[স্পয়লার রিভিউ]
এই বইটির কোনো কাহিনি সংক্ষেপ আলোচনা করছি না। পাঠ প্রতিক্রিয়ার আলোচনার ফাঁকে মূল গল্প নিয়ে আলোচনা থাকবে। শুরুটা শেষ দিয়ে করি।
"দ্য লুসিফার কোড" নামটি শুনলেই হয়তো ধারণা করা যায়, বইটি সম্ভবত শয়তান না এর উপাসনা জাতীয় কিছু একটা হবে। এই গল্পেও একজন লুসিফার আছে। কিন্তু কে সে? সে যেই হোক, গল্পের শেষে লেখক তাকে উন্মুক্ত করেন। ভালো কথা! টুইস্ট দেওয়ার জন্য হয়তো শেষ পর্যন্ত রেখে দিয়েছিলেন। কিন্তু যেভাবে শেষ করলেন, সেটা পড়ে কী অনুভূতি প্রকাশ করা উচিত ঠিক বুঝতে পারছি না। থ্রিলার গল্পে এভাবে হস্যকর উপস্থাপন কীভাবে করা যায় বুঝে উঠতে পারিনি। লুসিফার মানুষ হোক বা যেই হোক, তার একটি ক্ষমতা থাকা স্বাভাবিক। পৃথিবীর উপর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার ইচ্ছে থাকবে অবশ্যই। এখানেও ছিল। কিন্তু তার আদৌ কোনো ক্ষমতা ছিল কি না এটা একটা প্রশ্ন। সেটাও না থাকুক, কিন্তু যেভাবে তাকে উধাও করে দেওয়া হলো, এই বিষয়টা এখনো হজম হচ্ছে না। এটা থ্রিলার, না অতিপ্রাকৃত গল্প? গাঁজাখুরি সমাপ্তি দেখে পুরো মেজাজটাই খারাপ হয়ে গিয়েছে। সবকিছু এর সহজে শেষ?
এত কিছু করার পর, যুদ্ধ করার পর; প্রভাবশালী একজন ব্যক্তি হওয়ার পর একজন প্রফেসরের কাছে এভাবে সহজে নাস্তানাবুদ হওয়া আমার কাছে বালখিল্য ঘটনা মনে হয়েছে। মনে হয়েছে লেখক তার মূল চরিত্রগুলোকে অতিমানবীয় হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। শত্রুপক্ষের এর আক্রমণের পরও সব জায়গা থেকে সহজেই বেঁচে ফেরা একটু বেশি বাড়াবাড়ি। বিশেষ করে যখন সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে তারা পালাচ্ছিল। খুব সহজে গোপন দরজা খুঁজে পেয়ে পালিয়ে যাওয়া একটু বেশি অতিরঞ্জিত ছিল।
এখানে আরেকটি বিষয় আলোচনা করা দরকার। যেহেতু শুরু থেকেই আক্রমণের খেলা শুরু, মাঝের একটা ঘটনা বলছি। ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর লর্ডকে আক্রমণ করে সিআইএ এজেন্টদের একটি দল। সেখান থেকে ভাগ্যক্রমে পালিয়ে যায় ওরা। পরে যখন গুহার মধ্যে তারা তাদের লক্ষ্য খুঁজে বেড়ায় তখন কোনো না কোনোভাবে তাদের ট্র্যাক করে সেখানে চলে আসে সিআইএ এজেন্টরা। কিন্তু কীভাবে? কোন পদ্ধতিতে ট্র্যাক করা হয়েছিল? সেই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। অথচ সেই গুহার সুড়ঙ্গ পথ থেকে তারা যখন পালিয়ে যায়, তাদের আর খোঁজ পায় না। তাহলে তাদের সেই ট্র্যাক করার পদ্ধতি কোথায় হারিয়ে গেল?
