একজন বিদেশী সাংবাদিকের লেখা মুক্তিযুদ্ধের উপর অসংখ্য খণ্ড খণ্ড প্রতিবেদনের সংকলন এ বইটি। বইটির লেখক সিডনি শনবার্গ ছিলেন নিউ ইয়র্ক টাইমসের একজন সাংবাদিক। ২৫ মার্চের গণহত্যার সূচনা তিনি প্রত্যক্ষ করেছে ঢাকায় থেকে, বহিষ্কৃত হয়েছেন অন্যান্য সাংবাদিকের সঙ্গে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহিষ্কৃত হলেও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে সরে যাননি। পত্রিকার দিল্লি ব্যুরো হিসেবে বারবার ফিরে এসেছেন সীমান্ত এলাকায়। কখনো মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ঢুকে পড়েছেন মুক্তাঞ্চলে, প্রত্যক্ষ করেছে যুদ্ধ অপারেশন, ঘুরেছেন শরণার্থী শিবিরে। জুন মাসে মুষ্টিমেয় যেসব সাংবাদিককে ঢাকা আসার অনুমতি দিয়েছিল সামরিক সরকার, তাঁদেরও অন্যতম ছিলেন শনবার্গ। কিন্তু ঢাকা থেকে প্রেরিত তাঁর রিপোর্টে ক্ষুদ্ধ সামরিক কর্তৃপক্ষ আবারও বহিষ্কৃত করে তাকে। পরে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সম্মিলিত অভিযানের সঙ্গী হয়ে তিনি যশোর সীমান্ত পথে প্রবেশ করেন বাংলাদেশে, প্রত্যক্ষ করেন বাঙালির মহৎ সংগ্রামের সেই অবিস্মরণীয় বিজয় মুহূর্ত। সিডনি শনবার্গের রিপোর্টগুলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক অসাধারণ প্রামাণ্য দলিল ।
Sydney Hillel Schanberg was an American journalist best known for his coverage of the war in Cambodia. Schanberg joined The New York Times as a journalist in 1959. He spent much of the early 1970s in Southeast Asia as a correspondent for the Times. He has been the recipient of a Pulitzer Prize, two George Polk awards, two Overseas Press Club awards, and the coveted Sigma Delta Chi prize for distinguished journalism.
নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্টার সিডনি শনবার্গ ২৫শে মার্চের কালরাত্রিতে ঢাকায় অবস্থান করেছিলেন। দেখেছিলেন গণহত্যার ভয়াবহতা। তবে পাকিস্তান সরকারের হত্যাযজ্ঞ বহির্বিশ্বে যাতে প্রচারিত না হয়, সেজন্য বিদেশি সাংবাদিকদের দেশ থেকে জরুরিভাবে চলে যেতে বাধ্য করে; শনবার্গও সেই দলে ছিলেন। তবে তিনি থেমে থাকেননি। মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর সংগ্রহে সচেষ্ট ছিলেন এবং যুদ্ধ নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ ও বিশ্লেষণগুলোকে ধারাবাহিকভাবে বইটিতে লিপিবদ্ধ করেছেন।
অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালির উপর হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তান আর্মি। বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশ লাইন প্রধান লক্ষ্য হলেও ঢাকা ও চট্টগ্রামে বেসামরিক জনগণও আক্রান্ত হয়। দ্রুতই বাঙালিরা বুঝে নিয়েছিল তাদের কী করা উচিৎ! প্রতিরোধ যুদ্ধের উদ্দেশ্যে ভারত চলে যেতে থাকেন তাঁরা। সেখানে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে আবার দেশের মাটিতে ফিরে নতুন উদ্যমে যুদ্ধ শুরু করেন। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট না দেওয়া মানুষও যখন যুদ্ধাক্রান্ত হয় তখন তারাও যুদ্ধের স্বপক্ষে কথা বলা শুরু করেন। বইটিতে বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বয়ানেরও উল্লেখ পাওয়া যায়।
