দোসাদটোলায় কয়েকঘর অচ্ছুৎ পরিবারের বাস অনেককাল ধরে। তারা ওখানকার জমিদার রঘুনাথ সিং এর জন্য জমিতে চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। অন্যকোন পেশা গ্রহণের উপায় নেই। তাদের বোঝানো হয়েছে জমিদারের কাছে তাদের কয়েক পুরুষের বিরাট ঋণ আছে। সেই ঋণ পরিশোধ এর জন্যই জমিতে খাটতে হবে। অশিক্ষিত হওয়ার দরুণ তাদের কিছুই করার থাকে না মেনে নেওয়া ছাড়া, আর যারা একটু বিদ্রোহ করে তাদের ও কড়া শাসনের মাধ্যমে দমিয়ে রাখা হয়। কিন্তু মানুষ তো জন্মগত ভাবেই স্বাধীন হতে চায়। সেরকমই এদের মধ্যে ধর্মা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে। জমিদারের কর্মচারীর কাছে জানতে চায় কত টাকা ঋণ পরিশোধ করলে তারা এর থেকে মুক্তি পাবে। বলাবাহুল্য টাকার অংকটা কম ছিলো না। তাও ধর্মা মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় এই ঋণ যেভাবেই হোক শোধ করে মুক্তির স্বাদ নিবে। সত্যিই স্বাধীনতা বড় লোভনীয় বস্তু। ওইটি পাওয়ার জন্য মানুষ কিনা করে! এই উপন্যাসে স্বাধীনতার জন্য মানুষের সংগ্রামের ও ত্যাগের বিষদ বর্ণনা আছে।
Prafulla Roy was a Bengali author, lived in West Bengal, India. He received Bankim Puraskar and Sahitya Akademi Award for his literary contribution in Bengali.
প্রত্যাশা ছিলো না বাড়তি। বিসাকের লাইব্রেরি থেকে মোটামুটি দৈবচয়ন পদ্ধতিতে বইটা নিলাম এবং পড়ে চমৎকৃত হলাম। নিম্নবর্গের মানুষ নিয়ে উপন্যাস লেখা বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ। আবেগ ও মানবিকতার প্রাবল্য অনেক সময় লেখাটিকে জোলো আর সস্তা করে তোলে, এদিকে প্রফুল্ল রায়ের লেখাতেও নাটকীয়তার কমতি থাকে না। তাই পড়া শুরু করে ভয়ই পেয়েছিলাম উল্টো। আনন্দের বিষয়, লেখক অতিনাটকীয়তার ঝোঁক এড়িয়ে নির্মোহভাবে ভূমিদাস ধর্মা-কুশীদের দুর্বিষহ জীবন, প্রত্যহের নির্মম অভিজ্ঞতা, স্বপ্ন- স্বপ্নভঙ্গ, ভোটের রাজনীতি ও সমাজ বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।শেষে একটু তাড়াহুড়ো হয়ে গেলো, অনেক ঘটনা ঘটে গেলো অতি দ্রুত।তারপরও ভালো লাগলো সবটা মিলিয়ে। সত্যিকার অর্থে, এই প্রথম প্রফুল্ল রায়ের সৃজনশীল রচনা পড়ে মনে হলো,তার অন্যান্য বইও পড়া দরকার।
"এখন, এই জষ্ঠি মাসের এই বিকেলে গোটা আকাশ জুড়ে গলা কাঁসার রং ধরে আছে" – আকাশের নীচে মানুষ বইয়ের প্রথম লাইন পড়ে ঠিক করে ফেলেছিলাম এই বইটা আমি পড়ব। আগে প্রফুল্ল রায়ের কোনো বই পড়া হয়নি। তবে পরবর্তীতে অবশ্যই পড়া হবে।
বিহারের ছোটনাগপুর রেঞ্জ বইটির পটভূমি। পৃথিবী অনেক এগিয়ে গেলেও প্রত্যন্ত এই অঞ্চলে জমিদারিপ্রথা চলছে বহাল তবিয়তে। এখনও আছে ভূমিদাসপ্রথা। বংশানুক্রমে কয়েক জেনারেশন ধরে গ্রামসুদ্ধ মানুষ রঘুনাথ সিং-এর জমি চষে সোনালী ধান, তিল-তিসিসহ বিভিন্ন ফসল ফলায়। বিনিময়ে প্রাচীন গুহার মতো মাটির ঘর, দুদিন পর পর অখাদ্য খাবার, আর বছরে দুটো করে কাপড়।
এই সমাজের মানুষদের জীবনের অমোঘ নিয়ম হলো জীবনভর খেটে যাওয়া এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একই জীবন রেখে যাওয়া। চিরাচরিত এই নিয়মের বাইরে চাঞ্চল্যকর কিছু ঘটনা এ গ্রামে ঘটতে শুরু করে যখন রঘুনাথ সিং নির্বাচনে দাঁড়ান। ভূমিদাস ধর্মা, কুশী, গনেরি এবং তাদের গ্রামের সকলে ভাবতে বাধ্য হয়, তাদের জীবনেও কি পরিবর্তন আসা সম্ভব?
