মৃতি আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার।
হাওয়ায় মিশে থাকা রমাকান্ত খুব আদুরে ও তুলতুলে গলায় ডাকল লাটলু ও লাটলু। খড়ের উপরে নিজের বিছানা পরিপাটি করতে করতে লালটুর মেজাজটা খিঁচড়ে গেলো ভুলভাল নাম শুনে। একেই তো আজ বাদ্যকররা বাড়িতে নেই বাজনা বন্ধ। তাঁর উপরে রমাকান্তের এই ভুল নামে ডাকাডাকি। বিরক্ত তো হবেই সে।
বাদ্যকর বাড়িতে ঢোকার আগে গায়ে পুরো এক বোতল তেল মেখে নিয়েছে হরমুজ। ঢুকে অবশ্য কী করতে হবে বুঝতে না পেরে তাড়াতাড়ি গোয়ালঘরে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল কেউ দেখার আগে। উৎকট গোবরের গন্ধ আর মশার কামড় খেয়ে হরমুজের প্রান যখন ওষ্ঠাগত তখন হঠাৎ করেই গোয়ালঘরের একপাশে দুজন বালকের কথাবার্তা শুনতে পেল।
প্রথমটায় ভয় পেলেও ধীরে ধীরে সে এগিয়ে গেল অঅদেখার জন্য। গোয়ালঘরটা বেশ ভাঙাচোরা। তাকাতে কষ্ট হলো না তাঁর। সে ভিতরে তাকিয়ে দেখল একটা বালক খড়ের উপরে বিছানা তৈরি করতে করতে কারো সাথে কথা বলছে। যার সাথে কথা বলছে তাঁর গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। কিন্তু তাহলে মানুষটা কোথায়!! ঘরে তো ওই ছেলেটা একা। অথচ এখনও দুজনের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। হচ্ছেটা কী এসব!!
সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে বাদ্যকরদের ঘরে সকল বাজনা হঠাৎ করেই একসাথে বেজে উঠল। হরমুজ ভয় পেয়ে গেল। তাড়াতাড়ি বাদ্যকরদের বাজনার ঘরের মধ্যে উঁকি দিয়ে হরমুজ বিস্ময়ে আরো হতভম্ব হয়ে যায়। বাজনাগুলো সব আপনাআপনি বাজছে!! ঘরে কেউ নেই! গোয়ালঘরে ওই ছেলেটা একদম ঘুমে অচেতন তখন। হরমুজ নিজের মনে হতভম্ব, হচ্ছেটা কী!!
বাদ্যকর বাড়িতে রাখালের কাজ করে লালটু। রোজ রাতে বাদ্যকররা যখন বাজনা ঘরে বিভিন্ন সুরের চর্চা করে তখন সেইসাথে আরামে ঘুমায় সে। বাদ্যকররা মাঝে মাঝে বড় বায়না পেলে দূর দূরান্তে যায় কাজে। বাড়ি পাহারায় থাকে এ বাড়ির আরেক বাসিন্দা। সে আবার পালোয়ান পেশায়।
লালটুর ঘুম আসছিলো না তাই রমাকান্ত গিয়েছিল বাজনা ঘরে। এবং সেটাই দেখে ফেলে ডা কা ত হরমুজ। হ্যাঁ সে পেশায় ডাকাত এবং বিখ্যাত ডা কা ত সর্দার কিরমানের চ্যালা। তাঁকে পাঠানো হয়েছে এই বাড়ি সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে। সে সেটাই করছিল অবশ্য ঘুরে ঘুরে। কিন্তু হঠাৎ বাজনা ঘরে রমাকান্তকে দেখে হতভম্ব সে।
রমাকান্তকে এখনো অবশ্য পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়নি। তবে কিছুটা ধারনা বোধহয় এতক্ষনে পেয়ে গেছেন। ঠিক বুঝতে পেরেছেন রমাকান্ত এক বাচ্চা ভূত এবং রাখাল লালটুর খুব ভালো বন্ধু।
