বাঙালির অজন্তা-ইলোরা প্রেম বরাবরেই মনে হয়। না, খেয়ালের ঝোঁকে বলছি না। ৫ বছরে অন্তত ৪ বার গিয়ে, মারাঠি ভীড়ের পর বাঙালি-ই চোখে পড়েছে বেশি। অজন্তায় অন্তত একটি পরিবার তো পেয়েই যাবেন, যাঁরা নারায়ণ সান্যালের অজন্তা-অপরূপা হাতে আসবেন। কিন্তু ইলোরায়? গুহামন্দিরের থেকে বেশি, এখন ভগ্নাবশেষই বলা যথাযত। ক্রমাগত দালান, মূর্তি, ভেঙে ভেঙে গুহাপথ বন্ধ করে দিচ্ছে। তাঁরই মাঝে, শেষ বার দেখে এলাম, কয়েক বীরপুরুষ "tiktok"-এ video বানাচ্ছেন। জনসমাগমের খামতি নেই।
তা, অজন্তা ইলোরার ব্যাপারে বইও আজকাল তেমন দরকার পরে না। wikipedia-page যথেষ্ট তথ্যসমৃদ্ধ। চিত্র, বর্ণনা, ইতিহাস, ভূগোল, সবকিছুরই ধারাবিবরণী পেয়ে যাবেন। তারপর, ticket counter-এ, ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ(ASI) - এর ৪০ টাকার ছাড় পাওয়া ১০০ পাতার সুন্দর বাঁধাইয়ের সুচিত্রিত বইও পেয়ে যাবেন। এরপরেও, গাইডরা তো আছেনই। আওরংজেব কিভাবে হাতির শুঁড় ভাঙলেন, বা রাজা/রানী ইলা কি করে ইলাপুরের শৈবমন্দির বানানোর শপথ গ্রহণ করলেন, কিংবা "পার্বতী" কে দেখিয়ে তাঁকে নেহাত গঙ্গারূপে নতুন করে চিনতে আপনাকে এদের সাহায্য ও সময় - দুটিই মূল্য দিয়ে কিনতেই হবে। এই কথাগুলি একই ভাবে অজন্তার ক্ষেত্রেও খাটে।
এখানে বলে রাখি - নারায়ণ সান্যালের লেখা অজন্তা অপরূপা-র গ্রন্থটি যে কোনো স্থাপত্যশৈলীর বর্ণনায় একমোবাদ্বিতীয়ম। অজন্তার ভৌগোলিক স্থান, তাঁর ফেলে আসা অতীত, প্রতিটি গুহার বর্ণনায় এসে মিশেছে লেখকের কলমসমৃদ্ধ গুহাচিত্রগুলির সম্পূর্ণ বিস্তার ও সংশ্লিষ্ট জাতক কথামালার পুনর্নির্মাণ- যেগুলি ছাড়া পর্যটক-পাঠকের কাছে, গুহাচিত্রগুলি আধশুষ্ক ক্ষয়ে যাওয়া অতীতের জলরং এর বেশি কিছু মনে হবে না। এর সাথে রয়েছে লেখকের নিজের sketch করা জাতক ও গুহার blueprint। এই বইটির সাথে সান্যাল মশায়ের কলিঙ্গ ও আগ্রা বিষয়ক বইগুলিও অপূর্ব চিত্র ও বর্ণনার জন্যে জনপ্রিয়। (আমরা অজন্তা-ইলোরা এক নিশ্বাসেই বলি। তাই এই বইটির কথা এখানে না বলে পারা গেলো না।)
আমাদের আলোচ্য বই "ইলোরা- প্রত্ন ও শিল্প"র মুখবন্ধে, লেখক প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত "সূত্রপাত" এ লিখেছেন, সপ্তম শ্রেণীতে অধ্যায়নকালে প্রথমবার ইলোরা গুহাভ্রমণের কথা। তারপর, তিনি জানাচ্ছেন - চার দশকের মধ্যে, বাংলায় ইলোরা নিয়ে লেখার সংখ্যা - শুন্য। তাঁর এই বই, তিনি এই আফসোস দিয়েই শুরু করেছেন, কিন্তু সাথে আশাও রেখেছেন যে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁর এই প্রচেষ্টার দেশলাই বা মোমাগ্নির আলো-কে searchlight-এ পরিণত করবে।
