Shankha Ghosh (Bengali: শঙ্খ ঘোষ; b. 1932) is a Bengali Indian poet and critic. Ghosh was born on February 6, 1932 at Chandpur of what is now Bangladesh. Shankha Ghosh is regarded one of the most prolific writers in Bengali. He got his undergraduate degree in Arts in Bengali language from the Presidency College, Kolkata in 1951 and subsequently his Master's degree from the University of Calcutta. He taught at many educational institutes, including Bangabasi College, City College (all affiliated to the University of Calcutta) and at Jadavpur University, all in Kolkata. He retired from Jadavpur University in 1992. He joined the Iowa Writer's Workshop, USA in 1960's. He has also taught Delhi University, the Indian Institute of Advanced Studies at Shimla, and at the Visva-Bharati University. Awards: Narsingh Das Puraskar (1977, for Muurkha baro, saamaajik nay) Sahitya Akademi Award (1977, for Baabarer praarthanaa) Rabindra-Puraskar (1989, for Dhum legechhe hrit kamale) Saraswati Samman for his anthology Gandharba Kabitaguccha[1] Sahitya Akademi Award for translation (1999, for translation of raktakalyaan) Desikottam by Visva-Bharati (1999) Padma Bhushan by the Government of India (2011)
"আবারও কি তবে হারিয়ে ফেললাম বইখানা? আগেও হারিয়েছিল একবার। সেটা টের পাবার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়েছিল অল্প বয়সের একটা অংশই যেন হারাল আমার জীবন থেকে। সেটা-যে বইয়ের ভিতরকার কোনো মহিমার জন্য, তা কিন্তু নয়। সেটা তার চারপাশে ঘিরে থাকা অনুষঙ্গের জন্য। ভিতরের কথাগুলি ছাড়াও আরো কত সম্পদ থাকে বইয়ের, থাকে কত ব্যক্তিগত মুহূর্তের স্তবকে স্তবকে খুলে-যাওয়া স্মৃতি, কোনো একখানা বই হাতে নিলে যেন কোনো নিজস্ব জীবনাংশই জেগে ওঠে তাই। কোনো বইয়েরই তাই কোনো বিকল্প-বই হতে পারে না, একই সংস্করণের একই মুদ্রণের হলেও হয় না তা। প্রত্যেকটা বই-ই জেগে থাকে তার একলা গরিমায়, একক ইতিহাসে।"
ছোটবেলায় আমার সবচেয়ে প্রিয় বই ছিলো সুকুমার রায়ের "রচনাসমগ্র।" এ বইটা শেলফে রাখার দরকার পড়তো না। সৎপাত্র, সাধে কি বলে গাধা- জাতীয় কবিতাগুলো পড়ে কতবার যে ছোটবোন, ছোটমামা আর খালার সাথে হেসে গড়াগড়ি খেয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। কবিতার সাথে পাগলা দাশু, হারকিউলিস, জীবনী, নাটক সবই ছিলো প্রিয়। কলেজে ওঠার পর এক চাচা তার মেয়ের জন্য বইটা ধার নিয়ে গেলো....কিন্তু বইটা আর ফেরত এলো না।চাচার মেয়ে নাকি প্রচ্ছদ ছিঁড়ে ফেলেছে! ভালোমানুষ চাচা ক্ষতিপূরণ হিসেবে নতুন চকচকে সুকুমার রচনাসমগ্র কিনে পাঠিয়েছে আমার জন্য। বইটা শেলফে রেখে দিলাম। একদিন যায়, দু'দিন যায়।নতুন বইটার দিকে তাকালেই অস্বস্তি হতো। কারণ এই বইয়ের সাথে আমার কোনো স্মৃতি নেই। দেখতে যদিও একই, আসলে একই বই না। আমার রাশি রাশি স্মৃতি, অসংখ্য টুকরো টুকরো আনন্দঘন মুহূর্ত, "মুগ্ধ এক অবোধ বালক" এর শৈশব, বিস্ময়, ভালোলাগা পুরনো সুকুমার রচনাসমগ্রের পাতায় পাতায় আটকে আছে, যেটা নতুন বইতে নেই।তৃতীয় দিনে আর পারলাম না। আব্বার কাছে নতুন বইটা দিয়ে বললাম আমার সাধের পুরনো বইটাই ফেরত আনতে। "বইয়ের ঘর" বই নিয়ে এমন অনেক স্মৃতি মনে পড়িয়ে দিলো। আশ্চর্য, এতোটা পথ হেঁটে এসেছি!!
