ইন্দ্রনীল সান্যালের জন্ম হাওড়ার বালিতে, ১৯৬৬ সালে। নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ থেকে এম বি বি এস। প্যাথলজিতে এম ডি, পিজি হাসপাতাল থেকে।সরকারি চাকরির সূত্রে কাজ করেছেন সুন্দরবনের প্রত্যন্ত প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে মহাকরণের ডিসপেনসারিতে, লালবাজার সেন্ট্রাল লকআপ থেকে গঙ্গাসাগর মেলার হেল্থ ক্যাম্পে।বর্তমানে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত।প্রথম প্রকাশিত গল্প ২০০৪ সালে ‘উনিশকুড়ি’ পত্রিকায়।শখ: বই পড়া, ফেসবুকে ফার্মভিল এবং হ্যাপি অ্যাকোয়ারিয়াম খেলা, সুদোকু সমাধান।
একটা উপন্যাস, যাতে সেই অর্থে বলতে গেলে কোনও রহস্য নেই, নেই কোনও খড়্গনাসা ছ’ফুটিয়া প্রট্যাগনিস্ট, নেই কোনও দুনিয়া উথাল-পাতাল করে দেওয়া ঘটনা নিয়ে ঘাত-প্রতিঘাত-সংঘাত, অথচ আছে নীতি, আছে প্রেম, আছে সংশয়, আছে করুণা আর নিষ্ঠুরতার সীমারেখায় চটুল নাচ। এ কি কখনও থ্রিলার হতে পারে? আজ্ঞে হ্যাঁ, পারে। যদি বিষয় হয় ইচ্ছামৃত্যু বা ইউথ্যানেসিয়া, যা এই মুহূর্তে শুধু চিকিৎসা-জগতে নয়, বরং এথিক্স ও মর্যালিটি নিয়ে সামান্য ভাবনাচিন্তাও করেন এমন প্রতিটি মানুষের কাছে গভীর চিন্তার বিষয়। যদি ঔপন্যাসিকের মধ্যে ক্ষমতা থাকে হাসি-কান্নার হিরে-পান্না দিয়ে এই রক্তলাল এবং নিকষ অন্ধকার বিষয়টাকে সাজিয়ে দেওয়ার। আর, যদি তিনি নিজে হন এক ডাক্তার, যাঁকে বুঝতে আর যুঝতে হয় নীতি আর দাবির মধ্যের এই সি-স খেলাটা। যদি উপন্যাসটা হয় ইন্দ্রনীল সান্যালের “তবু অনন্ত জাগে”।
পূজাবার্ষিকীতে প্রকাশের সময়েই উপন্যাসটা পড়েছিলাম, আর তখনই টের পেয়েছিলাম যে দ্রুতগতি ন্যারেটিভ, সরস বর্ণনা, অনায়াসে একের-পর-এক বিশ্বাসযোগ্য পার্শ্বচরিত্র নির্মাণ, এবং গল্পের পরতে-পরতে ক্রূরতা ও পেলবতার সহাবস্থান এক মুহূর্তের জন্যেও পাঠককে এই লেখা ছেড়ে উঠতে দেয় না। কিন্তু গাঁদাল পাতার পাশে রাখা গোলাপের মতো এই লেখাটাও আর পাঁচটা বাজে লেখার ভিড়ে তার ইম্প্যাক্ট অনেকটা হারিয়ে ফেলেছিল সেখানে। বই হিসেবে লেখাটা পড়তে গিয়ে আর একবার বুঝলাম, কী অসীম দক্ষতায় লেখক এই উপন্যাসের চরিত্রদের মধ্য দিয়ে আমাদেরকেই নিয়ে গেছেন ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিটে, যেখানে মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে তিলে-তিলে মরে যায় রোগীর পরিবার। কেন্দ্রীয় চরিত্র দুজনের মধ্য দিয়ে লেখক অক্লেশে বুঝিয়ে দিয়েছেন, প্রতিটি দিনের মধ্যে লুকিয়ে থাকে রাত, প্রতিটি রাত থেকেই জন্মায় দিন। হয়তো সেজন্যেই, গল্পটা আসলে আমাদের সেই কথাই বলতে চায়, যে কথা বহু-বহু বছর আগে আমাদের সেই মনের মানুষটি লিখে গেছিলেনঃ “আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে, তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে”। অপরাধ আর অপরাধীর বুদ্ধির খেলার ঊর্ধ্বে, জীবন আর মৃত্যুর এই ব্যালাড আমাদের উপহার দেওয়ার জন্যে অভিনন্দন হে লেখক।
