Prafulla Roy was a Bengali author, lived in West Bengal, India. He received Bankim Puraskar and Sahitya Akademi Award for his literary contribution in Bengali.
অন্তত মাসখানেক আগে লেখার কথা ছিলো। অথচ লিখছি আজ, লেখকের মহাপ্রয়াণের পর। বর্তমান বাংলাদেশের সমৃদ্ধশালী অঞ্চল মুন্সীগঞ্জ বা বিক্রমপুরের বাসিন্দা ছিলেন প্রফুল্ল রায়। মোটামুটি রূপকথার মতো শৈশব ছিলো তার। মানুষজন ছিলো বড়ো বেশি ভালো, বড়ো বেশি সাহায্যপ্রবণ। অন্য এলাকার দরিদ্র এক স্কুলের পুরো এক ব্যাচ ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী আর তাদের শিক্ষকদের লেখকের গ্রামের মানুষ মাসভরে যেভাবে যত্ন আতিথেয়তা দেখিয়েছে তা অবিশ্বাস্য। প্রফুল্ল রায়ের প্রধান গুণ তার স্বাদু গদ্য।সরল কিন্তু নাটকীয় ঢঙে বলে চলেন তিনি। সাধারণ ঘটনাও হয়ে ওঠে অসাধারণ। দাদুর সাথে প্রথমবার হাটে যাওয়ার ঘটনাই ধরা যাক। হাটের বর্ণনা এতো বিস্তারিত আর জীবন্তভাবে লেখা যে মনে হয় আমি নিজেই সেখানে চলে গেছি। ব্রিটিশ আমলে হিন্দু মুসলিম সুসম্পর্কের ছবিও খুব অবাক করে দ্যায়। প্রচুর ভালো ভালো ঘটনার পাশে মাত্র একটা ঘটনা থেকে মানুষের পশ্চাৎপদতার পরিচয় পাওয়া যায়। এক ধর্মগুরুর গ্রামে আগমন, তার জন্য রাজকীয় অভ্যর্থনা, লেখকের গুরুকে সম্মান জানাতে অস্বীকৃতি,পরে এজন্য বেদম প্রহার খাওয়া মুদ্রার অপর পিঠ দেখায়।
বইয়ের শেষে আছে গ্রামের এক বিয়ের বর্ণনা। সত্যি বলতে বিয়েতে নাটকীয় তেমন কিছুই হয়নি কিন্তু পুরো গ্রাম একাট্টা হয়ে যে উদ্দীপনার সাথে এই উৎসবকে নিজের করে নিয়েছিলো তা বর্তমানে অচিন্তনীয়। ( আমি সবচেয়ে কষ্ট পেয়েছি বিয়ে করার জন্য বর এক মাসের ছুটি পেয়েছিলো এটা পড়ে। হা হা। একমাসের ছুটি! ভাবাই যায় না। জীবন কতো সহজ ছিলো!) রানী চন্দ'র "আমার মা'র বাপের বাড়ি" আর এ বই পড়ে মনে হচ্ছে, "সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা" বাঙলার অতিরঞ্জিত ধারণা কিছুটা হলেও সত্য ছিলো।
কিছু বই পড়তেই আরাম লাগে। এটা সেরকম ধাচের বই। লেখক প্রফুল্ল রায় তার শৈশবের নানান মধুর স্মৃতির কথা বলেছেন এতে। ঘটনাগুলো গত শতকের চল্লিশের দশকের, ঢাকার দক্ষিণ অংশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ইছামতীর পার্শ্ববর্তী এক গ্রামের।
আশি বছর আগের যে গ্রাম ও তার অবস্থার বর্ণনা এসেছে তা খুব একটা অপরিচিত নয়। কিন্তু আমাকে মুগ্ধ করেছে তাদের মধ্যকার সম্প্রীতি। গ্রামের একজনের বিয়ে অথচ আয়োজনে হাত লাগাচ্ছে সবাই, বিয়ের খরচা থেকে শুরু করে কনেপক্ষকে আপ্যায়ন সমস্ত কিছুতেই সরব উপস্থিতি। যেন এ দায়িত্ব, উৎসব সকলেরই। মেট্রিক পরীক্ষা দিতে আসা জনা চল্লিশেক ছাত্রের পুরো পরীক্ষার সময়কালীন থাকা-খাওয়া ও দেখাশোনার জন্য পুরো গ্রামের উদারতার গল্প তো এখন রীতিমত অলীকের মতোই শোনায়।
