সুপ্রতিষ্ঠিত কথাশিল্পী ভগীরথ মিশ্র কর্মজীবনে ছিলেন উচ্চপদস্থ আমলা। সেই সুবাদে সূদীর্ঘকালব্যাপী বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। এসেছেন বিচিত্র মানুষজনের সান্নিধ্যে। মুখোমুখি হয়েছেন কত বিচিত্র পরিস্থিতির! জেনেছেন প্রশাসনের কতই না হাঁড়ির খবর! তাঁর কর্মজীবনের সেই বিপুল অভিজ্ঞতার রম্য স্মৃতিচারণ, “আমলাগাছি”
এ সময়ের শক্তিমান কথাশিল্পী ভগীরথ মিশ্র প্রায় চার দশক ধরে রাজ্য সরকারের উচ্চপদস্থ আমলা ছিলেন। সুদীর্ঘ চাকরিজীবনে শ্রীমিশ্র যত বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। এসেছেন যত বিচিত্র মানুষের সংস্পর্শে, আর কোনও জাতের চাওকরিতে বুঝি তেমনটা সম্ভব ছিল না। পাশাপাশি, তাঁর জানবার সুযোগ হয়েছে প্রশাসনের এমন-সব হাঁড়ির খবর, যা ওই পদগুলিতে না থাকলে হয়তো-বা জানা সম্ভব হত না। প্রশাসন-যন্ত্রটির হাজারো মহিমা, রাজনৈতিক নেতাদের প্রকাশ্য অ গোপন কীর্তিকলাপ, জনগণ নামক বস্তুটির বিচিত্র আচরণবিধি, চাকরি করাকালীন কোনুওটাই তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। অই সবকিছু নিয়ে বিগত দেড় বৎসুরাধিক সময় ধরে ;সাপ্তাহিক বর্তমান’ পত্রিকার পাতায় লিখে চলেছেন ধারাবাহিক স্মৃতিচারণ। ইতিমধ্যে অই ধারাবাহিকাটি এততাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে, প্রিয় পাঠ-সমাজের দিক থেকে বেশ কিছুদিন যাবৎ রচনাগুলিকে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করবার দাবি ক্রমশ সোচ্চার হচ্ছিল। প্রিয় পাঠকবর্গের সেই দাবিকে সম্মান জানাতে, প্রকাশিত হল, চার দশকের আমলাগিরির রম্য স্মৃতিচারণ, ‘আমলাগাছি’।
ভগীরথ মিশ্র একজন ভারতীয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক। বিশ শতকের সত্তর দশকের পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যে যারা অবদান রেখেছেন তিনি তাদের অন্যতম। তার বহু রচনা বাংলার অনেক শিক্ষার্থীর কাছে গবেষণার বিষয়বস্তু। তিনি একইসাথে একজন ম্যাজিসিয়ান এবং বনসাই বিশেষজ্ঞ।
ভগীরথ মিশ্র স্কুল-কলেজ জীবন হতে লেখালেখিতে বেশি আগ্রহী ছিলেন। সময় পেলেই কাজের ফাঁকে সাহিত্যসৃষ্টিতে লিপ্ত হতেন। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে আশুতোষ কলেজের ছাত্র থাকাকালীন তার লেখা গল্প একটি প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে এবং পরের বছর ম্যাগাজিনে তা ছাপা হয়। এরপর নবকল্লোল পত্রিকায় ‘মূলধন’ নামের একটি গল্প প্রকাশ হয়।
১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে ভগীরথ মিশ্রের গল্প ‘কদমডালির সাধু’ প্রকাশিত হয় বালুরঘাট থেকে প্রকাশিত ‘মধুপর্ণী’ পত্রিকায়। এই গল্পটি প্রশংসিত হয়েছিল। এরপর একই পত্রিকার পূজা সংখ্যায় তার গল্প ‘লেবারণ বাদ্যিগর’ প্রকাশিত হয়। এরপর তিনি উত্তরবঙ্গে গল্পকার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যান। ১৯৮১ সালের মধ্যেই তিনি প্রায় ৪০টি গল্প রচনা করেন। এরপর তিনি মহাশ্বেতা দেবীর ‘বর্তিকা’ পত্রিকায় এবং ‘প্রমা’ এবং ‘অনুষ্টুপ’ পত্রিকায় নিয়মিত গল্প লিখতে থাকেন। এরপর ‘রাবণের বয়স’ নামের একটি গল্প দেশ পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়।
১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ভগীরথ মিশ্রের গল্পগ্রন্থ ‘জাইগেনসিয়া ও অন্যান্য গল্প’ প্রকাশিত হয়। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে প্রমা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম উপন্যাস ‘অন্তর্গত নীলস্রোত’। এটি প্রথম প্রমা পত্রিকার পূজাসংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।
১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ২০০০ অবধি তার সুবিশাল উপন্যাস ‘মৃগয়া’ পাঁচখণ্ডে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসটি লেখার জন্য লেখক দশ বছর গবেষণা এবং তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। সর্বমোট ১৫ বছর সময় লেগেছিল উপন্যাসটি সম্পূর্ণ করতে। তার ছোটবেলা থেকে জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা এবং চাকরি সূত্র থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে ভ্রমণ এবং আদিবাসীদের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তার এই উপন্যাস রচনার সহায় হয়।
ভগীরথ মিশ্র গল্প এবং উপন্যাস ছাড়াও ভ্রমণ সাহিত্য এবং রম্য রচনাও লিখেছেন। ‘উত্তরবঙ্গ সংবাদ’ পত্রিকাতে তার লেখা রম্যরচনাগুলি নিয়ে ‘অর্বাচীনের জার্নাল’ বইটি প্রকাশিত হয়। ‘লঘুপুরাণ’ তার অপর একটি রম্যরচনার বই।
ভাগীরথ মিশ্রকে অনেকে লেখক হিসেবে চেনেন। তবে, তার আরও একটি পরিচয় রয়েছে। তিনি পেশায় ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। পশ্চিমবঙ্গের প্রাদেশিক সার্ভিস তথা ডব্লিউ বিসিএস দিয়ে নিযুক্ত হয়েছিলেন জয়েন্ট ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসার হিসেবে। এই বই তার পেশাগত জীবনের স্মৃতিচারণ।
বলা হয়, আমলাতন্ত্রের কোনো প্রাণ নেই, নেই অনুভূতি। স্রেফ রুটিন কাজের বাইরে কিছুই করতে চায় না আমলাতন্ত্রের ধারক ও বাহক আমলারা। সদ্য বিডিও হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ভাগীরথ মিশ্র কথাগুলো জানতেন। কিন্তু তখনও নিজে প্রত্যক্ষ করেননি। এবার আমলাতন্ত্রে প্রবেশ করে বুঝলেন এ-ও এক আশ্চর্য দুনিয়া!