"সকলের জীবনে বইয়ের স্মৃতির সঙ্গে জড়ানো থাকে কিছু ঘটনার অভিজ্ঞতা। এ হলো সে রকম বই-কেন্দ্রিক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অল্প কয়েকটা বৃত্তান্ত।"
আমাদের পাঠকদের সবারই একটা বইয়ের ঘর করার স্বপ্ন থাকে, না? ভাবা যায় নিজের একটা বিশাল বইয়ের ঘর থাকবে, সেই ঘরে নিজের কেনা পছন্দমতো বই থাকবে, যখন ইচ্ছে তখন বই পড়া যাবে। এখন বলা যায় আমার কিন্তু এরকম একটা ঘর আছে, তবে আরো অনেক বই কিনা বাকি আছে, যেগুলো লেখকের মতোই আস্তে-ধীরে কিনে ফেলতে হবে।
এখানে আমরা লেখক শঙ্খ ঘোষ কে পাইনা বরং পাঠক শঙ্খ ঘোষের দেখা পাই। যে কিনা তাঁর বইয়ের ঘর গড়ে তোলার টুকরো টুকরো স্মৃতি বলেছেন। স্কুল থেকে শুরু করে বড় হওয়া পর্যন্ত কিভাবে দুষ্প্রাপ্য সব বই পড়েছেন এবং নিজেই সে বই সংগ্রহ করেছেন।
আমার কাছে লেখাটায় কিছু একটা মিসিং মনে হয়েছিল, যেমন স্মৃতিচারণাটা আরেকটু মধুর হতে পারত। তবুও পড়তে বেশ ভালোই লেগেছে। হালকা মেজাজের বই পড়তে চাইলে টুক করে পড়ে ফেলতে পারেন। অনেক ছোট একটা বই।
আমরা যারা নিয়মিত বই পড়ি, কিনি আর বইয়ের আলাপ করি তাদের প্রত্যেকের আছে বইয়ের সাথে ঘটে যাওয়া সহস্রাধিক স্মৃতিবিস্মৃতি। আমরা সবাই বইয়ের ঘরের মতো আরেকটা বই ইচ্ছে করলেই লিখতে পারি।
শঙ্খ ঘোষের 'বইয়ের ঘর' যেন আমাদেরই কথা বলে। আমাদের স্মৃতিকাতর করে। আমাদের অতীতে নিয়ে যায়, বর্তমানে ভালো থাকতে বলে বইয়ের সাথে। এবং ভবিষ্যতে আমাদের বন্ধন যাতে বইয়ের সাথেই থাকে সে কথাও মনে করিয়ে দেয়।
বইয়ের সাথে আমাদের সকলের অনেক হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, হারানো-পাওয়ার স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
যেমন ২০২১ সালে বইমেলাতে একদিন বই কেনার জন্য ৩০ হাজার টাকা নিয়ে গিয়েছিলাম। বই কিনে শেষ করে যখন পকেটে হাত দিই নীলক্ষেত থেকে শ্যামলী আসতে ১০ টাকা বাস ভাড়ার জন্য তখন খেয়াল করি যে পকেটশূন্য। তারপর বাধ্য হয়ে এক বস্তা বই মাথায় করে হাটতে হাটতে আমার গন্তব্যে চলে আসি। একটুকুও খারাপ লাগেনি, ক্লান্ত হইনি। বরং বইগুলোর ভারত্বে নিজেকে নিস্তার আর হালকা মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল আমার মতো ধনবান মানুষ জগতে আর দ্বিতীয়টি নেই৷
আর এখন তো আমি পুরোপুরি বইয়ের রাজ্যের রাজা বনে গিয়েছি। সকাল ১০টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত থাকি বইয়ের দুনিয়ার। বইয়ের সাথে আনন্দ( লোকে বলে কাজ) করি। বই নিয়ে কথা বলি।
যখন রাতে বাসে বসে বই পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে বাসায় নিজের বইয়ের ঘরে আসি তখন আমার বইগুলো বলে উঠে, 'বইয়ের ঘরে স্বাগত বন্ধু কাব্য'। আর আমি শঙ্খ ঘোষের বইয়ের ঘরের কবিতাটা আমার বন্ধুদের আবৃত্তি শোনাই আর নিজেও লিখে ফেলি আমার বইয়ের ঘরের কবিতা। তাদের শোনাই। তারপর তাদের আনন্দে আমার আনন্দ জেগে ওঠে।