এছাড়া বেশকিছু টুকরো ঘটনা পাওয়া গেল বইতে। অতো বছর আগে গ্রামে একটা সমৃদ্ধ লাইব্রেরি থাকা, সেই লাইব্রেরির দেখাশোনাতেও একজন গুণী ব্যাক্তি থাকার ব্যাপারটা অবাক করেছে। বইপড়ার গল্পের পাশাপাশি স্কুল ও স্কুলের শিক্ষকদের কথা আছে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল বলে তা নিয়ে পাড়াগায়ে মানুষের ভাবনার একটা অংশও আছে। সিনেমা দেখতে আসতে হতো ঢাকা শহরে। কোনো ভালো সিনেমা হলে তার গল্প,গান মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়তো পুরো গ্রামে। সিনেমা কেন্দ্রিক উন্মাদনা নিয়েও কিছু ঘটনা পাওয়া যায়। বড় বাজার মানে গঞ্জে যাওয়া ও সেখানকার স্মৃতিচারণ আছে। সাথে তখনকার সময়ে জিনিসপত্রের দাম। ভাবতে খারাপ লাগে যে অসম্ভব কম দামে এতো এতো জিনিস পাওয়া যেত তবুও কতো মানুষকে না খেয়ে মরতে হয়েছে।
কিছু চরিত্র ঘুরেফিরে বারবার এসেছে বইতে। তন্মধ্যে গ্রাম্য কবিরাজ ত্রিলোচনের যে বর্ণনা দিয়েছেন তা রীতিমতো ঈর্ষণীয়। তার অল্প কিছু পথ্য দিয়ে রোগী সাড়ানোর দুর্দান্ত ক্ষমতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন অসম্ভব ভ্রমণপিপাসু। তিনমাস রোগী দেখে এরপর একমাসের বিরতি। এ সময়টায় সস্ত্রীক দেশ বিদেশ দেখতে বেরিয়ে পড়তেন। ফিরে এসে আসর জমিয়ে বলতেন তাদের রোমাঞ্চকর সেসব ভ্রমণ কাহিনী।
লেখকের ছেলেবেলা কেটেছে তার মামাবাড়িতে। তার বড় দাদু ছিলেন গ্রামের কর্তাব্যাক্তির একজন। নানান ব্যাপারে তার নিকট নিয়মিতই লোকজনের আনাগোনা ছিলো। সেই সুবাদে গ্রামের কোথায় কী হচ্ছে তার খবর লেখক বাড়িতে বসেই পেয়ে যেতেন। আর কৌতুহলের বশে সমস্ত কিছুই ঘুরে ঘুরে আদ্যোপান্ত দেখতেন। এই চমৎকার সব ঘটনাবলী বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার। তবে লেখকের স্বাদু গদ্য এসব ঘটনাকে আরো উপভোগ্য করে তুলেছে। পড়ার পর মনে হয় এমন শৈশবও বুঝি কারো ভাগ্যে জুটে?
লেখক প্রফুল্ল রায়ের জীবনেরই টুকরো টুকরো ঘটনা নিয়ে লেখা "বিন্দু মাত্র " বইটা পড়ে জেনেছিলাম উনার লেখা " শতধারায় বয়ে যায়" ও "উত্তাল সময়ের ইতিকথা" বইটা লেখার জন্য কোথায় কোথায় গেছিলেন, কাদের সাথে দিনের পর দিন বসবাস করেছিলে। আর এই বইটা পড়ে জানতে পারলাম "কেয়া পাতার নৌকো" বইটাতে যে গ্রামের বর্ণনা, বিনুর শৈশবটা আসলে লেখকের নিজেরই। আশ্চর্য সুন্দর এক অনুভূতি হয়, যখন জানতে পারা যায় লেখক নিজের জীবনেরই ঘটনা উপন্যাসের মধ্যে তুলে ধরেছেন।
অখন্ড বাংলার ঢাকা জেলার একটি গ্রামে জন্ম ও বেড়ে ওঠা লেখকের। মূলত মামা বাড়ীতেই জন্ম এবং শৈশব ও কৈশোর কাটে। প্রতিটি ঋতু পরিবর্তনে গ্রামের রুপ ও বৈচিত্র্যর পাশাপাশি হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মধুর এক সম্পর্ক।
চল্লিশের দশকের সেই সময়টাতে কেমন ছিল নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম, একে অন্যের সাথে সম্পর্ক, ছোট বেলার ইচ্ছা, আনন্দ, পড়ালেখা, দেশ ও দেশের বাইরের হালচাল, গ্রাম বাংলায় বিচিত্র বিষয় ও সৌন্দর্য নিয়ে টুকরো টুকরো ঘটনা স্মৃতি হাতড়ে লিখেছেন এই বই " যখন যা মনে পড়ে"।
