বইটি জীবনানন্দ দাশের নির্বাচিত কবিতার একটি সুসম্পাদিত সংকলন। যা বইটি খুললেই বোঝা যায়। এই সংকলনটি সম্পাদনা করতে গিয়ে ভূমেন্দ্র গুহ সম্পাদনার প্রচলিত কোনো নিয়ম লংঘন করেননি। জীবনানন্দ দাশের জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়েছিল মাত্র পাঁচটি কবিতার বই এবং দেড়শোর কিছু বেশি কবিতাই ছিল যার জীবৎকালীন অবদান। আর তাঁর মৃত্যুর পরে ভূমেন্দ্র গুহের কারণে আবিষ্কৃত হলো তার অসংখ্য অপ্রকাশিত কবিতা। সংকলনটিতে জীবনানন্দ দাশের জীবদ্দশায় প্রকাশ হওয়া কবিতার বইগুলির নির্বাচিত কবিতা, নাভানা সংস্করণ ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র অগ্রন্থিত অংশ, কবির মৃত্যুর পর প্রকাশ পাওয়া কবিতার বই ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ থেকে নির্বাচিত কবিতা, প্রকাশিত-অগ্রন্থিত কবিতা এবং বইয়ের সবশেষে বিশাল অংশজুড়ে পাণ্ডুলিপি থেকে গৃহীত কবিতা। পাণ্ডুলিপি থেকে গৃহীত কবিতার অনেক কবিতাই দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংকলনে আছে। তার কবিতাগুলি আটচল্লিশটি খাতায় কপি করার পর তিনি খাতাগুলিকে ট্রাংকে রেখে দিয়েছিলেন। আগের ভুলগুলি সংশোধন করে একটি নির্ভুল পাঠোদ্ধারের উদ্দেশ্যে ভূমেন্দ্র গুহ প্রতিটি রচনার ক্ষেত্রে কলকাতায় অবস্থিত জাতীয় গ্রন্থাগারে সুরক্ষিত মূল পাণ্ডুলিপি অনুসরণ করেছেন। এই রকম পদ্ধতি যে আগের কাজগুলিতে সব জায়গায় সকল সময় অনুসরণ করা হয়নি তার প্রমাণ অনেক জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ মূল পাণ্ডুলিপি সর্বত্র অনুসৃত হয়নি, এই কথাটির একটি ভিত্তি আছে বলে মনে হয়। দেখা গেছে, জীবনানন্দের কবিতার সব চেয়ে ভালো যে সংকলনটি আছে, তা হলো দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত। সেইটিতেও কিছু কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে গিয়েছে। ছাড়া জীবনানন্দ দাশের অন্যান্য কবিতা সংকলনগুলিতেও মুদ্রণপ্রমাদ তো রয়েছেই, এমনকি মূলের সঙ্গে কোনো-কোনো শব্দের সাদৃশ্য নেই। ফলে বহু শব্দ এবং কবিতা
Jibanananda Das (bn: জীবনানন্দ দাশ) is probably the most popular Bengali poet. He is considered one of the precursors who introduced modernist poetry to Bengali Literature, at a period when it was influenced by Rabindranath Tagore's Romantic poetry. During the later half of the twentieth century, Jibanananda Das emerged as the most popular poet of modern Bengali literature. Popularity apart, Jibanananda Das had distinguished himself as an extraordinary poet presenting a paradigm hitherto unknown. It is a fact that his unfamiliar poetic diction, choice of words and thematic preferences took time to reach the heart of the readers. Towards the later half of the twentieth century the poetry of Jibanananda has become the defining essence of modernism in twentieth century Bengali poetry.
