কদিন আগেই অনিলিখার রহস্য সমগ্রের দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশ পেল। সে জিনিস হাতে পাওয়ার আগে, শেলফের নির্বাসিত কোন থেকে এই বইটিকে বের করে আনার সিদ্ধান্ত নিলাম। বইয়ের দুটি গল্পই অবশ্য উপরোক্ত সমগ্রে স্থান পেয়েছে, তাই আলাদা করে এটিকে কেনার আর কোনো দরকার দেখি না। স্রেফ কোয়ালিটির দিক দিয়েও অনিলিখার প্রথম অভিযানগুলোর তুলনায় এই গল্পদুটি সামান্য দুর্বল।
তবুও সবটাই এক সিটিংয়ে পড়ে ফেলা যায়। শারদীয়া কিশোর ভারতীর পুঁচকে লেগস্পেসে আটক হয়েও, উপন্যাস দুটি পার পেয়ে যায় কেবলমাত্র অভিজ্ঞান রায়চৌধুরীর সহজ ও গতিময় লেখনীর কল্যাণে! এই জিনিসে লেখকের জুড়ি মেলা ভার। প্রায় দুই দশক ধরে নিজের মানসকন্যাকে নিয়ে লেখালেখির যাবতীয় ফল। বইয়ের প্রথম গল্প, 'অনিলিখা ও হিরোসি', যতটা না অনিলিখার অভিযান, তার চেয়েও বেশি জাপানের প্রবীণ বিজ্ঞানী আসাহি ও তার সৃষ্ট রোবট হিরোসির কাহিনী।
সুইজারল্যান্ডের বুকে ঘনিয়মান এই রহস্যের মূলে স্পন্দিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চিরচেনা বিভীষিকার বিকৃত অনুরণন! সাথে অ্যাসিমভ মহাশয়ের রোবট সংক্রান্ত সমস্ত আইনকানুনের ওপেন কোরবানি। তবে গল্পটি আমার খুব একটা ভালো লাগেনি। তাড়াহুড়োয় গুটিয়ে নেওয়া ক্লাইম্যাক্স ছাড়াও লেখাটির শেষ পর্যায়ের টুইস্টখানি বেজায় কষ্টকল্পিত, যা লেখাটিকে স্রেফ একটি ডার্ক কল্পগল্প হতে এক্কেবারে অসম্ভবের পথে চালিত করে বসে।
তবে বইয়ের দ্বিতীয় উপন্যাসিকা 'অনিলিখা ও সেই লোকটা', আদতেই জমজমাট। এখানেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘিরে কাহিনীর সূত্রপাত। নেপথ্যে, একটি হারিয়ে যাওয়া চিঠি। সেই চিঠি অনিলিখার কাছে পৌঁছলে, প্রাপকের খোঁজে সে পৌঁছে যায় সুদূর ইংল্যান্ডে। এবং গিয়েই জড়িয়ে পড়ে এক কনস্পিরেসির মধ্যমায়। শেষলগ্নে গতিহীনতায় ভুগলেও, গল্পটির মূল শক্তি এর বহুমুখী ন্যারেটিভে।
চিঠির মিস্ট্রি বাদেও লেখক সাবলীল মুন্সিয়ানায় বলেন এক আশ্চর্য বালকের গল্প। সমান্তরালই আঁকেন বিশ্বের তাবড় তাবড় ক্যাপিটালিস্টদের অতর্কিত মৃত্যুচিত্রণ! সিরিয়াল কিলিং? না কোএনসিডেন্স? এই নিয়েই এগোয় গল্পের তোড়। অবশ্য, একেবারে ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে একগুচ্ছ 'প্রিচি' সংলাপ গল্পটিকে ভোতা করতে চায়। আধুনিক বিজ্ঞানের এথিকাল ও আনএথিকাল অপপ্রয়োগের বিরুদ্ধে অনিলিখার দিদিমণি গোছের মোরাল ওকালতি কিছুটা ক্লান্তিকর, এই যা।
তাই সব মিলিয়ে আড়াই। এইবারে (প্রিয়তমা) অনিলিখার রোষানলে না পড়লেই বাঁচোয়া।