আরও কত কিছুই তো লিখতে ইচ্ছে করছে। বইয়ের জন্য প্রিয়কে হারানো কিংবা প্রিয়র জন্য বইকে। সুইসাইডাল থেকে বইয়ের আনন্দে বই যখন ব্ল্যাকমেইল করে বাঁচতে শেখায় সুন্দর এই পৃথিবীতে তখন তো বইয়ের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করাকে মনে হয় যেন উন্নতির লোভে না পড়ে শুধুমাত্র আনন্দের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়া। এরই মাঝে তো আনন্দ। আর আনন্দের সাগরে জীবন। বইয়ের পাতায় দুনিয়া ভ্রমণ কিংবা বইয়ের পাতায় নিরর্থক এই জীবন অর্থবোধক করে তোলা।
বইয়ের জন্যই বেঁচে আছি। বইহীনা জীবন যেন মরণেরও অধিক। বইয়ের আলাপ করাও যেন বই পড়ার আর কেনার মতো শান্তির কাজ। যেন আমি আমাকেই খুঁজে পেলাম বইয়ের মাঝে বইয়ের ঘরে।
বইয়ের ঘরকেই ভালোবেসে যাব। বইয়ের ঘর নিয়েই থাকব। বইয়ের কাজ নিয়ে বাঁচব। বইয়ের জন্যই তো জীবনটা উৎসর্গ করে দিয়েছি সেই কবে যেদিন নতুন জীবন পেয়েছিলাম বইকে ভালোবাসে। আর বইও আমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে বোকা লাজুক প্রেমিকার মতো।
বইকে আমি যতই ভালোবাসছি বই ততই গভীরভবে আমার কাছে আসছে, কথা বলছে, ভালোবাসছে। ভালোবাসি বইয়ের ঘর তোকে।
অফিসে কাজ চলছে, ডেস্ক বেদখল, সেই সুবাদে আজ ক্যাফে কর্নারের পাশে বসে অনেকক্ষণ বই পড়া গেছে। শঙ্খ ঘোষের ‘বইয়ের ঘর’ শেষ করে A Farewell to Gabo and Mercedes এর পঁয়তাল্লিশ পাতা পড়তে পেরেছি। বইয়ের ঘরের সন্ধান দিয়েছিলেন সঞ্জীবদা। তিনি প্রায়ই এমন মূল্যবান বইয়ের সন্ধান দেন!
গল্পগুলো সম্ভবত আমাদের সবার। সেই ছোটবেলায় কারো (নানু, রাঙা, মামাদের) আলমারি ভর্তি বই খুঁজে পাওয়া—সেখান থেকে পড়ার শুরু। তারপর অল্প অল্প করে নিজেদের বই কেনা। এটা অবশ্য এখনকার তুলনায় বলা। সেদিনও একজন আমাকে বলছিল, তুমি এত বই কেনো, দেখে দুঃখ হয়। কিন্তু এত বই সবসময় কেনার সুযোগ ছিল না। রাঙা বই কিনে দিত, মা বই কিনে দিত। পড়া শেষ হতো, এক বই অসংখ্যবার পড়তাম। ‘নায়ীরা’ দশবারের কম পড়িনি।
এসব কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল বইয়ের ঘর পড়ার সময়। আর কবি-সাহিত্যিকদের নামগুলো আন্ডারলাইন করে রাখছিলাম। মনে হচ্ছিল, এখনই উঠে গিয়ে খুঁজে বের করি, তাঁদের কী কী বই আছে বাতিঘরে। রবী��্দ্রনাথ সমগ্র শঙ্খ ঘোষ কিনেছিলেন তিন বছর ধরে। রেক্সিনে বাঁধাই করা মেরুন রঙের এডিশনটা! এটা পড়ার কিছুক্ষণ পরই সিদ্দিক ভাই এসে হাজির হলেন�� জিজ্ঞেস করলাম, সেটটার দাম কত হবে আর মোট কয় খণ্ড। দামটা শুনে মনে হলো, কেনা অসম্ভব হবে না!
আর হঠাৎ করে জীবনান্দের হাতের লেখাসহ বই পেয়ে যাওয়া! ভেবেই তো গায়ের লোম সব খাঁড়া হয়ে যায়! আমাদের অ্যাকাউন্টসের ভাইয়া একবার বিল করার সময় জানিয়েছিলেন, ‘পুস্তানি’ হলো বইয়ের একদম শুরুর আর শেষের পাতা। মানে মলাটের সাথে লাগানো থাকে যে পাতাগুলো। এই বইয়ে শব্দটা পেয়ে কী ভীষণ ভালো লাগল!
