Muntassir Mamoon (Bangla: মুনতাসীর মামুন) is a Bangladeshi author, historian, scholar, translator and professor of University of Dhaka. He earned his M.A. and PhD degree from University of Dhaka. Literary works
Mamoon mainly worked on the historical city of Dhaka. He wrote several books about this city, took part in movements to protect Dhaka. Among his historical works on 1971 is his Sei Sob Pakistani, in which many interviews with leading Pakistanis was published. Most of them were the leading Pakistani characters during the liberation war of Bangladesh.
জন্ম এবং পরিবার মুনতাসীর মামুনের জন্ম ১৯৫১ সালের ২৪ মে ঢাকার ইসলামপুরে নানার বাড়িতে। তাঁর গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার গুলবাহার গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মিসবাহউদ্দিন এবং মায়ের নাম জাহানারা খান। পিতামাতার তিন পুত্রের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ। তিনি ১৯৭৫ সালে বিয়ে করেন। তার স্ত্রী ফাতেমা মামুন একজন ব্যাংকার। মুনতাসির মামুনের দুই ছেলে মিসবাহউদ্দিন মুনতাসীর ও নাবীল মুনতাসীর এবং কন্যা রয়া মুনতাসীর।
কর্মজীবন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই দৈনিক বাংলা/বিচিত্রায় সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন মুনতাসীর মামুন। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপক পদে কর্মরত আছেন। এর পাশাপাশি ঢাকা শহরের অতীত ইতিহাস নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। এছাড়া তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের 'মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ গবেষণা ইন্সটিটিউটে' সন্মানিক প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে ১৯৯৯-২০০২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। কৈশর থেকে লেখালেখির সাথে জড়িত হয়ে ১৯৬৩ সালে পাকিস্তানে বাংলা ভাষায় সেরা শিশু লেখক হিসেবে প্রেসিডেন্ট পুরস্কার লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার পর অনুবাদ, চিত্র সমালোচনা ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রচনা করেন অনেক বই। তাঁর লেখালেখি ও গবেষনার বিষয় উনিশ, বিশ ও একুশ শতকের পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশ ও ঢাকা শহর।
সাংগঠনিক কর্মকান্ড স্বাধীন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ডাকসুর প্রথম নির্বাচনে মুনতাসীর মামুন ছিলেন সম্পাদক। একই সময়ে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাংস্কৃতিক সংসদের সভাপতি। ডাকসুর মুখপত্র "ছাত্রবার্তা" প্রথম প্রকাশিত হয় তাঁর সম্পাদনায়। তিনি বাংলাদেশ লেখক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও যথাক্রমে প্রথম যুগ্ম আহ্ববায়ক ও যুগ্ম সম্পাদক। তিনি জাতীয় জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ড ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী এবং জাতীয় আর্কাইভসের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন। ঢাকা নগর জাদুঘরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। ঢাকার ইতিহাস চর্চার