বইটি মুলত স্মৃতিকথা। কী চমৎকার এক জীবন কাটিয়েছেন লেখক। মায়াময় এক পরিবেশে। স্মৃতিতেও যেন সেই মধুরতা লেগে আছে। লেখকের যা পড়ি তাই ভাল্লাগে।
প্রফুল্ল রায় তার বাল্যের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আমাদের নিয়ে যান ঢাকার বিক্রমপুরে।
এক আদর্শ গ্রাম। হিন্দু-মুসলমান মিলে-মিশে থাকে একত্রে। একজন খোঁজ নেয় আরেকজনের বিপদে-আপদে। বইয়ে দেওয়া এক বিয়ের আদ্যোপান্তই সকলের সম্পর্ক কেমন ছিল তা বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়। পড়তে গেলে বারবার মনে হয়, এক যেন রূপকথার গ্রামের বর্ণনা শুনি।
গতমাসে প্রফুল্ল রায়ের দেশভাগ ট্রিলজির ১ম বই 'কেয়াপাতার নৌকো' পড়ার সময় ভাবছিলাম বিনুর ছোটবেলাটা কি ভীষণ রকমের সুন্দর ছিল।
প্রফুল্লবাবুর স্মৃতিকথা 'যখন যা মনে পড়ে' পড়ে হতবাক হয়ে দেখলাম প্রফুল্লবাবু তার নিজের ছোটবেলাটাই যেন কপি পেস্ট করে বিনুকে দিয়ে দিয়েছেন।
ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের ইছামতি নদীর তীরে মামাবাড়িতে কেটেছে তার শৈশব ও কৈশোরকাল। কি অসম্ভব সুন্দর একটা সময় যে তিনি কাটিয়েছিলে��। ত্রিশের দশকে গ্রামে পাঁচ হাজার বইয়ের সংগ্রহ নিয়ে ছিল লাইব্রেরি। বাবা কাকারা ত বটেই মা মাসিমারাও বই পড়তেন। গায়ের মানুষ অভাব কাকে বলে জানতো না। একবার মুন্সিগঞ্জের ৩৯ জন ছাত্র শিক্ষক গিয়ে গায়ে হাজির হয় কারন ঐসময়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষার সিট পরেছিল ঐ গায়ে। গায়ের মুরুব্বিরা কাউকে ফেরাননি। কয়েক বাড়ি মিলে তাদের সবাইকে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। আজকাল এমন কিছু ভাবাই যায় না। এই বই নিয়ে মেলা মেলা কিছু বলা যেত আমি অত গুছিয়ে লিখতে না পারায় সেটা হয়ে উঠলো না
এই জীবনে দুজন মানুষের ছোটবেলা দেখে ভীষণ লোভ হয়েছে একজন হচ্ছেন এই প্রফুল্ল রায় আরেকজন হচ্ছেন সামরান হুদা। সব কিছু মিলিয়ে কি ঐশ্বর্যময় ছেলেবেলা কাটিয়েছেন তারা।
সুন্দর একটা বই (যদিও অসমাপ্ত) প্রফুল্ল রায়ের ছোটবেলাটা যেন জীবন্ত হয়ে আছে বইয়ের পাতায় পাতায়। চল্লিশের দশকের চিত্র... পড়লে মনে হয়, জীবন তখন কতোটা সহজ সরলই না ছিল... আবার হতেও পারে লেখকের লেখার গুণে সময়টা আরও বেশি জ্বলজ্বলে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এককালে বাঙ্গালিদের আতিথেয়তার জন্য বেশ নাম ছিল.. এই বইয়ে উঠে এসেছে তার প্রমাণ। উৎসব কিংবা অন্যান্য যে কোন কিছুতে হিন্দু-মুসলিম একসাথে যেভাবে মেতে উঠত... আসলে তখনকার চিত্রটাই ছিল সেরকম। সেরকম হৃদ্যতার সম্পর্ক থেকে দেশভাগের আগপিছু সময়টার সহিংসতা কিংবা বিভীষিকার মুহূর্তগুলো আসলে মিলানো যায় না। সুন্দর একটা বই।
বি.দ্র. হারুন ভাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ পড়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য।
"ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলি"র একটা আদর্শ পরিচয় এই স্মৃতিকথায় পেলাম। শঙ্খ ঘোষের "ছোট্ট একটা স্কুল" ঘরানার লেখা, পড়তে খুবই মজার। এখানে প্রধান উপজীব্য গত চল্লিশের দশকের অবিভক্ত বাংলার (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলার) এক গ্রাম। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটা খুব সুন্দর চিত্র পুরোটা কাহিনী জুড়ে বারবার ফুটে উঠেছে। গ্রামের সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে একত্রে সিদ্ধান্ত নেয়া, অতিথিপরায়ণতা, ছাত্রদের শিক্ষার প্রতি শিক্ষকদের যত্নশীল সান্নিধ্য, হাল আমলের সিনেমা দেখার কাহিনী, বিশ্বযুদ্ধের সময় আমাদের গ্রামীণ জনপদের মানুষের চিন্তা ভাবনা আর স্বল্প শিক্ষিত মানুষের মাঝে ক্ষয়িষ্ণু ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সচেতনতা - এসব কাহিনী সুন্দর গল্পের বুননে উঠে এসেছে। কয়েকটা কাহিনী আলাদাভাবে বলতেই হয়: এক কবিরাজ ছিলেন, যিনি মোটামুটি সর্ব রোগের ঔষধ দিতে পারতেন। ভদ্রলোক প্রতি তিন মাস গ্রামগঞ্জে চিকিৎসা দিয়ে একমাস সস্ত্রীক ভ্রমণে বের হতেন। সেই ভ্রমণ শেষে আবার গ্রামবাসীকে দেশ-বিদেশের আশ্চর্য সব অভিজ্ঞতা শোনাতেন। দূরবর্তী গ্রাম থেকে একবার ৪০ জন ছাত্র শিক্ষকের একটা বড় দল গ্রামে এসে উপস্থিত হলো মেট্রিক পরীক্ষা দেয়ার জন্য। পুরোটা সময় জুড়ে গ্রামের সব মানুষ মিলে তাদের নাওয়া খাওয়া - যত্নের সাথে দেখভাল করেছেন: যেটা এই সময়ে আমরা প্রায় চিন্তা করতে পারিনা। গল্পের সবথেকে আকর্ষণীয় কাহিনী হচ্ছে একটা বিয়ে। রাতে রাতে বিয়ে ঠিক করে বিশাল অনুষ্ঠান আয়োজনে গ্রামের সব মানুষের দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিয়ে আনন্দে মেতে ওঠা - আমাদের সুবর্ণ অতীতের পরিচায়ক। জেনে অভিভূত হয়েছি - তখনকার সময়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গ্রামে একটা পাঠাগার ছিল।
ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৪.৫/৫ খুব মন কেমন করা, বিষণ্ণ দিনে আমার বরাবরই অতীতভ্রমণে বের হতে ইচ্ছে করে৷ টাইমমেশিন তো হাতের কাছে নেই সত্যি সত্যি, তাই বইয়ের মতো চিরন্তন টাইমমেশিনেই ভরসা রাখতে হয়। আর সেই মেশিন কখনোই ভুল জায়গায় নিয়ে যায় না৷ প্রফুল্ল রায়ের দেশভাগ সিরিজ এর নামডাক অনেক শুনেছি, কিন্তু দুর্ভাগ্য যে তাঁর কোন লেখাই তখনো পড়া হয়ে ওঠে নি। তাই যেদিন বাতিঘরে এই চমৎকার মনকাড়া প্রচ্ছদওয়ালা স্মৃতিকথাটা দেখলাম, দুবার না ভেবে অর্ডার করে দিলাম৷ এমন একেকটা কাভার মনটা অর্ধেক ভালো করে দেয় আসলে৷ আর লেখার স্বাদুতা সেই ভালো লাগাকে বাড়িয়ে দিল চতুর্গুণ। বইটা প্রথাগত আত্মজীবনী ঠিক নয়, বরং লেখকের শৈশবের টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলোকে একসাথে করে একটা সুন্দর সময়ের বর্ণনা। পূর্ব বাংলার আদি সময়টা আসলে কত যে উপভোগ্য ছিল, আর পূর্ব বাংলার একজন মানুষ হিসেবে সেটা আরেকটু বেশিই যেন হৃদয় জুড়ায় আমার৷ জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদী-খালের মাঝে ঢাকার এক গ্রামে আধ বিঘে জমির