ভূতে মানুষে কী করে বন্ধু হলো সেটা অবশ্য বোঝা কঠিন। তবে রমাকান্ত ভূত হলেও বেশ বোকা ধরনের ভূত। তবে যেহেতু তাঁকে কেউ দেখতে পারে না লালটু ছাড়া তাই তাঁর কর্মকাণ্ড আসলেই ভয় দেয় বাকিদের মনে।
এই ভূতুড়ে কান্ডে জব্দ হয় পালোয়ান আর তাঁর বউ শুটকি। তাঁদের জব্দ করতে গিয়ে রমাকান্ত অবশ্য কিছু বোকা বোকা কাজ করে ফেলে। এবং এর থেকে পালোয়ান ও তাঁর বউ কিছু ভৌতিক অস্তিত্ব আঁচ করে। লালটু এই বোকামি শুনে রমাকান্তকে খুব বকাবকি করে এবং রাগ করে চলে যেতে বলে বাড়ি ছেড়ে।
কিন্তু ওদিকে যে সমূহ বিপদ ঘনিয়ে আসছে। কিরমান ডাকাত চ্যালাদের নিয়ে ফন্দি এঁটেছে বাদ্যকর বাড়িতে ডাকাতি করার। এবার কী হবে তাহলে! বাদ্যকর বাড়িকে কে বাঁচাবে এই বিপদ থেকে ? আবার কী হবে কোনো ভূতুড়ে কান্ড? নাকি বিপদে পড়বে গোটা বাদ্যকর বাড়ি?
// পাঠ প্রতিক্রিয়া:
ছোটবেলায় আমার কোনো এক জন্মদিনে বড় মামা এই বইটি দিয়েছিল আমাকে উপহার হিসেবে। আজ প্রিয় এই বইটি নিয়ে লিখতে বসে অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে মনে। শৈশব স্মৃতি আসলেই বড় মধুর হয়। আজীবন মনে থেকে যায় সব।
ইমদাদুল হক মিলনের লেখনীর সাথে আমার পরিচয় এই বইটির মাধ্যমে। এক সময়ের জনপ্রিয় এই লেখকের আমি অবশ্য বেশিরভাগই শিশুতোষ বই পড়েছি। এবং যতগুলো পড়েছিলাম আমার কাছে কিন্তু বেশ ভালোই লেগেছে। সাবলীল বর্ণনা এবং সবগুলোই কিশোর উপযোগী একদম।
এই বইয়ে ভয় নয় ভৌতিকতাকে তুলে ধরতে পারব আমি অবশ্যই। এবং ভূত নিজেই বন্ধু হিসেবে ধরা দিয়েছে মানুষের কাছে। সবমিলিয়ে চমৎকার উপস্থাপনা এক্ষেত্রে লালটু ও রমাকান্তের মধ্যকার বোঝাপড়া ও বন্ধুত্ব।
আচ্ছা সব ভয়ের বইয়ে যে ভয় পেতে হবে এমন তো কথা নেই। ভৌতিক কান্ডকারখানা দেখতেও কিন্তু মন্দ লাগে না। উপভোগ করা যায় একইভাবে।
// চরিত্রায়ন:
বইয়ে বেশ কিছু চরিত্রের সমাগমে আমার পছন্দের চরিত্র রমাকান্ত। বোকা হলেও লালটুর সাথে তাঁর বন্ধুত্ব ভালো লেগেছে। এছাড়াও পালোয়ান, তাঁর বউ শুটকি, ডাকাত কিরমান, চ্যালা হরমুজ এর বাইরেও আরো কিছু পার্শ্ব চরিত্রের দেখা মেলে।
শেষ করছি আলোচনা তবে এই বলে যে ভূত,ভৌতিকতা যাই হোক এই বইয়ের সাথে আনন্দময় সময় কেটেছে বেশ। রমাকান্তের ভুতুড়ে কর্মকাণ্ড ভয় দেয়নি তবে আনন্দ দিয়েছে।
বইয়ের নামঃ "ভূতের কবলে ডাকাত সর্দার" লেখকঃ ইমদাদুল হক মিলন ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৪.৫/৫