গান শেষ। আসুন এবার ধান ভাঙা যাক।
২০১৬র মুদ্রিত পত্রলেখা-র এই বইটিতে, পাঠকের সম্মুখে একটির পর আরেকটি অপূর্ব স্তর সুন্দর ভাবে উন্মোচন করেছেন লেখক। মুখবন্ধের পর, প্রথম অধ্যায়ে আমরা ভারতীয় উপমহাদেশের শিলাখন্ডে-ক্ষুদিত-স্থাপত্যের সংক্ষিপ্ত আলোচনা, ও তাঁর মাঝে ইলোরা ঠিক কোন সময়-স্থান অধিকার করে আছে, তার বর্ণনা পাই। দ্বিতীয় অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে ইলোরার ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট - নানান শাসনকর্তার কালে ইলোরার উল্লেখ। ইলোরার শৈবতীর্থ হিসেবে পরিচয় ও ক্রমান্বিত ইতিহাস, ও এর বৌদ্ধগুহা-গুলিতে তান্ত্রিকতার ইঙ্গিত তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়ের বিষয়। এর সাথে - জৈন গুহাগুলির একটি ছোট্ট আলোচনা আশা করছিলাম। তাহলে তিনরকমই গুহার একটা ছোট ভূমিকা পাওয়া যেত আরকি। কিন্তু জৈন গুহাগুলি সংখ্যায় কম। তাই হয়ত একেবারে পরের দিকেই তাতে হাত লাগিয়েছেন লেখক। পঞ্চম অধ্যায়টি গুরুত্ত্বপূর্ণ এবং অতি-উপভোগ্য। সময়ের স্রোতের ঠিক উল্টো-দিকে হেঁটে, এখানে আপনি খোঁজ পাবেন ইতিহাসের সেই চরিত্রদের- যাদের কথায় ও লেখায় উল্লেখিত হয়েছে ইলোরা। পন্ডিত ধর্মানন্দ কোসাম্বি, বাগদাদের অল মাসুদি, গুজরাটের মহানুভব সম্প্রদায়ের শ্রীচক্রধরস্বামী, আলাউদ্দিন খিলজি, মালিক কাফুর, মাহমুদ বিন তুঘলক, পারস্য অধিবাসী মোহাম্মদ কাশিম হিন্দু শাহ, দেবল রানী, কুতুবুদ্দিন মুবারক শাহ, বাহমানি সুলতান আলী-আল-দীন-আহসান, আহমদনগরের শাসক - বুরহান নিজাম শাহ, বিজাপুর সুলতান - আলী আদিম শাহ, মুঘলসম্রাট আওরঙ্গজেব ও তার রাজত্বের ইতিবৃত্ত রচয়িতা সাকি মুস্তাদ খান, মালিক অম্বর, ইলোরায় আসা প্রথম ইউরোপীয় - জঁ দে থেভেন্ঞ, ভেনিশিও পর্যটক নিকোলাও মানুচ্চি, ও এরপর বিভিন্ন ইংরেজ ও ভারতীয় দিক্পালদের উত্তরসূরিদের অপূর্ব বর্ণচ্ছটায় এই অধ্যায়টি সময়ের বয়ে চলা ছায়াছবি দেখাবে আপনাকে, যা শেষ হয়েছে ভারতলোকমাতা নিবেদিতার আখ্যানে। অধ্যায়টির নাম - "গন্তব্য ইলোরা"।