বর্তমান সময়ের বাঙালি লেখকদের ভেতর ইন্দ্রনীল স্যানাল অতি প্রিয় একজন। পেশায় চিকিৎসক, তাই চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞানকে যথার্থভাবে প্রয়োগ করে চমৎকার সব মেডিকেল থ্রিলার উপহার দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তবে তার লেখার সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে, থ্রিলার হয়েও দিনের শেষে গল্পগুলো বেশ মানবিক আবেদন নিয়ে চোখের সামনে হাজির হয়। এই কথাটার যথার্থ প্রয়োগ দেখা যায়, তবু অনন্ত জাগে নামক বইটিতে।
ইচ্ছামৃত্যু বা ইউথানাসিয়ার মতো প্রশ্নবিদ্ধ এক বিষয়কে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছে এই উপন্যাসের মূল কাঠামো। ফুটে উঠেছে আইসিইউ এর শীতল রুক্ষ পরিবেশের নিখুঁত চিত্র; জরাজীর্ণকে কান্নাভরা বিদায় জানিয়ে মনে মনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচার ভয়াবহ নির্মম বাস্তবতার কথা নাহয় বাদ-ই দিলাম।
প্রতিশোধের উপাখ্যান বললেও খুব একটা ভুল হবে না বোধহয়। পিতৃহ্রদয়ের গোপন প্রকোষ্ঠে লুকিয়ে রাখা মমত্ববোধ, আবেগতাড়িত হয়ে অপরাধের বশবর্তী হয়ে ওঠা - শুনতে কিছুটা নাটুকে লাগলেও বইয়ের পাতায় সত্যিই তা হাহাকার জাগিয়ে তুলতে সক্ষম।
আর টান টান উত্তেজনাটা যে কোথায়, সেই কথাটা একবার পড়তে শুরু করলে আর জিজ্ঞেস করার ফুসরত নেই!
নামের গুণগান দিয়ে শেষ করছি। বইয়ের কাহিনীর সাথে তাল মিলিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতের চরণ থেকে বেছে নেয়া 'তবু অনন্ত জাগে' নামটি সত্যিই স্বার্থক -
"আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে ॥ তবু প্রাণ নিত্যধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা, বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে ॥ তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে, কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে। নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ, নাহি নাহি দৈন্যলেশ-- সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে ॥"
