Jump to ratings and reviews
Rate this book

ক্রাইম কাহিনীর কালক্রান্তি

Rate this book
CRIME KAHINIR KALKRANTI [Essay]
By
Sukumar Sen


প্রচ্ছদ – অনুপ রায়

স্বনামধন্য শার্লক হোমস নাকি সশরীরে একবার এদেশে এসেছিলেন। সে ছিল কুইন ভিক্টোরিয়ার আমল। ওয়াটসনকে সঙ্গী করে উঠেছিলেন এসে বেহালায়, বঙ্গীয় গোয়েন্দাপ্রবর রাখাল মুস্তৌফীর পৈতৃক বাসভবনে। সত্যি এসেছিলেন কিনা সে-খবর অবশ্য ঠিকঠাক জানেন একজনইঃ ‘নীলতারা গল্পের স্রষ্টা পরশুরাম ওরফে রাজশেখর বসু। তবে একটা কথা আমরা জানি, শার্লক হোমস এদেশে আসার ঢের ঢের আগে থেকেই গোয়েন্দাঘটিত গল্পকাহিনী এদেশে এসে গেছে।

ঠিক কবে, তা অবশ্য জানি না। এও জানি না যে, এদেশেই প্রথম সূচনা অপরাধকেন্দ্রিক এই জনপ্রিয় সাহিত্যধারাটির, নাকি পৃথিবীর অন্য কোনও প্রান্তে। যদি অন্য প্রান্তেই তবে কোথায় ?
‘ক্রাইম কাহিনীর কালক্রান্তি’ নামের এই অসাধারণ সন্ধানী আলোচনা-গ্রন্থে এই জাতীয় যাবতীয় জিজ্ঞাসারই তন্নতন্ন জবাব খুঁজেছেন শ্রদ্ধেয় ভাষাতাত্ত্বিক সুকুমার সেন, গোয়েন্দাগল্প বিষয়ে যাঁর সবিশেষ প্রীতি আর দূর্বলতা এখন আর আমাদের অবিদিত নয়। বৈদিক যুগ কি তারও আগে থেকে বিংশ শতাব্দীর পঞ্চম দশক পর্যন্ত ব্যাপ্ত তাঁর অন্বেষণের সময়সীমা। প্রচ্যদেশ থেকে শুরু করে ইয়োরোপ, আমেরিকা, কানাডা পর্যন্ত বিস্তৃত আলো-ফেলা আলোচনার ক্ষেত্র।

সুকুমার সেনের এই মহামূল্য গ্রন্থকে যদি কেউ সাল-তারিখ নিয়ে পণ্ডিতী বিবাদ ভাবেন, অবশ্যই ভুল করবেন। ক্রাইম কাহিনীর এ-যাবৎকাল অলব্ধ ঠিকুজী ও কুলপঞ্জী উদ্ধার নিশ্চিৎ এ গ্রন্থের অন্যতম লক্ষ্য, তা বলে সেটাই একমাত্র লক্ষ্য নয়।

বিশ্বসাহিত্যের প্রাচীনতম শাখার – গোয়েন্দাকাহিনীর – উৎস ও বিকাশ অনুসন্ধানের সূত্রে পৃথিবীর তাবৎ গোয়েন্দাসাহিত্যেরই এক পূর্ণ পরিচয় এ-গ্রন্থে উপহার দিয়েছেন সুকুমার সেন। শুনিয়েছেন ক্রাইম কাহিনীর চরিত্র, প্রকৃতি ও শ্রেণীবিন্যাস। দেখিয়েছেন প্রাচীনের সঙ্গে আধুনিক ক্রাইম কাহিনীর মিল-অমিল। আলোচনাসূত্রে তেনে এনেছেন সেকাল থেকে একালের প্রতিটি উল্লেখ্য লেখা ও লেখকের প্রসঙ্গ। ভেঙেছেন দেশ-কাল-ভাষার দুর্লঙ্ঘ্য দেওয়াল।

এই আলোচনায় এমন-কী যুক্ত হয়েছে বেশ কিছু বিখ্যাত কিন্তু অধুনা-দুষ্প্রাপ্য গল্পের অনুবাদ কিংবা উদ্ধৃতি। ফলে, একইসঙ্গে মননশীল আলোচনাগ্রন্থ হয়েও এ-বই স্থানে স্থানে প্রাণস্পর্শী গল্পগ্রন্থ।
গবেষণাধর্মী হয়েও রসসমৃদ্ধ।