লেখকের বই পাবার ভাগ্যটা! সেটাও মিলে গেল! আর শেষমেষ নিজের একটা বইয়ের ঘর হওয়ার আনন্দ! ভূমিকার শুরুর লাইন, ‘এ-রকমও একটা বই যে লেখা হয়ে যাবে, তা আমার দূরতম কল্পনাতেও ছিল না।’ ভূমিকাটা লেখা হয়েছিল উনিশশো ছিয়ানব্বই সালে। আজ প্রায় পঁচিশ বছর পর লাইনটা পড়ে আমি কতবার যে মনে মনে বললাম, ‘ভাগ্যিস!’
পড়ুয়া মাত্রই বই বিলাসী। বই আর বই সংশ্লিষ্ট তথ্যে ভরা থাকে পড়ুয়ার চতুষ্কোণ। একটা সুখপাঠ্য বই হলেই হয়,পড়ুয়া সব ভুলে যেতে রাজি,ঐ বই পড়ার বিনিময়ে।
পড়ুয়ার সাত রাজার ধন "বই"।
এই যে পরম প্রিয় বস্তু বই,এটা সংগ্রহের পেছনে কত শত গল্প থাকে। গল্পগুলো সব সময় খুব প্রীতিকর হয়। সেসব গল্প সবাই বলে না,কেউ কেউ বলে। তেমন-ই একজন শ্রদ্ধেয় কবি শঙ্খ ঘোষ। লেখক তাঁর বই নিয়ে যত স্মৃতি আছে,সেই স্মৃতির তোরঙ্গ খুলে বসেছেন পাঠকের সামনে। এত মনোহর সেসব আখ্যান, পড়তে পড়তে কখন ১৮৩ পৃষ্ঠা'র একটা বই শেষ হয়ে গেল বুঝতেই পারিনি। অবশ্য শুধু এই বইয়ের জন্য নয়,শঙ্খ ঘোষের গদ্য সব সময় স্বাদু,পড়ে একটা তৃপ্তি পাওয়া যায় যেমন টা আমি পাই লাড্ডু খাওয়ার পর।
"বইয়ের ঘর" ছিল এই বইয়ের শেষ গদ্যের নাম। এটিই আমার সবচে বেশি ভালো লেগেছে,বিশেষ করে কবিতাটা। আমারো একটা বাসনা আছে, কবি-র মতো একদিন আমারো হবে একটি "বইয়ের ঘর"। যে ঘরে আমার বইয়েরা যাপন করবে তাদের দিন-রাত্রি,সঙ্গ দিবে আমাকে কোন দুঃসহ কোন দূর্যোগে...
ভাল্লাগে না রোগে ধরেছে বহুদিন। বান্ধবী তানিসার কাছে একটা সহজ সুন্দর বই চাইলাম, পেলাম একে। বইটি পড়ে সবচেয়ে বড় যে অনুভূতি, সেটা হলো আক্ষেপ, বেশ গভীর ই বলা যায়। কারণ হিসেবে বলবো, লেখকের প্রতি হিংসা আর 'দুই দিনের জীবনে এত এত বই পড়া সম্ভব না' জাতীয় আত্মোপলব্ধি। প্রতি পাতা উল্টাতে গিয়ে খুব হাহাকার লাগছিল, ইশ, কিছুই তো পড়া হয় নি এখনো।
লেখনী ঠিক যেমনটা আমি চাই, খুব সামান্য জিনিসকেও মনে হবে কত মহিমাময়, কত সুন্দর।
আমার বই পড়তে ভালো লাগে। না পড়লেও হাতে নিয়ে বসে থাকতে ভালো লাগে। হাতে না পেলেও চোখ ভরে দেখতে ভালো লাগে। বই নিয়ে লেখা এই বইয়ে কল্পনার চোখে অনেক বই দেখেছি, আমার ভালো লাগছে।
