এ-এক আশ্চর্য রমণীর কথা। পুরাতনী ভারতবর্ষে জন্ম নিয়েছিল সেই রমণী। আর্য সমাজে নয়। ধীবরকুলে। সেই মৎস্যগন্ধা নারী একসময় হয়ে ওঠে যোজনগন্ধা। সে কালিন্দী। ভারতের সবচেয়ে গৌরবময় বংশের মহারানি সে।
যমুনার স্বচ্ছ নীল জলে সেদিন রুপোর মতো চাঁদ বিম্বিত হয়ে রয়েছে, ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে রুপোর কুচি। বড় শোভা। সেই কলস্বনা যমুনা, যার আরেক নাম কালিন্দী, তার তীরে দাঁড়িয়ে এক রমণী। চাঁদের আলোয় দেখতে পাচ্ছি সে কৃষ্ণা এবং নতনাস, তার দৈর্ঘ্যও খুব বেশি নয়, কিন্তু তা সত্ত্বেও বড়ই চিত্তাকর্ষক সে। ফণাধরা লতার মতো তাঁর কোঁকড়ানো চুল ছড়িয়ে রয়েছে কাঁদের পরে। এদিক ওদিক উলটানো রয়েছে ডিঙি নৌকা, খুঁটি পুতে পুতে মেলা রয়েছে মাছ ধরার জাল। সবকিছুর উপর চিকচিক করছে চাঁদের হাসি। রমণী কিছুই দেখছে না, কী এক ভেতরের আবেগে ফুলে ফুলে উঠছে , ভালো করে দেখলে বোঝা যাবে তার চোখে ছলছল জল, মুখে খেলা করছে বিচিত্র এক মোনালিসা হাসি। সে খুশি, খুব খুশি, সেই সঙ্গে তাকে ভর করেছে কী এক অস্বস্তি। সেটা শঙ্কার কাছাকাছি।
Bani Basu is a Bengali Indian author, essayist, critic and poet. She was educated at the well-known Scottish Church College and at the University of Calcutta.
She began her career as a novelist with the publication of Janmabhoomi Matribhoomi. A prolific writer, her novels have been regularly published in Desh, the premier literary journal of Bengal. Her major works include Swet Patharer Thaala (The Marble Salver), Ekushe Paa (twenty One Steps), Maitreya Jataka (published as The Birth of the Maitreya by Stree), Gandharvi, Pancham Purush (The Fifth Man, or Fifth Generation?) and Ashtam Garbha (The Eighth Pregnancy). She was awarded the Tarashankar Award for Antarghaat (Treason), and the Ananda Purashkar for Maitreya Jataka. She is also the recipient of the Sushila Devi Birla Award and the Sahitya Setu Puraskar. She translates extensively into Bangla and writes essays, short stories and poetry.
Bani Basu has been conferred upon Sahitya Academy Award 2010, one of India's highest literary awards, for her contribution to Bengali literature.
মহাভারত বরাবরই আমার প্রিয় একটা বিষয়। এবং এই সিরিজটা শুরু করার ইচ্ছা ছিল অনেকদিনের। বইটা পড়ে খুব ভাল লাগলো। এখানে কুরুবংশের শুরুর কথা, তার পেছনের মূল নারী কালীন্দির কথা আছে। অনেক কথর ভেতরের কথা লেখিকা তুলে ধরেছেন।
ভারতবর্ষ তখন কেমন ছিল? উত্তরে আকাশছোঁয়া হিমালয়, স্থলভূমি সব অরণ্যে অরণ্যে পরিকীর্ণ, তাঁরই ভেতর দিয়ে কী উত্তরে কী দক্ষিণে, কাটাকুটি খেলতে খেলতে, কলকল ছলছল করতে করতে, কখনও বা সুগম্ভীর নাদে চতুর্দিক পরিপূরিত করে বয়ে চলেছে অসংখ্য বারিধারা, নদনদী, দূষদ্বতী, সিন্ধু, ভৈরব, গোমতী, হিরণ্যবাহ, নর্মদা, গোদাবরী, কৃষ্ণা, কাবেরী...। লক্ষণীয়, নামগুলো, প্রায় সবই তৎসম। তৎসম নাম হিমালয়ের সব প্রতিশব্দগুলিরও এবং ভারতের মাঝবরাবর যা স্থলভূমিকে প্রায় দু'ভাগে চিরে দিয়েছে সেই বিন্ধ্য পর্বত, পূর্ব সমুদ্রতীরে মলয়াদ্রি বা মহেন্দ্র পর্বত, পশ্চিম সমুদ্রতীরে সহ্যাদ্রি—সমস্ত নাম তৎসম। ...