ক্রম-দীপিকা –

পূর্ব খণ্ড –

বুদ্ধিশরণ

১ উপক্রম
২ বিচিত্র কাহিনী
৩ নীতিকথা
৪ অপূর্বকথা

পশ্চিম খণ্ড –

বিদ্যাশরণ

১ অষ্টাদশ শতাব্দী
২ ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্দ্ধ
৩ ঊনবিংশ-বিংশ শতাব্দীর সেতুবন্ধ
৪ বিংশ শতাব্দীর প্রথম দু’দশক
৫ বিংশ শতাব্দীর তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম দশক
৬ বিচার বিবেচনা

উত্তর খণ্ড -

ভাবশরণ

১ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
২ ও হেনরি

দক্ষিণ খণ্ড –

অনুসরণ

১ ফাঁড়িদারোগা
২ থানাপুলিশ
৩ দেশী-বিলাতী
৪ পালাবদল

কম্‌তি-পুর্‌তি

কথাকার নামাক্রমণি

200 pages, Hardcover

First published December 1, 1988

5 people are currently reading
30 people want to read

About the author

Sukumar Sen

77 books10 followers
সুকুমার সেন (১৬ জানুয়ারি ১৯০১ - ৩ মার্চ ১৯৯২) ছিলেন একজন ভাষাতাত্ত্বিক ও সাহিত্য বিশারদ। বৈদিক ও ধ্রুপদি সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত, বাংলা, আবেস্তা ও প্রাচীন পারসিক ভাষায় তাঁর বিশেষ বুৎপত্তি ছিল। তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব ও পুরাণতত্ত্ব আলোচনাতেও তিনি তাঁর বৈদগ্ধের পরিচয় রেখেছিলেন।


ভাষার ইতিবৃত্ত (বাংলা ভাষাতত্ত্বের একটি পূর্ণাঙ্গ আলোচনা)
Women's Dialect in Bengali (বাংলা মেয়েলি ভাষা নিয়ে গবেষণামূলক রচনা)
বাংলা স্থাননাম (বাংলা স্থাননাম নিয়ে ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ)
রামকথার প্রাক-ইতিহাস (রামায়ণ-সংক্রান্ত তুলনামূলক পুরাণতাত্ত্বিক আলোচনা)
ভারত-কথার গ্রন্থিমোচন (মহাভারত-সংক্রান্ত তুলনামূলক পুরাণতাত্ত্বিক আলোচনা)
ব্রজবুলি সাহিত্যের ইতিহাস
বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস (৫ট খণ্ডে, সুকুমার সেনের সবচেয়ে বিখ্যাত বই, বাংলা সাহিত্যের একটি পূর্ণাঙ্গ ও সামগ্রিক ইতিহাস)
বাঙ্গালা সাহিত্যের কথা
বাঙ্গালা সাহিত্যে গদ্য
বঙ্গভূমিকা (বাংলার আদি-ইতিহাস সংক্রান্ত গ্রন্থ)
বাংলা ইসলামি সাহিত্য
দিনের পরে দিন যে গেল ( আত্মজীবনীমূলক রচনা )

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
6 (60%)
4 stars
3 (30%)
3 stars
1 (10%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 2 of 2 reviews
Profile Image for Preetam Chatterjee.
7,476 reviews441 followers
July 15, 2025
ক্রাইম কাহিনীর কালক্রান্তি: অপরাধ সাহিত্যের ইতিহাস, রূপান্তর ও বিশ্লেষণ

সাহিত্যে অপরাধ কাহিনি কোনো আকস্মিক শাখা নয়—এটি সভ্যতার ইতিহাসে জন্ম নেওয়া এক অন্ধকার ধারার ভাষা, যা সমাজের নৈতিক দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার সংকট, এবং মানুষের অপরাধচেতনা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

বাংলা ভাষায় এই বিষয়ক সবচেয়ে প্রামাণ্য, গবেষণামূলক, এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক গ্রন্থগুলোর মধ্যে নিঃসন্দেহে অন্যতম সুকুমার সেন রচিত 'ক্রাইম কাহিনীর কালক্রান্তি'। এই গ্রন্থ শুধু অপরাধ সাহিত্যের ক্রমপর্যায়ের একটি খসড়া নয়—এটি বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে অপরাধচেতনার বিবর্তনের এক বিস্ময়কর মানচিত্র।