জ্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন সেন্টার ফর ঢাকা ষ্টাডিজ (ঢাকা চর্চা কেন্দ্র)। এ কেন্দ্র থেকে ঢাকা ওপর ধারাবাহিক ভাবে ১২টি গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি বাংলা একাডেমীর একজন ফেলো এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল ও সিনেটের নির্বাচিত সদস্য হয়েছেন কয়েকবার। '৭১-এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির তিনি একজন প্রতিষ্ঠাতা ও সক্রিয় সদস্য। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী ফাতেমা মামুন প্রতিষ্ঠা করেছেন মুনতাসীর মামুন-ফাতেমা মামুন ট্রাস্ট। এ ট্রাস্ট গরিব শিক্ষার্থী ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারদের নিয়মিত সাহায্য করছে।
সাহিত্য কর্ম মুনতাসীর মামুনের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২২০+। গল্প, কিশোর সাহিত্য, প্রবন্ধ, গবেষনা, চিত্র সমালোচনা, অনুবাদ সাহিত্যের প্রায় সব ক্ষেত্রেই মুনতাসীর মামুনের বিচরণ থাকলেও ইতিহাসই তার প্রধান কর্মক্ষেত্র। ।
পুরস্কার বাংলা একাডেমী পুরস্কার, লেখক শিবির পুরস্কার, সিটি আনন্দ আলো পুরস্কার, একুশে পদক, নূরুল কাদের ফাউন্ডেশন পুরস্কার, হাকিম হাবিবুর রহমান ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক পুরস্কার, ইতিহাস পরিষদ পুরস্কা, অগ্রণী ব্যাংক পুরস্কার, অলক্ত স্বর্ণপদক পুরস্কার, ডঃ হিলালী স্বর্ণপদক, প্রেসিডেন্ট পুরস্কার (১৯৬৩), মার্কেন্টাইল ব্যাংক স্বর্ণপদক, এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অর্লিয়েন্স শহর তাঁকে 'অনারেবল ইন্টারন্যাশনাল অনারারী সিটিজেনশিপ' প্রদান করে।
ঢাকা বিষয়ে একজন সত্যিকারের বিশেষজ্ঞ বলা যায় লেখক মুনতাসীর মামুনকে। আমি নিতান্ত জ্ঞানহীন এবং ফাঁকিবাজ বলেই এত বছর পর ঢাকা নিয়ে উনার লেখা বা রিসার্চের হাতেখড়ি হলো এই বইটি পড়ে। এর বাইরে ‘ঢাকার স্মৃতি’ এবং ‘ঢাকাঃ স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ বলে আরো দুটো সিরিজ আছে লেখকের।
শিশু সাহিত্য বিতান, চট্টগ্রাম থেকে এই বইটি প্রকাশিত ১৯৮০ সালে। ঘরের এক কোণায় খুঁজে পেয়ে পড়া শুরু করে দিলাম। বিরাট জ্ঞানভাণ্ডারের একটি ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে ছোটদের উদ্দেশ্য করে বইটি লিখেছেন মুনতাসীর মামুন। তবে অল্প সময়ে ঢাকার বিস্তৃত ইতিহাসের খণ্ডাংশ জানার জন্য নিঃসন্দেহে চমৎকার লেখা। ছোট ছোট অধ্যায়ে ভাগ করে বিভিন্ন ঘটনা ও বিষয়ের অবতারণা করেছেন লেখক।
ঢাকা আমার জীবনের অংশ। ক্লান্তিহীন ব্যস্ত এই নগরের নাগরিকতা রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমনভাবে ছড়িয়ে গেছে যে, অস্তিত্ব থেকে আলাদা করার উপায় নেই আর। তাই মুঘল আমল থেকে শুরু করে ঢাকার ইতিহাস-ব্যবচ্ছেদ পড়তে বেশ ভাল লেগেছে। এই বইয়ে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও কোনভাবেই তথ্যের ভারে চাপা পড়ার অনুভূতি হয়নি, কারণ পুরোটাই গল্পের ছলে সাবলীল ভাষায় বলে গেছেন লেখক। বিভিন্ন সময়ে চারবার রাজধানী হওয়ার গৌরব লাভ করা ঢাকায় ছাপ পড়েছে ভিন্নধর্মী প্রশাসনের, এর ফলে বারবার রঙ বদলেছে। পরিবর্তন এসেছে অর্থনীতিতে, শাসন প্রক্রিয়ায়। মুঘল শাসনামলে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু দিল্লীতে হলেও, সুবা বাংলার রাজধানী হিসেবে এদিকে চোখ ছিল অনেকেরই। মসলিন কাপড় ও এর কারিগরদের নিয়ে বেশ সুন্দর বর্ণনা রয়েছে বইয়ে। বিশ্বজোড়া এই কাপড়ের খ্যাতি ঢাকাকে উচ্চ আসনে আসীন করেছিল সেই প্রাচীনকাল থেকেই। কালক্রমে লাভজনক ব্যবসা, সুলভ পণ্যের সমাহার, ব্যবসায়িক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে এই মাটিতে পা দিয়েছে পর্তুগীজ, গ্রীক, ওলন্দাজ, ইংরেজসহ বহু জাতি, রেখে গেছে তাদের পদচিহ্ন – যার বেশ কিছু আজো দাঁড়িয়ে আছে আমাদের এই শহরে। আর মাটিতে, ধূলিকণায় মিশে আছে আরো কত হারিয়ে যাওয়া নিদর্শন।
আজকের ঢাকার নামের সাথে যুক্ত ‘মসজিদের শহর’ উপাধির সাথে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। কিন্তু অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য যে, একসময় একে বাগানের শহর এবং বৃক্ষের শহর ও বলা হতো। চলাফেরার জন্য লোক ব্যবহার করতো হাতি, ঘোড়া কিংবা নৌকা। জর্জরিত এই শহর বর্ষাকালে ইতালীর ভেনিসের সাথেও তুলনীয় ছিল। এখানে বলে রাখা ভাল, এই বইয়ে উল্লেখিত ইতিহাসের বেশিরভাগই বর্তমানের ‘পুরান ঢাকা’ ঘিরে। কারণ বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী তৎকালীন ঢাকায় শাহবাগের পরের অংশে তখনো জনমানুষের ছাপ পড়ে নি তেমন। বিভিন্ন এলাকার নামকরণের কমবেশি বর্ণনা পাওয়া যায় এই বইয়ে, মুঘল আমলের দেয়া কত এলাকার নাম যে আজো ধারণ করে আছি আমরা তাও জানতে পারলাম। এছাড়াও ১৮৫০ সালের মানচিত্রের পাশাপাশি বেশ কিছু দুর্লভ ও ঐতিহাসিক ছবি জুড়ে দেয়া আছে। আর দ্বিতীয়ার্ধে প্রাধান্য পেয়েছে মূলত দুইশ’ বছরের ইংরেজ শাসনে ঢাকার চিত্র। এর মাঝে ঘটেছে ফকির বিদ্রোহ, সিপাহী বিদ্রোহ। বিশ্বাসঘাতকতার এক মর্মান্তিক পরিণতির সাক্ষী হয়েছিল বাহাদুর শাহ পার্ক। নবাব পরিবারের উত্থান-পতন, ইংরেজদের সাথে সম্পৃক্ততার পাশাপাশি ঢাকায় শিক্ষা কার্যক্রমের সূত্রপাত ইত্যাদি বিষয়েও খুব প্রাথমিক কিছু বিবরণ আছে, তবে ছোটদের জন্য লেখা বলেই বোধহয় এসব নিয়ে বিশ্লেষণের দিকে যান নি লেখক। তবে ইতিহাসের বীজ বপন করার একটা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত পুরো বইয়েই অনুভূত হয়েছে। বারবার মনে হচ্ছিল, ব্যাপারগুলো আরো বিস্তারিত জানলে মন্দ হতো না।
ঢাকার কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আছে, যেগুলো কয়েকশ বছর পার হয়ে গেলেও খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। বুড়িগঙ্গার স্রোতে দূষণের সাথে বেড়েছে শোষণ ও শ্রেণী সংঘাত, ধনী-গরীবের ব্যবধান। সব মিলিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে, পাখির চোখে ঢাকার ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলিয়ে আসার জন্য বেশ ভাল একটা বই।
ঢাকা, যে শহর রাজধানী'র খেতাব পেয়েছিল ৪ বার। শহরের বয়স ৪০০ বছর বলা হলেও, আদতে এখানে জনবসতি অনেক পুরনো। মোগল আমলে সুবা বাংলা'র রাজধানী হয়ে যে জাঁকজমকের শুরু, সময়ে সময়ে তা মলিন হয়েছে, আবার উন্নতি-ও দেখেছে দিনে দিনে। এখনকার ঢাকায় যত জায়গার নামে বাগ, গঞ্জ, পুর, টুলি, বাজার ইত্যাদি শব্দ আছে, সবই গড়ে উঠেছিল মোগল আমলে। শহরের মাঝে দিয়ে বয়ে যেত বড় বড় খাল, বর্ষায় ভরা জলে যাদেরকে দেখাতো ভেনিসের মতো। জলপথ-ই ছিল শহরের ভেতর যাতায়াতের