এই যে আমরা বই পড়ে আনন্দ পাই, বিরক্ত হই, কাঁদি অথবা হাসি; এই যে একেকটা বইয়ের সাথে একেক রকম স্মৃতি মিশে থাকে, লুকিয়ে থাকে কোন শীতের রাতে কম্বল মুড়ি দেয়া, পড়ার বইয়ের ফাঁকে লুকানো, ট্রেনের অবিরাম ঝিকঝিক শব্দ অথবা বর্ষাদিনের বিষণ্ণ স্মৃতি- এই গল্পগুলো আমাদের একান্তই ব্যক্তিগত। পাঠকের হাতের বই আর বই হাতে ধরা পাঠক, এই দুজনের মাঝেই অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের উপাখ্যান রচিত হয় আপনা-আপনি।
লেখক মাত্রই পাঠক- এর ব্যতিক্রম হয় না, হতে নেই। কবি শঙ্খ ঘোষ, গল্পকার শঙ্খ ঘোষ যেমন একদিকে পরিচয়, ঠিক তেমনি আরেকটা পরিচয় পাঠক শঙ্খ ঘোষ। বইয়ের ঘর আমাদেরকে শঙ্খ ঘোষের সেই আরেকটা পরিচয়ের সাথেই পরিচিত করিয়ে দেয়। শৈশবের বইপড়া থেকে শুরু করে স্বাধীনমতো যথেচ্ছ বই কিনতে পারার সূচনা পর্যন্ত নানারকমের স্মৃতিকথা নিয়ে রচিত "বইয়ের ঘর।" নতুন বই হাতে নেয়ার আনন্দ, হারানোর কষ্ট, দুর্লভ বই স্পর্শ করার উত্তেজনা, অসাবধানতায় মূল্যবান বই হারিয়ে ফেলা, বইয়ের সাথে জড়িত আপনজন, তৎকালীন বাঙালিজীবন আর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ- সব অনুভূতির এক চমৎকার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই বইয়ে।
স্বয়ং লেখকই বলেছেন, এ লেখা কোন জ্ঞানের কথা নিয়ে নয়, বইপড়ার কোন তথ্যবাহী ইতিহাসও নয়। সবার জীবনে বইয়ের স্মৃতির সাথে জড়ানো থাকে কিছু ঘটনারও অভিজ্ঞতা। এ হলো সে-রকম বই-কেন্দ্রিক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অল্প কয়েকটা বৃত্তান্ত।
প্রথম গল্প হাতপাবাঁধা হনুমান থেকে শুরুর অংশটা তুলে দিলাম-
"আবারও কি তবে হারিয়ে ফেললাম বইখানা? আগেও হারিয়েছিলাম একবার। সেটা টের পাবার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়েছিল অল্প বয়সের একটা অংশই যেন হারাল আমার জীবন থেকে। সেটা যে বইয়ের ভিতরকার কোন মহিমার জন্য, তা কিন্তু নয়। সেটা তার চারপাশে ঘিরে থাকা অনুষঙ্গের জন্য। ভিতরের কথাগুলি ছাড়াও আরো কত সম্পদ থাকে বইয়ের, থাকে কত ব্যক্তিগত মুহূর্তের স্তবকে স্তবকে খুলে যাওয়া স্মৃতি, কোনো একখানা বই হাতে নিলে যেন কোনো নিজস্ব জীবনাংশই জেগে ওঠে তাই। কোনো বইয়েরই কোনো বিকল্প-বই হতে পারে না, একই সংস্করণের একই মুদ্রণের হলেও তা হয় না। প্রত্যেকটা বই-ই জেগে থাকে তার একলা গরিমায়, একক ইতিহাসে।"
ভালো কথা, বইয়ের ঘর নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ঘরে বই আসার পেছনের কথা চলে আসে। এই বইটা রেজওয়ান ভাইয়ের কাছ থেকে উপহার পাওয়া!
তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি,হঠাৎ একদিন ক্লাসে গিয়ে কয়েকজন বন্ধু মিলে একটা বই দেখছে উল্টে পাল্টে। তাদের কাছে গিয়ে জানতে পারলাম, বইটার নাম "কিশোর আলো"। এই কিশোর আলো দিয়ে আমার বই পড়ার হাতেখড়ি। কিন্তু,মুসকিল হতো সব মাসে কিশোর আলো কিনতে গিয়ে, অনেক কষ্টে বাঁচাতাম পঞ্চাশ টাকা।
পরিচয় হওয়ার পর থেকে প্রত্যক মাসে আমার কিশোর আলো পড়া চলত। একদিন বাড়িতে আমার দাদা বেড়াতে আসে,তার সাথে বই পড়া নিয়ে আলাপ আলোচনা হলো। তখন আমি জানতে বইয়ের জগতের বিশালতা। মূলত তখন থেকে বই পড়ার শুরু আমার। কিন্তু টাকার অভাবে কাগজের বই কিনতে পারতাম না,দাদার কাছে শুনেছিলাম পিডিএফ এর কথা। পিডিএফ পড়েই আমি শান্ত থাকতাম। পিডিএফে এত বই পড়েছি যে এখন পিডিএফ বললে চোখে অন্ধকার দেখি।
যাই হোক,ক্লাস এইট থেকেই আমি টুকটাক করে পড়তে শুরু করি। প্রথম পড়েছিলাম হুমায়ূন আহমেদ এর " নলিনী বাবু বিএসসি",তারপর "আমার বন্ধু রাশেদ"। আমার বন্ধু রাশেদ,বইটার রেশ কাটতে আমার অনেক দিন লেগেছিল। এভাবে করে জাফর ইকবাল স্যার অনেক বই পড়েছি স্কুলে থাকাকালীন সময়ে। তখন এত কিছু বুঝতাম না,জাফর ইকবাল নাম দেখলেই নিয়ে পড়া শুরু। এভাবে করে শুরু হয় আমার বইয়ের জার্নি,এখনো চলছে,সব কিছু ঠিক থাকলে চলতে থাকবে। তবে আফসোস একটাই, বই পড়ার জন্য একজীবন বড্ড কম সময়।
এবার " বইয়ের ঘরে" বইয়ের কথায়,এই লেখক শঙ্খ ঘোষ উনার শৈশবের বই পড়া থেকে শুরু করে বই সংগ্রহের গল্প বলেছেন।এত চমৎকার ভাবে ছোট ছোট খন্ডে ভাগ করে লেখক গল্পগুলো বলপছেন যে পড়ে বড় আরাম পেয়েছি। আর যাই হোক,অসংখ্য নতুন বইয়ের নাম জানার জন্য হলেও সবার এই বই পড়া দরকার।
লেখক কি লিখবেন তা হয়তো পরিকল্পনা করে রাখেন না আগে থেকে, হুট করেই দারুন কিছু লিখে নিজেই হতবাক হয়ে যান কখনও সখনও।
স্নেহভাজন শৌনক লাহিড়ী ও একরাম আলি এর চাপাচাপি তে " আজকাল" পত্রিকার জন্য লেখা র বিষয় খুজতে গিয়ে "ধূসর পান্ডুলিপি " বইয়ের প্রথম সংস্করণ এর মত দুর্লভ বইটা নিয়েই লেখার কথা ভাবেন। তবে লিখতে গিয়ে উঠে আসে বই নিয়ে বিচিত্র সব বিষয়। ছোট বেলার একটা রামায়ন, তার ছবি গুলো নিয়ে সেই ছবির ভঙ্গিতে স্ট্যাচু সেজে বাচ্চা বয়সটা পার করেছেন, একদিন সেই বইটা যায় হারিয়ে। তাতে ছিলো সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের তারিখ সহ সই। হারিয়ে যাওয়া সেই বই পথের পাশে খুজেও পরে আর পেলেন না।
তবে না হারিয়েও পেয়েছেন অমূল্য কিছু বইয়ের প্রথম সংস্করণের কপি। অনেকের কাছে এটার ততোটা মূল্য না থাকলেও লেখকের কাছে তা অমূল্য এক সম্পদ। বাংলা সাহিত্যের ছাত্র হয়ে কেন ইংরেজি বই পড়বেন তা নিয়েও খোটা শুনেছেন শিক্ষকদের কাছে। আবার লোভনীয় কোন বই দেখে ভয় কে জয় করে অনেক সাহস নিয়ে শিক্ষকের কাছে পড়তে চেয়েও পান নাই, এতে নিজের প্রতিজ্ঞাকে করেছেন আরও দৃঢ়।
২৫ টি শিরোনামে ছোট ছোট করে বিভিন্ন সময়ে বই নিয়ে স্মৃতি মূলত "বইয়ের ঘর"। ছোট বয়স থেকে পড়া বই আবার বয়সের কারনে পড়তে না পারা বইয়ের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা টা লেখক তুলে এনেছেন। নিজের কারনে হারিয়ে ফেলা বই আবার কুড়িয়ে পাওয়া বই, একই সাথে বিভিন্ন সময়ে উপহার পাওয়া বইয়ের সাথে মিলেমিশে আছে মধুর সব স্মৃতিই তীব্র ভাবে মিশে আছে লেখকের মনে। টুকরো টুকরো স্মৃতি অথচ কি জীবন্ত। বই যারা পড়েন বা লেখেন তাঁদের বই নিয়ে নানান ঘটনা থাকবে জীবনে এটা স্বাভাবিক তাই বলে সে ঘটনা এতোটা মধুরও মমতা মেশানো হবে ভাবাই যায় না। কি আকুলিবিকুলি একটা বইয়ের জন্য যেখানে বয়স কোন ব্যাপারই না।
ছোট একটা বই তাতে অজস্র নতুন নতুন সুন্দর সব নাম না জানা বইয়ের নাম জেনে প্রবল আনন্দের সাথে ডিপ্রেশনে চলে গেলাম আমি।
প্রতিটা বই পড়ুয়া মানুষের বই নিয়ে নানান রকম স্মৃতি আছে। ভালো লাগা, মন্দ লাগা, নতুন কোন বই পাওয়ার আনন্দ, প্রথম সংস্করণ খুঁজে পাওয়ার আনন্দে আত্মহারা হওয়ার কত রকম গল্প। লেখকের কত রকম স্মৃতির ভেতর দিয়ে গেলাম। এ এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। বইটা ভালো লাগলো খুব!