থ্রিলার যে শুধু মারমার কাটকাট অ্যাকশন, মাথা ঘুরিয়ে দেয়া চটকদার টুইস্ট সর্বস্ব নয় তার বেশ বড়সড় প্রমাণ ইন্দ্রনীল সান্যাল এর 'তবু অনন্ত জাগে'। শেষ পাতাটা পড়ে বইটা বন্ধ করে একমনে কিছুক্ষণ ভাবতে বাধ্য হয়েছি। "ইচ্ছামৃত্যু" এর মত একটা স্পর্শকাতর বিষয়কে ঘিরে দারুণ গল্প ফেঁদেছেন লেখক মহাশয়। ভীষণ গতি লেখায়, সেটা দু-তিন পাতা ওল্টালেই বুঝতে পারবে পাঠক। মূল চরিত্রের পাশাপাশি পার্শ্বচরিত্রের চিত্রায়নেও যথেষ্ঠ মুন্সিয়ানা প্রতীয়মান। শেষাংশে আবেগের পরিমাণও নেহায়েত কম নয়। খুব ভালো ভাবেই পরিচয় হলো ড. সান্যালের সাথে।
বাংলায় মেডিক্যাল থ্রিলার প্রথমবার পড়লাম। বলা যায় ইন্দ্রনীল সান্যাল লেটার মার্কস সহ পাশ করেছেন। থ্রিলার নামক রক্তপাত, খুন, অ্যাকশন সব থেকে সড়ে এসে রচনা করেছেন একটা মানবিক গল্প। তা বলে কি রক্তপাত নেই, খুন নেই? তা নয়। সবই আছে। কিন্তু গল্পের শেষে সেগুলোর থেকেও প্রাধান্য পেয়েছে মানুষের মানবিক মূল্যবোধ। চরিত্ররা বিশ্বাসযোগ্য । বিশেষ করে তাদের সবার মধ্যে হিপোক্রেসি বিদ্যমান। যেটা আমার সবথেকে ভালো লেগেছে(!)। গল্পের গতিও মারাত্মক। আর নেগেটিভ দিক কি? মেডিক্যাল থ্রিলার পড়তে এসে একটু প্রত্যাশা ছিল মেডিক্যাল লাইফের গল্প জানব। ডাক্তার, নার্সদের জীবনের ঘাত প্রতিঘাত, পেসেন্ট, rush hour, operation theatre, জীবন বাঁচানোর গল্প শুনবো। কোন বুদ্ধিমত্তার দ্বারা তারা ক্রিটিকাল পেসেন্ট বাঁচায় তা দেখব। তার বদলে সাংবাদিকদের দৈনিক জীবনকাহিনী পড়লাম। সেটা একটু আমার পক্ষে আশাহত হওয়ার সামিল। একটা স্টার কম দিলাম তার জন্যে 😐।
মেডিকেল থ্রিলার পড়ার সুবিধা এবং অসুবিধা দুই আছে। অসুবিধা হলো এত এত নতুন নতুন অপরিচিত শব্দ থাকে সেগুলো পড়ার সময় দূর্বোধ্য লাগে তখন হয় গুগল করতে হয় পড়ার মাঝেই না হয় ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থায় কেউ নমঃ নমঃ করে বই শেষ করে ,কেউ ছুড়ে পালায় বাঁচে 😑 সুবিধা হলো যারা এই টার্ম গুলোর সাথে পরিচিত তাদের কাছে গল্পটা অনেকটা কেস সিনারিও মতো হয়ে যায় সো তারা যে পড়াশোনা করে সেগুলো থেকে লব্ধ জ্ঞান কোন পাতায় আছে ,কোন জিনিসটা ভুলভাল লিখছেন লেখক,কোনটা তাদের জানার বাইরে নতুন আসলো শকুনের মত দৃষ্টি নিয়ে খুঁজতে থাকে 😎।এ অনেকটা গল্পে গল্পে পড়ার মতো আর কি 😝,জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি যে পড়ার কোনো শেষ নেই 😪
ইন্দ্রনীল স্যানালের ক্ষেত্রে ভুল হবার সম্ভাবনা শতভাগ কম কারন এই লোকটা নিজেই সাদা পোশাকধারী মানবসেবায় নিয়োজিত বান্দা যারে সোজা বাংলায় বলা যায় আমাদের দেশের ভাষায় কসাই ওরফে "ডাক্তার"কিন্তু ঘটনা হলো উনি ঐ মেডিসিন , অপারেশন,রক্তপাত,ফিনাইলেই গন্ধে জীবনটাকে না বেঁধে তার জানার পরিধির মধ্যে সুন্দর করে ছক কেটে লিখে ফেলেছেন মেডিকেল থ্রিলার।এটার জন্য একটা বাহবা উনার পাওনা