জীবনানন্দ যেন নিজের বাস্তব জীবনের যাবতীয় রিক্ততাকেই তুলে ধরেছেন 'কারুবাসনা উপন্যাসে। হেম এবং তার স্ত্রী কল্যাণীর আদলে যেন নিজের দাম্পত্যজীবনের অন্তর্গত দ্বন্দ্বই উঠে এসেছে। জীবনানন্দের লেখা উপন্যাসগুলোর ধারাক্রম বিবেচনা করলে সেই সময়ে তাঁর নিজ জীবনের নানা ঘটনাপঞ্জির প্রতিফলনই যেন উপন্যাসে দেখতে পাই। কারুবাসনা উপন্যাসের চৌত্রিশ বছরের হেম বারবার কলকাতায় গিয়ে জীবিকার কোন উপায় বের করতে না পেরে ফিরে আসে নিজ গ্রামে। সে কবিতা লেখায় নিজেকে মগ্ন করে রেখেছে। স্ত্রী কল্যাণীর সাথে তার কথোপকথন বেশিরভাগ সময়েই যেন একটা ঠাণ্ডা যুদ্ধেরই আভাস দেয়। সাংসারিক নানা প্রয়োজন মেটাতে নূন্যতম যে অর্থের প্রয়োজন হয়, তাও যখন হেম মেটাতে পারে না, তাকে নির্ভর করতে হয় পরিবারের অন্য সদস্যদের উপর, তখন নিজেকে রিক্ত এবং কখনো শুধু বাতিল বলে গণ্য করতে সে পুনরায় ভাবে না।উত্তম পুরুষে বর্ণিত উপন্যাসে হেম নিজেকে ঠিক এভাবে বিচার করে :
" কারুবাসনা আমাকে নষ্ট করে দিয়েছে। সব সময়ই শিল্প সৃষ্টি করবার আগ্রহ, তৃষ্ণা, পৃথিবীর সমস্ত সুখ-দুঃখ, লালসা, কলরব, আড়ম্বরের ভিতর কল্পনা ও স্বপ্ন চিন্তার দুশ্ছেদ্য অঙ্কুরের বোঝা বুকে বহন করে বেড়াবার জন্মগত পাপ। কারুকর্মীর এই জন্মগত অভিশাপ আমার সমস্ত সামাজিক সফলতা নষ্ট করে দিয়েছে। আমার সংসারকে ভরে দিয়েছে ছাই-কালি-ধূলির শূন্যতায়। "
তাদের আড়াই বছরের মেয়ে খুকি, যে কিনা অতটুকু বয়সেই বাবা-মা'র বিভিন্ন মালিন্য এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার শিকার, তাকে সামলে রেখেছে ঠাকুরদা- ঠাকুরমা, তার অল্প বয়সের বিহবলতাও ফুটে উঠেছে অত্যন্ত করুণভাবে, যা মন খারাপ করে দেওয়ার মতো।
" খুকি খাটের এক কিনারে পা ঝুলিয়ে পাথরের মত চুপচাপ বসে থাকে ; বয়স আড়াই বছর, দেখায় এক বছরের মতো ; বিচার-কল্পনার শক্তি হয় ত চল্লিশ বছরের গৃহিণীর মতো ; জীবনের আস্বাদ সত্তর বছরের মানুষের মত ; এর ভবিষ্যৎ কী, আমি ঠিক ঠাওর করে উঠতে পারি না কিছু। "
একদিন হেম তার মেয়েকে নিজেদের কাছে নিয়ে আসে ঘুম পাড়াবার জন্য। তখন তাদের যে বাক্যালাপ হয়, তাতে যেন সমস্ত মায়া, আকুলতা, সাংসারিক উপায়হীনতা, শিথিলতা, ভালোবাসা সবকিছু একসাথে ধরা পড়ে।