'বইয়ের ঘর' লেখক শঙ্খ ঘোষের লেখনীতে পাঠক শঙ্খ ঘোষের আত্মচরিত । বই শুধু একটা বস্তু নয়, বই একটা অনুভূতি - এই ভাবনাটিকে স্পষ্ট ভাষায় রূপদান করেছেন শঙ্খবাবু এই বইতে তাঁর 'হাতপাবাঁধা হনুমান' প্রবন্ধটিতে ...
"একটা বই হারিয়ে যাওয়া অল্প বয়সের একটা অংশ হারিয়ে যাওয়ার সমান । সেটা যে বইয়ের ভিতরকার কোনো মহিমার জন্য, তা কিন্তু নয় । সেটা তার চারপাশে ঘিরে থাকা অনুষঙ্গের জন্য । ভিতরের কথাগুলি ছাড়াও আরো কত সম্পদ থাকে বইয়ের, থাকে কত ব্যক্তিগত মুহূর্তের স্তবকে স্তবকে খুলে যাওয়া স্মৃতি, কোনো একখানা বই হাতে নিলে যেন কোনো নিজস্ব জীবনাংশই জেগে ওঠে তাই । কোনো বইয়েরই তাই কোনো বিকল্প-বই হতে পারে না, একই সংস্করণের একই মুদ্রণের হলেও হয় না তা । প্রত্যেকটা বই জেগে থাকে তার একলা গরিমায়, একক ইতিহাসে ।"
এর থেকে স্পষ্টভাবে বই হারানোর অভিব্যক্তি এবং হারানো বইয়ের প্রতি আকুতি প্রকাশ বোধহয় সম্ভব নয় ।
বইটির প্রতিটি প্রবন্ধে আমরা পাই শৈশব থেকে শুরু করে শঙ্খবাবুর বই পড়ার ক্রমবর্ধমান লেখচিত্র । সুন্দরকাকুর ট্রাঙ্ক থেকে লুকিয়ে বই পড়া, হেমেন্দ্রকুমার রায়ের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজের স্বাদগ্রহণ (যা নাকি ছিল 'নাচ আরম্ভের প্রথম ডমরুধ্বনি'), নাটকের অছিলায় ন বছর বয়সে 'মুক্তধারা' য় আবেশন, 'চৈতালি', 'ক্ষণিকা', 'উৎসর্গ' ও অন্যান্য রবীন্দ্রসাহিত্যে নিমজ্জন - এহেন এক বৈচিত্রময় সাহিত্যধারার সংসর্গে নিজেকে গড়ে তোলার নানা কাহিনী লেখক অত্যন্ত স্বাদু গদ্যে তুলে ধরেছেন প্রবন্ধগুলির পাতায় পাতায় । তারপর ক্রমে ক্রমে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন নানা দূর্লভ বই পাঠ ও প্রাপ্তির আনন্দ, হারিয়ে ফেলার বিষাদ, প্রেসিডেন্সির বাইরের রেলিঙে ঝুলে থাকা চেনা মলাট হঠাৎ খুঁজে পাওয়ার নির্মল আনন্দ, এইরকম নানা স্মৃতি ছড়িয়ে আছে পাতায় পাতায় ।
এই বইটি থেকে একটি বিশাল প্রাপ্তি বহু দূর্লভ বই সম্বন্ধে জানতে পারা, রবীন্দ্রসাহিত্য এবং পাঠকসমাজে তার প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে নানা খুঁটিনাটি তথ্যের উপলব্ধি এবং বইয়ের নানা সংস্করণ বিষয়ে সুক্ষাতিসুক্ষ তথ্য আহরণ । কে জানত রবীন্দ্রনাথের 'কবিকাহিনী' বইটির প্রথম সংস্করণের কিছু মুদ্রণে মুসোলিনিকে লেখা কবিগুরুর এক চিঠির প্রতিলিপি প্রকাশিত হয়েছিল । বই ছাপা হয়ে যাবার পরে অনেকের কাছে অনভিপ্রেত মনে হওয়ায় পাল্টে ফেলা হয়েছিল, কেবল অগ্রিম বাঁধিয়ে ফেলা ইতস্তত কয়েকখানা বই বাদ পড়ে যায় আর তারই একখানা দৈবক্রমে লেখকের হাতে এসে পড়ে । এইরকম বহু অমূল্য স্মৃতির টুকরো ছড়িয়ে আছে 'বইয়ের ঘর' এর পাতায় পাতায় যা প্রতিটি বিধগ্ধ পাঠককে সমৃদ্ধ করবে ।