এই বিশ্লেষণে, আমরা একদিকে যেমন বইটির সার্বিক গঠন, তাত্ত্বিক গভীরতা এবং সমাজ-মনস্তত্ত্বগত প্রেক্ষাপট আলোচনা করব, তেমনি তুলনা করব বিশ্বের উল্লেখযোগ্য কিছু সত্য অপরাধবিষয়ক নন-ফিকশন গ্রন্থের সঙ্গে।

প্রথমেই বলা দরকার, অপরাধ সাহিত্য মানেই শুধুমাত্র রহস্য আর হত্যার ধাঁধা নয়। বরং, এটি হলো সমাজের নৈতিক শূন্যতা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার, ন্যায়বিচারের সীমা, এবং মনুষ্যচরিত্রের ছায়াময় অঞ্চলকে বিশ্লেষণ করার এক সাহসী কাব্যভঙ্গি। ঠিক এইখানেই সুকুমার সেনের লেখাটি তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অর্জন করে।

প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর সাতের দশক পর্যন্ত অপরাধ সাহিত্যের দীর্ঘ ইতিহাসকে চারটি অধ্যায়ে বিভক্ত করেছেন লেখক: বুদ্ধিশরণ, বিদ্যাশরণ, ভাবশরণ ও অনুসরণ। প্রতিটি অধ্যায়ে সময়পর্ব অনুযায়ী অপরাধ সাহিত্যের রূপ, রীতি, চরিত্র এবং ভাষিক অভিযোজনের বিস্তৃত অনুসন্ধান রয়েছে।

'বুদ্ধিশরণ' অধ্যায়ে সেন ক্রাইম সাহিত্যের আদি রূপসন্ধান করেছেন। তিনি ওল্ড টেস্টামেন্টের দানিয়েল অধ্যায়, ঈডিপাস রেক্স, মহাভারতের দ্রৌপদী বস্ত্রহরণ, বা ঋগ্বেদের সামাজিক গদ্যাংশগুলিকে অপরাধ কাহিনির প্রোটোটাইপ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। প্রশ্ন জাগে, এগুলো কি সত্যি 'ক্রাইম কাহিনি'? সেন বলেন—হ্যাঁ, যদি আমরা বিচার করি অপরাধ, তদন্ত, বিচার এবং প্রতিশোধের বয়ানরীতিতে। এই যুক্তিতেই রবীন্দ্রনাথের 'কঙ্কাল' গল্পকেও তিনি ক্রাইম কাহিনি হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিতে চেয়েছিলেন, এবং সেই বিতর্ক থেকেই শুরু তার গবেষণা।

'বিদ্যাশরণ' অধ্যায়ে তিনি আধুনিক গোয়েন্দা কাহিনির সূচনা বিশ্লেষণ করেছেন—ভলতেয়ারের 'জাদিক' চরিত্র, ফ্রাঁসোয়া ভিদক, এডগার অ্যালান পো, ডুপিন, শার্লক হোমস, হারকিউল পোয়ারো, কিংবা আমাদের ব্যোমকেশ, ফেলুদা পর্যন্ত। শুধু চরিত্র নয়, লেখকদেরও পরিচয় সহ গোয়েন্দা সাহিত্যের রীতিগত বিবর্তন, আঙ্গিক পরিবর্তন, পাঠকের মনের মধ্যে অপরাধ ও ন্যায়বিচার সম্পর্কিত টানাপড়েন—সব কিছুই তুলে এনেছেন অত্যন্ত সুচিন্তিত উপায়ে। তিনি দেখান, কিভাবে গোয়েন্দা চরিত্র একজন মানুষ হিসেবে নয় বরং এক নৈতিক আদর্শ, এক বুদ্ধির প্রতিনিধি।

তৃতীয় অধ্যায় 'ভাবশরণ'-এ রবীন্দ্রনাথ এবং ও হেনরির গল্পবিশ্বে অপরাধ ও মানবচরিত্রের দ্বন্দ্ব-নাটকীয়তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের অন্তর্মুখী মনস্তত্ত্ব এবং ও হেনরির চমৎকারি সংবেদনশীলতা—এই দুইয়ের মধ্যে অপরাধ বয়ানের দুটি ভিন্ন পন্থা আমরা দেখতে পাই।