" ধীরে ধীরে খুকিকে তুলে নিয়ে নিজের বিছানায় চলে গেলাম আমি। বিছানায় আমার পাশে শুইয়ে মুখের দিকে চাইতেই দেখলাম চোখ চেয়ে আমার দিকে চেয়ে আছে। -তুই জেগে আছিস যে রে? - বিত্তি। - হ্যাঁ, বৃষ্টি পড়ছে ঝমঝম, কেমন লাগে? -বাবা। -কী মা? -মিছছি কোথায়? -মিছরি? -মিছছি খাব। -এখন খায় না মা। -বোতলে আছে। -হ্যাঁ। -খাব। -কাল সকালে খেও। -মিছছি খাব। -সকালবেলা দেব কাল। -বাবা। -কী মা? -মিছছি খাব। একটু চুপ থেকে - মিছরি খেলে পিঁপড়ে কামড়ায়। জীবনী শক্তি ঢের কম ; পিঁপড়ের কথা শুনে নিস্তব্ধ হল। মাথায় হাত বুলতে বুলতে - তোমার নাম কি খুকু? মনের অবসাদে সহসা কোন জবাব দিল না। - কী নাম তোমার? অন্ধকারের ভিতর দু-তিনটে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে - আমাল নাম? -হ্যাঁ। - কুকুলানি। এমন নিরপরাধ, এমন মিষ্টি অথচ এমন মর্মস্পর্শী। অন্ধকারের ভিতর আমার চোখের জল দেখল না মেয়েটি। ধীরে-ধীরে বললাম- খুকুরাণী - কী? -তুমি কাকে ভালবাস? -দাদুকে। -আর কাকে? -ঠাকুনকে। -আর কাকে? একটু চুপ করে থেকে - বাবাকে। -বাবা কোথায়? অন্ধকারের ভিতর কচি-কচি হাত আমার চোখ-নাকের উপর বুলিয়ে নিয়ে, 'এই যে বাবা। ' -মাকে ভালবাস না? -দাদুকে ভালবাসি। -মাকে? -দাদুকে ভালবাসি। -মাকে শেয়ালে নিয়ে যাবে। -না নিয়ে যাবে না। শীর্ণকণ্ঠে উত্তেজনায় আওয়াজ বেজে উঠল, 'নিয়ে যাবে না শেয়ালে। ' সন্ত্রস্ত হয়ে বললে - বাবা- -কী? -মাকে শেয়ালে নিয়ে যাবে না? -না । -মাকে ভালবাসি যে আমি। -বেশ। -রামুকে শেয়ালে নিয়ে যাবে। -রামু কে? উদ্ধত হয়ে - 'নিয়ে যাবে শিয়ালে রামুকে। ' একটু ভেবে-'নন্দুকে নিয়ে যাবে। ' আর একটু ভেবে -'বুলুকে নিয়ে যাবে। ' শিশুর মনের এই অন্ধকার স্রোত ফিরিয়ে দেবার জন্য - 'না, কাউকে নিয়ে যাবে না রে। ' -নেবে না? -না,শেয়াল নেই। -নেই? নিস্তব্ধভাবে জিনিসটা উপলব্ধি করতে লাগল সে।
জীবনানন্দের গদ্য যেন তাঁর জীবনেরই নির্জনতা এবং স্তব্ধতার রূপক।
" বিধাতা তো পনেরটা জীবন দেন নি, দিয়েছেন একটা, অথচ দুশটা জীবনের কামনা ও চরিতার্থতা এরই ভিতর গুদামজাত করতে হবে - মানুষের কি আর হাঁফ ফেলার সময় আছে ? কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছাই আর ধুলো : পথে পথে ব্যর্থতা মাড়িয়ে চলা। "
ট্রেনে করে যাওয়ার সময় অনেক কিছুই চোখে পড়ে। খাপছাড়া কিছু দৃশ্যপট। জীবনযাত্রার কিছু মুহূর্ত। স্টেশনে তরুণ স্বামী-স্ত্রী দাঁড়িয়ে। ছেলেটার চোখে জল, মেয়েটার কোলে একটা বাচ্চা। ভাল করে কিছু বোঝার আগেই ট্রেন স্টেশন ছেড়ে দেয়।
সুবিস্তীর্ণ মাঠের ঠিক মাঝখানে একটা দোতলা সাদা বাড়ি। ছাদে কে যেন লাফদড়ি খেলছে। কিন্তু ট্রেন থেকে পুরোটা জানা যায় না, বোঝা যায় না।