যাই হোক কর্কটক্রান্তি দিয়ে উনার লেখার সাথে পরিচয় আমার,প্লটটা যথেষ্ট পরিমাণে ইন্টিগ্রেটিং হলেও শেষ মেষ আমার মনে হয়েছে দায়সারাভাবে উনি ইতি টেনেছেন গল্পের,এক ক্যান্সার পেশেন্টের এরকম দুঃসাহসী অভিযান সচরাচর দেখা বড্ড বেশি নাটকীয় লেগেছিল
তো দ্বিতীয় বই শুরু করার পর মাথায় সেই আগের গল্পের ব্যাপারটাই ঘুরপাক খাচ্ছিল, কিন্তু এ গল্পের প্রেক্ষাপট একদমই ভিন্ন। স্বেচ্ছামৃত্যু বা লেখকের ভাষায় নিষ্কৃতি মৃত্যু কিংবা গদবাধা মেডিকেলীয় ভাষায় euthanasia নিয়ে এই গল্প। কলিকাতার এক নামী পত্রিকার স্বাস্থ্য বিভাগের খবর সংগ্ৰহ করে ঐশানী।সাথে প্রতিদ্ধন্ধী লিমা, কাঠখোট্টা বস তরুণ কে সামলিয়ে চুটিয়ে প্রেম করছে সীমান্তর সাথে,বাসায় বাবা মায়ের বরফশীতল সম্পর্ক,কাজের জায়গায় চিরায়ত প্রতিযোগিতা কিছুই তার নিত্য নতুন ব্রেকিং নিউজ সংগ্ৰহ করা থেকে দমাতে পারেনি।এর মধ্যে সামনে এলো এক জনপ্রিয় অভিনেত্রীর মৃত্যুর খবর,ঐশানীর instinct তাকে বলতে থাকে এ স্বাভাবিক বা ভীষ্মের মতো ইচ্ছেমৃতু্য নয় বরং এক ছকে আঁকা নিখুঁত কারিগরের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। কিন্তু কে এই ঘটনার পিছনে? নন্দিনীর মৃত্যুই কি প্রথম না এর আগে ঝরে গেছে আরো অনেক প্রাণ?
"তাসের দেশ" থেকে "খেলাঘর"পর্যন্ত যার সর্বত্র অবাধ চলাচল যে ঐশানির সে কি জানতে পারবে"নষ্টনীড়"(আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি এই তিনটাই হলো বাড়ির নাম , এবং নাম গুলো শুনে চমৎকৃত হয়েছি বৈকি,ওপার বাংলায় এই একটা জিনিশ দেখাই যায় বেশ এরা এদের পোশাকি নামের সাথে একটা করে ডাকনাম রাখে আবার বাড়িঘরের নামগুলো ও অনেক অদ্ভুত হয়) কৃতান্ত চট্টোপাধ্যায়েরর রহস্য,ভেদ করতে কি পারবে এই নিষ্কৃতি মৃত্যুর পিছনের গল্পগুলো।
জানার ইচ্ছে ,সময় থাকলে পড়ে ফেলুন বইটা
রেটিং :🌠🌠🌠.৭৫ চারটি তারাই দিতুম কিন্তু শুরুতে গল্পটা যা ছিল শেষ পর্যন্ত লেজেগোবরে করে ফেলার জন্য কর্তন করতে বাধ্য হলাম
আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।
প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া বা মৃত্যু পথযাত্রীর কষ্ট লাঘবের জন্য তার লাইফ সাপোর্ট বিচ্ছিন্ন বা অন্য উপায়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা। এটার পক্ষে বিপক্ষে পাঠকের মনে আলোড়ন তুলে যাবে এই উপন্যাস। কোমায় যাওয়া মানুষের ফিরে আসার চান্স থাকে খুব কম। আবার লাইফ সাপোর্টের খরচ যোগাতে গিয়ে পরিবার অর্থনৈতিকভাবে পংগু হয়ে যায়। এ অবস্থায় পরিবারের বাকিদের কথা ভেবে ইউথেনেশিয়াকে যৌক্তিক মনে হওয়ায় স্বাভাবিক। কিন্তু এতে মানুষটার বাচার যে একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা ছিল তাকেও শেষ করে দেওয়া হল। যাদেরকে আপন ভেবে সারাজীবন জড়িয়ে রেখেছিল, তারাই দিয়ে দিচ্ছে মেরে ফেলার সবুজ সংকেত। এই জিনিসটা যত যৌক্তিক হোক তাতে এর নির্মমতা তো কমে না।