এভাবে শুরু হয়েছে বাণী বসু'র 'কালিন্দী'। আর এখানেই ধরা পড়ে গেছি আমি, পছন্দের যত পড়ার বিষয় : নৃতত্ত্ব-ভূগোল-মহাভারতকে একসাথে পেয়ে।
কালিন্দী'র গল্প শুরু হয়েছে ভিল্ল রাজার স্ত্রী-কে দিয়ে, যে ধীবর রানীর গর্ভে এসেছিল অচেনা আর্য পুরুষের সন্তান, কালিন্দী তথা সত্যবতী। এই সত্যবতী জন্ম দিয়েছিলেন কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস-এর, আর দ্বৈপায়ন হতে জন্ম নিয়েছিল পরবর্তী কুরু বংশ, এবং পুরো মহাভারত। কালিন্দী বা যমুনা নদীর কোলে এক ধীবর গ্রামে শুরু হয়ে গল্প গড়িয়ে যায় বনের 'হড়' তথা সাঁওতালদের ভূমিদাস হওয়ার গল্পে, দীর্ঘকায় সাদা মানুষ আর খর্ব কালো মানুষদের মিলেমিশে যাবার গল্প গড়িয়ে চলে যমুনা ধরে, কখনো পৌঁছে হস্তিনাপুরেও।
কাব্যচ্ছলে যে অমর কাহিনী ধরে রেখেছে মহাভারত, তার মাঝে লৈকিকতার আশ্রয় নিয়ে ঢাকা হয়েছে অনেক বিতর্কিত ঘটনাবলী। সে সময়ে যা উচ্চারণ করা অসাধ্য ছিল, তাই বিটুইন-দ্য-লাইনস লুকিয়ে রাখা হয়েছে তাদের। বাণী বসু'র মহাভারত আশ্রিত উপন্যাসগুলো পড়তে গিয়ে অবাক হয়ে দেখছি, তিনি এইসব থিওরিগুলো অকপটে উচ্চারণ করেছেন, যেগুলো প্রতিভা বসু'র মহাভারতের মহারণ্যে তো বটেই, হরপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ঠোঁটকাটা বয়ান কৃষ্ণকাহিনী মহাভারত-ও স্পষ্টভাবে বলেনি।
মহাভারতের গল্পকে বারবার নানান আঙ্গিকে, নানান চরিত্রের কাছ থেকে পড়তে আনন্দ হয় যাদের, 'কালিন্দী' পড়তে পারেন। মহাভারতের আখ্যানের আগে অনেকখানি নৃতাত্ত্বিক গল্প-ও বলেছেন লেখক, বেশ উপভোগ করেছি সেটা।
আমি কালিন্দী,ধীবররাজের(প্রকৃত পিতা নন) কন্যা। পিতার মনে এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা- আমার সন্তান যেন কোনো রাজবংশে উচ্চ ক্ষমতায় আরোহণ করতে পারে। তাই মাছ ধরার পরিবর্তে নৌকার পাটনি হিসেবে হাতেখড়ি হয়। এখানেই পরাশর মুনীর সঙ্গ লাভ হয়।কৃষ্ণ বা ব্যাস কে সন্তান হিসেবে লাভ করার পাশাপাশি মুনীর বরে হয়ে উঠি যোজনগন্ধা। নদীর ওপারে এক রাজপুত্রের সাথে দেখা হয় একদিন।