"কারুবাসনা" ঠিক সেইরকম উপন্যাস। বইটা আসলে একটা জানালা, যেটার মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে আমরা পাঠকরা কিছুক্ষণের জন্য গল্পের কথক হেমের জীবনের বিচ্ছিন্ন কিছু অংশ সম্বন্ধে জানতে পারি। আর তারপর, কোনওরকম সমাপ্তি ছাড়ায় লেখক জানালাটা সপাটে আমাদের মুখের উপর বন্ধ করে দেন।
উপন্যাসটার আসলে কোনও নাম ছিল না। জীবনানন্দের কালো ট্রাঙ্কে পাওয়া ১৯৩৩ সালে লেখা দুটো খাতায় এই উপন্যাসটা novel I আর novel II হিসাবে পাওয়া গেছে। প্রতিক্ষণ প্রকাশনীর সম্পাদকমণ্ডলীর কথায়, "জীবনানন্দ নিজেই এ-রচনা 'novel' বলে চিহ্নিত করে না-গেলে মনে হতে পারত, যে তিনি সব আড়াল ভেঙেই নিজের জীবনের কোনো-এক সময়ের ডায়েরি রেখে গেছেন।"
সত্যিই তাই। উপন্যাসের কথক হেম আসলে জীবনানন্দেরই সারোগেট। সেই অভাবের সংসার, সেই বরিশালের বাড়ি, সেই তিক্ত দাম্পত্য জীবন, সেই একই... কারুবাসনা - সৃষ্টি করার বাসনা - সমস্ত শিল্পীদের অভিশাপ।
উপন্যাসে প্লট বলতে কিছু নেই৷ বরং পাতার পর পাতা সংলাপ রয়েছে। হেমের সাথে তার স্ত্রী কল্যাণীর দুর্বোধ্য সম্পর্ক; হেমের মেজকাকার, তথা সেইসময়ের সকল "বাবু"দের নৈতিক আর আধ্যাত্মিক অবক্ষয়; হেমের মা বাবার সম্পর্কের শীতলতা - একটা ছোট সংসারের মধ্যের এই সমস্ত মহাজাগতিক-সম গূঢ় সমস্যাকে সংলাপ হিসাবে পরিবেশিত করা হয়েছে। উপন্যাসের কেন্দ্রে হয়তো হেমের শৈল্পিক সত্তা বিরাজমান, কিন্তু তার অক্ষে আবর্তিত হেমের মা, বাবা, পিসিমা, স্ত্রী, কন্যা, মেজকাকা, বন্ধু - এদের কারুর গুরুত্ব কোনও অংশে কম নয়।
জীবনানন্দের গদ্যও যেন পদ্যময়। পরাবাস্তবের অদ্ভুত ছোঁয়া রয়েছে প্রতিটা পাতায়। উপন্যাসের একটা অংশে গল্পের কথক আর তার বাবা বৃষ্টির রাতে বসে বিড়ালছানার কান্নার আওয়াজ শুনতে পায়। নইলে স্মৃতিরোমন্থন করতে করতে হেম তার প্রতিবেশী বনলতার রূপ (হ্যাঁ সেই কবিতারই বনলতা) "নক্ষত্রমাখা রাত্রির কালো দিঘির জলে চিতল হরিণীর প্রতিবিম্ব"-এর সাথে তুলনা করে। "নগ্ন নির্জন হাত", "বিষণ্ণ খড়ের শব্দ" - এইসব কিছুর বীজ যেন এই উপন্যাসে প্রথম প্রোথিত হ���়েছিল। তাই জন্যেই, উপন্যাসের সমস্ত দৃশ্যপট আর উপমাগুলো ভারি অদ্ভুত, ভারি বিষণ্ণ। আচ্ছা সুন্দর মানেই কি বিষাদময়?
গল্পের নায়ক হেম। এম, এ পাশ। কিন্তু বৈষয়িক প্রতিযোগিতায় নির্লিপ্ত এক মানুষ। কলকাতা থেকে দেশের বাড়ি চলে আসে কাজের কোনো ব্যবস্থা করতে না পেরে। সাতদিনের কথা বলে তিন মাস হয়ে গেলেও কলকাতায় আবার যাওয়ার জন্য তার তাড়া নেই। কী করবে যেয়ে? টিউশনি না কি মাস্টারি?