মাধ্যম, রাস্তা বলতে কিছু ছিল না। হাতি-ঘোড়া বাদে বাহন-ও ছি না, ঘোড়ায় টানা গাড়ি এসেছিল অনেক পরে, ঠেলা আর রিকশা আসে ইংরেজ আমলে। ঢাকায় ইংরেজ আমলের সূচনা হয় পলাশীর পরে, সেই সাথে পাল্টে যেতে থাকে শহরের নিয়মকানুন। রাজস্য আদায়ের জন্য কোম্পানি সরকার শহরবাসীকে কর দিতে বলায় তীব্র প্রতিবাদ করেছিল তারা। মোগল আমলে জঙ্গল সাফ করে বাসযোগ্য জমি বের করেছিল তারা, এখন কর দিতে হলে তারা না খেয়ে মরবে। আসলেও কি শহরের মানুষ এতই দীন ছিল? ছিল বৈকি। 'আমীর' লোকেরা পয়সা ওড়াতো, মধ্যবিত্তদের জীবন চলতো একরকম, আর দরিদ্রদের ভাত জোটাতেও কষ্ট হতো। ইংরেজদের সময়ে খালগুলো ভরাট হতে থাকে, তাতে করে শহরের আবর্জনা নদীতে বয়ে নেওয়ার পুরনো ব্যবস্থায় ছেদ পড়ে। গলিতে গলিতে নোংরা ময়লা জমতে থাকে, প্রত্যেকের বাড়ি ছিল একেকটা ময়লার ভাগাড়, এমনকি খাবার পানির একমাত্র উৎস পাতকুয়া-ও নিরাপদ ছিল না, কারণ ময়লা ফেলা হতো তার ভেতরেও। বুড়িগঙ্গা ধরে শহরে ঢোকার দুই মাইল আগে থেকে দুর্গন্ধ পাওয়া যেতো। এদিকে দৈন্যদশায় পড়েছিল ভবনগুলো-ও। জঙ্গলে আগাছায় নষ্ট হচ্ছিল মোগল আর ইংরেজ আমলের স্থাপনাগুলো, বট-শ্যাওড়ার দখলে যাওয়া এমন বাড়ির বা মসজিদের ছবি উনিশ শতকের চিত্রকর্মগুলোতে দেখা যায়। বঙ্গভঙ্গের পর ঢাকায় কার্জন হল হয়, হাইকোর্ট হয়। সাধারণ মানুষ তবু বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধেই ছিল। রদ হবার পর, আবার রাজধানী হতে ঢাকাকে অপেক্ষা করতে হয় সাতচল্লিশ অব্দি। আর স্বাধীনতার পর, চতুর্থবার রাজধানী হলো ঢাকা। মাঝে এক লম্বা সফর, গৌরবে ঝলমলিয়ে ওঠা, আবার মিতমহিমা হয়ে পড়া, শেষে উনিশ শতকের শেষদিক থেকে ধীরে ধীরে আর্থিক উন্নয়ন দেখা। তবু তার মানুষদের যে আর্থিক বৈষম্য, তা একই আছে। উচ্চবিত্তরা সমাজের নিচতলা থেকে অনেক দূরে, মধ্যবিত্তরা চালিয়ে নিতে হিমশিম খান, আর নিম্নবিত্তদের জীবন কাটে এক একটা দিন করে। পেছন ফিরে দেখতে গেলে বেশ চমৎকার একটা গল্প দেখা যায় ঢাকা শহরের। আমরা যেমন ভাবি, ঢাকার ইতিহাস আসলেই অনেক ভিন্ন ছিল। সার্বিক সমৃদ্ধি তার ছিল না, তবু এই ভাটি বাংলার রাজধানীর স্বভাবটাই ছিল আলাদা। মুনতাসীর মামুন অনেক বই লিখেছেন ঢাকা নিয়ে, তার মাঝে 'ঢাকার কথা' নামের শিশুতোষ ছোট্ট বইটি একটা গল্পের বয়ে চলা তুলে ধরে পাঠকের সামনে, যে গল্পের অধিকাংশই বর্তমান ঢাকাবাসীর কাছে হতে পারে বেশ অভাবিত।
অামাদের প্রিয় এই ঢাকা শহর সম্পর্কে অামরা কতটুকুই বা জানি? ঢাকার অতীত ইতিহাস, তৎকালীন জীবনযাত্রা, শিল্প সাহিত্যের বিকাশ এসব সম্পর্কে অামাদের ধারণা খুবই কম। অামরা জানতে চায় না তা কিন্তু নয়, এসব জানি না কারণ আামাদের জানার মাধ্যম খুবই কম। ১৬১০ সালে সর্বপ্রথম ঢাকায় রাজধানী স্থাপনের পর থেকে বুড়িগঙ্গার ধার ঘেসে শহর গড়ে উঠতে থাকে। তৎকালীন সময়ে বিশ্বের দ্বাদশ বৃহত্তম শহর ছিলো এই ঢাকা। ঢাকায় রাজধানী প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে নবাবী অামল, ইংরেজ অামলের ধারাবাহিক বর্ণনা অাছে মুনতাসীর মামুনের এই "ঢাকার কথা" বইয়ে। কিভাবে এই ঢাকা বিশ্বের দ্বাদশ বৃহত্তম নগরীর জৌলুশ অর্জন করলো নবাবী অামলে, অার কিভাবে ইংরেজি শাসনে সেই জৌলুশ জঙ্গলে রূপান্তরিত হলো তার ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে বইয়ের পরতে পরতে।