এবার শুরুর দিকে আসি। প্রফেসর লর্ডসকে অপ হরণ দিয়ে শুরু। তাকে কেউ অপ হরণ করা হয়েছিল, এই ঘটনা বুঝতেই বা লেখকের ব্যাখ্যা করতেই পঞ্চাশ পৃষ্ঠার মতো লেগে গিয়েছিল। পরে বুঝতে পারলাম একটি ভাষার সমাধান করতে প্রফেসরকে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেই ভাষায় কী আছে, কেন এত গুরুত্বপূর্ণ তখনও বুঝিনি। সে যাই হোক, সেখানে পরে যুদ্ধ, আক্রমণ, পালিয়ে যাওয়া শেষে প্রফেসর নিজ হোটেলে ফিরে আসেন। কিন্তু যারা শুরুতে একটি ভাষার সমাধানের জন্য লেখককে অপ হরণ করেছিল, সেই ভাষার বই নিয়ে পালিয়ে এসেছিলেন লর্ডস। তাহলে তারা কোথায় উধাও হলো? সেই বইটি যদি তাদের কাছে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়, সেটি হারিয়ে যাওয়ার পর তাদের প্রফেসর ও তার দলকে ধাওয়া করে উচিত ছিল না? পরের পুরো কাহিনিতে তাদের কোনো অস্তিত্বই নেই।
শুরুতে আরও একটি গোঁজামিল দিয়েছেন লেখক। লর্ডসকে যখন অপ হরণ করা হয়, তখন আরও তিনজন প্রফেসরের উপর হামলা করে। ওরা কারা? জানা যায় সিআইএ থেকে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল শুধু জানতে যে বইটি প্রফেসরের কাছে আছে কি না। কিন্তু বলা হয় বইটি কোনোদিন ইস্তাম্বুলের বাইরে যায়নি। আর প্রফেসর মাত্রই ইস্তাম্বুলে এসেছেন। তাহলে কেন আগেই প্রফেসরকে ধাওয়া করা? অপ হরণ কারীদের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর প্রফেসরকে তুরস্ক পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদে বই সম্পর্কে লর্ডস কিছুই বলেননি। কিন্তু পাশের রুমে একজন সিআইএ অফিসার ঠিকই বই হাতে নিয়ে বসে ছিলেন পুলিশের সামনেই। তখন প্রশ্ন উঠেনি? পুলিশ যখন কাউকে ধরে তার ব্যাগ সার্চ করে দেখাটা স্বাভাবিক। এখানে তেমন কিছু ঘটেনি? আবার সেই সিআইএ অফিসার বই হাতে পেয়েই প্রফেসরকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। যদি তাদের কাছে বইটা এতই মূল্যবান হয়, তাহলে ফিরিয়ে দিবে কেন? ফিরিয়ে দিয়ে আবার এই বইটা পাওয়ার জন্য অন্য জায়গায় হামলা চালানো হবে কেন? এ কোন থিওরি লেখক উপস্থাপন করেছেন?
বইটির একাংশে সৌদি আরবের কথা বলা হয়েছে। শিয়া, সুন্নির বিরোধ যেখানে প্রধান। এখানে ঢুকে গিয়েছে বিশ্ব রাজনীতি। কেননা যুদ্ধ শুরু হলে তেলের দামের উপর প্রভাব পড়বে। তবে এই ঘটনার উপর অন্য কারো হাত আছে কি না এটাই প্রশ্ন। সৌদি আরবের সেই ঘটনা মূল অংশের সাথে কীভাবে ফিট হয় আমি বুঝিনি। মনে হয়েছে বইটিকে আরও আকর্ষণীয় করতে লেখক এমন ঘটনাগুলোর অবতারণা করেছেন। এখানে লেখক একটি ভুল তথ্য দিয়েছেন। বলেছেন মহানবী (সা) এর আবির্ভাবের পর শিয়া-সুন্নির বিরোধ। এটা হবে মহানবী (সা) এর ওফাতের পর। তবে এই অংশ আসলেই বাড়তি মনে হয়েছে। সবচেয়ে বিরক্ত লেগেছে এখানে যুদ্ধ হচ্ছে, আর চরিত্রগুলো কথা বলে যাচ্ছে। লেখক মূল ঘটনার চেয়ে সংলাপে জোর দিয়েছিলেন, আমার বিরক্তির অন্যতম কারণ ছিল এটি।
এবার আসি মূল অংশে। বইটিকে দ্য ভিঞ্চি কোডের সাথে তুলনা করে প্রচার করা হয়েছিল। অথচ ভিঞ্চি কোডের এক অংশও না বইটি। ভিঞ্চি কোড বুদ্ধির খেলা। যুক্তি তর্কে এগিয়ে যাওয়া। কোড ভেঙে রহস্য সমাধান যেখানে মূল লক্ষ্য। এখানে একটি বই আছে, ভাষা সংক্রান্ত বিষয় আছে; সেহেতু ভাষার কোড ভাঙা এখানে মূল আকর্ষণ হবে ধরেই নেওয়া যায়। কিন্তু কীভাবে? প্রফেসর সব কোড ভেঙেছেন বলেই দাবি করেছেন, সব ভাষা বুঝেছেন। কিন্তু কীভাবে তার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। আমার মনে হয় লেখক কোড বা ভাষা নিয়ে নিজেই কাজ করেননি। তাই পাঠককে জানাতেও অপারগ ছিলেন। খুবই হতাশাজনক। শুধু দুয়েকটা তথ্য, ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করলেই দারুণ কিছু হয়ে যায় না। উপস্থাপন আর এর গভীরে যাওয়াটাও জরুরি। যেভাবে দ্য ভিঞ্চি কোডের সাথে তুলনা করে প্রচার করা হয়েছে, এটা অপপ্রচার ছাড়া কিছুই না।