হেমের বাপ তাকে বলেন-
আমার সন্তান হয়ে যখন জন্মেছ, তখন অনেক বেদনা বইতে হবে তোমাকে। কিন্তু প্রাণ যাতে চিমসে হয়ে না যায়, ক্ষুদ্র হয়ে পড়ে, এমন কোনও জিনিস করো না তুমি; বেদনা ও সঙ্কীর্ণতা এক জিনিস নয়। যে কোনও কাজে বা চিন্তায় জীবন প্রসার নষ্ট হয়- তার থেকে নিজেকে ঘুচিয়ে নিও। বরং বাড়িতেই চলে আসবে আবার; কী আর করবে? পনেরো টাকার টিউশনির জন্য, টিউশনির টাকার প্রতিটি কানাকড়িও বাঁচাবার জন্য, হ্যারিসন রোড থেকে চেৎলায় হেঁটে যাওয়া-আসা- জীবনের এত বড়ো শকুন কোনও দিন সাজতে যেও না তুমি।
পিতা-পুত্রের কথোপকথনে মাঝেমধ্যে মনে হয় হেম যেন তার বাবার সাথে নয়, নিজের আত্মার সাথে কথা বলছে।
হেমের স্ত্রী কল্যাণী অনেকটা যেন রাগ করেই তেঁতুলের ঝোল দিয়ে পান্তা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। পড়াশোনা জানা স্বামী অথচ পরিবারে স্বচ্ছলতা আনয়ন করতে পারছে না। এটাই যেন বড়ো অপরাধ হেমের।
- আচ্ছা, আমি যদি ট্রাম-কন্ডাক্টর হই- কী বল, কল্যাণী? -ট্রাম-কন্ডাক্টর হবার জন্যই এম.এ পাশ করেছিলে? -কিন্তু সে-ও তো কাজ- মাসে এমন ২৫-৩০ কি দেবে না?- -বেশ তো, তা হলে তাই কর গিয়ে-
কিন্তু হেম তো আপাদমস্তক একজন কারুশিল্পী। তার জীবন তো আগেই উপসর্গীকৃত শিল্পের প্রতি। সাহিত্যের প্রতি।
❝কারুবাসনা আমাকে নষ্ট করে দিয়েছে। সব সময়ই শিল্প সৃষ্টি করবার আগ্রহ ও তৃষ্ণা - পৃথিবীর সমস্ত সুখ দুঃখ লালসা কলরব আড়ম্বরের ভিতর কল্পনা ও চিন্তার দুশ্ছেদ্য অঙ্কুরের বোঝা বুকে বহন করে বেড়াবার জন্মগত পাপ- কারুকর্মীর এই জন্মগত অভিশাপ - আমার সমস্ত সামাজিক সফলতা নষ্ট করে দিয়েছে - আমার সংসারকে ভরে দিয়েছে ছাই, কালি, ধূসর শূন্যতায়-❞
❝......এমনই অস্বাভাবিক - অবৈধ মানুষ সে- এই আর্টিস্ট।❞
তবে কারুশিল্পী হয়ে কেন বিয়ে করল হেম? কেনই বা সন্তানের পিতা হলো, যেখানে তার শিশুকন্যা খুকুরানি-কে ভুগতে হয় অপুষ্টিতে? জন্মের সময় থেকেই কন্যা সন্তান হিসেবে ভোগ করতে হয় গঞ্জনা?
❝সমস্ত কারুতান্ত্রিকতাই কি সংসারের স্ত্রীর প্রতি এমন বিরাট ভাবে উদাসীন? তা ঠিক নয়; শিল্পযানীও শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষ হিসেবেই মানুষ - রক্ত মাংসের সুখ সুবিধা সুব্যবস্থা চায় বৈ কি।❞
কারুশিল্পী হিসেবে এই জগত থেকে পরিত্রাণ বা পালানোর পথ নেই। তাকে হয় না খেতে পেয়ে মরতে হবে, নয়তো যক্ষ্মা কিংবা দুর্দিনের তিমিরের তীব্রতায়- চণ্ডীদাস, ভিঁলো, হাইনে, ভারতচন্দ্র, কীটস, শেলি - কেউই এর বাইরে যেতে পারেননি।
হেমের কখনও আত্মহত্যার চিন্তা আসেনি, এমন নয়। তবে সে মৃত্যু অন্য সবার মতো নয়-
❝চৌকাঠের সঙ্গে দড়ি ঝুলিয়ে কিংবা বিষ খেয়ে যে মরণ, সে রকম মৃত্যু নয়। আউটরাম ঘাটে বেড়াতে গিয়ে সন্ধ্যার সোনালি মেঘের ভিতর অদৃশ্য হয়ে যেতে ইচ্ছে করে; মনে হয় আর যেন পৃথিবীতে ফিরে না আসি-❞
হেমের স্ত্রী কল্যাণী আবার পুরনো এক সম্পর্কের(?) কাছে ফিরে যেতে চায়, নির্মলদা যিনি যক্ষ্মায় শয্যাশায়ী। হেম তাকে আশ্বাস দেয় তাকে এগিয়ে দিয়ে আসার। কিন্তু কল্যাণী নাকচ করে একাই যেতে চায়। রাত গড়িয়ে ভোর আসে। হেম ভেবে চলে, হয়তো তারই পুরনো ভালোবাসা বনলতা এভাবে স্বামীর গৃহে বসে তার কথা ভাবে?