অনিলিখা'র সঙ্গে আমাদের আলাপ হয়েছিল আজ থেকে এক দশকেরও বেশি আগে। মাঝের এই সময়টায় তার বয়স বেড়েছে কিছুটা, কিন্তু পৃথিবীর বয়স বেড়েছে অনেকটা। হয়তো সেজন্যই তার অভিজ্ঞতাগুলো কল্পবিজ্ঞানের অ্যাডভেঞ্চার বা অভিযান না হয়ে অন্যরকম হয়ে উঠেছে। কীরকম? খুব সরলভাবে বললে, এখন অনিলিখা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজ্ঞানের প্রয়োগের ক্ষেত্রে নীতি ও আদর্শের কষ্টিপাথর। সে নিজে বিচার করে না। কিন্তু তার চোখ দিয়েই আমরা দেখি বিজ্ঞানের উচিত-অনুচিত আর লাভ-ক্ষতির নানা অঙ্ক। তার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমরা বুঝে নিতে চাই, তথাকথিত সভ্যতার কোন সিদ্ধান্তগুলোতে থাকে মান, হুঁশ, মানবতা। এই বইয়ের দুটি উপন্যাসই সেই গোত্রীয়। প্রথম কাহিনি— 'অনিলিখা ও হিরোসি।' এই গল্পের কেন্দ্রে আছে বিজ্ঞানী আসাহি'র হাতে গড়া রোবট হিরোসি। হিরোশিমা বিস্ফোরণে সবাইকে হারিয়েছিলেন আসাহি। পরে তিনি এমনভাবে তৈরি করেছিলেন এই রোবটটিকে, যাতে তার প্রতিটি কাজের চালিকা শক্তি হয় সহযোগিতা ও সমবেদনা। কিন্তু ঘটনাচক্রে অনিলিখা'র সঙ্গে যখন আসাহি'র আলাপ হল, তখন বিজ্ঞানী চিন্তিত, এমনকি ভীত! কেন? কী হয়েছে হিরোসি'র? তার চেয়েও বড়ো কথা, কী করতে চলেছে সে? মেশিন লার্নিং, রোবটিক্স-এর সূত্র, আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স— এমন নানা উপাদানে গড়া হলেও এই লেখার বিশেষত্ব অন্য। ফ্র্যাংকেনস্টাইন কমপ্লেক্স ছাপিয়ে এই গল্প পৌঁছে গেছে সম্পূর্ণ অন্য এক এথিক্সের ভাঙাগড়ায়। অনিলিখা'র মতো আমরাও সেই প্রশ্নে দীর্ণ হয়েছি, যা হিরোসি-কে ঠেলে দিয়েছিল তার নিজস্ব কার্যকারণ চক্রে— "তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ? তুমি কি বেসেছ ভালো?" গল্পটার নির্মাণ অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। শুধু গল্পের শেষে যে চমকটা লেখক আমাদের, তথা অনিলিখা'র শ্রোতাদের জন্য রেখেছেন, সেটাই গল্পটাকে বড্ড অসম্ভাব্য করে দিল! দ্বিতীয় কাহিনি— 'অনিলিখা ও সেই লোকটা।' স্রেফ ঘটনাচক্রে একটি বইয়ের মধ্যে অনিলিখা খুঁজে পায় এক না-পাঠানো চিঠি। পত্রলেখক ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপে যুদ্ধরত ব্রিটিশ সৈন্য। তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করতে লন্ডনে গিয়ে অনিলিখা জড়িয়ে পড়ল এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রে। দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষগুলো একে-একে খুন হচ্ছে তখন। একরকম মরিয়া হয়ে এম.