১৮৮৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮৯৫ ডিসেম্বরের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরাদেবীকে যে চিঠিগুলো লেখেন সেই চিঠিগুলোর অধিকাংশের সারাংশ দুটি বাধানো খাতায় স্বহস্তে নকল করে ইন্দিরাদেবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উপহার দেন। রবীন্দ্রনাথ চিঠিগুলোর কিছু বাদ দিয়ে, কিছুর ভাষাগত সংস্কার পরিমার্জন করে সাধারণ পাঠকদের উপযোগী করে "ছিন্নপত্র" গ্রন্থে রূপান্তরিত করেন। ১৩১৯ বঙ্গাব্দে ছিন্নপত্র প্রথম প্রকাশিত হয়। এতে ১৫২ টি পত্র সংকলিত হয়েছিল। এর মধ্যে ১৪৩ টি চিঠি তিনি ইন্দিরাদেবীকে লিখেছিলেন।
Awarded the Nobel Prize in Literature in 1913 "because of his profoundly sensitive, fresh and beautiful verse, by which, with consummate skill, he has made his poetic thought, expressed in his own English words, a part of the literature of the West."
Tagore modernised Bengali art by spurning rigid classical forms and resisting linguistic strictures. His novels, stories, songs, dance-dramas, and essays spoke to topics political and personal. Gitanjali (Song Offerings), Gora (Fair-Faced), and Ghare-Baire (The Home and the World) are his best-known works, and his verse, short stories, and novels were acclaimed—or panned—for their lyricism, colloquialism, naturalism, and unnatural contemplation. His compositions were chosen by two nations as national anthems: India's Jana Gana Mana and Bangladesh's Amar Shonar Bangla.
ভাইয়ের মেয়ে ইন্দিরা দেবীকে বিভিন্ন সময় লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৪১ খানাসহ মোট ১৫২টি চিঠিসমেত গ্রন্থ "ছিন্নপত্র"। এই চিঠিগুলোর প্রায় সবই রবিবাবু লিখেছেন পতিসর, শাহজাদপুর, বোয়ালিয়া আর শিলাইদহে বসে। সাল হিসেব করলে সে সব চিঠিই ১৯০০ সালের আগে লেখা। বুঝতেই পারছেন আমাদের রবীন্দ্রনাথ তখন বেশ ইয়াং! সেইসাথে ফ্লেভার পাবেন শতবর্ষ পূর্বের পূর্ববঙ্গের আদি ও অকৃত্রিম ছবির।
রবীন্দ্র রচনাবলীর স্বাদ আস্বাদন বেশি করিনি। "গল্পগুচ্ছ " আর কিছু প্রবন্ধ, উপন্যাসেই দৌড় সমাপ্ত এ অধমের। রবীন্দ্রনাথের লেখা নিয়ে ভয় কিংবা আলাদা মোহ কাজ করার দরুন অনেকেই অনেক বই পড়লেও রবিঠাকুর কে ঘাঁটান না। রবিঠাকুরের চিঠি পড়তে গিয়ে দেখলাম চিঠির রবীন্দ্রনাথের মনের সাথে গল্প,প্রবন্ধ আর ঔপন্যাসিক রবিঠাকুরের কোথায় যেন এক মস্ত অমিল আছে ভাষার গাঁথুনিতে। "ছিন্নপত্র"র লেখক এক আলাদা জগতের মানুষ যেন। ভাষার আর বাক্যের