দেশভাগের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সুনাম ছিল বিশ্বজোড়া। আমেরিকা, রাশিয়া কিংবা চীন থেকে আমদানি করা অস্ত্র দিয়ে জোরেশোরেই সামরিক মহড়া দিচ্ছিল দেশটি। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের টালবাহানা করে সৈন্য সমাবেশ করে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার অনুগত বাহিনী। আক্রমণ শুরু করে ভেবে নিয়েছিল অচিরেই বাঙালির মনোবল ভেঙে তাদের কাবু করে দিতে পারবে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী তাদের সকল প্রচেষ্টা মাটির সাথে মিশে গিয়েছে।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবস্থান ও সাহায্য অস্বীকার করার কোনো কায়দা নেই। ভারত নিঃস্বার্থভাবে আমাদের সাহায্য করেছিল কিনা এই প্রশ্নকে পেছনে ফেলে আমাদের বুঝতে হবে ঐ সময়ে ভারতের মতো দেশ আমাদের পাশে না দাঁড়ালে স্বাধীনতা অর্জন বেশ কঠিন হয়ে পড়তো। যদিও ভারত আমাদের প্রথমদিকে অস্ত্র সহায়তা দিতে সম্মত হয়নি কারণ মাওবাদীদের হাতে অস্ত্র চলে যাওয়ার আশংকা ছিল। যাইহোক সেই সমস্যা কাটিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং এক কোটি শরনার্থীর ভার বহন করে উদারতার পরিচয় দিয়েছে ভারত।
ভারত যেমন আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। তেমনিভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন বন্ধু হিসেবে আমাদের পাশে ছিল। মূলত ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ২০ বছরের চুক্তি স্বাক্ষর বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। পাকিস্তান নিয়মিত আমেরিকার থেকে সামরিক ও আর্থিক সাহায্য পেয়ে আসছিল। এমতাবস্থায় সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো পরাশক্তি আমাদের পক্ষে দরকার ছিল। ভারত চাইলেই আমাদের অনেক আগেই স্বীকৃতি দিতে পারতো। কিন্তু তাতে করে যুদ্ধ বেঁধে যেত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে। এদিকে পাকিস্তান ভারতের ভূমিতে আক্রমণ করে সেই যুদ্ধকেই উস্কে দিয়েছে। কিন্তু ভারত যখন এই আক্রমণের অনেক আগেই একবার পাকিস্তান ভূমিতে প্রবেশ করেছিল, তখন পাকিস্তান উলটো আক্রমণ চালালে হয়তোবা পাকিস্তানের যুদ্ধ উস্কানি কিছুটা হলেও বৈধতা পেত।
আসলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এখনো আমাদের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি। প্রায় সব লেখকই নিজস্ব চিন্তাধারা কিংবা নির্দিষ্ট দলের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করে কলম চালিয়েছেন। এতে করে ইতিহাস জানতে আগ্রহী পাঠকরা বিভ্রান্ত হন। তবে এই ঘটনার ইতিবাচক দিকটা হচ্ছে, এই বিভ্রান্তি কাটাতে একাধিক বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। বইটার মূল ইংরেজি ভাষায়। অনুবাদ নিয়ে কিছু বলার জায়গা নেই। সুন্দর অনুবাদ করেছেন মফিদুল হক। হ্যাপি রিডিং।
অনেক দিন আগে কিনে রাখা। পড়ি পড়ি বলে পড়া হয় নি। দারুন রিপোর্টার এবং উনার রিপোর্টিং। তখন উনাদের মতন বিদেশি সাংবাদিক ১৯৭১ এর গণহত্যার কথা না জানালে সারা বিশ্ব জানতে পারতো না। উনারা আসলে সংবাদপত্রের মাধ্যমে একজন মুক্তিযোদ্ধার দায়িত্বই পালন করেছেন। অশেষ শ্রদ্ধা রইল বাংলাদেশ এর এই বন্ধুর প্রতি।
যুদ্ধদিনের টুকরো টুকরো খবরগুলোর এক অসামান্য সংকলন। যুদ্ধের পুরো আবহাওয়াটা বোঝা না গেলেও এই গুটিকয়েক রিপোর্টের মাধ্যমে সেই সময়টাতে ঘুরে আসা যায়, সেই সময়কার অবস্থাটা চোখের সামনে ভাসিয়ে তোলা যায়। সাধারণ মানুষের আশা-আকাংখা-হতাশা, অপরদিকে ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এবং মানবিক পরিস্থিতি অন্যদিকে বিশ্বরাজনীতির ধোয়াশা-কুয়াশা সব কিছুই একটু একটু করে উঠে এসেছে রিপোর্টগুলোয়।
সিডনি শনবার্গ অসীম সাহস আর দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে রিপোর্টগুলো সংগ্রহ করেছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহিস্কৃত হয়ে গিয়েও রিপোর্টগুলো সংগ্রহ করেছেন বিভিন্ন মাধ্যম আর তথ্যসূত্র থেকে। রিপোর্টগুলো তখনকার সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক আর মানবিক পরিস্থিতির অসামান্য দলিল নিঃসন্দেহে। মফিদুল হকের চমৎকার ও শৈল্পিক অনুবাদ বইটির স্বাদ আরো একটু বাড়িয়ে দিয়েছে।