আবারও একটা অসাধারণ লেখা পড়লাম। ❤️❤️ বইয়ের প্রথম পঞ্চাশ পাতা গল্প এগোয়ই না। তারপরের পঞ্চাশটা পাতায় মোটামুটি এগোল। একটা বস্তাপচা ভিলেন দেখলাম, আর সব ভালভাল protagonist রা এসে গেল। 😏 ভাবলাম এটাকে 3স্টার দেবো খুব জোর, কারণ ইন্দ্রনীল সান্যাল অনেক পড়েছি, এটা একদম খেলো মার্কা হয়ে গেছে। ব্যাস, হয়ে গেলো ভুল। 😅 তারপরের কয়েক পাতা থেকেই শুরু হল খেল। ভিলেনের মনস্তত্ত্বের layer, layer এর নিচে layer, তার নিচে layer। Portagonsit এর hypocrisy. আমাদের ethics কতটা ঠুনকো তার বাস্তব ব্যাখ্যা। মানে সব নিয়ে একদম কষ্ট দিয়ে, আনন্দে চুবিয়ে, নাক দিয়ে চোখ দিয়ে জল বার করে ছেড়ে দিলেন লেখক। 🥰🥰 🥳 বই শেষ করে আবার সেই বলতে বাধ্য হলাম "নাহ্, মাস্টারপিস ছিল একখানা।" "এই জন্যই এটা ইন্দ্রনীল সান্যাল।"😊
একটুও spoiler দিইনি কারণ সেটা বইটার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হবে। পড়ে আপনাকে দেখতেই হবে।
🌀 মানুষের মনের এত বিশ্লেষণ, এত সুন্দর চরিত্র নির্মাণ যে পড়তে পড়তে একদম পেগলে যাবেন। 🌀 তাও একটা না, সবকটা চরিত্রই বেশ কমপ্লেক্স এবং গুছিয়ে ডিজাইন করা মনস্তত্ত্ব সবারই আছে। 🌀 মানুষ কোথায় হার মানে, কোথায় নিজের পাপকে কেন justify করে, কখন থামে, কখন এগিয়ে যায়, এসবের একদম সুন্দর সামঞ্জস্য রেখে বানানো সব চরিত্র গুলো। তার সাথে তো আমাদের বাস্তবের চাকা কেমন করে ঘোরে তার শিক্ষা আছেই।
তবে হ্যাঁ ওই একটু "সবুরে মেওয়া ফলে" কেস আছে। একটু wait করতে হবে গল্পের স্পীড একদম 200 তে উঠে যাওয়ার জন্য। একদম বাস্তবমুখী মনস্তাত্বিক মেডিক্যাল থ্রিলার।
পুরো বাংলা মেডিকেল থ্রিলার মনে হয়, ইনি একাই দাপিয়ে যাচ্ছেন। আর লেখাগুলোও যথেষ্ট ভালো। কর্কটক্রান্তি পড়ার পর লেখক-কে নিয়ে একটু আশা জেগেছিল। আর এই বই সেটা ধরে রেখেছে।
ইন্দ্রনীল স্যানাল মনে হয় নারীদের কেন্দ্রীয় চরিত্রে রেখে লিখতে ভালোবাসেন। এতে মনে হয় গল্পের আসল উপাদানের সাথে সাথে মেয়ে রোজকার অসুবিধা নিয়েও বলা যায়।
বই যে লাখ টাকার প্রশ্নের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেটা হল- আমরা কী কারোর প্রাণ নিতে পারি? তা সে যতই কষ্টে থাকুক না কেন? আর মানসিক কষ্ট কী শারীরিক কষ্টের সমতুল্য নয়?