ষষ্ঠ অধ্যায়টি ইলোরার স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে কি কি শৈলী ও রীতি পালিত হয়েছে, এবং এর বৈশিষ্টতার একটি চিত্রিত আলোচনা। এই অধ্যায়টি আমাদের একদিকে যেমনি সিংহদ্বার তেমনি আবার মশাল-ও বটে, যা দিয়ে বাকি গুহাকাহিনীগুলির কুয়াশাচ্ছন্ন তিমির আলোকিত করেছেন লেখক। অষ্টম অধ্যায়ে পাই আধুনিক ইলোরার সংক্ষিপ্ত ঠিকানা ও স্থান-বৈশিষ্ট। নবম অধ্যায়টি আরেকটি ভিন্ন স্বাদের অভিব্যক্তি - বাংলা সাহিত্যে ইলোরা। অবশ্যই পাঠ্য। দশম অধ্যায়ে এই বই শেষ - 'পর্যটকের ইলোরায়' লেখক এখানে থাকার ও আশেপাশের নানান জায়গার বর্ণনা দিয়েছেন।
সপ্তম অধ্যায়, বইটির মুখ্য উপজীব্য। ৩৪টি গুহাসমূহের বর্ণনায় সমৃদ্ধ ১৪৪টি পাতায় উঠে এসেছে অতিবাহিত কাল, প্রাচীর ও স্তম্ভ, মুকুট ও কন্ঠাভরণ, কলস ও বিমান, অভঙ্গ-ত্রিভঙ্গ-ধর্মচক্রপরিবর্তন-অতিভঙ্গ, রামায়ণ-পুরাণ-মহাভারত-বুদ্ধচরিত-জৈন আগম, বাকাটক-কালচুরি-রাষ্ট্রকূট-শতবাহন, হিন্দু-বৌদ্ধ-জৈন-ধর্মাচরণের সহিষ্ণুতা - প্রতিটি গুহার দর্পণবর্জিত অন্ধকারাছন্ন কানাগলির আলোকিত সূক্ষ্ম বিবরণ। এই অধ্যায়টিই আকর গ্রন্থ। কিন্তু এতো কষ্ট-সত্ত্বেও, গুহাবিবরণীর পাঠ কিছুকাল করেই ক্লান্তিকর হয়ে উঠতে পারে। কারণ, উল্লেখিত কথামালার সাথে, চিত্র-অন্বেষণে, আপনাকে পাতা উল্টে দেখতে হবে, শেষের ৪০ পৃষ্ঠার চিত্রাবলী - যা খুব একটা স্পষ্ট নয়। ভালো হতো, যদি গুহা বা বর্ণিত স্থাপত্যের কিছু স্কেচ, বর্ণিত গুহাবিবরনীর সাথেই একই পৃষ্ঠায় আবদ্ধ করা যেত।
প্রত্ন ও শিল্পবর্ণনার মাঝে, স্থাপত্য কাহিনী ও বর্ণিত ঘটনাবলী যেমনি - রাবণানুগ্রহ, মার্কণ্ডেয়উদ্ধার, লিঙ্গদভব, ত্রিপুরান্তক, অন্ধকাসুরসংহার, বজ্রপানি-পদ্মপানি, ধর্মপরিবর্তন-মেদিনীস্পর্শমুদ্রা, পার্শ্বনাথ-আদিনাথ-বাহুবলি ও আরো বহু ঘটনার বিশদে বিবরণ নেই, তাই আগে থেকে এদের ব্যাপারে না জানা থাকলে, রস-আস্বাদনে ঘাটতি পড়তে পারে। কারণ, নামোল্লেখেই পাঠক চিনতে না পারলে, পেছনের ছবি যথেষ্ট নয়, অজানা পাঠকের মননে সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরতে। পরের মুদ্রণে, এই ছোট ছোট বিষয়গুলি খেয়াল রেখে বইটি পরিমার্জিত করা যেতে পারে।
বইশেষে অভিধান ও গ্রন্থপঞ্জি রয়েছে, পাঠকের ভুলে যাওয়া শব্দ আহরণ, ও বাড়তি-ক্ষুদার আহার অনুসন্ধান সাহায্যার্থে।
লেখক ও প্রকাশক দুজনকেই বহুল সাধুবাদ জানাই, ইলোরা নিয়ে এই বিষদবর্ণিত বইটি ছাপিয়ে, বাংলা ভাষায় একটি ব্যাপক শূন্যস্থান পূরণ করতে।