মন দেওয়া নেওয়া চলে। মনে মনে সেই রাজপুত্রকে প্রত্যাশা করি। কিন্তু বিধিবাম! রাজপুত্রের পরবর্তে আমাকে বিয়ে করতে মরিয়া হয়ে উঠলেন তার পিতা শান্তনু। কিন্তু আমার পিতা ধীবররাজও কম নয়। আমার বংশধর ভবিষ্যতে সিংহাসন প্রাপ্তিতে কোনো বাধা থাকবে না এই প্রতিশ্রুতিতে আমার রাজার সাথে বিয়ে হয়ে গেল।এক তীব্র অপমান ও প্রতিশোধস্পৃহা আমার মধ্যে জেগে উঠলো। রাজপুত্র দেবব্রতকে সবসময় আকাঙ্ক্ষা করতাম কিন্তু রীতিমত সে আমাকে মা বানিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুললো।তাই আমি আমার মৃত সন্তানের স্ত্রীদের গর্ভে সন্তান তৈরিতে ব্যবহার করলাম আমার প্রথম সন্তান ব্যাসকে।
কালিন্দী থেকে সত্যবতী হয়ে উঠা এক ধীবরকন্যার আখ্যান।যার লোভ,দুঃখ ও প্রতিশোধস্পৃহা থেকেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সূচনা হয়েছে বললেও ভুল হবে না।
কালিন্দী পুরাণ নির্ভর এক উপন্যাস। কালিন্দী ছিলেন ধীবরকন্যা। দাসরাজা ভিল্লর এর কন্যা। যার হাত ধরে সূচনা হয় কুরুবংশের। অসামান্য এক রমনী। ভারতবর্ষের গৌরবময় কুরুবংশের মহারানী। সে কালিন্দী।
পরাশরমুনি সারাজীবন কৌমার্যব্রত রক্ষার করে চললেও তিনি অনুভব করলেন বংশপ্রদীপ জ্বালিয়ে রাখাতে একটি পুত্রসন্তানের। তিনি তপোবন ছেড়ে পথে চলতে চলতে একদিন এলেন ধীবরপল্লীতে। দেখলেন একটি সুন্দরী পঞ্চদশী ধীবরকন্যাকে। দেখলেন দাসরাজা ভিল্লর কন্যা কালিন্দীকে। কালিন্দী মুনির পুত্রলাভ করলেন, হলেন যোজনগন্ধা। কাহিনি এখান থেকেই শুরু। ছোট একটা বই, যাতে লেখক কুরুবংশের সূচনার পরিচয়টা দিয়ে গেছেন।
"কুরুবংশ ধ্বংস হইল কার পাপে?" বেশ প্রচলিত একটা জিজ্ঞাস্য আছে এরকম।
দীর্ঘ একটা সময় পর্যন্ত আমার বিশ্বাস ছিল, দুর্যোধন নয়, শকুনি নয়, কিংবা বাসুদেব কৃষ্ণের কূটচালের জন্যও নয়, বরং কুরুবংশ ধ্বংসের দায় পুরোটাই ছিল সত্যবতী কালীর। সত্যবতীর অপরিসীম উচ্চাকাঙ্খাই কুরুবংশকে ডুবিয়েছে কালক্রমে।
কিন্তু কালিন্দী'তে বাণী বসুর কলমে নতুন করে দেখতে গিয়ে মনে হলো, এ পাপ কালীর একার নয়। বরং বুড়ো বয়সে মহারাজ শান্তনুর নতুন করে বিয়ের পাপ, রাজপুত্র সত্যব্রত'র প্রতিজ্ঞা রক্ষার "পূণ্যের" পাপ, ভীল্ল'র প্রতিহিংসার পাপ, কিংবা সেই অপরিচিত কোন এক রাজপুরুষের কামনার ফলে এক জেলে কণ্যার গর্ভধারণের পাপ...