উপর লেখকের চার দাদুর একত্রে বাড়ি। গমগম করছে সবসময় মানুষজন। হিন্দু-মুসলিমনির্বিশেষে সবার সাথে সবার ভালো সম্পর্ক। কে কার বাড়ি যাচ্ছে, কে আসছে খেয়াল রাখছে না কেউ, বরং গোটা গ্রামটাই একটা পরিবার। সেইসব দিনে আসলে রূপকথার মানুষদেরই বাস৷ গ্রামের চৌকিদার পাগলাটে ভালোমানুষ মকবুল কিংবা গান্ধীবাদি, আধুনিকচেতা যোগেশ মামার স্মৃতি আজো সমুজ্জ্বল লেখকের স্মৃতিতে৷ সেকালের শিক্ষকদের আন্তরিকতার জুড়ি মেলা ভার। ম্যাট্রিক পরীক্ষার সেন্টার দূরে পড়ায় নিশানাথ মাস্টার তাঁর চৌত্রিশজন ছাত্রসহ গ্রামে পরীক্ষা শুরুর তিন দিন আগেই থাকতে চলে এলেন৷ অন্যান্য শিক্ষক সহ মোট ৩৯ জন মানুষের জায়গা দেয়া কি মুখের কথা! কিন্তু অতিথি নারায়ণ, তাঁদের যত্নের ত্রুটি হতে দেয়া যাবে না। তাই লেখকের দাদু এবং আরো কজন মান্যগণ্য ব্যক্তি মিলে ৩৯ জন অতিথির থাকার ব্যবস্থা করে দেন৷ তখনকার শিক্ষকেরা এমনই ছিলেন, ছাত্র অন্তঃপ্রাণ। অথচ ছেচল্লিশের দাঙ্গায় এই শিক্ষককেই প্রাণ দিতে হয় নির্বিচারে। বিপ্লবী যতীন ভট্টশালীর আগমন ছিল বিশেষ কিছু। ছোটখাট কিন্তু অসমসাহসী এই বিপ্লবী গ্রামের নিস্তরঙ্গ জীবনে যেন জোয়ার এনে দিয়েছিলেন৷ লেখকের বিমল মামার বিয়ের গল্প শুনে ইচ্ছে হচ্ছিল ইস, লেখকদের বালকদলে যদি আমিও জুটতে পারতাম। কী যে মনোহর বর্ণনা! গ্রামের হাটে বাজার করার অভিজ্ঞতা, গ্রামে প্রথম সিনেমা আসার গল্প, স্কুলের গল্প, ত্রিলোচন কবিরাজের দেশভ্রমণের গল্প, লেখকের বেরিবেরি রোগ থেকে সেরে উঠার গল্প, নানা ডানপিটেমোর কাহিনী সব মিলিয়ে জমজমাট এক স্মৃতিকথা যা পাঠককে এক মোহময় আবেশে ডুবিয়ে রাখে। পূর্ববাংলার গ্রামীণ সোনাঝরা দিনগুলো যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বইটির প্রথম খণ্ড এটি, জানিনা আর আসবে কিনা বা চলে এসেছে কিনা৷ দ্বিতীয় খন্ডটি হয়তো এত আনন্দময় হবে না কারণ শৈশবের চেয়ে সুখময় মানুষের জীবনে আর কিছুই হতে পারে না।
স্মৃতিকথা পড়তে বরাবরই আমার ভালো লাগে। বিখ্যাত, স্বল্প বিখ্যাত, অখ্যাত সবার জীবন থেকেই কমবেশি মনে রাখার মতো বা আনন্দদায়ক ঘটনা পাওয়া যায়। প্রফুল্ল রায়ের 'যখন য মনে পড়ে' তেমনই টুকরো টুকরো কিছু জীবনের স্মৃতির সমাহার। নিতান্ত সাধারণ ঘটনাও যে লেখনীর মাধ্যমে অসাধা���ণ, উপভোগ্য করে তোলা যায় তার প্রমাণ এই বই। বইটা আবার কখনো পড়ে দেখার চেষ্টা থাকবে।
স্মৃতিকথার প্রতি আমার পক্ষপাত সবসময় প্রকট। হাতের কাছে যুৎসই একটা বই পেলেই অমনি পড়া চাই। স্মৃতিকথার সবচেয়ে মোহনীয় দিক হলো- লেখকের বিক্ষিপ্ত, খণ্ড খণ্ড জীবনস্মৃতির আদলে পাঠক নিজ জীবনের স্মৃতিরোমন্থনের সুযোগ পান। পেছনে ফেলে আসা সেইসব দিনগুলোতে ফিরে যাওয়���র সম্ভাব্য সহজতর মাধ্যম স্মৃতিকথা। আমাদের প্রায় সবারই জীবন এক ও অভিন্ন সুতোয় গাঁথা; এই যোগসূত্র আবিষ্কারের আনন্দই বোধহয় স্মৃতিকথার আসল সার্থকতা ও সৌন্দর্য।
