‘মহাভারতের “মরাল” কী সেটা ভেবেও বিচলিত হলাম। ... যা আছে তা কেবল সুবিধাবাদীর সুবিধাভোগ।’
লেখিকার মতে সত্যবতী কুটিলা, কুন্তী স্বৈরিণী, কৃষ্ণ দুর্নীতিপরায়ণ, বিদুর কুচক্রী এবং যুধিষ্ঠির সাম্রাজ্যলোভী - এতটা ভদ্রভাবে তিনি বলেননি যদিও; দুর্যোধন পরম প্রজাবৎসল ও নীতিবান, দুঃশাষন তাঁর সুযোগ্য সহায়ক, কর্ণ সর্বশ্রেষ্ঠ বীর, জরাসন্ধ – শিশুপাল ন্যয়বান, ধার্মিক রাজা; ভীষ্ম ‘সত্যবতী’লোলুপ অবধ্য যোদ্ধা, দ্রোণ সুযোগ্য আচার্য, অশ্বত্থামা উত্তম বীর, ধৃতরাষ্ট্র বিদুরস্নেহে অন্ধ, ব্যাস ঋষি বা ব্রক্ষ্মচারীর নামে কলঙ্ক ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। মোটকথা কুন্তী আর বিদুর মিলে সুপরিকল্পিতভাবে পাণ্ডু আর মাদ্রীকে হত্যা করে পুর্বোক্ত দু’জনের ঔরসে জন্মানো পাহাড়ী বুনো অসভ্য অবৈধ অক্ষত্রিয় পঞ্চপুত্রকে হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসিয়ে উৎকৃষ্ট ক্ষত্রিয় জাতিকে বিনাশ করে অপেক্ষাকৃত শুদ্র এবং নিকৃষ্ট জাত’কে প্রতিষ্ঠা করার এক অধর্মের কথাই ব্যাসদেব তাঁর নিজ গ্রন্থে ‘ধর্ম’ বলে চালিয়ে দিয়েছেন আর এতকাল মানুষ সেটাই বিশ্বাস করে এদের পূজো করছেন। একমাত্র লেখিকাই এই ধোঁকাটা টের পেয়েছেন – সত্য সেলুকাস!
আর তাই লেখিকা তাঁর বইতে শকুনি চরিত্র, জয়দ্রথের চরিত্র সম্পর্কে নীরব থেকেছেন; নীরব থেকেছেন অভিমন্যু হত্যা, মদ্ররাজের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা; এড়িয়ে গেছেন পাশা খেলায় কৌরব ও অন্যান্যদের পাশবিকতা’র ব্যাপারে, হাল্কা করে বললেও মূলত যুধিষ্ঠিরকে দায়ী করে কর্তব্য সমাপন করেছেন; নীরব থেকেছেন ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রান্ধতা, দুর্যোধনের প্রজাপীড়ন সম্পর্কে; অন্যায়ভাবে বিরাট রাজ্য আক্রমণ ও গো-ধন লুন্ঠন সম্পর্কে; নীরব থেকেছেন পাণ্ডব চরিত্রের স্বকীয়তা, কৃষ্ণের শৌর্যতা সম্পর্কে। বদলে বারবার অত্যন্ত দৃষ্টিকটুভাবে বিদুর, যুধিষ্ঠির, কুন্তী, কৃষ্ণকে আক্রমণ করে গেছেন।
আবেগের বশে মিথ্যাকে সত্য বলে মনে হলে, তাকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে অহেতুক আক্রমণ করা ছাড়া, অত্যন্ত নিন্দনীয়ভাবে কলঙ্ক আরোপ করা ছাড়া মতপ্রতিষ্ঠার অন্য কোন পথ থাকে না। এটা একটা শিশুও বুঝতে পারে, লেখিকা পারেন নি। আর পারেন নি বলেই তিনি শুধুমাত্র কালীপ্রসন্ন সিংহ আর রাজশেখর বসু’র মহাভারত পড়ে যা বোঝার বুঝে নিলেন।
সবশেষে বইটা বন্ধ করার সময় ‘প্রাক্কথন’ চোখে পড়ল। উনি লিখছেন, “ঊনত্রিশ বছর আশিতে পৌছেও যখন মহাভারত বিষয়ে একই বিভ্রান্তিতে পীড়িত হতে লাগলো, তখন নিজের মতটুকু লিপিবদ্ধ করাই সংগত মনে করলাম।”
বিভ্রান্তি হলে তো এমন বই-ই বের হয়। তাই না? মহাভারতের ঘটনার পাশাপাশি যদি ‘বিদুর নীতি’, ‘শান্তিপর্ব’, শ্রীমদ্ভাগবদগীতা’, কণিক নীতি, দুর্যোধন-যক্ষ সংবাদ ভাল করে স্টাডি করতেন তাহলে চরিত্রগুলো সম্পর্কে আরোও সুষ্পষ্ট ধারণা হত। সেইসাথে এ’কথাও বলতে পারি, যদি উনি আরেকটু গভীরে গিয়ে পড়াশোনা করতেন, তাহলে অনেক সুসঙ্ঘবদ্ধভাবে ওনার মত প্রতিষ্ঠা করতে হয়তোবা পারতেনও, কিম্বা সত্য উপলব্ধি করতে পারতেন। দুটোর পথ বন্ধ করে মাঝখান থেকে এই মহারণ্যের কোন চোরাবালিতে ডুবে গিয়ে যে হাত-পা ছুড়লেন, তা কেষ্টই জানেন।