প্রত্যেকটি চরিত্র, প্রকৃতি আর ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা আছে এই উপন্যাসে। লেখার মধ্যে কিছুটা নাটকীয়তাও লক্ষ্য করেছি, তবে তা পরিমিত। ডায়লগ বেশির ভাগ হিন্দিতে লেখা, সম্ভবত বিহারের বাস্তবতা ফুটিয়ে তোলার জন্য। কিন্তু এজন্য পড়ার গতি একটু কমে যায়। আমার মনে হচ্ছিল উপন্যাসটা যেহেতু বাংলায়, কথাগুলোও বাংলায়ই হতে পারত। কিন্তু গল্প এত সুন্দর যে মুগ্ধ হয়ে পড়েছি।
বইটির মূল চরিত্র ধর্মা আর কুশী। 'অচ্ছুৎ' এই দুই মানব-মানবীর স্বপ্ন নিজেদের স্বাধীনতা কিনে নেবার। সেজন্য সারাদিন হাড় কালি করা খাটুনির পরেও জেগে থাকে তারা। খুঁজে বেড়ায় মুক্তির পথ। এদের দুজনের মধ্যে কথোপকথন তেমন নেই। শুধু জ্যোৎস্নায় তাদের হেঁটে যাওয়া বা পাশাপাশি ঘরে নির্ঘুম শুয়ে থাকার বর্ণনা তীরের মতো বিঁধে।
নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনার পাশাপাশি জাতবিভেদ, ভূমিদাসের জীবনেও পুরুষদের তুলনায় নারীদের ওপর অতিরিক্ত নিপীড়ন, ব্যক্তিস্বার্থে মানুষকে বলি দেওয়া, নিরক্ষরতার সুযোগ নেওয়া – এসবসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাবটেক্সট আছে বইটিতে, যা গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
একই আকাশের নীচে সব মানুষ বেঁচে থাকে, কিন্তু কি বিশাল ব্যবধান মানুষের সাথে মানুষের। কেউ উড়ে ডানা মেলে আর কারো হাত-পা-মুখ সব বান্ধা, দুইয়ের মধ্যে ফারাক বেড়েই যাচ্ছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে।
দোসাদটোলায় কয়েকঘর অচ্ছুৎ পরিবারের বাস অনেককাল ধরে। তারা ওখানকার জমিদার রঘুনাথ সিং এর জন্য জমিতে চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। অন্যকোন পেশা গ্রহণের উপায় নেই। তাদের বোঝানো হয়েছে জমিদারের কাছে তাদের কয়েক পুরুষের বিরাট ঋণ আছে। সেই ঋণ পরিশোধ এর জন্যই জমিতে খাটতে হবে। অশিক্ষিত হওয়ার দরুণ তাদের কিছুই করার থাকে না মেনে নেওয়া ছাড়া, আর যারা একটু বিদ্রোহ করে তাদের ও কড়া শাসনের মাধ্যমে দমিয়ে রাখা হয়। কিন্তু মানুষ তো জন্মগত ভাবেই স্বাধীন হতে চায়। সেরকমই এদের মধ্যে ধর্মা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে। জমিদারের কর্মচারীর কাছে জানতে চায় কত টাকা ঋণ পরিশোধ করলে তারা এর থেকে মুক্তি পাবে। বলাবাহুল্য টাকার অংকটা কম ছিলো না। তাও ধর্মা মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় এই ঋণ যেভাবেই হোক শোধ করে মুক্তির স্বাদ নিবে। সত্যিই স্বাধীনতা বড় লোভনীয় বস্তু। ওইটি পাওয়ার জন্য মানুষ কিনা করে! এই উপন্যাসে স্বাধীনতার জন্য মানুষের সংগ্রামের ও ত্যাগের বিষদ বর্ণনা আছে।