ওজনদার মিশেলে নাদান পাঠক এখানে নাকানিচুবানি খাবেন না। বরং জমিদার রবীন্দ্রনাথ তাঁর জমিদারি দেখাশোনার ছলে শিলাইদহ, পতিসর, বোয়ালিয়া আর শাহজাদপুরের প্রাকৃতিক পরিবেশের সৌন্দর্য আকন্ঠ পান নিচ্ছেন। গরিব কৃষক, অর্ধউলঙ্গ রাখাল, নদীর ধারে স্নানঘাট কিংবা সহজসরল রায়তের দৃষ্টি জীবনকে নিয়ে ভাবতে আরো বেশি বাধ্য করেছে রবীন্দ্রনাথকে। বজরায় চোষে বেরিয়েছেন পুরো অঞ্চল। শহুরে ঝঞ্ঝাট একপাশে ফেলে দু'চোখ ভরে দেখেছেন চারপাশ। তার প্রতিচ্ছবি এই বইয়ের প্রতিটি চিঠিতে আছে। রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন "ছিন্নপত্রে" বড় সোজাসাপ্টা। অথচ চিঠির কথাগুলো কত নিবিড়, কত বেশি সহজবোধ্যতার মোড়কে মোড়া তেতো সত্য তা পড়তে গিয়ে বুঝেছি।
এই বই পড়ে একটা বিষয় জলবৎ তরলং যে চিঠিতে ব্যক্তির ভেতরকার আলাদা এক সত্তা আবির্ভূত হয়। সে ব্যক্তিমানবের স্বাভাবিকতাকে ছাপিয়ে সন্ধান দেয় অন্য এক মানুষের।
যে কোনো সময় পড়বার মতো বই "ছিন্নপত্র"। জীবনকে সহজভাবে তুলে ধরা আলাদা এক রবি ঠাকুরের বই "ছিন্নপত্র"।
গতবছর ৫ই আগষ্টের পরপরই দেখলাম একদল লোক জাতীয় সংগীত আর রবিঠাকুরকে নিয়ে পরলো৷ এরা এদের ফেসবুকীয় নলেজ আর গু মার্কা লজিক দিয়ে ফেসবুক ভাসিয়ে ফেলছিলো আর গলার রগ ফুলিয়ে রবীন্দ্রনাথ কে গালিগালাজ করছিলো। দেশে সংষ্কারের মতো প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই ছিলো যা নিয়ে তখন আলোচনা করা উচিত ছিলো- কিন্তু সবার প্রথমেই তারা মাতলো রবীন্দ্রনাথ আর জাতীয় সংগীত নিয়ে। কেনো? আওয়ামী আমলে যে ভয়গুলোকে জুজুর ভয় মনে হতো এবার দেখলাম তার সবকিছুই অমূলক নয়। এদের ৯০%ই জীবনে রবীন্দ্রনাথ পড়েনি। কারণ পড়া কঠিন, তারচে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেওয়া ঢেড় সহজ। গল্প, উপন্যাস বাদ দিয়ে- অন্তত রবিঠাকুরের কিছু চিঠিপত্রও যদি তাদের পড়ানো যেতো! চিঠিতে যেভাবে তাঁকে পাওয়া যায় আর কোনোখানেই তা বোধহয় সম্ভব না। রবিঠাকুর নাকি 'বাংলাদেশ' কে রিপ্রেজেন্ট করেনা; অথচ পদ্মার বুকে ভাসতে ভাসতে যেভাবে তিনি বাংলাদেশের আকাশ, বাতাসের ছবি এঁকেছেন তা তারচে ভালো আর কে পারে? অনুভব হয়তো অনেকেই করতে পারে কিন্তু সেটাকে ঠিকঠাক ভাবে প্রকাশ করার মতো ভীষণ কঠিন কাজকেও রবিঠাকুর অবলীলায় করে গেছেন। 'ছিন্নপত্র' আমার কাছে অনেকটা ওষুধের ডোজের মতো৷ ব্যস্ত, বিশ্রী শহুরে জীবনে একটা, দুটো করে চিঠিগুলো পড়েছি। অস্থির মন শান্ত করেছি, কখনোবা চোখ বুজে নিজেকে কল্পনা করেছি সেই বজরার বুকে।