মুনতাসীর মামুনের ঢাকার কথা এমন একটি বই যেখান থেকে অামরা ঢাকার গোড়াপত্তন থেকে শুরু করে ইংরেজ শাসনের শেষ পর্যন্ত অাদ্যপন্ত ঘটনা জনতে পারবো। কোন সময়ে কি ঘটেছিলো, কিভাবে একটি নগর গড়ে উঠলো। বিস্তার অালোচনা নেই, কিন্তু প্রতিটি বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা অাছে। প্রাঞ্জল বর্ণনা অার সাবলীল লেখনী এই জানতে চাওয়া মনের রসদ জোগাবে। হইতো পরদিন অাপনি ছুটে যাবেন ফরাশগঞ্জ কিংবা বাবু বাজারে। সদরঘাট কিংবা চকবাজার ঘুরে দেখতে চাইবেন নতুন ভাবে। নীমতলির এশিয়াটিক সোসাইটি এখনো নির্দেশ করে সেইসব নবাবী মহলের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস দিয়ে চলার সময় তাকে দেখতে চাইবেন নতুন রূপে। টিএসসির মাঠে যে হলডেটে ছোট স্তম্ভ অাছে তা এখনো মনে করিয়ে দিবে গ্রিকদের সমাধি স্তম্ভের কথা। কিংবা শহিদুল্লা হলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ঈশা খানের কবরের কথা মনে করাবে নবাবী সময়ের ইতিহাস। ফজলুল হক হলের সামনের দিঘি এখনে নির্দেশ করে নবাবী নিদর্শন।
অাবার ধরুন দোলাই খালের কথা। ঢাকার ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে ছিলো এই খাল। ছিলো, কারণ এখন অবশ্য এর উপর দিয়ে পিচ ঢালা পথ। কিন্তু একসময় এই দোলাই খাল ঢাকার যোগাযোগ স্থাপনের অন্যতম মাধ্যম। ময়মনসিংহ এবং সিলেটের সাথে ঢাকার যোগাযোগ রক্ষা করতো এই খাল। বালু নদী থেকে বের হয়ে ঢাকার বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত অার খালের অারেকটি শাখা বাবুবাজারের দিকে।
এবার একটু জীবন ব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়া যাক,,
শায়েস্তা খানের দৈনিক অায় ছিলো দুই লক্ষ টাকা অার খবচ হতো এক লক্ষ টাকা। যেখানে তৎকালীন একজন উকিলের মাসিক অায় পঞ্চাশ টাকা, কেরানীর চার টাকা, তাতীর অাট টাকা, পিয়ন তিন টাকা, ধোপা-নাপিত তিন টাকার মতো। অার যারা রাজ কর্মচারী ছিলেন তাদের দু তিনশো এর মতো অায় ছিলো। তখন চাল ডাল কিংবা মাছ ছিলো খুব সন্তা। কিন্তু এখনের মতো তখনো কেও বাজার বয়ে নেওয়ার জন্য পাইক নিয়ে অাসতো। অার কেও ডাল, মাছ তো দূর নুন লবনও কিনতে পারতো না। অাজকের মতো তখনও ধনীরা টাকা উড়াতেন, মধ্যবিত্ত মোটামুটি নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করতেন, অার সাধারণ মানুষ অাজীবন ভাতের স্বপ্ন দেখে কোন রকমে চেষ্টা করতেন বেঁচে থাকার।।
নবাবী অামলে অবশ্য হিন্দু মুসলিম একসাথে বসবাস করতো। একসাথে মিলেমিশে থাকতো। হিন্দু মহিলাদের পর্দা করার প্রবনতা ছিলো না, মুসলিম নিম্নবর্গের মানুষদেরও পর্দা করতে দেখা যেত না। কিন্তু উচ্চ বর্ণের মুসলিম মহিলারা পর্দা করতেন। এমনকি বাইরে বের হলেও গাড়ির চারপাশে কাপড় ঘেরা থাকতো।
ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানের যে নাম তারও ইতিহাস অাছে। এই ধরুন চানখার পুল কিংবা সেগুন বাগিচা। যদি শোনেন খালের উপরে পুল নির্মাণ হয়েছিলো বলে এখানকার নাম চানখার পুল কিংবা সেগুন বাগান থাকার দরুন সেগুন বাগিচা তবে অবাক না হয়ে উপায় নেই। অাবার ধরুন কেন পুরান ঢাকায় একটা এলাকার নাম ফরাশগঞ্জ বা অার্মানিটলা। অথবা বাবু বাজার নামটা কেমন করে হলো বা চকবাজারই কেমন করে প্রতিষ্ঠা হলো? অার মোদ্দা প্রশ্ন হলো ঢাকার নামই বা ঢাকায় কেমন করে হলো এর ইতিহাস কি?