আদতে অবশ্য পাপ নয়, এরা সবাই নিমিত্ত মাত্র, বরং পুরোটাই ছিল নিয়তি।
তবুও, মহাভারতে যার কার্যক্রম নিয়তি বলে মানতে কষ্ট হয়, তিনি ভীষ্ম। শুধু অপ্রয়োজনীয় এক প্রতিজ্ঞা রক্ষার জন্য, বারবার সুযোগ থাকার পরেও যিনি নিজের পিতৃবংশকেই নির্বংশ করে দিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শত সহস্র প্রাণ হরণ হতো না হয়তো, শুধু এই একটা মাত্র প্রতিজ্ঞা রক্ষা না করলে।
আদতে কুরুবংশ তো নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিলো বিচিত্রবীর্যের মৃত্যুর মাধ্যমেই। কুরুক্ষেত্রে যে ভাতৃঘাতী যুদ্ধ, তা সবই ছিল কৃষ্ণদৈপায়ন ব্যাসের বংশধারার মধ্যে।
ছোট বই। মহাভারতের কুরুবংশের সূচনার গল্প। লেখিকার ভাষ্যে এপিকের দু'লাইনের মাঝের স্পেসে অনেক না বলা কথা লুকিয়ে থাকে।লেখিকা সেই কথা তুলে আনতে চেয়েছেন। পড়ে ভালো লেগেছে।
বাণী বসুর বই প্রথম পড়লাম।ভেবেছিলাম ইংরেজি শব্দের ব্যবহা��� দু-এক জায়গায় অসচেতন ভাবে এসেছে।পরে দেখলাম এগুলো তিনি সচেতনভাবেই তাঁর বয়ানের সময় 'ইউজ' করেছেন।...
This was an awesome experience. Many unknown facts about Satyavati and how her and Parashara's genes are destined to rule the Bharat varsha! Feminist yet unbiased.
যা নেই মহাভারতে, তা নেই ভূভারতে। কিন্তু যা নেই মহাভারতে, তা আপনি পাবেন মহাভারতের প্রাপ্তবয়স্ক পুনর্কথনে। ছোটবেলায় রাগ হতো বিটকেলপনা retelling গুলো পড়তে বসে। একটু বড় হতে বুঝেছি আমার রাগ বা আনন্দ সবকিছুই যে গ্রন্থটিকে আশ্রয় করে, সেটি নিজেই একখানি "ছোটদের জন্য" নিশান নিয়ে ঘুরছে। সুতরাং, ওটিও একটি retelling বই কিছু নয়। তাই এখন মজা করেই পড়ি এই ধরণের লেখাগুলো। কেমন একটা আনন্দবাজারের তিন নম্বর বিনোদন পৃষ্ঠার কথা মনে আসে। বাণী বসু আমার মধ্য কৈশোরের, সেই যখন আমি কোনো এক অজ্ঞাত কারণে হঠাৎ করেই মা পিসিদের জন্য লেখা যাকে ঢং করে বলে "জীবনধর্মী উপন্যাস" সেই সেগুলোর প্রতি সাংঘাতিকভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছিলাম, সেই যুগের প্রিয় লেখিকা। "কালিন্দী" তে তিনি দেবব্রত আর সত্যবতীর মধ্যে ওই খানিকটা রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় ঘরাণার জিনিসপত্র খোঁজার চেষ্টা করেছেন, তবে শেষ পর্যন্ত আর সত্যবতীর সুইসাইড নোট ফোট লিখে ফেলেননি। ওইটাই যা স্বস্তি। ঝরঝরে লেখনীতে মহাভারতের একদম শুরুর দিকের ঘটনাবলীতে তুলে ধরেছেন, যেটাকে স্টার প্লাস এর সিরিয়ালটা মাত্র কয়েকমাসেই গুটিয়ে ফেলেছিল আর কি। ভালো লাগে পড়তে, তবে শ্বেত পাথরের থালার মত বুকে ঘা ঠা মোটেই দিয়ে যায় না। তিনটি তারা দিলাম।
বাণী বসুর লেখনী নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই। যারা পড়েছেন তারা জানেন। অত্যন্ত সুলিখিত এই বই। যারা মহাভারতের উপর লেখা উপন্যাস পড়তে পছন্দ করেন তাদের ভালো লাগবেই। তবে প্রতি পৃষ্ঠায় অসংখ্য বানান ভুল ও মুদ্রণ প্রমাদ এই বইয়ের একমাত্র নেগেটিভ পয়েন্ট। এই ব্যাপারটায় প্রকাশক দেজ পাবলিশিং-এর নজর দেওয়া উচিত। এই ব্যাপারটা ছাড়া বইটার আর কোনও খুঁত নেই। শুধুমাত্র এটার জন্য চার তারা দিলাম। নাহলে এই বই পাঁচ তারা ডিজার্ভ করে।