শঙ্খ ঘোষ তার স্বভঙ্গিমাতেই একেবারে তার ছোট বেলা থেকে বড়বেলা পর্যন্ত তাঁর পড়া, সংগ্রহ করা আর হারিয়ে ফেলা বিভিন্ন বই নিয়েই স্মৃতিচারণ করেছেন। খুব অদ্ভুতভাবেই সেই স্মৃতিচারণেই উঠে এসেছে বেশ দুষ্প্রাপ্য কিছু বইয়ের কথা। বই লেখার পিছনের কথা। কলকাতার স্মৃতিচারণ। কলকাতায় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো আর পুরনো বইয়ের দোকানগুলির কথাও উঠে এসেছে এই বইতে।
আপনি যদি বইপ্রেমি হন, নিদেনপক্ষে আমার মতন বই জিনিশটা পছন্দ করেন, শঙ্খ ঘোষ সম্ভবত এই বইটা আপনার আর আমার জন্যেই লিখেছেন।।
আশ্চর্য হয়েছি, এতোদিন আগের পড়া বই ও তাদের নিয়ে বিস্তীর্ণ স্মৃতিচারণ কতো আদরের সাথে উপস্থাপিত হয়েছে এই বইতে। ছোটবেলায় বইগুলো শুধু সাদা কাগজের গায়ে কিছু কালো হরফের সন্নিবেশ নয়, বরং শিশুমনের তাবৎ কল্পনার জগতে প্রবেশের উপায়ক ও একই সাথে অনুঘটক। তাই আমরা এই বইতে দেখি শঙ্খ ঘোষ কতো সুন্দর করে ছেলেবেলা ও কিশোর বয়সে তার সংগ্রহে থাকা বই, যেসব বইয়ের সান্নিধ্যে তিনি এসেছেন, তাদের নিয়ে লিখেছেন, তাদের পেছনের কাহিনী নিয়ে লিখেছেন, সাথে যেসব মানুষের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠেছে বইয়ের সুবাদে, তাদের কথা টেনেছেন সরল গদ্যে। শঙ্খ ঘোষের চিরায়ত ভঙ্গিতে লেখা সুখপাঠ্য বই। (অনেক সময় নিয়ে ফেলেছি এটা পড়তে। অফিসের ব্যস্ততার ফাঁকে একটা দুটো করে পড়তাম কাজের চাপ হালকা করার জন্য। চাইলে দুদিনেই শেষ করা সম্ভব)
কবিদের লেখা গদ্য এত্ত সুস্বাদু হয় কেন! এর আগে শঙ্খ ঘোষের আত্মজৈবনিক উপন্যাস ত্রয়ী পড়েছিলাম, খুব ভালো লেগেছিল। এছাড়া ভাস্কর চক্রবর্তী, মণীন্দ্র গুপ্তের লেখা পড়েও মুগ্ধ হয়েছি।
বইয়ের ঘর, নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে বইয়ের বিষয়বস্তু ‘বই’। এই বইতেই আবার এমন বই নিয়ে প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে, যেই বইটিও কিনা বই নিয়েই লেখা! মেটাস্য মেটা ব্যাপার-স্যপার আরকী। ছোট থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত নিজের পড়া বই, নিজেদের বাড়িতে থাকা বই, লাইব্রেরির বই, হারিয়ে ফেলা বই, উপহার পাওয়া বই; বই জুড়ে শুধু বই, বই আর বই। এমন বই ভালো না লেগে পারে?