আই-সিক্স যোগাযোগ করল অনিলিখা'র সঙ্গে। উপস্থিত বুদ্ধি ও পর্যবেক্ষণ কাজে লাগিয়ে একটা প্যাটার্নও চট করে পেয়ে গেল অনিলিখা। কিন্তু... গল্পের মধ্যে যে প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন অনাথের বয়ানে আমরা জানতে পারছি অনেক কিছু— সে আসলে কে? ঠিক কী উদ্দেশ্য আছে এই খুনগুলোর পেছনে? অনিলিখা'র জীবন কি বিপন্ন? এই গল্পেও মূল জিনিস হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজ্ঞানের এথিক্স তথা তার অপপ্রয়োগের পরিণাম। অনিলিখা ও কেন্দ্রীয় চরিত্রের কথোপকথন অনাবশ্যকভাবে দীর্ঘায়িত হয়েছে। অপরাধী তথা কাণ্ডারীকে আমরা চিনতে পেরেছি অনেক আগেই। সর্বোপরি গল্পের ক্লাইম্যাক্সে লেখক রীতিমতো গথিক আবহ তৈরি করেও 'শেষ হয়ে হইল না শেষ' স্তরে থেমে গেছেন। এই কারণে এই লেখায় টানটান সাসপেন্স ব্যাপারটা জমেনি। কিন্তু এ-কথা অনস্বীকার্য যে বিজ্ঞানের অপপ্রয়োগ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের সঙ্গে সমাজের সংঘাতের বিষয়টি লেখক তাঁর এই কিশোরপাঠ্য লেখাগুলোয় ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। হয়তো প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য লিখলে এই প্লট নিয়ে তিনি ডার্ক মিরর-এর মতো হার্ড-হিটিং উপাখ্যানমালা আমাদের সামনে তুলে ধরতে পারতেন— যা এই পরিসরে সম্ভব হয়নি। ভরসা রাখি, প্রাপ্তমনস্ক পাঠকের জন্য প্রাপ্তবয়স্ক কাহিনিতেও আমরা অনিলিখাকে পাব একদিন।
১২৮ পাতার বেশ ছোট বই। দুটো গল্প আছে মোট। অনিলিখা ও হিরোসি, অনিলিখা ও সেই লোকটা। বইয়ের genre হিসাবে বলা যায় "কিশোর কল্পবিজ্ঞান।" 🤗 🌚 খুনখারাবি অল্প আধটু আছে তবে কিশোর মন তা নিতে পারবে আমি নিশ্চিত। ছোট বয়সে এই বই পেলে খুব খুশিই হতাম। যাই হোক আসি গল্পের কথায়, ☺️ অনিলিখা IOT(Internet Of Things) নিয়ে কাজ করছেন এমন একজন মানুষ। কাজের সূত্রে নানান দেশ - বিদেশে তাঁকে ঘুরে বেড়াতে হয়। বিজ্ঞান ছাড়াও আছে তার ইতিহাসে বিশাল দখল। এত কিছুর মধ্যেও তিনি জড়িয়ে পড়েন সব বিশাল বিশাল রহস্যে। দিয়ে তার উদঘাটন ও করে ছাড়েন। পরে সেই adventure এর গল্প রসদ হয় পাড়ার খুদেদের সান্ধ্য আড্ডায়। 🥰🥰
🌀 প্রথম গল্প হিরোসি কে নিয়ে। যে আদতে একজন andro-humanoid with a consciousness. তাকে তৈরি করা হয়েছে অ্যাসিমভের নিয়ম গুলো উপেক্ষা করে। সাধারণ দৃষ্টিতে দেখলে হিরোশি একদম এক নিষ্পাপ শিশু। কিন্তু প্রফেসর হঠাৎ করে মারা যান বিষক্রিয়ায়, পাড়ার কিছু ছেলেও, যারা হিরোসির সাথে দুর্ব্যবহার করেছিল হঠাৎ করেই একদিন একদম বেমালুম বেপাত্তা। আসল রহস্য কি? 🧐🧐
🌀 দ্বিতীয় গল্প, শহরে একের পর এক খুন হয়ে চলেছেন নামী নামী সব genius রা। কেউ Quantum Computing এর revolutionary আবার কেউ বিশাল social networking site এর স্রষ্টা। খুনি সব জায়গায় ছেড়ে যাচ্ছে কিছু অঙ্ক আর খুনের পদ্ধতিও সব ক্ষেত্রে আলাদা আর অভিনব। একবার nerve-agent তো একবার পার্সেল বম্ব।😳😳 অনিলিখা কি পারবে এর পিছনের আসল mastermind কে ধরতে?