প্রফুল্ল রায়ের শৈশব-কৈশোর কেটেছে অখণ্ড বাংলার ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের আটপাড়ায়। পূর্ববঙ্গের অসংখ্য নদ-নদী, খালবিল আর দিগন্তজোড়া সবুজের সমারোহ যেন গুণীশিল্পীর জলরঙের চিত্র অপেক্ষা বর্ণিল ও স্বপ্নীল। কিংবদন্তির বাংলার চিত্র (গোয়ালভরা গরু, গোলাভরা ধান আর পুকুরভরা মাছের) দেখতে পাই পুরো বইতে। সেইসাথে অসাম্প্রদায়িক বাংলার জনজীবনও চোখে পড়ার মতন।
গ্রামের চৌকিদার মকবুলমামু'র চরিত্রকে লেখক এত সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন, সত্যিকারের রক্তমাংসের মানুষ বলে বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হয়। তার সংলাপ, পরহিতব্রতী মনোভাব, সারল্য, আনন্দদানের ক্ষমতা শক্তিমান কাল্পনিক চরিত্রকে ছাপিয়ে যায় যেন।
যোগেশমামা'র লাইব্রেরি একইসাথে বিস্মিত ও মুগ্ধ করেছে। তিরিশ-চল্লিশের দশকে কোনো অজপাড়াগাঁয়ের লাইব্রেরিতে ৫ হাজারের বেশি বই-ম্যাগাজিন থাকা চাট্টিখানি কথা নয়।
দোর্দণ্ডপ্রতাপ অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার আশুতোষ স্যার, তাঁর জোড়াবেত ও সিনেমাকাণ্ড বইয়ের অন্যতম সেরা অংশ (এই অংশটা ৩ বার পড়েছি। অবাক হয়েছি এমন সিনেমাপ্রীতি দেখে। এত ভয়াবহ শাস্তি এখনকার দিনে কল্পনাও করা যায় না)।
এরপর আসে এলাকার ঘোড়সওয়ার ধন্বন্তরি ত্রিলোচন কবিরাজের কথা। এমন ভ্রমণপিয়াসী কবিরাজ তথা মানুষের কথা কে কবে শুনেছে আমার জানা নেই! প্রতি তিনমাস রোগীদেখা এবং পরবর্তী এক মাস নিয়ম করে (বাধ্যতামূলকভাবে) সস্ত্রীক, সবান্ধবে দেশভ্রমণে বেড়িয়ে পড়া। তার গল্পের আসর কম কৌতূহলোদ্দীপক নয়।
এই বইয়ের অন্যতম আকর্ষণ হাটের বর্ণনা। এই অংশটা ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে ওঠে; একেই বোধহয় বলে চিত্ররূপময়। হরেকরকমের মাছ, তরিতরকারির প্রাচুর্য আর অবিশ্বাস্য সস্তা মূল্যে রীতিমতো অবাক হতে হয়। হাটের সবচেয়ে হাস্যরসাত্মক দিক হলো লেখকের প্রথম দরকষাকষির বিদ্যা ঝালিয়ে নেওয়া আর জগজ্জননী মহাকালী ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী নিত্যানন্দ বসাকের কাকুতিমিনতিপূর্ণ কথোপকথন। এরপর আসে কাগা-বগার উন্মত্ত ঢেঁড়াপেটানো এবং চা, ডালডার চমকপ্রদ ও অভিনব প্রমোশন।
বইটা বারবার পড়ার মতো। আবার কখনও সময় করে পড়বো।
★ ৪.৫/৫
*** আঞ্চলিক ভাষার ট্রান্সলেশন অত্যধিক বিরক্তিকর। এত ব্রাকেটের ব্যবহার বইয়ের সৌন্দর্য অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে।
পুরো ৩৪ জন মেট্রিক পরীক্ষার্থী সাথে ৫ জন শিক্ষক, কুল্যে ৩৯ জন মানুষ আকস্মিক এক গ্রামে উপস্থিত হয়ে অনুরোধ করছেন তাদেরকে যেন সেই গ্রামে পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত থাকতে দেওয়া হয়। নিজেদের গ্রাম অনেক দূরে। সেখান থেকে প্রতিদিন যাওয়া আসা করে, দিনে দুটো পেপার পরীক্ষা দেওয়া তাও আবার এক টানা, এ তো সম্ভব নয়। তা এমন অনুরোধ সেটা যতই মানবিক হোক, কেউ কি রাখতে পারে? ৩৯ জন মানুষকে সপ্তাহভর রাখা, তাদের খাদ্য, পরীক্ষার্থীদের দুধ ডিমের ব্যবস্থা কি কেউ করে?