সাহসী আমলা, বোকা আমলা, আধ পাগল আমলা, সৎ আমলা, অসৎ আমলা, কর্মনিপুণ আমলা এবং ঘনাদা আমলা - আমের মতো নানান জাতের আমলার কেচ্ছা-কাহিনি লিখেছেন মিশ্রবাবু। সওদাগর আনোয়ার, মুস্তাক মুর্শেদের কথা পাঠকের অনেকদিন মনে থাকবে।
'৭৭ সালের ২ অক্টোবর ভারতের জাতির পিতা গান্ধিজির জন্মদিবস। তখন সেখানে ইন্দিরা গান্ধির শাসন, চলছে জরুরি অবস্থা। সরকার সিদ্ধান্ত নিলো জাতির পিতার জন্মদিনে কেউ গৃহহীন থাকবে না। গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প চালু করলো সরকার। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব এসে পড়লো বিডিওদের কাঁধে। বইয়ের সবচাইতে চমকপ্রদ অংশ বোধহয় এটি। মুজিববর্ষে আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এদেশের কর্মকর্তারা যেসব অসুবিধায় পড়েছিলেন, ১৯৭৭ সালে ভারতের কর্মকর্তারা ঠিক একইরকমের সমস্যার মুখোমুখি হন। আমাদের কর্তাব্যক্তিরা একটু পড়াশোনা করলে সহজেই আশ্রয়ণ প্রকল্পের অসুবিধাগুলো পূর্বেই চিহ্নিত করতে পারতেন।
নির্বাচনে দায়িত্ব পালন বিডিওর আরেক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। সেই ঘটনা পড়ে বিশেষ আনন্দ পেয়েছি।
ভাগীরথ মিশ্র নিরপেক্ষ জায়গা থেকে লেখেননি। তিনি প্রথমেই ধরে নিয়েছেন জনতা আর রাজনীতিবিদ মন্দ। তাই আমলাতন্ত্রের ভালো দিকটাই বেশি বেশি দেখেছেন। যা বইটির অন্যতম দুর্বল দিক।
"গল্পে গল্পে আমলাগিরি", এভাবেও বলা যেত আমলাগাছি নামের বইদু'টোকে। দু'টো বলছি, কারণ একই নামে তপন বন্দ্যোপাধ্যায়েরও একটা বই আছে, একই বিষয়বস্তু নিয়ে। ভগীরথ মিশ্র'র বইয়ের ভূমিকা পড়ে বিষয়টা পরিস্কার হলো। দু'জন বন্ধু, দু'জনই আমলা, প্রশাসনে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন, পরে সিদ্ধান্ত নেন একই নামে একই সময়ে একই পত্রিকায় এসব অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখবেন। তপনবাবুর বইটা আগেই পড়েছি, কাজেই ভগীরথ মিশ্র'র অভিজ্ঞতা পড়ে তুলনা একটা এসেই যায়। চাকরিজীবনে কে কেমন ছিলেন সেটার জন্য তাদের বয়ান ছাড়া আমাদের কাছে আর কোন সূত্র নেই, কাজেই লেখা দিয়েই বিচার করতে হচ্ছে এখানে। সেই আলোকে বলতে পারি, তপনবাবুর তুলনায় ভগীরথবাবু'র লেখার মাঝে আমলা হবার গৌরব ও ভারভার্তিক অনেকটাই বেশি। আমলাতন্ত্রের ভাল দিকটাই তিনি তুলে ধরেছেন প্রায় পুরোটা জুড়ে; দোষত্রুটি কিছু আনলেও তা সুগার-কোটেড কুইনাইনের মত। লেখার সুরে অ-আমলা কর্মকর্তা (প্রশাসন ব্যতীত অন্য সরকারি কর্মকর্তা), জনগণ ও রাজনীতিবিদদের প্রতি প্রচ্ছন্ন অবজ্ঞার ভাবটা লুকোতে পারেননি, যে ভাবটা তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় পাইনি বললেই চলে। তার অভিজ্ঞতার বয়ান বেশ কার্যকর হলেও, এই আমলাসুলভ অহমিকার কারণে লেখার মূল্য খানিক কমে গেছে সেটা বলতেই হবে। ৩-এর বেশি দেয়া গেল না তাই।