দুইটা স্থানের নামকরণ সম্পর্কে বলা যাক, লক্ষীনারায়ন দুইটি বাজার প্রতিষ্ঠা করলেন অার নাম দিলেন লক্ষীবাজার অার নারায়ণগঞ্জ। এই যে অামরা পিলখানা বলে চিনি বিজিবি সদরদপ্তরকে। এই নামটারও একটা ইতিহাস অদছে। ঢাকা ছিলো সেই সময়ে হাতির নগরী, প্রচুর হাতি ছিলো শহরে। বুড়িগঙ্গায় নিয়মিত গোসল করানো হতো সেই হাতিগুলোকে। সেই হাতিগুলোকে রাখা হতো এই পিলখানায়। অার হাতি রাখার স্থান হলো পিলখানা।
ঢাকাকে একসময় অাদর করে বৃক্ষের নগরীও বলা হতো। অার তোমরা একে অাধুনিক করার নামে সেই বৃক্ষগুলোকে কেটে ফেলেছো। সেগুন বাগানের নাম হয়েছিলো সেগুন গাছের সারি থেকে। জাফরানবাগ, মালিবাগ, হাজারিবাগ, রাজারবাগ এইসব নাম হয়েছিলো সুসজ্জিত বাগানের কারনে। অার ঢাকার অলিতে-গলিতে ছিলো প্রচুর মেহগনি গাছের সারি। কিন্তু পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর সেসব গাছের জঞ্জাল সাফাই করে দেওয়া হয়, খাল ভরাট করে দেওয়া হয়। এই খাল ভরাটের কারনে নগরে ঘটলো বিপত্তি। ময়লা বয়ে নিয়ে যেত এই খাল। কিন্তু খাল ভরাট হওয়ায় ময়লা জমে ঢাকায় বিশ্রী গন্ধের সৃষ্টি হলো।
এখন যেমন ধানমন্ডি টু মতিঝিল বাসে চলাচল করছেন, চারশো কিংবা দুশো বছর অাগে সেখানে চলাচল করতো নৌকা। ৭/এ তে যে পুরান হাল ধাচের একখানা মসজিদ দেখছেন সেখান থেকে সদরঘাট চলাচল করতো নৌকা। বর্ষায় ঢাকাকে মনে হতো ভেনিস। একসময় ঢাকা ছিলো বিশ্বেস দ্বাদশ বৃহত্তম নগরী। এই ঢাকা থেকে মাল বোঝায় জাহাজ অনেক দেশে না গেলে তাদের খাবার জুটতো না। অামরা এখন যেমন উপার্জনের জন্য মধ্য প্রাচ্যের দেশে যেতে চাচ্ছি, একসময় বিভিন্ন দেশ থেকে ভাগ্য অন্মেষনে বাংলায় অাসতো।
বলতে শুরু করলে তো গোটা বই বলে ফেলতে ইচ্ছে করবে। সেসব অাকর্ষন তুলে রাখলাম পাঠকদের জন্য। অাপাতত এটুকু বলতে পারি ঢাকার অলিগলির ইতিহাস, গোড়াপত্তন এবং ক্রমবিকাশ সম্পর্কে যাদের জানা নেই তাদের জন্য অাদর্শ বই মুনতাসীর মামুনের ঢাকার কথা। অবশ্য যারা একটু বেশি জানেন তাদের জন্য এই বই না। তবে সত্যি কথা বলতে এই সমস্ত ইতিহাস জানার পরেও বইয়ের সাবলীল বর্ণনা অামাকে বইয়ের মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছিলো। এটা লেখকের লেখনীর স্বার্থকতা বৈ অন্য কিছু নয়। ঢাকার ইতিহাস পাঠে অাপনাদের স্বাগতম জানিয়ে অাজ এই পর্যন্ত।
বইঃ ঢাকার কথা লেখকঃ মুনতাসীর মামুন প্রকাশনীঃ সুবর্ণ মূল্যঃ একশত টাকা