এখন অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে কিন্তু প্রফুল্ল রায়ের ছেলেবেলায় এমনই হয়েছিল। অবশ্য যে গ্রামের মানুষেরা সকলে সবাইকে আত্মীয় ভাবে, একজনের বিপদে আপদে আরেকজন এগিয়ে যেতে যারা এতটুকুও দ্বিধা বোধ করেনা তাদের কাছ থেকে তো এমন ভব্য আচরণ আশা করাই যায়।
অবশ্য, তখন যে জাত পাতের বালাই একেবারেই ছিল না এমন নয় কিন্তু। তবে বরাবরই পূর্ববঙ্গের উচ্চ শিক্ষিত ও ধনী শ্রেণীর মধ্যে ধর্ম নিয়ে পারস্পরিক ঝামেলা ছিল না। বলা যেতে পারে একজন ধনী হিন্দুর এক জন ধনী মুসলমানের সাথে বসতে খেতে অসুবিধা না থাকলেও গরীব মুসলমানের সাথে বসতে খেতে অসুবিধা ছিল। অর্থ্যাৎ বৈষম্য টা যতটা না ধর্মের বা সাম্রদায়িক তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থনৈতিক।
আমরা ছোটবেলায় যে সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা গ্রামের কথা পড়েছি, যেখানে হিন্দু-মুসলমান সবাই মিলে মিশে বাস করে, প্রফুল্ল রায়ের নানাবাড়ি, আটপাড়া গ্রামটি ঠিক তেমনই। ভাবা যায়, সেই আমলে এই গ্রামে পাঁচ হাজারের বেশি বই সমৃদ্ধ একটি লাইব্রেরী ছিল। সেখান থেকে বই নিয়ে গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতারা পড়ত, বই নিয়ে আলোচনা করত। লাইব্রেরী তে কোন বই আসবে বা আসবে না এসব নিয়ে সবার মত প্রকাশের সুযোগ ছিল। এমনই অসাধারণ ছিল আটপাড়া গ্রামটি।
প্রফুল্ল রায়, তার শৈশবের সময়টুকু ধরে রেখেছেন এক নহর মধু মিশিয়ে, প্রাঞ্জল লেখনীর মাধ্যমে। এই বই পড়ে রায়সাহেবের ছোট বেলাকে ঈর্ষা না করে পারা যায় না। তিনি সেই সময়ের কথা লিখেছেন যখন টাকায় দুই-আড়াই কেজি সাইজের পাঁচটা ইলিশ পাওয়া যেত সাথে একটা ফাও! এমন অনেক মজার, মধুর, স্নিগ্ধ স্মৃতির সমন্বয়ে বইটি লেখা হয়েছে। পড়তে গিয়ে পাঠকের মন সুন্দর এক মায়ায় ভরে যায় আবার এক দুঃখবোধ ও সৃষ্টি হয় যে, আমার নিজের দেশ এত সুন্দর ছিল? সত্যিই?
৪৭-এর দেশবিভাগের শিকার যারা হয়েছেন, সেইসব লেখকদের কলমে ঘুরেফিরে এর দীর্ঘঃশ্বাস সবসময়ই চলে আসে... আ-শৈশব যে জন্মভূমিতে বেড়ে উঠা, তাকে পেছনে ফেলে চলে যেতে হওয়ার যে প্রগাঢ় বেদনা, তারা তা কখনোই ভুলতে পারেন নি। পারা সম্ভবও নয়।
প্রফুল্ল রায়ের এ বইটি দেশবিভাগের আগে ইছামতি নদীর তীরে বিক্রমপুরের এক অজপাড়া গাঁয়ে কাটিয়ে যাওয়া লেখকের শৈশবের টুকরো টুকরো আখ্যান। জীবনের অনেকটুকু পথ পাড়ি দেয়ার পর লেখক এখানে স্মৃতি রোমন্থণ করেছেন পরম মমতা আর আন্তরিকতায়। সহজ-সরল গ্রাম্য যে জীবনের যে কথা আমরা শুনে এসেছি বইয়ের পাতায় আর গানে, এ তার-ই গল্প। যদিও আজকের পরিবর্তিত বাস্তবতায় দাড়িয়ে একে এখন মনে হয় রূপকথা।