বইয়ের ইউথানেশিয়াকে ইচ্ছামৃত্যুও বলে। তবে একে নিষ্কৃতিমৃত্যু বলাই শ্রেয়। তবে এখানে থ্রিলারের পাশাপাশি কিছু সামাজিক সম্পর্ক আর সংবাদ পত্রের অফিসের রেষারেষিও চোখে পড়েছে।
থ্রিলার প্রসঙ্গে বলতে গেলে সবটাই ভালো, তবুও শেষের দিকটায় গল্পটায় কীরকম জোর করে happy ending করার চেষ্টা। শুধু ওইটুকুর জন্যই রেটিং টা কমল।
📝 এই উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু হলো ‘ইউথ্যানেসিয়া’ বা ইচ্ছামৃত্যু, লেখকের ভাষায় বললে ‘নিস্কৃতি মৃত্যু’। এই ‘নিস্কৃতি মৃত্যু’ বেশ কয়েক দশক ধরে বিতর্কের কেন্দ্রে । জীবন দেওয়ার ক্ষমতা যখন চিকিৎসকের নেই, তখন জীবন নেওয়ার অধিকার কেন থাকবে ; আর মানুষের মর্যাদায় বাঁচিয়ে রাখতে না পারলে রোগীকে বাঁচ��য়ে রাখা অর্থহীন — এই দুই যুক্তির টানাপোড়েনে চিন্তাবিদদের দুই ভিন্ন মেরুতে অবস্থান । উপন্যাসের মূল চরিত্র ডাঃ কৃতান্ত চট্টোপাধ্যায়ের মতে - “ইউথ্যানেসিয়া বা নিষ্কৃতি-মৃত্যু কোনও অন্যায় কাজ নয় । মৃত্যুর অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার । প্যাসিভ ইউথ্যানেসিয়া ভারতে আইন স্বীকৃত ।”
▪️তাহলে এই ‘নিস্কৃতি-মৃত্যু’ কি সত্যিই কষ্ট থেকে মুক্তি ? নাকি এটিও একধরনের ‘হত্যা’ ?
📝 ‘মেডিক্যাল থ্রিলার’ হল ‘চিকিৎসা জগৎ’ বা ‘চিকিৎসা-বিজ্ঞান’ সংক্রান্ত বিষয়বস্তু নিয়ে লেখা থ্রিলারধর্মী উপন্যাস । ইতিমধ্যেই যারা ইন্দ্রনীল সান্যা��ের লেখার সাথে পরিচিত তারা জানেন, ‘চিকিৎসা-বিজ্ঞান’ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্লটের ওপর ভিত্তি করে কি দুর্দান্ত সব থ্রিলার উপন্যাস লেখক আমাদের উপহার দিয়ে থাকেন । তবে তার লেখার সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে, থ্রিলার উপন্যাস হয়েও গল্পগুলি শেষমেশ বেশ মানবিক আবেদনে পরিপূর্ণ হয়ে ধরা দেয় পাঠকের কাছে... আর এই বিষয়ের যথার্থ উদাহরণ ‘তবু অনন্ত জাগে’ বইটি ।
📝 টানটান উত্তেজনায় ভরপুর এই মেডিকেল থ্রিলারটির অন্যতম বিশেষত্ব হল - দ্রুতগতির ন্যারেটিভ, সুন্দর বর্ণনা এবং চরিত্রায়ন । মূল বিষয়ের সাথে সমান্তরাল ভাবে মিশে আছে প্ৰেম, নৈতিকতা, সংশয় আর নিষ্ঠুরতা । আছে ‘ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিট’এর পরিবেশের নিখুঁত চিত্র, যেখানে এই উপন্যাসের চরিত্রদের মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন কিভাবে মুমূর্ষ রোগীকে বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে তিলে তিলে মারা যায় রোগীর পরিবার ।
▪️এই উপন্যাস পাঠককে আবিষ্ট করে রাখে শেষ পৃষ্ঠা অবধি... পড়া শেষ হলে গভীর মমত্ববোধে আবেগতাড়িত হয়ে হঠে পাঠকের হৃদয় ।
"তবু অনন্ত জাগে" ইন্দ্রনীল সান্যালের লেখা এমন একটি উপন্যাস, যা পাঠককে একটি গম্ভীর ও গভীর অর্থবোধক যাত্রায় নিয়ে যায়। এই উপন্যাসে রহস্যের অভাব নেই, তবে এটি দৃষ্টিগত বিষয়বস্তু এবং মানবিক সম্পর্কের একটি সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ প্রদান করে। এখানে কাহিনীটি এমন এক চিকিৎসা পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হয়েছে, যেখানে ইচ্ছামৃত্যু বা ইউথেনেসিয়া কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ফলস্বরুপ, এটি একদিকে আমাদের নৈতিকতা ও মানবিকতার প্রশ্ন তোলে, অন্যদিকে মেডিকেল পরিসরে সঙ্কটের মুখোমুখি করায়।