মোদ্দা কথা : দুটো গল্পই একদম টানটান। একদিনের বেশি লাগবে না শেষ করতে। কিশোর মন নিয়ে পড়বেন, তাহলে মজা পাবেন নচেৎ underwhelming লাগবেই।
ক্ষুদ্র (আণুবীক্ষণিক) আপত্তি: বেদিক ম্যাথ বলে কিছু হয়ই না। তাও সেটা নিয়ে এত হুলোহুলির কি ছিল বুঝলাম না।😒😒 অবশ্য আষাঢ়ে গল্পে হয়তো এটুকু চলে। তবু বেশ misinformation ছড়াচ্ছে মনে হল।🙄 Then again, কোন আহাম্মক গল্প থেকে information collect করে? আমি তো নই। 🧐
বছর ছয়েক আগের কথা, তখন পশ্চিমবঙ্গের খবরের কাগজগুলির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল "কঙ্কাল-কান্ড"র মতন ঘটনা। যা সেই সময় জন-মানসে রীতিমতন শোরগোল ফেলে দিয়েছিলো। আবার সেই "কঙ্কাল-কান্ড" ফিরে এলো লেখক অভিজ্ঞান রায় চৌধুরীর হাত ধরে খোদ কলকাতার বুকে। একটা নয় , দুটো নয়, পর-পর ন-ন'টা খুন !!! আর খুনের সাক্ষী হিসাবে পরে থাকছে শুধু হতভাগ্যের কংকাল। হ্যাঁ , ঠিকই ধরেছেন এবারের কাহিনীর মূল আকর্ষণ হলো "সিরিয়াল কিলিং" আর "কঙ্কাল-কান্ড"।
এই ন'টা খুনের তদন্তে নেমে যখন রীতিমতন হিমশিম খাচ্ছেন রাজর্ষি সরকারের মতন ফরেনসিক এক্সপার্ট, ঠিক তখনই তিনি পাশে পেলেন অনিলিখাকে। এরকম একটা কেসের ব্যাপারে অনুসন্ধান করতে অনিলিখাও এসে হাজির খোদ শহর কলকাতাতে। অনিলিখা রাজর্ষির সাথে কথা বলে বুঝতে পারে খুনি অত্যন্ত বেপরোয়া এবং খুন করতে এমন মারাত্মক বস্তু ব্যবহার করছে যার কথা আগে কখনও শোনা যায়নি। কি সেই বস্তু যা রক্ত-মাংসের জীবিত মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে কঙ্কালে পরিণত করছে ? অনিলিখা কি পারবে এই রহস্য ভেদ করতে ? জানতে গেলে পড়ে ফেলতেই হবে "রহস্য যখন সংকেতে" উপন্যাসটি। লেখাটি যত শেষের দিকে গেছে কাহিনীতে চমকের পরিমান ঠিক ততটাই বেড়েছে।
হার্ড সায়েন্স ফিকশন উপর ভিত্তি করে একটি দুর্দান্ত সাইকো থ্রিলার উপহার দিয়েছেন অভিজ্ঞান রায় চৌধুরী। হার্ড সায়েন্স নিয়ে খুব বেশি লেখা কিশোর সাহিত্যে দেখতে পাওয়া যায় না , সেদিক থেকে দেখতে গেলে উনি একটি অসাধারণ উদ্যোগ নিয়েছেন বলা চলে। বেশ কয়েক বছর আগে লেখা উপন্যাস "সংকেত রহস্যের" পর আবার ওনার হাত থেকে পাওয়া গেল "রহস্য যখন সংকেতে" নাম এই টানটান সাই-ফাই থ্রিলারটি। কাহিনীতে মৌলিক সংখ্যার প্যাটার্ন , ইউক্লিডের তত্ত্ব , এনক্রিপশনের ব্যবহার সহ অনেক জটিল বিষয়বস্তুকে ভারী সহজভাবে উদাহরণ সহ বোঝানো হয়েছে। যা পড়তে গিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ভারী হয় না , অথচ খুব সুন্দর সুন্দর বিষয়বস্তুর সমন্ধে সম্যক ধারণা লাভ করা যায় এই কাহিনী পড়তে পড়তে।
আর একটা নতুন জিনিস পাঠকরা এই কাহিনী পড়তে গিয়ে দেখতে পাবেন সেটি হলো খুনিকে ধরবার জন্য যে সকল সূত্র বা ক্লু পাওয়া গেছে তা অনিলিখার সাথে পাঠকরাও দেখে নিতে পারবেন। প্রতিটি ক্লু বা সংকেত ছবির আকারে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে লেখার সাথে সাথে। অনিলিখার সাথে সাথে আপনিও নেমে পড়ুন তদন্তে। আই-কিউ ( IQ ) পরীক্ষা করে নেবার এমন দুর্দান্ত সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। কে বলতে পারে এই কোড গুলো দেখে আপনিই হয়ত অনিলিখার আগেই খুনিকে ধরে ফেললেন। তাই বলি চ্যালেঞ্জটা একবার নিয়েই দেখুন না !!!