'অনুসরণ' অধ্যায়ে বাংলা সাহিত্যে গোয়েন্দা কাহিনির জন্ম ও বিকাশ নিয়ে বিশদ আলোচনার পাশাপাশি রয়েছে এক বিস্তৃত তথ্যভাণ্ডার। 'বাঁকাউল্লার দপ্তর' থেকে শুরু করে শরদিন্দুর ব্যোমকেশ পর্যন্ত, বাংলা ভাষায় ক্রাইম ফিকশনের মূল স্রোতের উত্থানপতনের একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এই অধ্যায়ে পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য বিষয়, সেন বাংলা সাহিত্যে নারীদের অপরাধ কাহিনির লেখক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন—যা প্রায়শই আলোচনার বাইরে থেকে যায়।

এই বইয়ের অন্যতম শক্তি হলো এর তথ্যভাণ্ডার। ১৯৬ পৃষ্ঠার এই বইটিতে শতাধিক দেশি-বিদেশি লেখকের নাম, চরিত্র, প্রকাশনার সাল, এবং সাহিত্যধারার পার্থক্য পাওয়া যায়, যেটি একে এক ঐতিহাসিক অভিধান রূপে প্রতিষ্ঠা করেছে। সেন নিজে ছিলেন একজন ভাষাবিজ্ঞানী—সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত, পারসিক, বাংলা ইত্যাদি ভাষায় তাঁর দখল ছিল অসাধারণ। এই ভাষাগত দক্ষতাই তাঁকে বিভিন্ন সভ্যতার পুরাকাহিনির মধ্যে অপরাধবোধের প্রকাশ খুঁজে বের করতে সাহায্য করেছে।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, একুশ শতকে দাঁড়িয়ে এই বই কতটা প্রাসঙ্গিক? এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের তুলনা করতে হবে সমকালীন জনপ্রিয় কিছু সত্য-অপরাধ ভিত্তিক নন-ফিকশন গ্রন্থের সঙ্গে। যেমন—Truman Capote-এর In Cold Blood, Erik Larson-এর The Devil in the White City, David Grann-এর Killers of the Flower Moon, Ann Rule-এর The Stranger Beside Me, অথবা John Douglas-এর Mindhunter।

এই সব বইয়ের এক বৈশিষ্ট্য হলো—তারা বাস্তব অপরাধকে গল্পের ভঙ্গিতে, কিন্তু অনুসন্ধানী গভীরতায় উপস্থাপন করে। In Cold Blood একদিকে যেমন ক্লাটার পরিবার হত্যা মামলা বিশ্লেষণ করে, তেমনি আমেরিকান গ্রামীণ জীবনের সমাজমনস্তত্ত্ব তুলে ধরে। The Devil in the White City শিকাগোর বিশ্বমেলা ও সিরিয়াল কিলার এইচ এইচ হোমসের সমান্তরাল চিত্র আঁকে, যা আধুনিকতা ও নৃশংসতার সহাবস্থানের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। Killers of the Flower Moon ফেডারেল বিচারব্যবস্থার প্রথম পদক্ষেপ, গোঁড়ামি, এবং জাতিগত নিপীড়নের কাহিনি।

এই সব গ্রন্থের মতোই, সুকুমার সেন বাস্তব কাহিনি নন, কিন্তু এক ঐতিহাসিক বাস্তবতার বিশ্লেষণ তুলে ধরেন—যেখানে অপরাধ সাহিত্যের অন্তর্নিহিত সমাজবীক্ষণ পাঠযোগ্য হয়ে ওঠে। Capote বা Grann যে নৃশংসতার সামনে দাঁড়িয়ে নৈতিক ভঙ্গুরতা তুলে ধরেন, সেন তা করেন সাহিত্যের অন্তরগভীরে গিয়ে, আখ্যানের বুননে।

আরও গভীর মিল রয়েছে একটি বিষয়ে—তারা সকলেই অপরাধের বাইরে গিয়ে অপরাধচেতনার উৎস অনুসন্ধান করেন। কেন মানুষ হত্যা করে? কেন অপরাধ আমাদের এতটা আকর্ষণ করে? কেন সমাজ একদিকে ন্যায়বিচার চায়, আবার অন্যদিকে অপরাধের চিত্রায়নে মুগ্ধ হয়? Capote যেমন খুনি পেরি স্মিথের শৈশব খোঁজেন, সুকুমার সেন তেমনি খোঁজেন পৌরাণিক চরিত্রদের নৈতিক পতনের কারণ।

