কলেজ পড়ুয়া ইলোরার এক পরিচিত কিশোরী ধর্ষিতা হয়, তার প্রতিবাদে ইলোরা ও তার বন্ধুরা মিলে জড়িয়ে পড়ে এক অভিনব আন্দোলনে। শেষপর্যন্ত কী হল ইলোরা ও তার বন্ধুদের তাই নিয়ে এক রুদ্ধশ্বাস কাহিনি।
শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকায় ১৪২৩ সালের প্রকাশিত উপন্যাস
বিনোদ ঘোষাল-এর জন্ম ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ হুগলি জেলার কোন্নগরে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যে স্নাতক। মফস্সলের মাঠঘাট, পুকুর জঙ্গল আর বন্ধুদের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা আর অভিনয়ের দিকে ঝোঁক। গ্রুপ থিয়েটারের কর্মী হিসেবেও কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। কর্মজীবন বিচিত্র। কখনও চায়ের গোডাউনের সুপারভাইজার, শিল্পপতির বাড়ির বাজারসরকার, কেয়ারটেকার বা বড়বাজারের গদিতে বসে হিসাবরক্ষক। কখনও প্রাইভেট টিউটর। বর্তমানে একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত। নিয়মিত লেখালেখি করেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। ২০০৩ সালে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্প। বৃহত্তর পাঠকের নজর কেড়েছিল। বাংলা ভাষায় প্রথম সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার প্রাপক। ২০১৪ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমির সোমেন চন্দ স্মৃতি পুরস্কার। তাঁর একাধিক ছোটগল্পের নাট্যরূপ মঞ্চস্থ হয়েছে।
কাহিনীর সূত্রপাত হয় শান্তিনগরে ঘটে যাওয়া একটি নৃশংস ধর্ষণের ঘটনা দিয়ে। ঐ অঞ্চলের পঞ্চায়েত প্রধানের ছেলে এবং তার কিছু সাগরেদ মিলে অঞ্জলি নামক একটি ১৫ বছরের মেয়েকে গণধর্ষণ করার পর গলার নলি কেটে হত্যা করেছে। এই খবরটা কাগজে পড়ার পর থেকেই কলেজ পড়ুয়া ইলোরা স্থির থাকতে পারে না, যখন দেখে রাজ্য সরকার বিষয়টিকে একটি সাজানো ঘটনা আখ্যা দিয়ে ধামাচাপা দিতে চাইছে। ইলোরা ঠিক করে বিষয়টি নিয়ে একটি গণ-প্রতিবাদ হওয়া উচিত এবং খানিকটা আবেগের বশেই সে একাডেমি অফ ফাইন আর্টসের গেটের সামনে তার কিছু বন্ধুকে সঙ্গী করে একটি তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেখানে উপস্থিত লোকজনের সামনে। তার এই প্রতিক্রিয়াটি ভাইরাল হয়ে যায়, যখন সেখানে উপস্থিত একটি মেয়ে ঘটনার বেশ কিছু বিশেষ মুহূর্ত ভিডিও করে আপলোড করে দেয় সোশ্যাল মিডিয়ার দেয়ালে। প্রচুর বাহবা সে পেতে থাকে তার এই কাজের জন্য এবং একে একে অনেকে পাশে এসে দাঁড়ায় তার এই প্রতিবাদকে সমর্থন করে। কাহিনীতে একদিকে যেমন আসতে থাকে উপরমহলের তীব্র চাপ, নানা রকম বাধা-নিষেধ ; ঠিক তেমনি ভাবে আসে বহু মানুষের অকুন্ঠ সমৰ্থন, সাহায্য ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
বাকি কাহিনীটি এগোতে থাকে তার এই প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে। তবে শেষপর্যন্ত কি ঘটে তা জানতে হলে একবার পড়ে ফেলতেই হবে এবারের এই উপন্যাসটি। রাজ্যে নিত্যদিন বেড়েচলা খুন, ধর্ষণ এবং অন্যান্য ঘটনা লেখককে যে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে তা এই কাহিনী পড়লেই বোঝা যায়।
উপরে বর্ণিত কাহিনীর সাথে সমান্তরাল ভাবে লেখক শুনিয়েছেন আরেকটি মেয়ের জীবন যন্ত্রণার কাহিনী। যে প্রতিবাদের ভাষার অভাবে নীরবভাবে প্রতিদিন লাঞ্চিত নিপীড়িত হচ্ছে, হারিয়েছে তার নিজস্ব আত্মসম্মান বোধ । শেষপর্যন্ত কিভাবে এই চরিত্রটি তার প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পায় তাও এই উপন্যাসের আরেকটি আকর্ষণের দিক। সাথে রয়েছে আরো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, যাদের উপস্থিতি এই কাহিনীকে পাঠকদের কাছে আরো উপভোগ্য করে তুলেছে।
তবে এবারের উপন্যাসে একটি জমাটি প্রেমের প্রত্যাশা করলে কিন্তু পাঠকদের একটু হতাশ হতে হবে। কাহিনীতে প্রেম আছে ঠিকই, কবিতা-শায়েরীও আছে, কিন্তু অন্যবারের মতন ততটা জোরালো নয়।