লেখক ইন্দ্রনীল সান্যাল নিজে একজন ডাক্তার, তাই তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাস্তবতা ও নৈতিক দ্বন্দ্বকে সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা অর্জন করেছেন। তাঁর লেখার পদ্ধতি এবং চরিত্র নির্মাণে যে গভীরতা রয়েছে, তা পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। তিনি প্রতিটি চরিত্রকে এক একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রধান চরিত্রগুলো আমাদের সামনে রোগী এবং তাদের পরিবারের রূপে হাজির হয়, যাদের জীবন নির্মম সময়ে একটি পরিবর্তনশীল নাট্যক্ষেত্র।
উপন্যাসটির ন্যারেটিভের গতি যথেষ্ট দ্রুত, যা পাঠককে এক সিটিংয়ে বইটি শেষ করতে বাধ্য করে। লেখক আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, প্রতিদিনের জীবন এবং মৃত্যুর মাঝে লুকিয়ে রয়েছে একটি সুন্দর সত্য। তিনি বলেন, “আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু,” অথচ জীবনের এই দুঃখভার এবং পীড়ন সত্ত্বেও যে “তবুও শান্তি, তবু আনন্দ” রয়েছে, তা আমাদের কখনও ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
শেষটা বড্ড তাড়াহুড়ো আর গোঁজামিল হল। তবে ইউথ্যানাসিয়া নিয়ে লেখা রোমাঞ্চ উপন্যাসটি নি:সন্দেহে অভিনব। মানুষ প্রাণ দিতে পারে না, তাই প্রাণ নিতে পারে কি না এই নিয়ে দ্বন্দ্ব চিরকালের। সেটা মৃত্যুদণ্ড হোক বা স্বেছামৃত্যু। মীমাংসায় পৌঁছানো কঠিন। ৩.৫/৫
"তবু অনন্ত জাগে" - ডাঃ ইন্দ্রনীল সান্যাল -এর মেডিকেল থ্রিলার। কাহিনীর বিষয়বস্তু খুব ইন্টারেস্টিং - ইউথ্যানাসিয়া ( Euthanasia )। গ্রিক ভাষায় 'ইউ' অর্থ ভাল আর 'থ্যানাটস' হল মৃত্যু। বাংলা শব্দার্থ 'স্বেচ্ছামৃত্যু'। লেখক সুন্দর নাম দিয়েছেন - 'নিষ্কৃতি মৃত্যু'। সংজ্ঞা হচ্ছে, 'প্র্যাকটিস অফ ইনটেনশনালি এন্ডিং আ লাইফ, ইন অর্ডার টু রিলিভ পেইন এন্ড সাফারিং'।
নিষ্কৃতি মৃত্যু নিয়ে বিতর্কের অব্দি নেই। লেখকের ভাষায়, জীবন দেবার ক্ষমতা যখন চিকিৎসকের নেই, তখন জীবন নেয়ার অধিকার কেন থাকবে? অন্যদিকে মানুষের মর্যাদায় বাঁচিয়ে রাখতে না পারলে রোগীকে টিকিয়ে রাখা অর্থহীন। এই দুই যুক্তির টানাপোড়েনে ইউথ্যানাসিয়া নিয়ে চিন্তাবিদদের দুই ভিন্ন মেরুতে অবস্থান। মেডিকেল কলেজে থাকাকালীন ফরেনসিক মেডিসিন পাঠ্যবইতে প্রথম ইউথ্যানাসিয়া নিয়ে পড়েছিলাম, এখন ইন্দ্রনীল সান্যালের দৌলতে একই বিষয়ে জমজমাট থ্রিলার পড়ে মন্দ লাগছে না!
ইন্দ্রনীল সান্যালের বইতে বাড়িগুলোর খুব সুন্দর নামকরণ করেন, যেমন- আকাশলীনা, খেলাঘর, তাসের দেশ। প্রথম নামটি মনে ধরেছে, ঘর করলে নামকরণ করা যেতে পারে। এই চিকিৎসক লেখকের চারটি বই সংগ্রহে আছে - তবু অনন্ত জাগে, পাঁচফোড়ন, আমসূত্র এবং কুন্দন। লেখকের আরো দু'টি হটকেকের সন্ধানে আছি - রক্তবীজ আর শূন্য দশকের উপাখ্যান। আগ্রহী পাঠক সংগ্রহ করে পড়তে পারেন।