কল্যাণী যদিও এরপরে নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে যদি নিজের যক্ষ্মা বাঁধিয়ে বসে, তবে নিজের পরিবারের কাছে, নিজের সন্তানের কাছে ফিরতে পারবে না! আবারও পুরোদস্তুর ঘরকন্নার কাজে মন দেয় কল্যাণী। হেম ভাবে, ❝হয়তো বনলতাও এই রকম হয়েছে আজ!❞
উপন্যাসের শেষ পর্যায়ে এক বৈষয়িক লোকের সাথে মুখোমুখি বসে হেম। হেমকে উপদেশ দেয়- ❝ফকির সেজো না- ঘুঘু সাজ- পৃথিবীকে যদি উপভোগ করতে চাও, তা হলে সৃষ্টির স্রোতের ভিতরকার অক্লান্ত সুবিধাবাদ ও অশ্রাব্য আত্মপরতাকে মন-প্রাণ দিয়ে গ্রহণ করতে শেখ। ভগবানও আশীর্বাদ করবেন- নারীও হাতের পুতুল হবে।❞
উপন্যাসটি যেন আচমকাই শেষ হয়ে গেল। আর তাদের তর্কও। এই দ্বন্দ্বের কি শেষ আছে আদৌ? জীবনের সাথে কারুবাসনার?
আমার আঁটপোড়ে কুঁড়ে ঘরে এসে তুমি কি কখন নিজেকে, এক চিলতে সুখের প্রমোদ দিতে পেরেছো? তোমার মাঝে নিমরন্দা বাস করে তাকে কি মেরে ফেলতে পরেছো? সিঁথির সিঁদুর কি কখনও মনে হয়নি তোমার বন্দী শালা? যাকে হৃদয়ে পুষলে তাকে ভুলে থাকতে হৃদয়ে একাকীত্ব মনে হয় না। আমাকে দেখো অসহায় হয়ে তোমার মত বেদনায় বন্দী। তানপুরার সুর আমার মাঝে বাজে না? আগের মত, উদ্দাম প্রেমিক হয়ে কলকাতার রাস্তায় একলা হেঁটে বেড়ানো আমার হয় না। শালিকের ভেসে আমার ভালবাসা এক খাঁচায় বন্দী।
তোমার মত বেদনার সুর কেউ বাজায় না! তোমার ঐ হাসির মত পৃথিবীর কোনো কিছু আমাকে উদ্বেলিত করে না। তোমার মত কারুবাসনা নিয়ে রাতের আঁধারে কেউ চিঠি লিখে না।
ইতি, তোমার একাকীত্ব! Review is hidden in this letter
'কারুবাসনা' জীবনানন্দের নিজের জীবনেরই সফলতা-নিষ্ফলতার আখ্যান, তবে খণ্ডচিত্রে। উপন্যাসের মাঝখানে জীবনানন্দই যেন আক্ষেপ করে ওঠেন— 'কারুবাসনা আমাকে নষ্ট করে দিয়েছে' অথবা গল্প বা কবিতা লেখার যে কোনো সাংসারিক মূল্য নেই এবং এমনই অস্বাভাবিক অবৈধ মানুষ সে, অর্থাৎ আর্টিস্ট।
কিন্তু উপন্যাস হিসেবে খুব নড়বড়ে লাগছে— 'মাল্যবান' এর মতো অতো নিরেট না। যেন ডায়েরি লিখে চলেছেন তিনি। অন্যান্য চরিত্রগুলা এবং তাদের কথাবার্তা প্যাসিভ মনে হইছে। সবচেয়ে ভালো লাগছে যেইটা— প্রতিটা জায়গায় জীবনানন্দের উপস্তিতি, যেইটা আবার সমান্তরালভাবে অস্বস্তিও জাগায়।