ছোট ছোট লেখাগুলো থেকে তৎকালীন গ্রামীন জীবন, সংস্কৃতি আর সৌহার্দ্যের খন্ড খন্ড চিত্র পাওয়া যায়। বইটা পড়তে পড়তে পাঠক যেন চোখের সামনে দেখতে পাবেন আমাদের জাতিস্বত্বার অতীতের গল্প। ভালো লাগবে, মন বিষন্নও হবে।
একটা বইটাতে ঘাটতি আছে বলে আমি বলবো। লেখক এখানে সচেতনভাবে গ্রামীণ সমাজের অন্ধকারদিকগুলোর কথা এড়িয়ে গেছেন। পরম সামাজিক আন্তরিকতার মাঝেও ধর্মীয় বিভাজনের প্রসঙ্গটা তিনি এনেছেন সত্য, কিন্তু আরও বহু কিছুই আসতে পারতো। অবশ্য এজন্যে লেখককে দোষ দেয়া যায় না। মানু্ষ যখন স্মৃতির সাগর হাতড়ায়, তখন সে হীরে-মুক্তোই তুলে আনতে চায়। কাঁদা নয়।
"যখন যা মনে পড়ে" বইটি লেখক প্রফুল্ল রায় এর লেখা। বইটি আসলে লেখকের বাল্যকাল এবং কৈশোর কাটানো অখণ্ড বাংলার বৃহত্তর ঢাকা জেলার একটি গ্রামের স্মৃতিকথা। গ্রামটি ছিল তৎকালীন বিক্রমপুরের আটপাড়া (লেখকের মামাবাড়ি)। লেখকের ছোটবেলার এই স্মৃতিচারণ আমার নিজের জেলার তৎকালীন শান্ত, স্নিগ্ধ, ও মায়াবী এক প্রতিচ্ছবি। সেকালে প্রতিটা গ্রাম যেন ছিল একেকটা বড় পরিবার। বিভিন্ন পুজা, বিয়েসহ আরো অনেক পালাপার্বণে সবাই সবাইকে কতটা আপন করে নিয়েছিল। আমার বিশ্বাস, এটি শুধুমাত্র আমার জেলার একটি গ্রামের না, সেকালের বাংলাদেশেরই প্রতিচ্ছবি।
আমার মেমোয়ার পড়তে ভীষণ ভালো লাগে। এমনও হয়, কোনো লেখকের অন্য কোনো বই না পড়লেও আমি তাঁর মেমোয়ারটা ঠিকই পড়ে ফেলি। লেখকদের জীবন, তাঁদের শৈশব, চারপাশের মানুষজন—এসব জানতে পড়তে আমার আলাদা একটা টান আছে। এই বছর বেশ কয়েকটা স্মৃতিচারণমূলক বই পড়া হয়েছে।
এই বইটা কেনার পেছনে মূলত সুন্দর হলুদ কভারটাই কারণ ছিল। তবে কভার দেখে কেনা হলেও পড়ে ভীষণ আরাম পেয়েছি। প্রফুল্ল রায়ের শৈশবটা যেন একেবারে রূপকথার গল্প—যেখানে হিন্দু-মুসলিমের কোনো ভেদাভেদ নেই। বিয়ের সময় পুরো গ্রামের মানুষ একসঙ্গে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে। পাশের গ্রামের ৩০–৩৫ জন ছাত্র-শিক্ষকের থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে পুরো ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময়টাতেই। খুব সাধারণ একটা বিয়েকেও প্রফুল্ল রায় তাঁর সুন্দর, সহজ গদ্যের মাধ্যমে অসাধারণ আর ভীষণ উপভোগ্য করে তুলেছেন। পিঠা-পুলি আর মিষ্টান্নের বর্ণনাগুলো ছিল অসম্ভব লোভনীয়।
শেষ এমন অনুভূতি পেয়েছিলাম সামরান হুদার শৈশবকাহিনি: অতঃপুর অন্তপুরে পড়ে, একেবারে ছবির মতো লেখা। এই বইটা পড়তে গিয়ে মনটা একটু খারাপও হয়ে গিয়েছিল। আমাদের গ্রামেও একটা হিন্দুপাড়া আছে। ছোটবেলায় পুজো কিংবা বিয়ের সময় আমরা কয়েকজন পিচ্চি মিলে আম্মুদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সেখানে ঘুরতে যেতাম। কখনো দাদুর সঙ্গে, আর হেমদিদিমার মতো আরও কয়েকজন দিদিমা আমাদের ঘরে বানানো নানান মিষ্টান্ন খেতে দিতেন। আহা! সেসব এখন আর কল্পনাও করা যায় না।