এছাড়া John Douglas-এর Mindhunter FBI-এর ক্রিমিনাল প্রোফাইলিংয়ের জন্ম দেখায়, যেটি আধুনিক অপরাধবিজ্ঞানের ভিত্তি। অথচ সেই প্রোফাইলিংয়ের চর্চা আমরা খুঁজে পাই শার্লক হোমস বা ব্যোমকেশের পর্যবেক্ষণ-ভিত্তিক তদন্তে। Ann Rule-এর লেখা Bundy সম্পর্কিত আত্মকথা, ‘The Stranger Beside Me’, যেখানে অপরাধ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িত, সেটিও অনুরণিত হয় সেনের রবীন্দ্রনাথের বিশ্লেষণে, যেখানে ব্যক্তি ও অপরাধ একে অন্যের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।

তবে এখানেই পার্থক্যও তৈরি হয়। West-এর এই বইগুলো একক ঘটনা বা কেস স্টাডির উপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে কাহিনি ও ন্যারেটিভ উত্তেজনার হাত ধরে চলে। সেনের গ্রন্থ তার সম্পূর্ণ বিপরীত—তিনি নিরবিচারে শত শত কাহিনিকে কোলাজ করে এক মহামিছিল তৈরি করেছেন, যেখানে সময়, ভাষা, চরিত্র ও পাঠচিন্তা সমান্তরালে চলে। তিনি গোয়েন্দা সাহিত্যের ধারা ও রীতির বিশ্লেষণ করেছেন, এবং একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন—গোয়েন্দা চরিত্র আদতে কীভাবে ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করে, সমাজ কিভাবে নিজেকে অপরাধ ও ন্যায়ের দ্বন্দ্বে চিনে নিতে শেখে।

সব মিলিয়ে ‘ক্রাইম কাহিনীর কালক্রান্তি’ নিছক একটি সাহিত্যিক সমীক্ষা নয়—এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক, সমাজ-তাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিক পাঠ, যা বাংলা ভাষায় এই বিষয়ে সম্ভবত একমাত্র এবং অনন্য গ্রন্থ।

এখানে পাঠক শুধু শার্লক হোমসের কেসলগ খুঁজে পাবেন না—পাবেন ব্যোমকেশের মনস্তাত্ত্বিক জিজ্ঞাসা, রবীন্দ্রনাথের নৈতিক আলো-আঁধারির প্রশ্ন, পুরাণের প্রতিশোধচক্র, এবং আধুনিক সাহিত্যের ছায়াময় মানসিক গহ্বর। পাঠক বুঝবেন, ক্রাইম ফিকশন হলো কেবল রোমাঞ্চের নয়—এটি সভ্যতার আত্মসমীক্ষার আয়না।

সারসংক্ষেপে, 'ক্রাইম কাহিনীর কালক্রান্তি' একদিকে যেমন পাঠককে বাংলা সাহিত্যের অপরাধ ধারার বিস্তীর্ণ ইতিহাস জানায়, তেমনি অপরাধ, ন্যায়বিচার ও সমাজচেতনার গভীরে নিয়ে যায়—যেখানে সাহিত্যের ভাষা হয়ে ওঠে আত্মবিশ্লেষণের হাতিয়ার। সত্য অপরাধবিষয়ক আধুনিক নন-ফিকশন যে প্রশ্ন তোলে, সুকুমার সেন সেই প্রশ্নকে ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করেন। ফলত, বইটি শুধু গবেষণাগ্রন্থ নয়—একটি সভ্যতার আত্মজিজ্ঞাসা।

আপনি যদি ক্রাইম সাহিত্যের অনুরাগী হন, এই বই আপনার জন্যই লেখা।

অলমতি বিস্তরেণ।


Profile Image for Manas Neogi.
1 review
December 29, 2021
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ক্রাইম কাহিনির সংক্ষিপ্ত পরিচয় সহ সুকুমার সেনের প্রজ্ঞালব্ধ বিশ্লেষণ উঠে এসেছে এই বইতে৷ গোয়েন্দা বা হুনুর সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে এই বই অবশ্যপাঠ্য বলা যায় নিঃসন্দেহে৷
Displaying 1 - 2 of 2 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.