কিছু-কিছু লেখা বহুবার পড়লেও পুরোনো হয় না। সে কি তাদের নিজস্ব কাব্যময়তার জন্য? না বক্তব্যের দার্ঢ্য সেই কথাগুলো আমাদের বাধ্য করে বারবার লেখাটির কাছে ফিরে যেতে? এ-বিষয়ে আমার সুনির্দিষ্ট কোনো ধারণা নেই। তবে এমন বেশ কিছু লেখা আছে, যাদের আমি 'কমফোর্ট রিড' হিসেবে ব্যবহার করি— যাতে আমার টলমল করতে থাকা মনোভুবন তাদের ধরে আবার থিতু হয়। তাদের মধ্যে অন্যতম হল 'ছিন্নপত্র।' এমনিতে চিঠি একটা অত্যন্ত কেজো ও কেঠো জিনিস। এখন তো ব্যক্তিগত আলাপচারিতার ক্ষেত্রে বস্তুটি একরকম লুপ্তই হয়ে গেছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের চিঠিরা ভাবনা, বর্ণনা এবং দর্শনের সমন্বয়ে জানালা হয়ে উঠত— যা একইসঙ্গে তাঁর চোখে দেখা পৃথিবী, তাঁর চারপাশের মানুষজন, আর তাঁর নিজের মনের খণ্ডচিত্র তুলে ধরে। এই বইয়ের দেড়শো-প্লাস চিঠি সেই বৈশিষ্ট্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বললে ভুল হবে না। এরা কখনও কৌতুকে, কখনও নিতান্ত সাংসারিক টুকিটাকি বিবরণে, কখনও ভাবের গাম্ভীর্যে, আর অতি অবশ্যই বর্ণনার মাধুর্যে আমাদের মোহিত করে রাখে। মনে হয়, যেন চিঠির বদলে একটার পর একটা ছোটোগল্প পড়ছি— যারা মনের মেঝেতে জলের দাগে ফুটিয়ে তুলছে নকশা, মুছে দিচ্ছে, আবার আঁকছে নতুন কিছু। 'ক্লাসিক' বিশেষণটা বহু-ব্যবহারে ক্লিশে হয়ে গেছে। তবে এই বই নিয়ে ভাবতে গেলে ওই বিশেষণটিই মনে হয়। না পড়ে থাকলে দয়া করে পড়ে নেবেন। বাংলা ভাষায় এমন লেখা আর একটিও নেই।
এইসব চিঠিপত্রে এমন এক রবীন্দ্রনাথকে পাওয়া যায়, যাকে অন্য আর কোথাও পাওয়া যায়না। তিনি নিজেই বলেছিলেন, এই চিঠিগুলোতে তিনি নিজের কথার কোন সংশোধন বা পরিমার্জন করেননি, বলেছেন যা অনুভব করেছেন বা যা মনে এসেছে তার পুরোটাই, কোনরকম সম্পাদনা ছাড়া। এ কারণে এই বইয়ের মাধ্যমে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের মনের ভেতরটা উঁকি দিয়ে দেখে আসা যায়।
এমন একটা সময় যখন বাংলা গদ্য বড়জোর তার কৈশোরকাল পার করছে, আর রোববাবু মুখের কথার কোল ঘেঁষে বাংলা গদ্য তৈরির কারবার করে যাচ্ছেন। এটা সহজ কথা না, কঠিন কাজ-ই। নতুন পথ দেখা এবং তৈরি করার ব্যাপার আছে। আর এটা বললে নিশ্চয়ই বাড়িয়ে বলা হবে না যে রোববাবু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতকে বাংলা ভাষায় প্রকাশের এক বিস্তারিত প্রজেক্ট হাতে নিয়েছিলেন। আমরা অবশ্য বলছি না যে বলে কয়ে এই প্রজেক্ট হাতে নিয়েছেন। কোথাও নির্দিষ্ট করে বলা নাই, কিন্তু আঁচ করা যায়। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতে উপস্থিত বাস্তবতা যেভাবে ধরা পড়েছে এবং পাশাপাশি অনুপস্থিত বাস্তবতাকেও বাংলা ভাষায় প্রকাশ করে ঠাকুরদা এক অনন্য স্বচ্ছ মনের নজির আমাদের সামনে রেখে গেছেন। তিনি কাব্যও করেছেন। অনুপস্থিত কোন বাস্তবতাকে ভাষায় গ্রেফতার করার কাজটিকে যদি কবিতা বলে সাব্যস্ত করি তবে তিনি কাব্যই করেছেন। এই কাব্য করে ঠিক কাজটাই করেছেন।