আরও অসংখ্য ভুলত্রুটি ছিল বইয়ে। যেমন একজন খুব সহজেই সরকারি ওয়েবসাইট, সিসি ক্যামেরার অ্যাকসেস নিচ্ছিল ব্যাপারটা অতিরঞ্জিত লেগেছে। এছাড়া শুরুর দিকের আক্রমণ, হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়ে যাওয়া, কে মারা যাচ্ছে আর কে বেঁচে যাচ্ছে সেই বোঝাটাও কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। এখানে লেখকের বর্ণনার দুর্বলতা অনেকাংশে দায়ী। আরো অসংখ্য ছোটখাটো ভুলত্রুটি ছিল, যেগুলো নিয়ে লিখতে গেলে একটা বই লিখে ফেলতে পারব! তাই বেশিকিছু আর বলছি না।
▪️অনুবাদ প্রসঙ্গ :
আমি মনে করি একজন অনুবাদক যখন অনুবাদ করেন, তখন তার সাহিত্য জ্ঞান থাকাটা জরুরি। ভাষাশৈলী, বাক্যগঠন, শব্দচয়ন - সবকিছুতেই জ্ঞান থাকা লাগে। এই বইয়ে কোনো কিছুই ছিল না। ভুল শব্দচয়ন যেমন ছিল, বাক্য গঠনেও অসঙ্গতি ছিল অনেক। অনেকক্ষেত্রে দুইবার পড়ার পর বুঝতে হয়েছে আসলে কী বোঝানো হয়েছে। সবচেয়ে যে বিষয়টি খারাপ লেগেছে, কিছু শব্দ অনুবাদক ইংরেজি হরফেই লিখেছেন। হোটেলের নাম, জায়গায় নাম, খাবারের নাম, পোশাকের নাম, বইয়ের নামগুলো কেন ইংরেজিতেই লেখা হয়েছে বোধগম্য হয়নি। বাংলাতে লিখলেই বেশি ভালো হতো। সবচেয়ে ভালো হতো কিছু বিষয়ের ফুটনোট লিখে দিলে।
▪️সম্পাদনা ও প্রোডাকশন :
কথায় আছে, "First impression is the best impression". একটি প্রকাশনী তাদের প্রথম বই বের করছে, সেই প্রথম বইতেই তাদের উচিত ছিল পাঠককে আকৃষ্ট করা। সেই কাজে ব্যর্থ হয়েছে প্রকাশনী। খুবই হতাশাজনক বিষয়। কনটেন্ট বাছাই যে মান সম্মত ছিল না, সেটা তো উপরের আলোচনাতে বোঝা যায়। তাও যদি সম্পাদনা ঠিকঠাক হতো। এমন যাচ্ছেতাই সম্পাদনা ভীষণ রকমের মর্মাহত করেছে।
অনুবাদের ভুলত্রুটির অনেকাংশ প্রকাশনীর উপর বর্তায়। প্রকাশনীর উচিত ছিল সম্পাদনায় জোর দেওয়া। অনভিজ্ঞ কেউ অনুবাদ করলে একটু ভালো সম্পাদনা প্রত্যাশিত। অবশ্য এই বইয়ের সম্পাদনা হয়েছে কি না এটাও এক সন্দেহ। মনে হয়েছে অনুবাদক যে ফাইল দিয়েছে, সেটাই ছাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রচুর পরিমাণে বানান ভুল। কিছু জায়গায় ছাপার ভুল হিসেবে ধরে নিতে চাচ্ছিলাম, কিন্তু একই নানান সব জায়গায় যদি ভুল থাকে তাহলে সেটা বানান না জানার অজ্ঞতা ��্রকাশ পায়। চন্দ্রবিন্দু আছে এমন বানানের প্রায় ৯৫% বানানে চন্দ্রবিন্দু ছিল না।
এছাড়া বাক্য গঠনে অসঙ্গতির কথা তো বলেছি। শব্দের মধ্যে অক্ষর উধাও, কোনো কোনো বাক্যে শব্দ উধাও! কোথাও স্পেস বেশি, যতিচিহ্ন নেই, ইনভার্টেড কমা আলাদা; পুরোটাই যাচ্ছেতাই অবস্থা। যেন টাকার শ্রাদ্ধ ছাড়া কিছুই না। প্রথম বইয়ে যে প্রকাশনী এমন কান্ড করতে পারে তাদের পরবর্তী বই কেনার সময় দ্বিতীয়বার ভাবতে হবে বৈ কি!
প্রোডাকশন কোয়ালিটিও ভালো না। দুই পৃষ্ঠা পড়ার পর প্রথম ফর্মা হাতে খুলে এসেছে। মাঝের দুই ফর্মা খুলবে খুলবে করছে। এত দুর্বল বাঁধাই! কেবল প্রচ্ছদটাই জোস। এছাড়া কিছুই না।
▪️পরিশেষে, কী বলব? থাক! অনেক কিছু বলে ফেলেছি। শুধু পুরস্কারে বইটি নিয়েছিলাম বলে টাকার মায়ায় হাহাকার করতে পারছি না। তবে আরও ভালো বই নিতে পারতাম, এই আফসোস থেকেই যাবে।
▪️বই : দ্য লুসিফার কোড
▪️লেখক : চার্লস ব্রোকাও
▪️অনুবাদক : নিজাম উদ্দিন আপু
▪️প্রকাশনী : অধ্যায় প্রকাশনী
▪️পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৩২০
▪️মুদ্রিত মূল্য : ৫৬০ টাকা
▪️ ব্যক্তিগত রেটিং : ১/৫