'ছিন্নপত্রাবলী'র চিঠিগুলো থেকে বাছাই করে 'ছিন্নপত্র' সংকলিত হয়েছে। প্রকৃতি নিয়ে লেখা চিঠিই বেশি পাওয়া যায় ছিন্নপত্রে। ছিন্নপত্রাবলীতে অনেক চিঠি আছে যেখানে তরুণ রবীন্দ্রনাথের দর্শন প্রকাশিত হয়েছে। যেই চিঠিগুলি এখানে বাদ পড়েছে। বেশি প্রিয় চিঠিগুলি বাদ পড়ায় 'ছিন্নপত্র' ঠিক পছন্দ করতে পারলাম না। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পাঠকদের 'ছিন্নপত্র' পড়ার আগে 'ছিন্নপত্রাবলী' পড়তে রিকমেন্ড করছি।
রবি ঠাকুর তার ভাইঝি ইন্দিরা দেবীকে ১৮৮৭-১৮৯৫ পর্যন্ত যে চিঠিগুলো লিখেছিলেন সেগুলো সংকলন করা হয়েছে এই বইটিতে। এইখানে রবি ঠাকুরের প্রকৃতি এর প্রতি ভালোবাসা দেখা যায়। কবি প্রায় প্রতিটি চিঠিতেই বোলপুর, শিলাইদহ, সাজাদপুর, কলকাতা, পতিসর এই জায়গাগুলোর প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন। কবি বেদে দের জীবন নিয়ে যে চিঠিটি লিখেছেন সেটি আমার সবচেয়ে প্রিয়।এছাড়াও কবি মানুষের জীবন ও মন নিয়েও এমন অনেক কথা বলেছেন যা নিজের জীবনের সাথে মিলে যাচ্ছিল। এই চিঠিগুলো ই আমার বেশি ভালো লেগেছে। Overall, এই বইটি বারবার পড়ার মত একটি বই।
ছুটির দিনে স্নায়ু শান্ত রাখতে সকাল সকাল ছিন্নপত্র নিয়ে বসেছিলাম। অনেক আগেই একবার পড়া ছিল, রবিবাবু বারবার পড়তে দোষ কী !
অনেক অনেক অংশ একদম মতের মিল, কিছুতে দ্বিমত! যদি অন্যের চিন্তার দৈন্যতাকে তার সময় আর দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মিলিয়ে দেখতেই না শিখলাম, তবে আর রবিবাবু পড়ে লাভ কী!
এ-বইয়ের তুলনা নেই। এই রবীন্দ্রনাথকে আমি প্লটের বেড়াজালে পাইনি, এই লেখাগুলোয় যেন এক অসাধারণ প্রাণের অনুভূতি অনুভব করলাম। ছিন্নপত্রেই রয়েছেন আমার রবীন্দ্রনাথ।
এক কথায় স্নিগ্ধ। দশ কথায়: অতিপঠিত কোনো বই আমি সচরাচর এড়িয়ে চলবার চেষ্টা করি; রবীন্দ্রনাথের 'ছিন্নপত্র'কেই বোঝাচ্ছি, রবীন্দ্র-নওয়াজেশের যুগলবন্দিটিকে না। ঠাকুর যেমন লিখেছেন, মরবার আগে গ্যেটের Mehr Licht (আরো আলো)-র স্থলে তিনি চাইতেন আলো আর স্থান, বইটা জুড়ে তেমন লিখ্টের ঝলকানি। ঝকমকঝকমক পদ্মা আর তার আশপাশের মানুষ আর প্রাণপ্রকৃতি। এমন করে পরে প্রথম আলোর ছুটির দিনে-তে কিছু আলোকচিত্রকাব্য প্রকাশিত হতে দেখেছি। যদিও কিছু ছবির রেজোলিউশন কম বিধায় কম মনোহর, আলো আর ওই স্থানের খেলা অনেকটা পুষিয়ে দিয়েছে। "নীড়চ্যুত পাখি হঠাৎ এক মুহূর্তের জন্য জেগে উঠল, তার পরে আর তাকে জাগতে হল না।" এক সময় আমাকেও আর জাগতে হবে না।